মাহবুবুল আলম তারেক

গত বছর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি “সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি” স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর রাশিয়ার ভূমিকা এখনো অনেকটাই দর্শকের মতো।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডকে পুতিন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমানো, যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানায়। তবে এসব বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তার কোনো ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি।
এর কারণ হিসেবে ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়, চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো ধারা না থাকায় রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেনি। তবে বাস্তবেও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়ক অংশীদার হিসেবে ইরানকে কার্যকর সহায়তা দিতে মস্কো তেমন কিছুই করেনি। রাশিয়া হয়তো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য বা উন্নত ড্রোন কৌশলে সীমিত সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু এ ধরনের সহায়তা যুদ্ধের ফলাফলে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম নয়।
ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই সীমিত ভূমিকা একটি পরিচিত ধারা অনুসরণ করে—মিত্র দেশগুলো সংকটে পড়লে মস্কো সাধারণত কঠোর ভাষায় বিবৃতি দেয়, কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ খুব কমই নেয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সংঘাতে রাশিয়া কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করেনি। ফলে নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলটি আজারবাইজানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এর এক বছর পর সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বিদ্রোহীরা বাশার আল-আসাদের সরকারকে উৎখাত করে, সেখানেও রাশিয়া কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পরও রাশিয়ার কোনো দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এই ঘটনাগুলো রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ইরান সংকট রাশিয়ার জন্য কিছু পরোক্ষ সুবিধাও তৈরি করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে রাশিয়ার অতিরিক্ত আয় হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ সম্প্রতি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন চীনও ভবিষ্যতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইউক্রেন ও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে সরাসরি সহায়তা না করেও রাশিয়া কৌশলগতভাবে এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া ও ইরান পারস্পরিক স্বার্থে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়। এর আগে কয়েক শতাব্দী ধরে তারা মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এবং ককেশাস অঞ্চল ও কাস্পিয়ান সাগর ঘিরে প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতা করত। তবে ১৯৯০-র দশকের শুরুতে রাশিয়া তার অতিরিক্ত সামরিক ও বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি বিক্রির সুযোগ খুঁজছিল। অন্যদিকে, ইরান ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। ফলে এই সময় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়।
১৯৯০-র দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়া ইরানকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর মধ্যে ছিল মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান, সু-২৪ আক্রমণ বিমান, কিলো শ্রেণির সাবমেরিন, টি-৭২ ট্যাংক এবং এস-২০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পরে টর-এম১ স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এস-৩০০ দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সরবরাহ করা হয়। তবে রাশিয়া ইরানের সঙ্গে কোনও সামরিক জোট গড়েনি। আর অস্ত্র সরবরাহও ছিল বিচ্ছিন্ন এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমিত। সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি, যেমন এস-৪০০ বা আধুনিক যুদ্ধবিমান, ইরানকে দেওয়া হয়নি।
একই সময়ে মিশর, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখে রাশিয়া, যাদের অনেকেই ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ। ২০১০ সালে পশ্চিমা চাপের মুখে রাশিয়া ইরানের জন্য এস-৩০০ সরবরাহ স্থগিত করে এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সম্মতি জানায়। দুই দেশের বাণিজ্যও মাত্র বছরে ১ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ রাশিয়া ও ইরানকে একটি কৌশলগত জোটে নিয়ে আসে। বাশার আল-আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে রাশিয়া আকাশ থেকে সামরিক সহায়তা দেয় এবং ইরান স্থলবাহিনীকে শক্তিশালী করে। লেবাননের হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে যুদ্ধে যুক্ত করা হয়। তবে প্রকৃত অর্থে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর। এরপর থেকে মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রূপ নেয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর রাশিয়া তার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে তিনটি প্রধান বিষয় প্রত্যাশা করতে শুরু করে। প্রথমত, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সরাসরি বা পরোক্ষ সমর্থন। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা। তৃতীয়ত, ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া পশ্চিমা জোটের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা। ইরান এই তিন ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মাত্রায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রধান অংশীদার হিসেবে তেহরানের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ে। তবে ইরানের দিকে রাশিয়ার ঝুঁকে পড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। এতে ইসরায়েল ইউক্রেনকে কিছু সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ শুরু করে। তবুও মস্কো মনে করে, তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত মূল্য বেশি।
ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ইরান রাশিয়াকে অস্ত্রও সরবরাহ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোন, যা ২০২২ সালের শরৎ থেকে রাশিয়া ব্যবহার শুরু করে। পরবর্তীতে রাশিয়া দ্রুত এসব ড্রোনের উৎপাদন নিজস্বভাবে শুরু করে। দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে নকশায় পরিবর্তন আনা হয় এবং উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়।
এর বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে কিছু নতুন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান, এমআই-২৮ আক্রমণ হেলিকপ্টার, স্পার্টাক সাঁজোয়া যান এবং ছোট অস্ত্র। ইরান সু-৩৫ যুদ্ধবিমান ও বহনযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও কেনার চুক্তি করেছে, তবে সেগুলোর সরবরাহ এখনো স্পষ্ট নয়। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে মহাকাশ প্রযুক্তি। রাশিয়ার উৎক্ষেপণ অবকাঠামো ও কক্ষপথ সংক্রান্ত দক্ষতা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৩ সালে সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস সতর্ক করে বলেন, রুশ প্রযুক্তিবিদরা সরাসরি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কাজ করছেন।
ইরান রাশিয়ার অর্থনীতিকেও গুরুত্বপূর্ণভাবে সহায়তা করেছে, বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায়। গত এক দশকে ইরান তেল বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করে। ২০১০-এর দশকে তারা “শ্যাডো ফ্লিট” নামে পরিচিত একটি ট্যাংকার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, যা নিষিদ্ধ তেল পরিবহন করে। পাশাপাশি বীমা, অর্থ লেনদেন ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বিকল্প পদ্ধতি তৈরি করা হয়। ২০২২ সালের পর রাশিয়া এই পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের একই অবকাঠামো ব্যবহার শুরু করে। পরে রাশিয়া এই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করে এবং ইরানের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। এতে একদিকে ইরান কিছুটা সুবিধা পেলেও, অন্যদিকে রাশিয়া একই বাজারে প্রতিযোগী হয়ে ওঠে, বিশেষ করে চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে।
তারপরও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া রাশিয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ২০২৩ সালে ইরানকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সদস্য করতে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরের বছর ব্রিকস জোটে ইরানের অন্তর্ভুক্তির জন্যও মস্কো সক্রিয়ভাবে লবিং করে। পাশাপাশি ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে রাশিয়া সহায়তা করে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রভাব ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় ধরনের সংঘাতে ইরানের সবচেয়ে প্রয়োজন উন্নত যুদ্ধবিমান, আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নির্ভুল অস্ত্র। এসব সরঞ্জাম রাশিয়ার কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলেও সেগুলো তার ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অপরিহার্য। ফলে ইরানকে দ্রুত এসব সহায়তা দেওয়ার বাস্তব সুযোগ নেই।
ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার কারণে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দৃঢ় অবস্থানের মুখে সরাসরি জড়াতে অনিচ্ছুক হওয়ায় রাশিয়া ইরানকে দৃশ্যমান কোনো বড় সহায়তা দেয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চলমান আলোচনাও মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া আশা করছে, এসব আলোচনার মাধ্যমে অন্তত ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কিছুটা কমানো এবং নতুন নিষেধাজ্ঞার গতি ধীর করা সম্ভব হবে। এই বাস্তবতায় ইরানের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়া মস্কোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তাদের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও লজিস্টিক কেন্দ্র। একইভাবে সৌদি আরব ওপেক প্লাস জোটে রাশিয়ার প্রধান অংশীদার। ফলে ইরানের পক্ষে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়লে এই সম্পর্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে ধারণা করা হয়, রাশিয়া কিছু গোপন সহায়তা দিয়ে থাকতে পারে, যা সরাসরি দৃশ্যমান নয়। যেমন মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি বা হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা। কিন্তু এই সহায়তার প্রভাব অনেক সীমিত।
রাশিয়া ইরান যুদ্ধের কিছু পরোক্ষ সুবিধাও পাচ্ছে। এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার অস্ত্রের সরবরাহ সীমিত, ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহার বাড়লে ইউক্রেনের প্রাপ্তি কমে যাবে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা আসছে জ্বালানির বাজার থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেলের দাম বাড়ছে। এতে রাশিয়ার তেল বিক্রি বেড়ে আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সাময়িকভাবে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যাতে রাশিয়ার তেল বিক্রি সহজ হয়। একইভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি কমে গেলে এশিয়ার বাজারে রাশিয়ার গ্যাসের চাহিদা বাড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হলে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এতে রাশিয়ার অর্থনীতি বড় সুবিধা পাবে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে চীনও রাশিয়া থেকে নতুন স্থলপথে তেল ও গ্যাস আমদানির দিকে ঝুঁকতে পারে। রাশিয়া বহু বছর ধরে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইউরোপ যখন রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে, তখন চীনকে বড় বাজার হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আরও অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। ফলে সরাসরি প্রভাব বিস্তার না করে, বৈশ্বিক সংকটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে লাভ তোলাই এখন রাশিয়ার প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে।
(ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত আলেকজান্ডার গাবুয়েভ, নিকোল গ্রাজেউস্কি ও সের্গেই ভাকুলেঙ্কোর বিশ্লেষণ ‘হোয়াই রাশিয়া ইজ ওয়াচিং ইরান বার্ন’ অবলম্বনে)

গত বছর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি “সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি” স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর রাশিয়ার ভূমিকা এখনো অনেকটাই দর্শকের মতো।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডকে পুতিন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমানো, যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানায়। তবে এসব বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তার কোনো ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি।
এর কারণ হিসেবে ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়, চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো ধারা না থাকায় রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেনি। তবে বাস্তবেও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়ক অংশীদার হিসেবে ইরানকে কার্যকর সহায়তা দিতে মস্কো তেমন কিছুই করেনি। রাশিয়া হয়তো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য বা উন্নত ড্রোন কৌশলে সীমিত সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু এ ধরনের সহায়তা যুদ্ধের ফলাফলে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম নয়।
ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই সীমিত ভূমিকা একটি পরিচিত ধারা অনুসরণ করে—মিত্র দেশগুলো সংকটে পড়লে মস্কো সাধারণত কঠোর ভাষায় বিবৃতি দেয়, কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ খুব কমই নেয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সংঘাতে রাশিয়া কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করেনি। ফলে নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলটি আজারবাইজানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এর এক বছর পর সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বিদ্রোহীরা বাশার আল-আসাদের সরকারকে উৎখাত করে, সেখানেও রাশিয়া কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পরও রাশিয়ার কোনো দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এই ঘটনাগুলো রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ইরান সংকট রাশিয়ার জন্য কিছু পরোক্ষ সুবিধাও তৈরি করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে রাশিয়ার অতিরিক্ত আয় হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ সম্প্রতি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন চীনও ভবিষ্যতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইউক্রেন ও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে সরাসরি সহায়তা না করেও রাশিয়া কৌশলগতভাবে এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া ও ইরান পারস্পরিক স্বার্থে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়। এর আগে কয়েক শতাব্দী ধরে তারা মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এবং ককেশাস অঞ্চল ও কাস্পিয়ান সাগর ঘিরে প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতা করত। তবে ১৯৯০-র দশকের শুরুতে রাশিয়া তার অতিরিক্ত সামরিক ও বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি বিক্রির সুযোগ খুঁজছিল। অন্যদিকে, ইরান ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। ফলে এই সময় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়।
১৯৯০-র দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়া ইরানকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর মধ্যে ছিল মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান, সু-২৪ আক্রমণ বিমান, কিলো শ্রেণির সাবমেরিন, টি-৭২ ট্যাংক এবং এস-২০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পরে টর-এম১ স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এস-৩০০ দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সরবরাহ করা হয়। তবে রাশিয়া ইরানের সঙ্গে কোনও সামরিক জোট গড়েনি। আর অস্ত্র সরবরাহও ছিল বিচ্ছিন্ন এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমিত। সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি, যেমন এস-৪০০ বা আধুনিক যুদ্ধবিমান, ইরানকে দেওয়া হয়নি।
একই সময়ে মিশর, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখে রাশিয়া, যাদের অনেকেই ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ। ২০১০ সালে পশ্চিমা চাপের মুখে রাশিয়া ইরানের জন্য এস-৩০০ সরবরাহ স্থগিত করে এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সম্মতি জানায়। দুই দেশের বাণিজ্যও মাত্র বছরে ১ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ রাশিয়া ও ইরানকে একটি কৌশলগত জোটে নিয়ে আসে। বাশার আল-আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে রাশিয়া আকাশ থেকে সামরিক সহায়তা দেয় এবং ইরান স্থলবাহিনীকে শক্তিশালী করে। লেবাননের হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে যুদ্ধে যুক্ত করা হয়। তবে প্রকৃত অর্থে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর। এরপর থেকে মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রূপ নেয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর রাশিয়া তার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে তিনটি প্রধান বিষয় প্রত্যাশা করতে শুরু করে। প্রথমত, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সরাসরি বা পরোক্ষ সমর্থন। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা। তৃতীয়ত, ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া পশ্চিমা জোটের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা। ইরান এই তিন ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মাত্রায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রধান অংশীদার হিসেবে তেহরানের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ে। তবে ইরানের দিকে রাশিয়ার ঝুঁকে পড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। এতে ইসরায়েল ইউক্রেনকে কিছু সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ শুরু করে। তবুও মস্কো মনে করে, তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত মূল্য বেশি।
ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ইরান রাশিয়াকে অস্ত্রও সরবরাহ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোন, যা ২০২২ সালের শরৎ থেকে রাশিয়া ব্যবহার শুরু করে। পরবর্তীতে রাশিয়া দ্রুত এসব ড্রোনের উৎপাদন নিজস্বভাবে শুরু করে। দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে নকশায় পরিবর্তন আনা হয় এবং উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়।
এর বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে কিছু নতুন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান, এমআই-২৮ আক্রমণ হেলিকপ্টার, স্পার্টাক সাঁজোয়া যান এবং ছোট অস্ত্র। ইরান সু-৩৫ যুদ্ধবিমান ও বহনযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও কেনার চুক্তি করেছে, তবে সেগুলোর সরবরাহ এখনো স্পষ্ট নয়। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে মহাকাশ প্রযুক্তি। রাশিয়ার উৎক্ষেপণ অবকাঠামো ও কক্ষপথ সংক্রান্ত দক্ষতা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৩ সালে সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস সতর্ক করে বলেন, রুশ প্রযুক্তিবিদরা সরাসরি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কাজ করছেন।
ইরান রাশিয়ার অর্থনীতিকেও গুরুত্বপূর্ণভাবে সহায়তা করেছে, বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায়। গত এক দশকে ইরান তেল বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করে। ২০১০-এর দশকে তারা “শ্যাডো ফ্লিট” নামে পরিচিত একটি ট্যাংকার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, যা নিষিদ্ধ তেল পরিবহন করে। পাশাপাশি বীমা, অর্থ লেনদেন ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বিকল্প পদ্ধতি তৈরি করা হয়। ২০২২ সালের পর রাশিয়া এই পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের একই অবকাঠামো ব্যবহার শুরু করে। পরে রাশিয়া এই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করে এবং ইরানের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। এতে একদিকে ইরান কিছুটা সুবিধা পেলেও, অন্যদিকে রাশিয়া একই বাজারে প্রতিযোগী হয়ে ওঠে, বিশেষ করে চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে।
