বন্ধু দিবস
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রয়োজনীয় কিছু বই কিনতে গিয়েছিলাম নীলক্ষেতে বইয়ের দোকানে। মেট্রোতে বাসায় ফিরব বলে রিকশায় উঠলাম টিএসসির উদ্দেশে। যেতে যেতে দেখলাম, শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোতে ঝলমল করছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর। মাঠ ভর্তি মানুষ। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা মনে পড়ায় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। মনে হলো, একটু কিছু সময় না হয় মাঠে বসেই সময় কাটাই, তারপর না হয় ফিরব বাসায়।
রিকশা ছেড়ে দিলাম। মাঠের দিকে আগাতেই দেখি ছোট-বড় বিভিন্ন আড্ডার আসর। কোথাও তরুণ-তরুণী বসে অবসর সময় কাটাচ্ছে, কোথাও সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে পরিবারসহ অনেকে বেড়াতে এসেছে। আবার কোথাও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, সঙ্গে গিটার বাজিয়ে গান গাইছে। ওই গানের আসরের পাশে একটু দূরে গিয়ে এক ঠোঙা বাদাম কিনে বসলাম। বাদাম খেতে খেতে দেখতে লাগলাম কেনা বইয়ের সব পাতা ঠিক আছে কি না।
হঠাৎ খেয়াল করলাম, আড্ডার ভেতর থেকে কিছু শব্দ কানের ওপর আছড়ে পড়ছে—‘এই ব্রো, এদিকে আয়’, ‘মামা, চা খাওয়াবি না’, ইত্যাদি।
চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি, আড্ডার ভেতরে দাঁড়ানো এক তরুণ আরেকজনকে বলছে, ‘কী রে হোমি, এত দেরি করলি কেন?’ পাশেই আরেকটি আড্ডায় বসা একজন মোবাইল ফোনে কাউকে বলছে, ‘কমরেড’, কই তুমি? জলদি আসো মিটিং শুরু হবে এক্ষুনি।’
দেখে আন্দাজ করা যায়, এরা সবাই বন্ধু। কিন্তু এই কয়েক মিনিটের কথোপকথনে ‘বন্ধু’ শব্দটি একবারও কেউ উচ্চারণ করল না। এক সময় যেখানে ‘বন্ধু’, ‘সখা’, ‘সাথি’ বা ‘মিত্র’ প্রচলিত ছিল, সেখানে আজকের তরুণদের মুখে শোনা যায় দোস্ত, ব্রো, মামা, হোমি, গ্যাং, কমরেড কিংবা বস। এটি কি শুধু শব্দেরই পরিবর্তন, নাকি সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক যোগাযোগের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন?
বাংলা ভাষায় ‘বন্ধু’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত বন্ধু (বান্ধু) থেকে। এর অর্থ আত্মীয়, ঘনিষ্ঠজন, শুভাকাঙ্ক্ষী বা সহচর। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের রচনায় ‘বন্ধু’ শব্দটি গভীর আবেগ, ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ভাষা কখনো স্থির থাকে না। সমাজ বদলায়, মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলায়, আর সেই সঙ্গে বদলে যায় সম্বোধনের ভাষাও।
একইভাবে ‘দোস্ত’ শব্দটি বাংলা শব্দ নয়। এটি এসেছে ফারসি দোস্ত শব্দ থেকে, যার অর্থ প্রিয় বন্ধু, ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি। মুঘল আমলে ফারসি ভাষার প্রভাব বাংলা ও উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষায় প্রবেশ করে। পরে উর্দু ও হিন্দির মাধ্যমে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক থেকে ভারতীয় সিনেমা, টেলিভিশন এবং জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে ‘দোস্ত’ শব্দটি তরুণদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। আজও অনেকেই সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে ‘দোস্ত’ বলেই ডাকেন। ‘দোস্ত’ ডাকটিতে আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আন্তরিকতার প্রকাশ বেশি।
