এক্সপ্লেইনার/পশ্চিমবঙ্গের ঘাটতি মেটাচ্ছে গুজরাটের ইলিশ, যেভাবে আসছে বাংলাদেশেও

বর্ষা এলেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মনে পড়ে ইলিশের কথা। গরম ভাত, সরিষার তেল আর এক টুকরো রুপালি ইলিশ তাদের খাবারের টেবিলে নিয়ে আসে আলাদা আবেদন। কিন্তু একসময় যে ইলিশ ছিল সহজলভ্য, এখন সেটিই হয়ে উঠছে দুর্লভ ও দামি। পশ্চিমবঙ্গের নদীগুলোতে দেশি ইলিশের জোগান কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে বাজারে বাড়ছে মিয়ানমার ও ভারতের গুজরাটের ইলিশের উপস্থিতি।
এরই মধ্যে নতুন খবর। বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানি করছে ভারত। গত দুই মাসে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি করেছে দেশটি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারত থেকে বাংলাদেশে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ রপ্তানি হতে পারে। এমন ঘটনা বাংলাদেশে এবারই প্রথম।
ইলিশ আহরণ কমেছে পশ্চিমবঙ্গে
পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরে সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিআইএফআরআই) বিজ্ঞানী শ্রীকান্ত সামন্ত ভারতের ইলিশ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর হিসাবে, ২০০১ সালে ভারতে বছরে প্রায় ৮০ হাজার টন ইলিশ ধরা পড়লেও ২০১৬ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৪০ হাজার টনে। এর মধ্যে নদী থেকে পাওয়া ইলিশের পরিমাণ কমেছে আরও দ্রুত। ইলিশ মূলত সাগরে বেড়ে ওঠে। বর্ষাকালে ডিম ছাড়ার জন্য নদীর উজানে উঠে আসে। কিন্তু নদীর পথ বাধাগ্রস্ত হওয়া, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়া এবং ছোট মাছ নির্বিচারে ধরার কারণে এই স্বাভাবিক যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
সামন্তের মতে, একসময় ফারাক্কা ব্যারাজের আশপাশে গবেষকেরা দেখেছেন, উজানে উঠতে না পেরে অনেক ইলিশ নিচের দিকে ডিম ছাড়ছে। পরে সেই ডিম, লার্ভা ও ছোট মাছ সূক্ষ্ম জালের মাধ্যমে ধরে ফেলা হতো। ফলে মাছগুলো পরিণত হয়ে আবার প্রজননের সুযোগই পেত না।
কলকাতার বাজারে ইলিশের জোগান দিচ্ছে গুজরাট
ইলিশের জোগান কমে যাওয়ায় এখন ইলিশের চাহিদা মেটাতে পশ্চিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কলকাতার বাজার। সেই তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গুজরাট। গুজরাটের ইলিশ আরব সাগর থেকে গালফ অব খাম্বাত হয়ে নর্মদা নদীর মোহনায় আসে। বর্ষার সময় মিঠা পানির প্রবাহ বাড়লে পরিণত ইলিশ নর্মদার উজানে যায়। একসময় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই এলাকায় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ত।
তবে ১৯৮৭ সালে নর্মদা উপত্যকা প্রকল্পের আওতায় সরদার সরোবর বাঁধ নির্মাণ শুরু হওয়ার পর নদীর প্রবাহ ও লবণাক্ততার পরিবর্তন ইলিশের চলাচলে প্রভাব ফেলে। পরে নর্মদার ইলিশের জোগান কমতে থাকে। তবে গত বছর অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় গুজরাটের ভারুচ এলাকায় ইলিশের উৎপাদন আবার বাড়ে। গত বছর গুজরাট থেকে কলকাতায় বিপুল পরিমাণ ইলিশ আসে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, শুধু গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরেই ৪ হাজার টনের বেশি গুজরাটের ইলিশ কলকাতায় পৌঁছেছিল। পশ্চিম উপকূলের এই ইলিশ তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যেও এর চাহিদা তৈরি হয়।
চলতি বছরে গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুজরাটের ইলিশে প্রচুর ডিম থাকার কারণে ভারতের বাজারে এর চাহিদা তুলনামূলক কম। তবে এই একই বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের ক্রেতাদের কাছে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটে এটিকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কারণ বাংলাদেশে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা বরাবরই বেশি। এছাড়া বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ডিম আলাদা করে বিক্রি বা প্রক্রিয়াজাত করে অন্য দেশে পুনরায় রপ্তানিও করছেন।
ইলিশকে ঘিরে বাণিজ্যে জট, বাজারে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
পদ্মার ইলিশের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক শুধু স্বাদের নয়, স্মৃতিরও। দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের কাছে পদ্মার ইলিশ হারিয়ে যাওয়া শিকড়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। পরে দুর্গাপূজার সময় বিশেষ অনুমতিতে সীমিত পরিমাণ ইলিশ ভারতে পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের পরও ইলিশ রপ্তানি নীতিতে পরিবর্তন দেখা গেছে এবং ভারতে একবার উৎসবের মৌসুমেও ইলিশ পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব নদীগুলোতে ইলিশের জোগান কমে যাওয়ায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছোট বা ‘জাটকা’ ইলিশ ধরা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ছোট ইলিশ বিক্রি না করতে বলা হলেও উৎসস্থলে যথেষ্ট নজরদারি না থাকলে বাজারে এর সরবরাহ বন্ধ করা কঠিন। জোগান বেশি হলে দাম কমে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, গত বছর গুজরাটের ইলিশ কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ রুপিতেও বিক্রি হয়েছে। বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গের কমে যাওয়া ইলিশের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ রুপি কেজি। বড় ইলিশের দাম আরও বেশি।
একসময় পাবনা কিংবা মুর্শিদাবাদের অনেক এলাকায় ইলিশ এত সহজলভ্য ছিল যে কখনো কখনো সবজি বা ডালের চেয়েও কম দামে পাওয়া যেত। তখন মাছ সংরক্ষণের জন্য লবণ দিয়ে তৈরি করা হতো ‘নোনা ইলিশ’। খাদ্য গবেষকদের মতে, ইলিশের প্রতি বাঙালির টান তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের খাবার, পারিবারিক রীতি ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে। মাছের মাথা কে পাবেন, কোন দিনে ইলিশ রান্না হবে এসব ছোট ছোট বিষয়ও অনেক পরিবারে ভালোবাসা ও পারিবারিক সম্পর্কের অংশ।
কলকাতার রেস্তোরাঁতে ইলিশের চাহিদা এখনো প্রবল। আগস্ট-সেপ্টেম্বর এলেই বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় শুরু হয় ইলিশ উৎসব। অনেক রেস্তোরাঁ আগেই পাইকারদের টাকা দিয়ে মাছের সরবরাহ নিশ্চিত করে। কলকাতার রেস্তোরাঁগুলো তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইলিশ উৎসব আয়োজন করে আসছে। প্রতি মৌসুমে তারা প্রায় ১ হাজার ১৫০ কেজি ইলিশ সংগ্রহ করে। বড় আকারের কমপক্ষে ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ কেজি ওজনের মাছ তাদের পছন্দ।
তবু রপ্তানি বাংলাদেশে
পশ্চিমবঙ্গের নদীগুলোতে ইলিশ আহরণ কমলেও গোটা ভারতের চিত্র একরকম নয়। অন্যান্য রাজ্যের নদীগুলোতে ইলিশ আহরণ বেড়েছে। গুজরাট সরকারের মৎস্য বিভাগ বলছে, রাজ্যটিতে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৭ দশমিক ৭২ টন। এর আগের বছর ছিল ৮ হাজার ৫৩৫ দশমিক ৭৫ টন এবং ২০২৩–২৪ সালে ৮ হাজার ২০৯ দশমিক ৪৮ টন। অর্থাৎ সর্বশেষ বছরে বড় ধরনের বৃদ্ধি হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে নর্মদা নদীর ইলিশ আহরণে।
গুজরাটের জেলেদের জালে ধরা পড়া এসব বিপুল ইলিশ আসছে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে। সেখান থেকে বাংলাদেশে। এখানে সরবরাহ চেইনটি মোটামুটি এরকম—গুজরাটের নর্মদা থেকে ভারুচ, সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গ-হাওড়া, তারপর বাংলাদেশ।
তথ্যসূত্র: দ্য মিন্ট, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়া টুডে, ইকনোমিক টাইমস
.png)








