এক্সপ্লেইনার

কীভাবে নির্বাচিত হন জাতিসংঘের মহাসচিব, কারা আছেন আলোচনায়

কে হবেন জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব। ছবি: ১. মিশেল ব্যাচেলেট, ২. রাফায়েল গ্রোসি, ৩. রেবেকা গ্রিনস্প্যান, ৪. ম্যাকি সল

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর। ফলে ২০২৭ সালের জন্য নতুন মহাসচিব বাছাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ (৩০ জুলাই) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’ বা গোপন মতামতভিত্তিক ভোট, যা আগামী মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

যদিও এই ভোটে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ নির্বাচিত হবেন না, তবুও এর মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যাবে কোন প্রার্থী নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং কারা ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এই অনানুষ্ঠানিক ভোটের ধারাবাহিক ফলই শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তি তৈরি করে।

স্ট্র পোল কী

স্ট্র পোল হলো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে গোপনে অনুষ্ঠিত একটি পরীক্ষামূলক ভোট। এতে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের প্রত্যকের কাছ থেকে প্রার্থী সম্পর্কে তিন ধরনের মতামত নেওয়া হয়। সমর্থন করি, সমর্থন করি না, কোনো মতামত নেই। প্রথম দিকের ভোটে বোঝা যায় না কোন ভোট স্থায়ী সদস্যদের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) এবং কোনটি অস্থায়ী সদস্যদের।

সাধারণত একাধিক দফায় এ ধরনের ভোট হয়। পরবর্তী ধাপগুলোতে রঙিন ব্যালট ব্যবহার করা হয়। স্থায়ী পাঁচ সদস্য এক রঙের ব্যালটে ভোট দেবেন। অস্থায়ী ১০ সদস্য অন্য রঙের ব্যালটে ভোট দেবেন। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে কোনো প্রার্থী স্থায়ী সদস্যদের সম্ভাব্য ভেটোর মুখে পড়ছেন কি না। এই প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবরের শুরুতে শেষ হতে পারে। তবে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নিয়ে ঐকমত্যে না আসতে পারলে সময় আরও দীর্ঘায়ু হতে পারে।

কীভাবে নির্বাচিত হন জাতিসংঘের মহাসচিব

জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মহাসচিবকে নিয়োগ দেয় সাধারণ পরিষদ। তবে তার আগে নিরাপত্তা পরিষদকে একজন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে হয়। বাস্তবে এই সুপারিশ পাওয়ার জন্য দুটি বড় শর্ত পূরণ করতে হয়। একটি হলো, ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৯ সদস্যের সমর্থন থাকতে হবে। অন্যটি, পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কেউ ভেটো দিতে পারবেন না। অর্থাৎ কোনো প্রার্থী ব্যাপক সমর্থন পেলেও যদি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের একজনও আপত্তি করে, তবে তার মহাসচিব হওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর পর্যন্ত একাধিক দফা স্ট্র পোল অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালে তাঁর নাম সাধারণ পরিষদে পাঠানো হয়। সাধারণ পরিষদ এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে নিয়োগ দেয়।

এবার কারা আছেন দৌড়ে

ইতোমধ্যে জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব গুতেরেসের স্থলাভিষিক্ত হতে সাতজন আনুষ্ঠানিক প্রার্থী নাম উঠেছে। তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেট, যদিও তার প্রার্থীতায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান চিলির সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন। তবে ব্রাজিল, মেক্সিকো তার সমর্থন পুর্নবহাল রেখেছে। এরপরে আছেন ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফের্নান্দা এস্পিনোসা, আর্জেন্টিনার কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার বর্তমান মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি, কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অর্থনীতিবিদ রেবেকা গ্রিনস্প্যান, গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেট, জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল ও তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের বিশেষ প্রতিনিধি উগান্ডার ওলারা ওতুন্নু এবং সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সল।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ছবি: সংগৃহীত

এখন পর্যন্ত কে হবেন মহাসচিব তার সুস্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া না গেলেও কূটনৈতিক মহলে বেশকিছু বিষয় আলোচনা হচ্ছে। এনপিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি জাতিসংঘের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। কারণ বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট, শরণার্থী সমস্যা, জাতিসংঘের আর্থিক সংকট এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সংঘাতের পর নতুন মহাসচিবকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাই দক্ষ এবং বিশ্ববাসীকে এক কাতারে আনার বিশেষ ক্ষমতা আছে এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হবে।

এনপিআরের মস্কো ব্যুরো চিফ মিশেল কেলেমেনের মতে, এবার লাতিন আমেরিকার প্রার্থী এগিয়ে থাকতে পারেন। জাতিসংঘে অলিখিত আঞ্চলিক রোটেশনের প্রথা অনুযায়ী এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মহাসচিব নির্বাচনের দাবি জোরালো। ফলে আর্জেন্টিনা, কোস্টারিকা ও ইকুয়েডরের প্রার্থীদের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বিবেচনায় আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি, কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান এবং ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ ছাড়া এবার নারী মহাসচিব আশা করছেন মিশেল। তার মতে, জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে এখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি। ফলে মিশেল ব্যাচেলেট, রেবেকা গ্রিনস্প্যান, মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা ও ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বারকেট এই চার নারী প্রার্থীর প্রতি আলাদা আগ্রহ রয়েছে। অনেক সদস্যরাষ্ট্র এবার একজন নারীকে মহাসচিব হিসেবে দেখতে চায়। অন্যদিকে, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করছেন। আর দীর্ঘদিন জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করা উগান্ডার ওলারা ওতুন্নুও অভিজ্ঞতার কারণে আলোচনায় এসেছেন।

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এই পাঁচ দেশের যেকোনো একটি দেশ ভেটো দিলে কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারবেন না। তাই সবচেয়ে যোগ্য হওয়ার পাশাপাশি এমন একজনকে বেছে নেওয়া হবে, যিনি বড় শক্তিগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য।

নতুন মহাসচিবকে শুধু একজন কূটনীতিক নয়, বরং একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারী, প্রশাসক এবং বৈশ্বিক সংকটে নৈতিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম ব্যক্তি হতে হবে। কারণ বর্তমান সময়ে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

আজকের ভোটের ফলাফল হয়তো নতুন মহাসচিবের নাম নির্ধারণ করবে না, তবে এটি পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকনির্দেশনা ঠিক করে দিতে পারে। আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে একাধিক দফা গোপন ভোট শেষে নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। এরপর সেই নাম সাধারণ পরিষদে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

তথ্যসূত্র: এনপিআর, ফার্স্ট সিকিউরিটি কাউন্সিল, সাউদার্ন ভয়েস, ইউএন, রয়টার্স ও দ্য টাইমস

Ad 300x250

সম্পর্কিত