‘ব্রো’ এসেছে ইংরেজি ব্রাদার শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘ব্রো’ থেকে। এর মূল অর্থ ভাই। তবে আধুনিক ইংরেজি ভাষায় এটি রক্তের সম্পর্কের চেয়েও ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সমবয়সী পুরুষকে সম্বোধনের একটি অনানুষ্ঠানিক শব্দ। যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান-আমেরিকান সংস্কৃতি এবং পরে কলেজ ক্যাম্পাসের ভাষায় এটি জনপ্রিয় হয়।
হলিউড সিনেমা, ইউটিউব, গেমিং সংস্কৃতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে ‘ব্রো’ এখন বিশ্বজুড়েই পরিচিত। বাংলাদেশেও এটি তরুণদের অন্যতম জনপ্রিয় সম্বোধন। মজার বিষয় হলো, অনেক সময় ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে বন্ধুরাও একে অপরকে ‘ব্রো’ বলে সম্বোধন করেন।
বাংলা ভাষায় ‘মামা’ মূলত মায়ের ভাইকে বোঝায়। কিন্তু শহুরে কথ্য ভাষায় এই শব্দের অর্থ অনেকটাই বদলে গেছে। একসময় রিকশাচালক, দোকানদার বা পরিচিত কাউকে সৌজন্য প্রকাশে ‘মামা’ বলে ডাকার প্রচলন ছিল। পরে এটি বন্ধুদের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। এখন অনেক তরুণ একে অপরকে ‘মামা’ বলে ডাকেন, যদিও তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।
সেইজ জার্নালে সমাজবিজ্ঞানী মার্গারেট কে নেলসন হোয়েদার ফিকটিভ কিন? অর হোয়াটস ইন আ নেম শীর্ষক গবেষণায় বলছেন, এ ধরনের সম্বোধন দূরত্ব কমিয়ে আত্মীয়তার অনুভূতি তৈরি করে। ইংরেজি ভাষায় একে বলা হয় ফিকটিভ কিনশিপ বা ফিকটিভ কিন। অর্থাৎ রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় না হয়েও আত্মীয়তার ভাষা ব্যবহার করে সামাজিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা।
‘হোমি’ এসেছে ইংরেজি হোমিই শব্দ থেকে। এর উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকান-আমেরিকান কথ্য ভাষা থেকে। প্রথম দিকে ‘হোমি’ বলতে একই পাড়া বা একই এলাকায় বেড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ মানুষকে বোঝানো হতো। পরে এর অর্থ পরিবর্তন হয়ে হলো বিশ্বস্ত বন্ধু, যে সুখে-দুঃখে পাশে থাকে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের র্যাপ সংগীত, হিপ-হপ সংস্কৃতি, নেটফ্লিক্স, ইউটিউব এবং ভিডিও গেমের মাধ্যমে এই শব্দটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের তরুণদের একটি অংশও এখন ‘হোমি’ শব্দটি ব্যবহার করছে। বর্তমানে এটি এমন বন্ধুকে বোঝানো হয়, যার ওপর নিঃসংকোচে ভরসা করা যায়।
‘গ্যাং’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে অপরাধী চক্রের ছবি ভেসে ওঠে। কারণ সংবাদমাধ্যমে ‘গ্যাং’ শব্দটি প্রায়ই অপরাধী দলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তরুণদের ভাষায় ‘গ্যাং’ অনেক সময় শুধু বন্ধুদের দল বোঝায়। যেমন ‘আমাদের গ্যাং’, ‘পুরো গ্যাং চলে এসেছে।’ ইংরেজি গ্যাং শব্দের প্রাচীন অর্থ ছিল একসঙ্গে কাজ করা মানুষের দল। সময়ের সঙ্গে এটি অপরাধী চক্রের অর্থও পেয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শব্দটি আবার ইতিবাচক অর্থে বন্ধুদের দল বা ঘনিষ্ঠ গ্রুপ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ, একই শব্দ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।
