এক্সপ্লেইনার/ক্রেডিট রেটিং কী, সংস্থাগুলো কীভাবে কাজ করে
স্ট্রিম ডেস্ক

একটি দেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হবে, সেই দেশ সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারবে কি না, এসব বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে ক্রেডিট রেটিং গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে।
গতকাল বুধবার প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে মুডিস জানিয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হ্রাস, রিজার্ভ বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক থাকায় বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ হয়েছে।
ক্রেডিট রেটিং আসলে কী
ক্রেডিট রেটিং হলো কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার একটি মূল্যায়ন। তারা একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতি, আয়, সরকারি ঋণ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে একটি রেটিং দেয়। সেই রেটিং দেখে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পান।
সাধারণত রেটিং যত ভালো হয়, ঋণদাতাদের আস্থাও তত বেশি থাকে। ফলে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু রেটিং কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিতে থাকে। তখন ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন ক্রেডিট রেটিং সংস্থা হলো মুডিস, স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর’স (এসঅ্যান্ডপি) এবং ফিচ রেটিংস। তাদের একসঙ্গে বলা হয় ‘বিগ থ্রি’। তিনটিই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। মুডিস ও এসঅ্যান্ডপির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। ফিচের প্রধান কার্যালয় রয়েছে নিউইয়র্ক ও লন্ডনে। বিশ্বের আরও অনেক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা থাকলেও বৈশ্বিক বাজারে এই তিন প্রতিষ্ঠানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
রেটিং কীভাবে বোঝা যায়
ক্রেডিট রেটিংয়ের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। সর্বোচ্চ মানের রেটিংকে সাধারণত সবচেয়ে নিরাপদ বা শক্তিশালী ক্রেডিট রেটিং হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে সর্বনিম্ন পর্যায়ের রেটিং বলতে, ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে গুরুতর সমস্যায় পড়েছে বা খেলাপি হয়েছে।
তবে তিন সংস্থার রেটিং দেওয়ার পদ্ধতি ও প্রতীক এক নয়। যেমন মুডিসের রেটিংয়ে সর্বোচ্চ রেটিং ট্রিপলএ। এরপর রয়েছে এএ, এ, বিএএ ইত্যাদি ধাপ। এসঅ্যান্ডপি ও ফিচের স্কেলে সর্বোচ্চ রেটিং হলো ট্রিপলএ। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির আভাস থাকলেও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের কারণে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রেটিং ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘নট প্রাইম’-এ অপরিবর্তিত রেখেছে মুডিস।
রেটিংয়ের পাশাপাশি ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো একটি দেশের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আউটলুক দেয়। সাধারণত এটি তিন ধরনের—পজিটিভ, স্টেবল ও নেগেটিভ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আউটলুক ‘স্টেবল’ দিয়েছে মুডিস।
স্টেবল মানে বর্তমান রেটিংয়ে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা আপাতত কম। পজিটিভ হলে ভবিষ্যতে রেটিং বাড়তে পারে। আর নেগেটিভ হলে রেটিং কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কারা রেটিং ঠিক করে
ক্রেডিট রেটিং কোনো একজন কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় না। সাধারণত সংস্থাগুলো অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, তাদের একটি কমিটিতে সাধারণত পাঁচ থেকে আটজন বিশেষজ্ঞ থাকতে পারেন।
তারা একটি দেশের সরকারি আয়-ব্যয়, ঋণের পরিমাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি, বৈদেশিক লেনদেনসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করেন। বড় কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ঘটনাও তাদের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্রেডিট রেটিংয়ের ইতিহাস বেশ পুরোনো। তিন বড় সংস্থার মধ্যে এসঅ্যান্ডপির ইতিহাস সবচেয়ে দীর্ঘ। ১৮৬০ সালে এর যাত্রা শুরু। ১৯০৯ সালে জন মুডি প্রতিষ্ঠা করেন মুডিস। শুরুতে রেলওয়ে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা এবং তাদের শেয়ার ও বন্ড নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করত প্রতিষ্ঠানটি। আর ফিচ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালে। প্রতিষ্ঠাতা জন ফিচের নামেই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়।
তিন প্রতিষ্ঠানের এত প্রভাবের একটি কারণ হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে তাদের রেটিং দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ১৯৭৫ সালে মুডিস, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচকে ‘ন্যাশনালি রিকগনাইজড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রেটিং অর্গানাইজেশন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে আর্থিক বাজারে তাদের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
কীভাবে আয় করে তারা
ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো সাধারণত কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ বা বন্ডের রেটিং দেওয়ার বিনিময়ে ফি বা অর্থ নেয়। এ নিয়েই অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের যুক্তি, যেহেতু রেটিংয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেই অর্থ নেওয়া হয়, তাই স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি থাকে।
তবে মুডিস, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ এ ধরনের অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, মুডিস, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ
.png)
-40e58c.jpeg)






