গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে উৎপাদনে ধস, বিদেশি ক্রয়াদেশ নিয়ে শঙ্কা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সাভার (ঢাকা)

প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৩২
স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকার সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কারখানার উৎপাদনে ধস নেমেছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগও সীমিত। এতে সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকরা।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ২০০ কারখানা এই সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, ডাইং, ইস্পাত, সিরামিক ও কাগজ শিল্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। অনেক কারখানার উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

সম্প্রতি সাভারের রেডিও কলোনি, হেমায়েতপুর এবং আশুলিয়ার জামগড়া, কাঠগড়া, জিরাবো, নরসিংহপুর, বেরুন, শিমুলতলা, পলাশবাড়ী, নিশ্চিন্তপুর, বাইপাইল ও জিরানী এলাকার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা যায়, গ্যাসনির্ভর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি কারখানায় গ্যাসের চাপ বৃদ্ধি ও বিদ্যুতের অপেক্ষায় উৎপাদন ইউনিট বন্ধ ছিল। কোথাও শ্রমিকরা কাজ শুরুর অপেক্ষায় বসে আছেন, আবার কোথাও সীমিত পরিসরে বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

কারখানা শ্রমিক ও কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে বয়লারে প্রয়োজনীয় তাপ তৈরি করা যাচ্ছে না। এতে কাপড় ধোয়া, শুকানো, প্রেসিং ও ফিনিশিংয়ের মতো ধাপগুলো আটকে যাচ্ছে। উৎপাদনের শেষপর্যায়ে সংকটের কারণে পুরো উৎপাদন চক্রের গতিই কমে গেছে।

কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য যেখানে গ্যাসের চাপ থাকতে হয় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই, সেখানে বর্তমানে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। এতে বয়লার, জেনারেটরসহ উৎপাদন যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

ব্লু জিনস ওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, বারবার উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় ডেনিম প্রক্রিয়াজাতকরণে পুরো ব্যাচ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে কেবল কাপড় নয়, যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হচ্ছে।

গোল্ডলাইফ স্পিনিং ফ্যাক্টরির মালিক মঈনুদ্দিন আহমেদ শিপন বলেন, বিদ্যুৎ থাকলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেশিন বন্ধ থাকে, এতে আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে।

বিদেশি ক্রয়াদেশ ছুটে যাওয়ার ঝুঁকি

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশুলিয়ার শত শত কারখানায় প্রতিদিন উৎপাদিত পোশাক ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। তাই উৎপাদনের গতি কমে গেলে শুধু একটি কারখানা নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়ে। তারা বলছেন, শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের স্বল্পচাপের সমস্যা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সংকট আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তীব্র হওয়ায় উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রজন সোয়েটারের পরিচালক আহমেদ মোর্তুজা বলেন, উৎপাদনের বেশির ভাগ কাজ শেষ হলেও বয়লার চালানো না গেলে ফিনিশিং ও আয়রন করা সম্ভব হয় না। এতে পণ্য প্যাকিং করে বন্দরে পাঠানো যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত শিপমেন্ট নির্ধারিত সময়ের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে আরেক কারখানা কর্মকর্তা রিপন সরকার বলেন, নির্ধারিত সময়ের পর পণ্য সরবরাহ করতে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের জরিমানা গুনতে হয়। এতে ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

স্থানীয় আলহাজ আব্দুল মান্নান কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক আমজাদ হোসেন বুলবুল বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার এই সময়ে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। একবার কোনো ক্রেতা হারালে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।

বাড়তি শ্রম দিচ্ছেন শ্রমিকেরা

এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা এলপিজি গ্যাস ও ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। শিল্পমালিকদের হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতে প্রতি ইউনিট উৎপাদনে ব্যয় হয় ১৪ থেকে ১৫ টাকা। কিন্তু ডিজেল ব্যবহারে এই খরচ বেড়ে প্রায় ৩৪ টাকায় পৌঁছে যায়। তবু বিকল্প জ্বালানিতে প্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা সব সময় নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এতে কাজ শেষ করতে শ্রমিকদেরও বাড়তি শ্রম দিতে হচ্ছে।

নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিলেও গ্যাস না থাকায় অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা। গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে তাদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কমে যাবে। সেই সঙ্গে কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন সীমিত করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সোহরাব হোসেন নামে এক শ্রমিক বলেন, সকালে কারখানায় এলেও গ্যাসের অভাবে কাজ শুরু করা যায় না। রাজন নামে আরেক শ্রমিক বলেন, প্রায় প্রতিদিনই একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, কখন গ্যাস আসবে তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।

আশুলিয়ার একটি কারখানায় কর্মরত কামরুজ্জামান বলেন, ‘কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যু পাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। কাজ শেষ করতে নির্ধারিত সময়ের বেশি থাকতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান চলতে হবে। তাই কাজ করছি।’ আরেক শ্রমিক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘কারখানায় এসেও গ্যাসের সংকটের কারণে কাজ করতে পারছি না। কাজ না করতে পারলে বেতন কীভাবে দেবে? কারখানা না চললে তো আমাদের পথে বসতে হবে।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, উৎপাদন মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের অনেক সময় নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পরও কারখানায় অপেক্ষা করতে হয়। এতে তাঁদের কাজের সময়সূচি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

সংকট সমাধানের আশায় শিল্পমালিক ও কর্তৃপক্ষ

এর আগে ২১ জুলাই মহেশখালীর উপকূলে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসীয়করণ ইউনিটে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে শিল্পকারখানার উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। শিল্পাঞ্চলে দ্রুত পর্যাপ্ত গ্যাস-চাপ নিশ্চিত এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন শিল্পমালিকরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ভিয়েতনামের মতো প্রধান রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের নিটওয়্যার শিল্প এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তার ওপর গ্যাস সংকট উৎপাদন পরিকল্পনাকেই প্রায় অচল করে দিয়েছে।

তিতাস গ্যাসের আশুলিয়া জোনাল বিপণন অফিসের ম্যানেজার প্রকৌশলী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন বলেন, সংকটের কারণ চিহ্নিত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত