leadT1ad

প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল ও ফোর্সেস গোল ২০৩০: বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে বড় পরিবর্তনের পদধ্বনি

নিজেদের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ। ছবি: উইকিপিডিয়া

বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়নে ২০০৯ সালে গ্রহণ করা হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কেবল সরঞ্জাম কেনায় সীমাবদ্ধ না থেকে ‘প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল’ গড়ে তোলার মাধ্যমে সামরিক স্বনির্ভরতার এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল বলতে মূলত এমন একটি বিশেষায়িত ভৌগোলিক অঞ্চলকে বোঝায়, যেখানে সামরিক সরঞ্জাম, উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন, প্রযুক্তিগত গবেষণা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি অংশীদারিত্বের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত শিল্প হাব গড়ে তোলা হয়। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে সামরিক চাহিদা পূরণ করা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সরবরাহ চেইনে যুক্ত হওয়া।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্ত কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত মাইলফলক। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বর্ম তৈরির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। এই শিল্পাঞ্চল জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উচ্চ-প্রযুক্তি বিকাশে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এরমাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন কেবল একজন ক্রেতা নয়, বরং একটি উদীয়মান সামরিক-শিল্প শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে।

২.

প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল: আমদানিকারক থেকে উৎপাদক হওয়ার পথে যাত্রা

এতদিন বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের কাতারে থাকলেও মিরসরাইয়ে ৮৫০ একর জমিতে প্রস্তাবিত ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ এই আমদানিনির্ভরতার ধারাকে আমূল বদলে দেবে। প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদেশি অস্ত্রের ক্রেতা থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম উৎপাদনকারী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির এই পদক্ষেপ জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ চেইনে একটি শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

মিরসরাইয়ের কৌশলগত গুরুত্ব: ভূ-রাজনীতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের সমন্বয়

মিরসরাইয়ের ভৌগোলিক অবস্থান সমুদ্রবন্দরের সন্নিকটে হওয়ায় এবং শিল্পনগরের উন্নত অবকাঠামো বিদ্যমান থাকায় কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদিত সামরিক পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা সহজ হবে। কৌশলগতভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, পূর্বে নির্ধারিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের ৮০ একর জমি এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা, যা জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি সাহসী ও স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় বার্তা। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি শিল্পাঞ্চল স্থাপন নয়, বরং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের সার্বভৌম অবস্থানের একটি শক্তিশালী প্রতিফলন।

বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থান: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত

প্রতিরক্ষা শিল্পের নতুন এই নীতিমালায় শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের শিল্পখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এর ফলে দেশে উচ্চ-প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং হাজার হাজার দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ানের জন্য উচ্চমানের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী শক্তি ও দক্ষতা যুক্ত হওয়ায় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থায় গতিশীলতা আসবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্প কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং বেকারত্ব হ্রাসে একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

৩.

তুরস্ক-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব: নতুন প্রতিরক্ষা কূটনীতির ভিত্তি

বাংলাদেশের বর্তমান প্রতিরক্ষা কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তুরস্ক, যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর কেবল সাধারণ ‘ক্রেতা-বিক্রেতার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই অংশীদারত্ব বর্তমানে একটি গভীর কৌশলগত মৈত্রীতে রূপ নিয়েছে, যেখানে তুরস্ক বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। এই সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভর সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদন: সামরিক স্বনির্ভরতার মাইলফলক

তুরস্কের বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান রকেটসান এবং অ্যাসেলসান-এর কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশে উন্নতমানের কামানের গোলাবারুদ এবং আধুনিক গাইডেড মিসাইল তৈরির মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একইসাথে তুরস্কের আনকা ও বায়রাক্তার ড্রোনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিং হাব বাংলাদেশে স্থাপনের মাধ্যমে দেশীয় ড্রোন শিল্পের বিকাশের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ার ফলে বাংলাদেশ কেবল বিদেশি যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর না করে নিজেরাই উন্নত সামরিক প্রযুক্তির মালিকানা লাভ করবে। এরফলে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

ন্যাটো স্ট্যান্ডার্ড ও শর্তহীন অংশীদারিত্ব: বাংলাদেশের কৌশলগত সুবিধা

তুরস্কের সামরিক সরঞ্জামগুলো ন্যাটো স্ট্যান্ডার্ডের হওয়ায় এগুলোর গুণগত মান বিশ্বমানের, যা বাংলাদেশের বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করছে। অথচ এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো কোনো কঠিন রাজনৈতিক শর্তারোপ নেই, যা বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথকে সুগম রাখে। উচ্চমান এবং নমনীয় শর্তের এই সমন্বয় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতির জন্য একটি বিশাল কৌশলগত সুবিধা হিসেবে কাজ করছে। এই ভারসাম্যের ফলে বাংলাদেশ কোনো বড় শক্তির ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে না পড়ে নিজের সামরিক সক্ষমতা নির্বিঘ্নে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হয়।

৪.

ফোর্সেস গোল ২০৩০: আধুনিক ও চৌকস বাহিনীর রূপরেখা

বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা আমূল বদলে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর মূল উদ্দেশ্য হলো সশস্ত্র বাহিনীকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও বহুমুখী শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রতিটি বাহিনীর অবকাঠামো উন্নয়ন, উন্নত সমরাস্ত্র সংগ্রহ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক অভেদ্য প্রতিরক্ষা বর্ম তৈরি করা হচ্ছে। কেবল সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মাধ্যমেই এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা বাংলাদেশকে অদূর ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করবে। এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া কেবল সরঞ্জামের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং বাহিনীর সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি স্তরে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্ত কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত মাইলফলক। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বর্ম তৈরির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের তিন বাহিনীতে সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চলছে। সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হচ্ছে আধুনিক ভারী সরঞ্জাম, উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন আর্টিলারি এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল আধুনিকায়নে। নৌবাহিনীতে ইতোমধ্যে সাবমেরিন ও আধুনিক ফ্রিগেট যুক্ত হয়ে ত্রিমাত্রিক সক্ষমতা নিশ্চিত হয়েছে এবং এখনকার মূল লক্ষ্য হলো দেশীয় ডকইয়ার্ডগুলোতে উন্নত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করে ব্লু-ইকোনমি রক্ষা করা। বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করতে চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট সংগ্রহ এবং আকাশসীমা সুরক্ষায় সর্বাধুনিক রাডার সিস্টেম স্থাপনের প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রতিটি বাহিনীর এই উন্নয়ন কার্যক্রম অত্যন্ত সুসমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যাতে যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ মোকাবিলায় বাংলাদেশ একটি দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করতে পারে।

৫.

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব: আঞ্চলিক ভারসাম্যের পরিবর্তন

বাংলাদেশের এই পরিকল্পিত সামরিক উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার প্রথাগত ভূ-রাজনীতিতে বেশ কিছু নতুন এবং শক্তিশালী সমীকরণ তৈরি করছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং যেকোনো বাহ্যিক চাপ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলবে।

কৌশলগত ভারসাম্য ও ভূ-রাজনৈতিক স্বকীয়তা

প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য চীন ও রাশিয়ার ওপর দীর্ঘদিনের অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে তুরস্কসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে অংশীদারত্বের বিস্তার বাংলাদেশের কূটনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই বহুমুখীকরণ কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ের বাইরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বতন্ত্র অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে। নিজস্ব শিল্পাঞ্চল এবং প্রযুক্তির উৎস পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করবে। এরফলে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের ওপর নির্ভরশীল না থেকে জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন বাংলাদেশের জন্য আরও সহজতর হবে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সক্ষমতার টেকসই উন্নয়ন

মিয়ানমারের সঙ্গে বিদ্যমান সীমান্ত সংকট এবং বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে বাংলাদেশ এখন আর কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নেই। নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল স্থাপিত হলে যেকোনো জরুরি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সময় বিদেশের মুখাপেক্ষী না থেকেই দীর্ঘ সময় নিজস্ব শক্তিতে সামরিক কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হবে। এটি কেবল গোলাবারুদ বা অস্ত্রের যোগান নিশ্চিত করবে না, বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার এক শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেবে। এই স্বনির্ভরতা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও অপরাজেয় করে তুলবে এবং যেকোনো উস্কানি মোকাবিলায় তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা জোগাবে।

৬.

