
নতুন বিশ্ব-মানচিত্র চালুর প্রস্তাব করেছে জাতিসংঘ। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ের পক্ষে বিপুল ভোট পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ বলছেন, এত পুরোনো মানচিত্র বদলানোর দরকার কী? কেউ বলছেন, বহু দেশের সীমানাই বদলে যাবে নতুন মানচিত্রে। এরই মধ্যে মানচিত্রটি সম্পর্কে আপত্তি জানিয়েছে জাপান, ভারত, ইউক্রেনসহ আরও কয়েকটি দেশ।
বিতর্কটি পুরোনো। নতুন করে সামনে এসেছে গত ৪ সেপ্টেম্বর। ওই দিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ শীর্ষক প্রস্তাবটি ১৬৪-১ ভোটে অনুমোদন করে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। আফ্রিকান গ্রুপের পক্ষে টোগো প্রস্তাবটি উত্থাপন করে।
কী বলছে জাতিসংঘ
জাতিসংঘ বলছে, প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য হলো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন মানচিত্রে তুলনামূলক সঠিকভাবে তুলে ধরে সমান-আয়তনভিত্তিক বা ইকুয়াল এরিয়া প্রজেকশন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। জাতিসংঘ কোনো নতুন রাজনৈতিক বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেনি। কোনো দেশের সীমানা বদলানোর সিদ্ধান্তও নেয়নি। কোনো ভূখণ্ডের মালিকানা নিয়েও নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনকি বিশ্বের সব দেশকে একটি নির্দিষ্ট মানচিত্র ব্যবহার করতেও বাধ্য করেনি। মূল আলোচনাটি হলো বিশ্বকে আমরা মানচিত্রে কীভাবে দেখি।
বর্তমান মানচিত্রের দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায়, আফ্রিকাকে বাস্তবের চেয়ে একটু ছোট দেখায়। আর ইউরোপ বা গ্রিনল্যান্ডকে দেখায় বাস্তবের চেয়ে একটু বড়। এসব অসঙ্গতিই দূর করতে চাইছে জাতিসংঘ।
মার্কেটর মানচিত্র নিয়ে বিতর্ক কেন
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত মানচিত্রগুলোর একটি হলো মার্কেটর প্রজেকশন। ১৫৬৯ সালে জেরার্ডাস মার্কেটর এটি তৈরি করেছিলেন। নৌপথ নির্ধারণে এই প্রজেকশন দীর্ঘদিন অত্যন্ত কার্যকর ছিল। কারণ এতে দিক ও কোণ ঠিক রাখার সুবিধা রয়েছে এবং নির্দিষ্ট দিক ধরে চলা নৌপথ মানচিত্রে সরলরেখায় দেখানো যায়। কিন্তু সাধারণ বিশ্ব-মানচিত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মেরুর দিকে বিভিন্ন ভূখণ্ডকে বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায় মার্কেটর প্রজেকশন। ফলে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা, রাশিয়া ও উত্তর ইউরোপের মতো অঞ্চল আফ্রিকার তুলনায় অনেক বড় মনে হতে পারে।
বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন ইউরোপ, চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত আয়তনের কাছাকাছি। কিন্তু প্রচলিত মানচিত্রে সেই অনুপাত বোঝা কঠিন। তবে মার্কেটরকে ‘ভুল মানচিত্র’ বলা ঠিক নয়। একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এই মানচিত্র প্রজেকশন তৈরি করা হয়েছে।
বিকল্প হিসেবে কেন ইকুয়াল আর্থ
এই সীমাবদ্ধতা কমানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ইকুয়াল এরিয়া প্রজেকশন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ইকুয়াল আর্থ সম্প্রতি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ২০১৮ সালে কার্টোগ্রাফার বোয়ান শাভরিচ, টম প্যাটারসন ও বার্নহার্ড জেনি ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন তৈরি করেন। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আপেক্ষিক আয়তন যতটা সম্ভব সঠিক রাখা। অর্থাৎ আফ্রিকা, ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা এশিয়ার আয়তন তুলনা করলে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। তবে ইকুয়াল আর্থও নিখুঁত নয়। পৃথিবী গোলাকার, আর মানচিত্র সমতল। ফলে কোনো সমতল মানচিত্রেই একই সঙ্গে আয়তন, আকৃতি, দূরত্ব ও দিক সবকিছু নিখুঁতভাবে দেখানো সম্ভব নয়। মার্কেটরেও দিক ও কোণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আর ইকুয়াল আর্থেও অঞ্চলগুলোর প্রকৃত আয়তনের তুলনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মানচিত্র বদলালেও বদলাবে না সীমানা
কোনো দেশের আকার মানচিত্রে বড় বা ছোট দেখালেই সেই দেশের ভূখণ্ড বড় বা ছোট হয়ে যায় না। একইভাবে কোনো বিতর্কিত অঞ্চলকে একটি নির্দিষ্ট প্রজেকশনে দেখালেই তার মালিকানা নির্ধারিত হয় না। মানচিত্রের প্রজেকশন হলো পৃথিবীর বাঁকা পৃষ্ঠকে সমতল কাগজ বা পর্দায় দেখানোর একটি গাণিতিক পদ্ধতি। একটি দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা বা ভূখণ্ডের মালিকানা নির্ধারিত হয় চুক্তি, রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি, আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ বিষয়ে জানিয়েছে, এ ধরনের মানচিত্র ব্যবহারের ফলে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক সীমান্ত বা ভূখণ্ডগত অবস্থান পরিবর্তিত হয় না।
জাতিসংঘ কি ইকুয়াল আর্থকে বাধ্যতামূলক করেছে
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবটি কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি নয়। এটি এমন কোনো আইনও তৈরি করে না, যার ফলে সব দেশকে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন ব্যবহার করতেই হবে। জাতিসংঘ সনদের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে পারে এবং সদস্যরাষ্ট্র বা নিরাপত্তা পরিষদের কাছে সুপারিশ করতে পারে। তাই এই প্রস্তাবের মূল শক্তি হলো এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব।
১৬৪টি দেশের সমর্থন বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এর ফলে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রকাশনা সংস্থা, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল ম্যাপিং সেবাগুলো ভবিষ্যতে সমান-আয়তনের মানচিত্র ব্যবহারে বেশি আগ্রহী হতে পারে।
আন্তর্জাতিক আদালতে ভূখণ্ডের বিরোধ নিষ্পত্তিতে মানচিত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু কোনো মানচিত্রে একটি সীমারেখা আঁকা থাকলেই সেটি আইনগত আন্তর্জাতিক সীমান্ত হয়ে যায় না। ১৯৮৬ সালে বুরকিনা ফাসো ও মালির সীমান্ত বিরোধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বলেছিল, মানচিত্র মূলত সহায়ক প্রমাণ। এর গুরুত্ব নির্ভর করে কে মানচিত্রটি তৈরি করেছে, কখন তৈরি করেছে, কতটা নির্ভরযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সেটিকে গ্রহণ করেছে কি না এসব বিষয়ের ওপর। অর্থাৎ মানচিত্রের প্রজেকশন নয়, রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি ও আইনি দলিলই সীমান্তের মূল ভিত্তি।
আফ্রিকার জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ উদ্যোগের সঙ্গে আফ্রিকার দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগ জড়িত। মার্কেটর প্রজেকশনে উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চল বড় দেখানোর কারণে আফ্রিকা অনেক সময় বাস্তবের তুলনায় ছোট মনে হয়। আফ্রিকান ইউনিয়ন তাই মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন নিখুঁতভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৩৯তম অধিবেশনেও ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়।
এটি শুধু মানচিত্রের বিষয় নয়, এর সঙ্গে শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং ঔপনিবেশিক মানচিত্র-চর্চার উত্তরাধিকার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে মার্কেটর আফ্রিকাকে ছোট দেখানোর উদ্দেশ্যে মানচিত্রটি তৈরি করেছিলেন, এমন নয়। তিনি মূলত নৌ-চলাচলের সুবিধার কথা মাথায় রেখেই প্রজেকশনটি তৈরি করেছিলেন।
মানচিত্র নিয়ে কেন আপত্তি জাপান, ভারত ও ইউক্রেনের
জাতিসংঘের নতুন মানচিত্র পদ্ধতি নিয়ে জাপান, ভারত ও ইউক্রেন অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। দেশগুলোর অস্বস্তির কারণ মানচিত্রের আকার নয়, বিতর্কিত ভূখণ্ডগুলো কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন দেশই নতুন ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র পদ্ধতির মূল ধারণার বিরোধিতা করেনি। তবে নিজেদের দাবিকৃত বা বিতর্কিত অঞ্চলগুলো মানচিত্রে যেভাবে রঙ করা হয়েছে, তা নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
ইউক্রেনের আপত্তি ক্রিমিয়া নিয়ে। রাশিয়ার দখলে থাকা উপদ্বীপটি নতুন মানচিত্রে ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে আলাদা রঙে এবং রাশিয়ার রঙের কাছাকাছি দেখানো হয়েছে। কিয়েভের মতে, ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে দেখানোর ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। জাপানের অভিযোগ, কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা বিতর্কিত চারটি দ্বীপকে রুশ ভূখণ্ডের একই রঙে দেখানো হয়েছে। টোকিও বলছে, এতে তাদের ভূখণ্ডসংক্রান্ত অবস্থান ভুলভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের আপত্তি কাশ্মীর ও লাদাখ নিয়ে। নয়াদিল্লির দাবি, ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ডকে দেশটির সরকারি মানচিত্র অনুযায়ীই দেখাতে হবে, বিভ্রান্তিকর কোনো উপস্থাপন গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নতুন মানচিত্রের লড়াই শুধু পৃথিবীর আকার ঠিক করার নয়। কোন ভূখণ্ড কার, মানচিত্রের রঙে সেই রাজনৈতিক বার্তাটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: ডিপ্লোম্যাসি অ্যান্ড ল এবং আল জাজিরা
.png)
-40e58c.jpeg)






