গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ মঙ্গলবার ২৫তম দিনে গড়িয়েছে। গতকাল থেকেই সংঘাতের পাশাপাশি সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার বিষয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়ে বলেছেন, একটি বৃহত্তর চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। ওদিকে ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, আমেরিকা এই অঞ্চলে আরও সেনা মোতায়েন করার জন্য শুধু সময়ক্ষেপণ করছে।
ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা পাঁচ দিনের জন্য পিছিয়ে দিয়েছেন। এর মাঝে ইরান ইসরায়েলের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো বারবার ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার খবর জানিয়েছে। লেবানন এবং ইরাকেও লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে।
ইরানের ভেতরের চিত্র
আলোচনা হচ্ছে দাবি করে ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনার ব্যাপারে ইরান ভীষণ সিরিয়াস। তবে ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই দাবি শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং সংসদীয় নেতারা ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘ফেক নিউজ’ এবং ‘ডাহা মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইরানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল এবং আর্থিক বাজারকে প্রভাবিত করতেই আমেরিকা এসব বানোয়াট দাবি করছে। এই অঞ্চলে আরও মার্কিন সেনা মোতায়েনই যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার (২১ মার্চ) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ইরান যদি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত করে গুঁড়িয়ে দেবে। সোমবার সেই সময়সীমা আরও পাঁচ দিনের জন্য বাড়িয়েছেন ট্রাম্প।
আন্তর্জাতিক চাপ ও এশিয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও ইরানের অবস্থান অনড়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
দ্য হিল পত্রিকার হোয়াইট হাউস কলামিস্ট নিল স্ট্যানেজের মতে, ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সম্মানজনক পথ খুঁজছেন। কারণ আমেরিকার ভেতরে এই যুদ্ধ একেবারেই জনপ্রিয়তা পায়নি। জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের দাম বাড়ায় উল্টো অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক মোহাম্মদ ভাল তেহরান থেকে জানান, ইরানি কর্মকর্তারা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিরোধের শক্তি প্রদর্শন করছে। মোহাম্মদ ভালের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পদক্ষেপ বা বার্তার প্রতি ইরানের গভীর সন্দেহ রয়েছে। ট্রাম্পের শান্তি আলোচনার দাবিকে তারা সময় কেনার কৌশল হিসেবেই দেখছে।
এই সপ্তাহেই তেহরানসহ দেশটির অন্যান্য শহরে বর্তমান সরকারের সমর্থনে এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিশাল জনসমাবেশ হয়েছে। বৃষ্টি ও বোমাবর্ষণের হুমকি উপেক্ষা করে এতে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র নিন্দা জানায়।
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুতর পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান তিনি।
উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি
গতকাল (২৩ মার্চ) কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার জবাব দিয়েছে। এক রাতেই অন্তত সাতবার বিপদের সাইরেন বেজেছে দেশটিতে।
একইদিনে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশকে লক্ষ্য করে আসা প্রায় ২০টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। ওই অঞ্চলে রাজ্যের বেশিরভাগ জ্বালানি এবং তেল স্থাপনা অবস্থিত। গত ২৪ ঘণ্টায় বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বেশ কয়েকবার সতর্কীকরণ সাইরেন বাজিয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ বারবার সংঘাত কমানো এবং আলোচনার আকুতি জানাচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় তারা মধ্যপ্রাচ্যে স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাচ্ছেন।
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধে এখন পর্যন্ত (২৩ মার্চ) ২ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছেন। আল-জাজিরার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল এবং আমেরিকার হামলায় ইরানে ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১৮ হাজার ৫৫১ জন আহত হয়েছেন।
লেবাননে ১ হাজার ১ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৮৪ জন আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনে ৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সিরিয়ায় ৪ জন নিহত হয়েছেন। জর্ডানে ২৮ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হামলায় ১৮ ইসরায়েলি নিহত এবং ৪ হাজার ৬৯৭ জন আহত হয়েছেন। ইরাকে ৬১ জন নিহত এবং ১০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ১৩ জন সদস্য নিহত এবং ২০০ জন আহত হয়েছেন। কুয়েতে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। বাহরাইনে ২ জন নিহত এবং ২০-এর অধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সৌদি আরবে ২ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। কাতারে ১৬ জন আহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১৬০ জন আহত হয়েছেন। ওমানে ৩ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে দেশটির উত্তরাঞ্চলকে লক্ষ্য করে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। তাদের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুমকি মোকাবিলায় কাজ করছে।
এই সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলের ‘ডেভিডস স্লিং’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়। এই সুযোগে দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে। এতে বেশ কিছু ইসরায়েলি আহত হয়েছেন বলে সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে।
জ্বালানি বাজার, তেল এবং অবরুদ্ধ হরমুজ
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দক্ষিণ কোরিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটি তাদের তেলের চাহিদার ৭০ শতাংশেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করে। এই সংকটের কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী তার চীন সফর বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন।
জাপানের অবস্থাও ভয়াবহ। দেশটির প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। সেখানে একপ্রকার জ্বালানি জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি অ্যাডনক-এর প্রধান তেহরানের এই অবরোধের কড়া সমালোচনা করেছেন। হরমুজ বন্ধের কারণে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তিনি একে প্রতিটি জাতির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জ্বালানি সরবরাহে এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করছে।