অর্থনৈতিক গুরুত্ব: জিডিপি ও রপ্তানি নীতিমালায় নতুন মাত্রা

বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি নীতিমালা পণ্যের বহুমুখীকরণ ও উচ্চ-প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে, যার সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই খাতটি কেবল জাতীয় ব্যয়ের ক্ষেত্র নয়, বরং উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ও খুচরা যন্ত্রাংশ বিশ্ববাজারে রপ্তানির মাধ্যমে এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি শক্তিশালী উৎসে পরিণত হতে পারে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে তা দেশের জিডিপিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।

রপ্তানি সম্ভাবনা: বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি

তুরস্কের বিশ্ববিখ্যাত প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের অংশীদার হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে ছোট অস্ত্র, উন্নত গোলাবারুদ এবং ড্রোনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ রপ্তানির বিশাল সুযোগ পাবে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং তুরস্কের ‘বায়রাক্তার ও ‘আনকা’ ড্রোনের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এই খাতের একটি শক্তিশালী উৎপাদন হাবে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রতিরক্ষা কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তুরস্ক, যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর কেবল সাধারণ ‘ক্রেতা-বিক্রেতার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই অংশীদারত্ব বর্তমানে একটি গভীর কৌশলগত মৈত্রীতে রূপ নিয়েছে, যেখানে তুরস্ক বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।

সুনির্দিষ্ট কারিগরি জ্ঞান অর্জনের ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোতে তুলনামূলক কম খরচে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে বাংলাদেশ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজার দখলের সম্ভাবনা রাখছে। এই রপ্তানি প্রক্রিয়া কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই করবে না, বরং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাণিজ্যে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ বা ভাবমূর্তিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি: ব্যয়ের বোঝা থেকে আয়ের উৎসে রূপান্তর

প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশে অসংখ্য লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠবে, যা সরাসরি জাতীয় উৎপাদন খাতে বড় ধরনের অবদান রাখবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়, যা সম্পূর্ণ ব্যয় হিসেবে গণ্য করা হলেও এই শিল্পায়নের ফলে তা সরাসরি আয়ের উৎসে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অভ্যন্তরীণভাবে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, যা পরোক্ষভাবে জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি করবে। তুরস্ক ও অন্যান্য বৈশ্বিক অংশীদারদের যৌথ বিনিয়োগের ফলে এই খাতটি আগামী এক দশকের মধ্যে জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য শতাংশ অবদান রাখবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন।

৭.

‘প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল’ স্থাপন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ভূখণ্ড বরাদ্দ নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার দৃঢ় অঙ্গীকার। ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর সঙ্গে এই শিল্পাঞ্চলের নিখুঁত সমন্বয় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ আর কেবল অস্ত্রের ক্রেতা নয়, বরং একজন গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী, এই শিল্পাঞ্চলটি হবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিনির্ভর এক আধুনিক হাব, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াবে।

মিরসরাইয়ের এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে সমরাস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানির এই যাত্রা জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি যেকোনো বহিঃশত্রুর জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সঙ্কটের মুহূর্তে বাংলাদেশ হবে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল। প্রযুক্তির স্থানান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির এই প্রক্রিয়া আগামী দিনে বাংলাদেশকে একটি ‘প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্তানিকারক’ দেশে রূপান্তর করার পথ প্রশস্ত করবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত