গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ/সত্যিই কি এক বছরের মধ্যে পুরো ইন্টারনেট দখল করবে এআই

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ৩৪
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যত দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই তাকে ঘিরে বাড়ছে ভয়। কেউ বলছেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই এআই-নিয়ন্ত্রিত ‘বটনেট’ পুরো ইন্টারনেটকে বিপর্যস্ত করতে পারে। কারও আশঙ্কা, আগামী এক দশকে এআইয়ের কারণে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও বেশি। আবার কেউ মনে করছেন, এসব আশঙ্কার বড় অংশই অনুমাননির্ভর এবং প্রযুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে।

আসলেই কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে এআই? আর যে ভয়াবহ ভবিষ্যতের কথা বলা হচ্ছে, তার কতটা বাস্তব ভিত্তি আছে?

এক বছরের মধ্যেই কি ইন্টারনেট দখল করবে এআই

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এমন একটি এআই-চালিত ‘বট’ তৈরি হতে পারে, যা ইন্টারনেটের বিভিন্ন দুর্বল সিস্টেমে ঢুকে একটি স্থায়ী ‘বটনেট’ গড়ে তুলতে পারে। এতে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছেন তিনি। তবে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক গ্যারি মার্কাস মনে করেন, এই আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না ঠিকই, কিন্তু এটিকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবেও দেখা উচিত নয়।

মার্কাস ও তাঁর সহকর্মীদের মতে, ইন্টারনেটের বড় অংশ ক্লাউডফ্লেয়ার, গুগল ও অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এসব অবকাঠামো দীর্ঘ সময়ের জন্য পুরোপুরি অচল করে দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। কোনো দুর্বল ওয়েবসাইটে হামলা চালানো সম্ভব হলেও তার অর্থ পুরো ইন্টারনেট ধসে পড়া নয়।

হাগিং ফেসের প্রকৌশলী নিলস রগও পুরো ইন্টারনেট দখলের ধারণাকে ‘অদ্ভুদ’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, কোনো এআই একটি সিস্টেমে ঢুকতে পারলেই যে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ ধরনের বড় আকারের হামলার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন, যা মূলত হাতে গোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের কাছেই রয়েছে।

ইন্টারনেট কি এত সহজে অচল করা সম্ভব

ইউনিভার্সিটি অব সারের সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ডের মতে, বটনেট দিয়ে পুরো ইন্টারনেট অচল করে দেওয়া বাস্তবে যতটা সহজ মনে হয়, বিষয়টি ততটাও সহজ নয়। কারণ, ইন্টারনেট কোনো একক অবকাঠামো নয়। এর বিভিন্ন অংশের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কাঠামো আলাদা। কোনো একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তথ্যের প্রবাহ অন্য পথ দিয়ে ঘুরে যেতে পারে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট অংশে হামলা হলেও পুরো নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম।

উডওয়ার্ডের মতে, এআই নিজে নিজে সব সিদ্ধান্ত নেয় বিষয়টি এমন নয়। এআই একটি হাতিয়ার, আর সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করে মানুষের ওপর।

মানুষের জায়গা দখল হওয়ার আশঙ্কা ১০ শতাংশ

এআই নিয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবিগুলোর একটি এসেছে অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের প্রধান ইভান হুবিঙ্গারের কাছ থেকে। তাঁর মতে, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআই মানুষের জায়গা দখল করে নেওয়ার আশঙ্কা ১০ শতাংশেরও বেশি। এআই গবেষণায় এ ধরনের আশঙ্কাকে বলা হয় ‘পি (ডুম)’ । তবে সবাই এ ধরনের শতাংশের হিসাবকে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। এআই নাউ ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি খলাফের মতে, এসব দাবিকে সঠিক প্রমাণ বা ভুল প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত বাস্তব তথ্য নেই। ফলে ১০ শতাংশ বা এ ধরনের অন্য কোনো সংখ্যা মূলত অনুমাননির্ভর।

জুলাইয়ে ওপেনএআই জানায়, নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাদের কিছু এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। এসব এজেন্ট পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করে দলভুক্ত হয়ে কাজ করার পাশাপাশি ইন্টারনেটের অন্য অংশে প্রবেশ করে হ্যাক করার চেষ্টাও করেছিল। অ্যানথ্রপিকও জানিয়েছে, তারা এমন পাঁচটি ঘটনা শনাক্ত করেছে, যেখানে তাদের এআই মডেল এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা জৈব অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

এআই কি পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও ভয়ংকর

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেস ব্রাউন বলেছেন, ‘সুপারইন্টেলিজেন্ট’ বা অতিমানবীয় বুদ্ধিসম্পন্ন এআই পারমাণবিক অস্ত্রের মতো, এমনকি তার চেয়েও বড় হুমকি হতে পারে। অক্সফোর্ডের গবেষক টবি অর্ডও মনে করেন, মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া এআই তৈরি হলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখনো এমন সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই তৈরি হয়নি। ভবিষ্যতে তা কবে তৈরি হবে, আদৌ হবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন পূর্বাভাসে এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে র‍্যান্ড করপোরেশনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআই দিয়ে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয় না, যদি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় থাকে এবং সেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকে। তবে এআই ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পারমাণবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে, এমন ঝুঁকি রয়েছে।

এআইয়ের অগ্রগতি কি থামানো উচিত

এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন, প্রযুক্তির অগ্রগতি কি ধীর করা উচিত? মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স উন্নত এআই প্রযুক্তির বিকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের অধ্যাপক পেদ্রো ডোমিঙ্গোসের মতে, এআইকে ভালোভাবে বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গবেষণা না কমিয়ে, বরং আরও গবেষণা করা উচিত।

আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এআইয়ের অগ্রগতি থামালে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে চীনের কাছে পিছিয়ে পড়তে পারে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও এআই প্রতিযোগিতায় চীনকে এগিয়ে যেতে না দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তবে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণের দাবি তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে চীনের তুলনামূলক সস্তা ও ওপেন-সোর্স এআই মডেলগুলো বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতিযোগিতার নতুন চাপ তৈরি করছে।

আতঙ্ক নয়, দরকার বাস্তব প্রস্তুতি

সব মিলিয়ে এআই নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই এ কথা যেমন বলা যায় না, তেমনি আগামী এক বছরের মধ্যেই এআই পুরো ইন্টারনেট দখল করবে বা আগামী এক দশকে মানুষের জায়গা দখল করবে, এমন দাবিকেও নিশ্চিত সত্য বলা যাবে না। এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। কেউ আশঙ্কা করছে তার সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মাত্রা নিয়ে, কারও আপত্তি সেই ঝুঁকিকে নির্দিষ্ট শতাংশে প্রকাশ করা নিয়ে। তবে সাইবার হামলা, দুর্বল সিস্টেম শনাক্তকরণ, জৈব অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এআই ব্যবহারের মতো ঘটনাগুলো সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ।

এআইকে ভয় না পেয়ে এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত।

(দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত