মহাকাশে নতুন ‘চোখ’: দক্ষিণ এশিয়ায় কি হঠাৎ যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ভারত?

লেখা:
লেখা:
আব্দুল মুয়িজ খান ও শের আলী কাকার

এআই জেনারেটেড ছবি
এআই জেনারেটেড ছবি

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) সম্প্রতি জিওসিনক্রোনাস আর্থ অরবিটে একটি নতুন নজরদারি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ইওএস-০৫। গত ৪ সেপ্টেম্বর জিএসএলভি-এফ১৭ রকেটের মাধ্যমে এটি মহাকাশে পাঠানো হয়। মহাকাশে এটিই ভারতের প্রথম আর্থ অবজারভেশন বা পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইট, যা জিও অরবিটে স্থাপন করা হয়েছে।

এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভারত এখন মাটি থেকে ৩৪,৯০৩ থেকে ৩৫,৮৮৪ কিলোমিটার ওপর থেকে পুরো উপমহাদেশের ওপর একটানা নজরদারি চালাতে পারবে। ইসরোর চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন একে ভারতের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ভারতের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি সক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি এক পরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে ভারত এখন খুব সহজেই উপমহাদেশের সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। বিশেষ করে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, বিমানের গতিবিধি, কৌশলগত সম্পদের অবস্থান এবং যুদ্ধের সময় তাদের সৈন্য সমাবেশের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা সম্ভব হবে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মহাকাশে এমন একটি নতুন ‘চোখ’ ভারতের সামরিক সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ভারতের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি সক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি এক পরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে ভারত এখন খুব সহজেই উপমহাদেশের সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।

বর্তমানে ভারতের মহাকাশ ব্যবস্থায় নেভিগেশন, যোগাযোগ এবং নজরদারির জন্য বেশ কিছু স্যাটেলাইট রয়েছে। সামরিক যোগাযোগের জন্য তাদের তিনটি নিজস্ব স্যাটেলাইট আছে। এর পাশাপাশি আরও ১০টি স্যাটেলাইট সামরিক ও বেসামরিক—উভয় কাজেই ব্যবহৃত হয়। ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন সিস্টেম ‘ন্যাভিক’-এর অধীনে নজরদারির জন্য বেশ কয়েকটি স্যাটেলাইট কাজ করছে। তবে সদ্য উৎক্ষেপিত ইওএস-০৫ স্যাটেলাইটটি ভারতকে প্রথমবারের মতো রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক নজরদারির সুবিধা এনে দেবে।

ভবিষ্যতের মহাকাশ কৌশল

২০২৪ সালে ভারতের মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি ‘স্পেস বেজড সার্ভেইল্যান্স ফেজ-৩’ অনুমোদন করে। এর আওতায় নজরদারির জন্য ৫২টি প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বড় পরিকল্পনা করা হয়।

২০২৫ সালের মে মাসের সঙ্কটের পর (ভারত-পাকিস্তান হামলা ও পাল্টা হামলা), ভারতের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর দাবি ওঠে। ২০২৬ সালের ইন্ডিয়ান ডিফেন্স স্পেস সিম্পোজিয়ামে ভারতের সাবেক চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘মহাকাশে ব্যর্থ হলে আমাদের অন্ধের মতো লড়তে হবে। আর মহাকাশে আধিপত্য থাকলে আমরা দূরদর্শিতার সঙ্গে লড়তে পারব।’ তার এই বক্তব্য ভারতের যুদ্ধকৌশলগত চিন্তাধারার বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রমাণ দেয়।

পাকিস্তানের জন্য সরাসরি হুমকি

আগে ভারতের স্যাটেলাইটগুলো লো-আর্থ অরবিটে ছিল। সেগুলো ভালো ছবি দিলেও দ্রুত স্থান পরিবর্তন করত। ফলে একটানা নজর রাখা যেত না। কিন্তু জিও অরবিটে থাকায় ইওএস-০৫ দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় স্থির থেকে নজরদারি করতে পারবে।

এর ফলে ভারতের নিখুঁত হামলা চালানোর সক্ষমতা বাড়বে। কারণ, নিখুঁত হামলার জন্য শুধু অস্ত্রের পাল্লা বা নির্ভুলতা যথেষ্ট নয়, লক্ষ্যবস্তুর সঠিক অবস্থান জানাও জরুরি। মহাকাশ থেকে পাওয়া তথ্য দ্রুত ব্যবহার করে ভারত এখন সহজেই ‘সেন্সর-টু-শুটার’ (তথ্য পাওয়া মাত্রই আক্রমণ) প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত সম্পন্ন করতে পারবে।

বলাই বাহুল্য, ইসলামাবাদ তার অস্ত্র লুকানো ও দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কৌশল এখন আরও উন্নত করবে। ইওএস-০৫ কেবল একটি স্যাটেলাইট হয়ে থাকছে না, এটি ভারত-পাকিস্তানের আগামী দিনের সংকটকে আরও জটিল রূপ দেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এই সার্বক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থা পাকিস্তানের জন্য সরাসরি উদ্বেগের কারণ। মহাকাশে ভারতের এই চোখ আরব সাগরে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর অবস্থান, যুদ্ধবিমান এবং ভ্রাম্যমাণ মিসাইল লঞ্চারগুলোর সহজেই শনাক্ত করতে পারবে। মোবাইল সিস্টেমের নিরাপত্তা মূলত সেটি লুকিয়ে রাখার ওপরই নির্ভর করে। কিন্তু এই সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা এবং সেখানে আঘাত হানার মধ্যবর্তী সময়টুকু অনেক কমে আসবে।

দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতায় প্রভাব

এই স্যাটেলাইট ভারতের আত্মরক্ষার কাজেও লাগবে। পাকিস্তানের যেকোনো পাল্টা হামলা বা সৈন্য সমাবেশ সম্পর্কে ভারত আগেভাগেই সতর্ক হতে পারবে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার মতো উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে এটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে।

দ্রুত শনাক্তকরণ ও নিখুঁত হামলার সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় যেকোনো সঙ্কটের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেক কমে যাবে। ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের প্রতিবেশী হওয়ায় এমনিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় খুব কম পাওয়া যায়। এখন গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার ভয়ে পাকিস্তান হয়তো তাদের অস্ত্র আরও দ্রুত মাঠে নামাতে বা স্থানান্তর করতে বাধ্য হবে।

এতে ‘ইউজ ইট অর লুজ ইট’ (হয় ব্যবহার করো, নয়তো হারাও) এমন একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ফলে দুই দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এবং হঠাৎ যুদ্ধ বেধে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।

বলাই বাহুল্য, ইসলামাবাদ তার অস্ত্র লুকানো ও দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কৌশল এখন আরও উন্নত করবে। ইওএস-০৫ কেবল একটি স্যাটেলাইট হয়ে থাকছে না, এটি ভারত-পাকিস্তানের আগামী দিনের সংকটকে আরও জটিল রূপ দেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: আব্দুল মুয়িজ খান (রিসার্চ অফিসার, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, ইসলামাবাদ) এবং শের আলী কাকার (অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর, বেলুচিস্তান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক নেটওয়ার্ক, কোয়েটা)।

(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে লেখাটি ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত