জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরানের ব্যাপারে কঠোর হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো

প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২৬, ২২: ৪৫
প্রতীকী ছবি।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের সংঘাত এখন আর নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আটকে নেই। যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। উপসাগরীয় দেশগুলো শুরুতে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে ছিল। এখন তাদের মধ্যে সম্মিলিত ফ্রন্ট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। ইরানের ধারাবাহিক হামলার মুখে আরব রাষ্ট্রগুলো তাদের সুর চড়াচ্ছে। তারা এখন শুধু প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না।

গত বৃহস্পতিবার ইরানের উদ্দেশে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের কড়া বার্তার পর উপসাগরীয় সব পক্ষই নিজেদের প্রতিবাদের ভাষা বদল এনেছে। এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই ইরানকে ‘ক্রিমিনাল’ চিহ্নিত করছে তারা।

সৌদি আরবের কড়া হুঁশিয়ারি ও ধৈর্যের শেষ সীমানা

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ জানান, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা সহ্যক্ষমতা অতিক্রম করছে। তিনি অবিলম্বে ইরানকে নিজেদের কৌশল ‘হিসাব করার’ আহ্বান জানান।

প্রিন্স ফয়সাল ইরানের ক্ষমতার বিপরীতে উপসাগরীয় দেশগুলোর শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রের ‘অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সক্ষমতা ও সামর্থ্য’ রয়েছে। তারা চাইলে যেকোনো সময় এই সক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারে। ইরানি কূটনীতিকরা হামলার কথা অস্বীকার করলেও প্রিন্স ফয়সাল তা মানতে নারাজ। তিনি জানান, ইরান তাদের আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের ওপর আঘাত হানার জন্য খুব সতর্কতার সঙ্গে কৌশল সাজিয়েছে।

হামলার নিখুঁত লক্ষ্যের দিকে ইঙ্গিত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই আঘাতগুলোর নির্ভুলতা অনেক কিছু প্রমাণ করে। সৌদি আরব এবং প্রতিবেশীদের ওপর হওয়া হামলাগুলো পূর্বপরিকল্পিত, পূর্বসংগঠিত এবং সুচিন্তিত। তিনি নির্দিষ্ট করে জানাননি ঠিক কী ঘটলে সৌদি আরব রক্ষণাত্মক বা পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, ইরানিদের আগে থেকে এমন সংকেত দেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

প্রিন্স ফয়সাল স্পষ্ট করে বলেন, তাদের ধৈর্যের সীমা আছে। ইরানিদের হাতে কি একদিন, দুই দিন বা এক সপ্তাহ সময় আছে, সেই সময়সীমা তিনি জানাবেন না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরান আজকের বৈঠকের বার্তা বুঝবে এবং দ্রুত তাদের হিসাব মেলাবে। তারা প্রতিবেশীদের ওপর হামলা বন্ধ করবে। একইসঙ্গে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন, ইরানিদের সেই প্রজ্ঞা বা বোধশক্তি আছে কি না।

জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত ও পাল্টা হামলার সমীকরণ

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই হুঁশিয়ারির আগে রিয়াদে আরব ও ইসলামি দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়। বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানি বাহিনী উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালায়। এর আগে ইসরায়েল ইরানের বুশেহর উপকূলের বিশাল অফশোর গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্স-এ হামলা চালিয়েছিল। এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি আগেই হুমকি দিয়েছিল। তারা বলেছিল, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোতে এর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

ইরান তাদের হুমকি বাস্তবায়ন করেছে। কাতারের রাস লাফান গ্যাস স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা হয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহা থেকে ৮০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এর অবস্থান।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাস লাফান শিল্প নগরীতে এই ‘নির্লজ্জ ইরানি হামলার’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাস স্থাপনাতেও হামলা হয়েছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৩টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ২৭টি ড্রোন মোকাবিলা করেছে। সফলভাবে একটি মিসাইল ধ্বংস করার পর তার ধ্বংসাবশেষ হাবশান স্থাপনায় পড়ে। এর ফলে সৃষ্ট ঘটনার পর সেখানে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

বিশ্বাসের চূড়ান্ত পতন ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এই যুদ্ধ একদিন শেষ হবে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে অনেক বেশি সময় লাগবে। কারণ প্রতিবেশীদের লক্ষ্যবস্তু করার ইরানি কৌশলের কারণে বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

প্রিন্স ফয়সাল জোর দিয়ে বলেন, ইরান গত এক দশক ধরে এই কৌশল তৈরি করেছে। এটি চলমান কোনো পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়। ইরান এখানে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। প্রতিবেশীদের ওপর হামলা করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপে ফেলা তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনারই অংশ। তিনি জানান, যুদ্ধ শেষে বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। ইরান যদি অবিলম্বে এসব বন্ধ না করে, তবে সেই বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের আর কোনো উপায়ই অবশিষ্ট থাকবে না।

বাহরাইনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ও অভ্যন্তরীণ ধরপাকড়

ইরানের সাম্প্রতিক হামলার পর বাহরাইনও অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার শুরু করেছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দেশটির একটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় আগুন লাগে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছে। তারা একে ‘অপরাধমূলক ইরানি আগ্রাসন’ বলে আখ্যায়িত করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ড্রোন হামলার কারণে বাহরাইনে বড় বিপর্যয়ের খবর পাওয়া গেছে। সেখানে ক্লাউড কম্পিউটিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

বাহরাইন এখন পর্যন্ত ইরানের ছোড়া ১৫৩টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার দাবি করেছে। তারা ৩০১টি ড্রোনও আকাশেই ধ্বংস করেছে।

এই ক্রমাগত হামলার মুখে বাহরাইন একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। জিসিসি এবং জর্ডানের পক্ষে বাহরাইনের অনুরোধে বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে একটি ‘জরুরি সভা’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের সামরিক আগ্রাসনের নিন্দা জানানো হবে। জিসিসি দেশগুলো একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করছে। প্রস্তাবে এই অঞ্চলে অবকাঠামো এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির জন্য ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিও থাকছে।

বাইরে কড়া সুরের পাশাপাশি বাহরাইনের ভেতরে পুরোনো শিয়া-সুন্নি বিভেদ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের সদর দপ্তর অবস্থিত। এজন্য দেশটি ইরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। তারা খামেনিকে নিজেদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মানেন।

শোক প্রকাশ করতে গিয়ে তারা সুন্নি নেতৃত্বাধীন সরকারের চরম রোষানলে পড়ছেন। প্রিজন অ্যাফেয়ার্স অথরিটির (পিএএ) তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার মূলত ইরানি আগ্রাসনের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং মিথ্যা খবর ছড়ানোর অভিযোগে এই ধরপাকড় চালাচ্ছে। দিরাজ, সিত্রা, কারবাবাদ ও কারজাকানের মতো শিয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গভীর রাতে অভিযান চলছে।

পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী মাহদি আল জাল্লাওয়ি এবং মনসুর দারবিশকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা প্রকাশ্যেই সরকারপন্থী ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ এবং শিল্পকর্মের মাধ্যমে ইরানের প্রতি সমর্থনের অভিযোগেই তাদের আটক করা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময়কার শিয়া-সুন্নি বিভেদের ক্ষতগুলো এই যুদ্ধের কারণে নতুন করে সামনে আসছে। শিয়াদের এই শোক প্রকাশকে সরকার রাজপরিবারের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার শামিল মনে করছে।

কাতারের অবস্থান ও ভেঙে পড়া নিরাপত্তা

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আল-আনসারি জানিয়েছেন, চলমান এই যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। দোহা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কোনো আলোচনায় যুক্ত নেই। তারা নিজেদের দেশ রক্ষায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দিচ্ছে। এ পর্যন্ত ৯০ শতাংশেরও বেশি হামলা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।

ইরানে পাল্টা হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে পাল্টা আঘাত হানার অধিকার তাদের রয়েছে। তারা আঞ্চলিক উত্তেজনার পথে হাঁটতে চান না। তারা শান্তির পথেই কাজ করতে চান। সামরিক ও শীর্ষ নেতৃত্বের পর্যালোচনার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত পাল্টা হামলার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের হাবশান গ্যাস স্থাপনা এবং বাব তেল ক্ষেত্রে হামলার পর কঠোর বিবৃতি দিয়েছে। তারা একে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য ‘বিপজ্জনক উসকানি’ বলেছে। তারা সতর্ক করেছে যে তাদের ভবিষ্যৎ জবাব শুধু প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তারা আক্রমণাত্মক পাল্টা ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছে।

এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কোনো সামরিক জোট বা অক্ষ গঠনের ঘোষণা আসেনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নতুন এক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর এমন একাট্টা অবস্থান আগে খুব একটা দেখা যায়নি। তারা এখন আর নীরব দর্শক বা কেবল প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না।

বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, আরব দেশগুলোর আচমকা এমন সুর বদল সেই নতুন জোটের দিকেই পরিষ্কার ইঙ্গিত করছে। নিজেদের অস্তিত্ব ও অর্থনীতি বাঁচাতে তারা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। ইরানের ক্রমাগত হামলা তাদের এক বিন্দুতে মেলাতে বাধ্য করেছে। প্রতিরক্ষার খোলস ছেড়ে এখন হয়ত তারা আক্রমণাত্মক নীতির পথেই হাঁটবে।

সম্পর্কিত