তারপরও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া রাশিয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ২০২৩ সালে ইরানকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সদস্য করতে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরের বছর ব্রিকস জোটে ইরানের অন্তর্ভুক্তির জন্যও মস্কো সক্রিয়ভাবে লবিং করে। পাশাপাশি ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে রাশিয়া সহায়তা করে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রভাব ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় ধরনের সংঘাতে ইরানের সবচেয়ে প্রয়োজন উন্নত যুদ্ধবিমান, আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নির্ভুল অস্ত্র। এসব সরঞ্জাম রাশিয়ার কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলেও সেগুলো তার ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অপরিহার্য। ফলে ইরানকে দ্রুত এসব সহায়তা দেওয়ার বাস্তব সুযোগ নেই।
ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার কারণে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দৃঢ় অবস্থানের মুখে সরাসরি জড়াতে অনিচ্ছুক হওয়ায় রাশিয়া ইরানকে দৃশ্যমান কোনো বড় সহায়তা দেয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চলমান আলোচনাও মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া আশা করছে, এসব আলোচনার মাধ্যমে অন্তত ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কিছুটা কমানো এবং নতুন নিষেধাজ্ঞার গতি ধীর করা সম্ভব হবে। এই বাস্তবতায় ইরানের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়া মস্কোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তাদের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও লজিস্টিক কেন্দ্র। একইভাবে সৌদি আরব ওপেক প্লাস জোটে রাশিয়ার প্রধান অংশীদার। ফলে ইরানের পক্ষে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়লে এই সম্পর্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে ধারণা করা হয়, রাশিয়া কিছু গোপন সহায়তা দিয়ে থাকতে পারে, যা সরাসরি দৃশ্যমান নয়। যেমন মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি বা হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা। কিন্তু এই সহায়তার প্রভাব অনেক সীমিত।
রাশিয়া ইরান যুদ্ধের কিছু পরোক্ষ সুবিধাও পাচ্ছে। এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার অস্ত্রের সরবরাহ সীমিত, ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহার বাড়লে ইউক্রেনের প্রাপ্তি কমে যাবে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা আসছে জ্বালানির বাজার থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেলের দাম বাড়ছে। এতে রাশিয়ার তেল বিক্রি বেড়ে আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সাময়িকভাবে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যাতে রাশিয়ার তেল বিক্রি সহজ হয়। একইভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি কমে গেলে এশিয়ার বাজারে রাশিয়ার গ্যাসের চাহিদা বাড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হলে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এতে রাশিয়ার অর্থনীতি বড় সুবিধা পাবে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে চীনও রাশিয়া থেকে নতুন স্থলপথে তেল ও গ্যাস আমদানির দিকে ঝুঁকতে পারে। রাশিয়া বহু বছর ধরে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইউরোপ যখন রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে, তখন চীনকে বড় বাজার হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আরও অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। ফলে সরাসরি প্রভাব বিস্তার না করে, বৈশ্বিক সংকটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে লাভ তোলাই এখন রাশিয়ার প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে।
(ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত আলেকজান্ডার গাবুয়েভ, নিকোল গ্রাজেউস্কি ও সের্গেই ভাকুলেঙ্কোর বিশ্লেষণ ‘হোয়াই রাশিয়া ইজ ওয়াচিং ইরান বার্ন’ অবলম্বনে)

ইরানে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পর এবার বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, আন্তর্জাতিক সার বাজারও বড় ধরনের চাপে পড়েছে।
২ দিন আগে
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী একক মেরু বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকার যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল, তা আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ওয়াশিংটন এখন আর কেবল একটি ফ্রন্টে মনোনিবেশ করে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না।
২ দিন আগে
২০২৬ সালের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ছায়া যুদ্ধের কৌশলগত পর্দা পুরোপুরি সরে গিয়ে এক সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়েছে, যেখানে ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ইসরায়েল ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে।
৩ দিন আগে
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে প্রতিনিয়ত বাড়ছে হতাহত ও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ। ১৭ মার্চের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী পুরো অঞ্চলে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু ইরানেই নিহতের সংখ্যা ১৩০০ থেকে ১৪৪৪ ছাড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে শত শত বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। মিনাব শহরের একটি স্কুলেই ১
৪ দিন আগে