‘কমরেড’ এসেছে স্প্যানিশ কমরেডা এবং পরে ফরাসি ও ইংরেজি কমরেড শব্দ থেকে। এর অর্থ সহযোদ্ধা বা সহকর্মী। বিশ শতকে সমাজতান্ত্রিক ও শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় সবাই সমান, কেউ কারও ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশেও বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে সদস্যরা একে অপরকে ‘কমরেড’ বলে সম্বোধন করেন। তবে বর্তমানে অনেক তরুণ এটি মজার ছলেই ব্যবহার করেন, যদিও শব্দটির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অর্থ এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষক ক্রিস্টেন রিসেগার তাঁর ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড কালচার: গ্লোবাল ফ্লোস অ্যান্ড লোকাল কমপ্লিক্সিটি তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে বৈশ্বিক যোগাযোগ ও সংস্কৃতির মিশ্রণ স্থানীয় ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রবেশ ঘটিয়ে প্রাত্যহিক শব্দভান্ডারকে বদলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সমাজভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা ডিজিটাল ল্যাংগুয়েজ ইলুশন অনুযায়ী টুইটার, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন শব্দ বা নিওলজিজম তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
সিনেমা ও ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে এই শব্দগুলো খুব দ্রুত ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়ছে। তারুণ্যের পরিচয় নির্মাণ ও কোড-সুইচিং তরুণ প্রজন্ম নিজেদের সামাজিক পরিচয় ও আলাদা সত্তা প্রকাশ করতে নতুন সম্বোধন ও স্ল্যাং ব্যবহার করে। ভাষাবিদ সুয়েশ ও পিলারের গবেষণা অনুযায়ী, বিভিন্ন কমিউনিটির মাঝে এই ভাষা বদল বা কোড-সুইচিং তরুণদের নিজস্ব কথ্য রূপ গড়ে তোলে। যোগাযোগের সহজীকরণ ও ভাষার অর্থনীতি প্রিন্সিপাল অব লিস্ট এফোর্ট বা ভাষাবিজ্ঞানীদের নীতি অনুযায়ী, মানুষ সব সময় দ্রুত ও সহজ মাধ্যমে যোগাযোগ করতে ভালোবাসে। আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে সহজ ও সাবলীল প্রকাশভঙ্গি ভাষার রূপ পরিবর্তনকে স্থায়ী করে তোলে।
অনেকেই মনে করেন, বিদেশি শব্দ ব্যবহারে বাংলা ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখেন। ভাষার ইতিহাস বলছে, বাংলা নিজেই বহু ভাষার মিশ্রণে সমৃদ্ধ হয়েছে। সংস্কৃত, ফারসি, আরবি, পর্তুগিজ, ইংরেজি সব ভাষা থেকেই বাংলা শব্দ গ্রহণ করেছে। আজ যে শব্দগুলোকে আমরা একেবারে বাংলা মনে করি, তার অনেকগুলোরই বিদেশি উৎস রয়েছে। অর্থাৎ, ভাষা পরিবর্তন হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ভাষার পার্থক্য বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল যোগাযোগের প্রভাবে আগামী দিনে আরও নতুন সম্বোধন জনপ্রিয় হবে। আবার আজকের অনেক জনপ্রিয় শব্দ হয়তো কয়েক দশক পর হারিয়েও যাবে। যেমন একসময় ‘ইয়ার’, ‘সাথী’ বা ‘মিত্র’ ছিল বহুল ব্যবহৃত শব্দ। আজ সেগুলোর জায়গা অনেকটাই নিয়েছে ‘ব্রো’, ‘দোস্ত’ কিংবা ‘হোমি’। ভবিষ্যতে হয়তো এগুলোর জায়গায় আসবে সম্পূর্ণ নতুন কোনো শব্দ। ভাষার এই বিবর্তনই প্রমাণ করে, মানুষের সম্পর্কের অনুভূতি একই থাকে, শুধু প্রকাশের ধরন বদলে যায়।
তথ্যসূত্র: সেইজ জার্নাল, এনসাইক্লোপিডিয়া, অক্সফোর্ড ডিকশনারি, অক্সফোর্ড লার্নার ডিকশনারি

প্রয়োজনীয় কিছু বই কিনতে গিয়েছিলাম নীলক্ষেতে বইয়ের দোকানে। মেট্রোতে বাসায় ফিরব বলে রিকশায় উঠলাম টিএসসির উদ্দেশে। যেতে যেতে দেখলাম, শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোতে ঝলমল করছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর। মাঠ ভর্তি মানুষ। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা মনে পড়ায় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। মনে হলো, একটু কিছু সময় না হয় মাঠে বসেই সময় কাটাই, তারপর না হয় ফিরব বাসায়।
রিকশা ছেড়ে দিলাম। মাঠের দিকে আগাতেই দেখি ছোট-বড় বিভিন্ন আড্ডার আসর। কোথাও তরুণ-তরুণী বসে অবসর সময় কাটাচ্ছে, কোথাও সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে পরিবারসহ অনেকে বেড়াতে এসেছে। আবার কোথাও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, সঙ্গে গিটার বাজিয়ে গান গাইছে। ওই গানের আসরের পাশে একটু দূরে গিয়ে এক ঠোঙা বাদাম কিনে বসলাম। বাদাম খেতে খেতে দেখতে লাগলাম কেনা বইয়ের সব পাতা ঠিক আছে কি না।
হঠাৎ খেয়াল করলাম, আড্ডার ভেতর থেকে কিছু শব্দ কানের ওপর আছড়ে পড়ছে—‘এই ব্রো, এদিকে আয়’, ‘মামা, চা খাওয়াবি না’, ইত্যাদি।
চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি, আড্ডার ভেতরে দাঁড়ানো এক তরুণ আরেকজনকে বলছে, ‘কী রে হোমি, এত দেরি করলি কেন?’ পাশেই আরেকটি আড্ডায় বসা একজন মোবাইল ফোনে কাউকে বলছে, ‘কমরেড’, কই তুমি? জলদি আসো মিটিং শুরু হবে এক্ষুনি।’
দেখে আন্দাজ করা যায়, এরা সবাই বন্ধু। কিন্তু এই কয়েক মিনিটের কথোপকথনে ‘বন্ধু’ শব্দটি একবারও কেউ উচ্চারণ করল না। এক সময় যেখানে ‘বন্ধু’, ‘সখা’, ‘সাথি’ বা ‘মিত্র’ প্রচলিত ছিল, সেখানে আজকের তরুণদের মুখে শোনা যায় দোস্ত, ব্রো, মামা, হোমি, গ্যাং, কমরেড কিংবা বস। এটি কি শুধু শব্দেরই পরিবর্তন, নাকি সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক যোগাযোগের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন?
বাংলা ভাষায় ‘বন্ধু’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত বন্ধু (বান্ধু) থেকে। এর অর্থ আত্মীয়, ঘনিষ্ঠজন, শুভাকাঙ্ক্ষী বা সহচর। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের রচনায় ‘বন্ধু’ শব্দটি গভীর আবেগ, ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ভাষা কখনো স্থির থাকে না। সমাজ বদলায়, মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলায়, আর সেই সঙ্গে বদলে যায় সম্বোধনের ভাষাও।
একইভাবে ‘দোস্ত’ শব্দটি বাংলা শব্দ নয়। এটি এসেছে ফারসি দোস্ত শব্দ থেকে, যার অর্থ প্রিয় বন্ধু, ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি। মুঘল আমলে ফারসি ভাষার প্রভাব বাংলা ও উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষায় প্রবেশ করে। পরে উর্দু ও হিন্দির মাধ্যমে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক থেকে ভারতীয় সিনেমা, টেলিভিশন এবং জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে ‘দোস্ত’ শব্দটি তরুণদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। আজও অনেকেই সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে ‘দোস্ত’ বলেই ডাকেন। ‘দোস্ত’ ডাকটিতে আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আন্তরিকতার প্রকাশ বেশি।
‘ব্রো’ এসেছে ইংরেজি ব্রাদার শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘ব্রো’ থেকে। এর মূল অর্থ ভাই। তবে আধুনিক ইংরেজি ভাষায় এটি রক্তের সম্পর্কের চেয়েও ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সমবয়সী পুরুষকে সম্বোধনের একটি অনানুষ্ঠানিক শব্দ। যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান-আমেরিকান সংস্কৃতি এবং পরে কলেজ ক্যাম্পাসের ভাষায় এটি জনপ্রিয় হয়।
হলিউড সিনেমা, ইউটিউব, গেমিং সংস্কৃতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে ‘ব্রো’ এখন বিশ্বজুড়েই পরিচিত। বাংলাদেশেও এটি তরুণদের অন্যতম জনপ্রিয় সম্বোধন। মজার বিষয় হলো, অনেক সময় ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে বন্ধুরাও একে অপরকে ‘ব্রো’ বলে সম্বোধন করেন।
বাংলা ভাষায় ‘মামা’ মূলত মায়ের ভাইকে বোঝায়। কিন্তু শহুরে কথ্য ভাষায় এই শব্দের অর্থ অনেকটাই বদলে গেছে। একসময় রিকশাচালক, দোকানদার বা পরিচিত কাউকে সৌজন্য প্রকাশে ‘মামা’ বলে ডাকার প্রচলন ছিল। পরে এটি বন্ধুদের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। এখন অনেক তরুণ একে অপরকে ‘মামা’ বলে ডাকেন, যদিও তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।
সেইজ জার্নালে সমাজবিজ্ঞানী মার্গারেট কে নেলসন হোয়েদার ফিকটিভ কিন? অর হোয়াটস ইন আ নেম শীর্ষক গবেষণায় বলছেন, এ ধরনের সম্বোধন দূরত্ব কমিয়ে আত্মীয়তার অনুভূতি তৈরি করে। ইংরেজি ভাষায় একে বলা হয় ফিকটিভ কিনশিপ বা ফিকটিভ কিন। অর্থাৎ রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় না হয়েও আত্মীয়তার ভাষা ব্যবহার করে সামাজিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা।
‘হোমি’ এসেছে ইংরেজি হোমিই শব্দ থেকে। এর উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকান-আমেরিকান কথ্য ভাষা থেকে। প্রথম দিকে ‘হোমি’ বলতে একই পাড়া বা একই এলাকায় বেড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ মানুষকে বোঝানো হতো। পরে এর অর্থ পরিবর্তন হয়ে হলো বিশ্বস্ত বন্ধু, যে সুখে-দুঃখে পাশে থাকে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের র্যাপ সংগীত, হিপ-হপ সংস্কৃতি, নেটফ্লিক্স, ইউটিউব এবং ভিডিও গেমের মাধ্যমে এই শব্দটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের তরুণদের একটি অংশও এখন ‘হোমি’ শব্দটি ব্যবহার করছে। বর্তমানে এটি এমন বন্ধুকে বোঝানো হয়, যার ওপর নিঃসংকোচে ভরসা করা যায়।
‘গ্যাং’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে অপরাধী চক্রের ছবি ভেসে ওঠে। কারণ সংবাদমাধ্যমে ‘গ্যাং’ শব্দটি প্রায়ই অপরাধী দলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তরুণদের ভাষায় ‘গ্যাং’ অনেক সময় শুধু বন্ধুদের দল বোঝায়। যেমন ‘আমাদের গ্যাং’, ‘পুরো গ্যাং চলে এসেছে।’ ইংরেজি গ্যাং শব্দের প্রাচীন অর্থ ছিল একসঙ্গে কাজ করা মানুষের দল। সময়ের সঙ্গে এটি অপরাধী চক্রের অর্থও পেয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শব্দটি আবার ইতিবাচক অর্থে বন্ধুদের দল বা ঘনিষ্ঠ গ্রুপ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ, একই শব্দ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।
‘কমরেড’ এসেছে স্প্যানিশ কমরেডা এবং পরে ফরাসি ও ইংরেজি কমরেড শব্দ থেকে। এর অর্থ সহযোদ্ধা বা সহকর্মী। বিশ শতকে সমাজতান্ত্রিক ও শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় সবাই সমান, কেউ কারও ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশেও বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে সদস্যরা একে অপরকে ‘কমরেড’ বলে সম্বোধন করেন। তবে বর্তমানে অনেক তরুণ এটি মজার ছলেই ব্যবহার করেন, যদিও শব্দটির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অর্থ এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষক ক্রিস্টেন রিসেগার তাঁর ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড কালচার: গ্লোবাল ফ্লোস অ্যান্ড লোকাল কমপ্লিক্সিটি তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে বৈশ্বিক যোগাযোগ ও সংস্কৃতির মিশ্রণ স্থানীয় ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রবেশ ঘটিয়ে প্রাত্যহিক শব্দভান্ডারকে বদলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সমাজভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা ডিজিটাল ল্যাংগুয়েজ ইলুশন অনুযায়ী টুইটার, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন শব্দ বা নিওলজিজম তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
সিনেমা ও ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে এই শব্দগুলো খুব দ্রুত ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়ছে। তারুণ্যের পরিচয় নির্মাণ ও কোড-সুইচিং তরুণ প্রজন্ম নিজেদের সামাজিক পরিচয় ও আলাদা সত্তা প্রকাশ করতে নতুন সম্বোধন ও স্ল্যাং ব্যবহার করে। ভাষাবিদ সুয়েশ ও পিলারের গবেষণা অনুযায়ী, বিভিন্ন কমিউনিটির মাঝে এই ভাষা বদল বা কোড-সুইচিং তরুণদের নিজস্ব কথ্য রূপ গড়ে তোলে। যোগাযোগের সহজীকরণ ও ভাষার অর্থনীতি প্রিন্সিপাল অব লিস্ট এফোর্ট বা ভাষাবিজ্ঞানীদের নীতি অনুযায়ী, মানুষ সব সময় দ্রুত ও সহজ মাধ্যমে যোগাযোগ করতে ভালোবাসে। আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে সহজ ও সাবলীল প্রকাশভঙ্গি ভাষার রূপ পরিবর্তনকে স্থায়ী করে তোলে।
অনেকেই মনে করেন, বিদেশি শব্দ ব্যবহারে বাংলা ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখেন। ভাষার ইতিহাস বলছে, বাংলা নিজেই বহু ভাষার মিশ্রণে সমৃদ্ধ হয়েছে। সংস্কৃত, ফারসি, আরবি, পর্তুগিজ, ইংরেজি সব ভাষা থেকেই বাংলা শব্দ গ্রহণ করেছে। আজ যে শব্দগুলোকে আমরা একেবারে বাংলা মনে করি, তার অনেকগুলোরই বিদেশি উৎস রয়েছে। অর্থাৎ, ভাষা পরিবর্তন হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ভাষার পার্থক্য বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল যোগাযোগের প্রভাবে আগামী দিনে আরও নতুন সম্বোধন জনপ্রিয় হবে। আবার আজকের অনেক জনপ্রিয় শব্দ হয়তো কয়েক দশক পর হারিয়েও যাবে। যেমন একসময় ‘ইয়ার’, ‘সাথী’ বা ‘মিত্র’ ছিল বহুল ব্যবহৃত শব্দ। আজ সেগুলোর জায়গা অনেকটাই নিয়েছে ‘ব্রো’, ‘দোস্ত’ কিংবা ‘হোমি’। ভবিষ্যতে হয়তো এগুলোর জায়গায় আসবে সম্পূর্ণ নতুন কোনো শব্দ। ভাষার এই বিবর্তনই প্রমাণ করে, মানুষের সম্পর্কের অনুভূতি একই থাকে, শুধু প্রকাশের ধরন বদলে যায়।
তথ্যসূত্র: সেইজ জার্নাল, এনসাইক্লোপিডিয়া, অক্সফোর্ড ডিকশনারি, অক্সফোর্ড লার্নার ডিকশনারি
.png)

পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসার ক্ষেত্রে চালু করা ভিসা বন্ড কর্মসূচি স্থায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানসহ ৫০টি দেশের নাগরিকদের ওপর এই বন্ড আগামী সোমবার (৩ আগস্ট) থেকে কার্যকর হবে।
১৬ ঘণ্টা আগে
সারা দিন কাজের চাপে কেটে গেছে। সকালে অফিস, বিকেলে যানজট, বাসায় ফিরে সংসারের টুকিটাকি কাজ, সন্তানের পড়ালেখা… সব মিলিয়ে রাত ১১টা বেজে গেছে। শরীর বলছে, এবার একটু ঘুমানো দরকার। কিন্তু আপনি বিছানায় গিয়েও মোবাইলটা হাতে তুলে নিলেন। ভাবলেন, ‘আর মাত্র পাঁচ মিনিট।’
৩০ জুলাই ২০২৬
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর। ফলে ২০২৭ সালের জন্য নতুন মহাসচিব বাছাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
৩০ জুলাই ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকাল থেকেই দেখা যাচ্ছে অনেকেই লিখছেন, ‘হ্যাপি ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডশিপ ডে।’ কিন্তু আর মাত্র কয়েক দিন পরই, আগস্টের প্রথম রোববার আবারও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর হোয়াটসঅ্যাপ ভরে যাবে একই শুভেচ্ছাবার্তায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বন্ধু দিবস কি বছরে দুবার আসে?
৩০ জুলাই ২০২৬