কুষ্টিয়ায় হামলার আগে ফেসবুকে ভিডিও ছড়াল কারা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

স্ট্রিম গ্রাফিক

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মাজারে হামলায় আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ১০ এপ্রিল শুক্রবার তাঁর একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। স্ট্রিম ফ্যাক্টচেক অন্তত ৩টি ভিডিও শনাক্ত করেছে, যেখানে প্রায় হুবুহু উসকানিমূলক ক্যাপশনে ৩টি আলাদা অ্যাকাউন্ট থেকে খণ্ডিত ভিডিওটি ছড়ানো হয়।

শনিবার কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাসিন্দা মাসুদ বলেন, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ফেসবুকের একটি পোস্টে শামীম বাবার বক্তব্য এমনভাবে ছড়ানো হয়, যাতে বিষয়টি ধর্মীয়ভাবে উসকানিমূলক রূপ নেয়। মাসুদসহ একাধিক ব্যক্তির দাবি, এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এলাকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক বাসিন্দা স্ট্রিমকে বলেন, তিন-চারটি আইডি থেকে ভিডিওটি ফিলিপনগর ইউনিয়ন এলাকায় বিভিন্নভাবে ছড়ানো হয়। প্রথমে অনেকেই সেটি আলাদা আলাদাভাবে দেখতে থাকেন। পরে শোনা যায়, এ নিয়ে একটি ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপও খোলা হয় এবং সেই গ্রুপের মাধ্যমে ভিডিওটি আরও অনেকের কাছে পাঠানো হয়। একসময় এটি এলাকায় গ্রুপভিত্তিক ছড়ানোর হয়।

পুলিশও বলছে, ভিডিওটি পুরোনো হলেও সেটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ শামীম রেজাকে উদ্ধার করলেও বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় সদস্যসংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

এই সূত্র ধরে তিনটি পোস্ট

এই সূত্র ধরে ফেসবুকে ভিডিওটি কারা ছড়িয়েছিল, তা খুঁজতে গিয়ে ফেসবুকের সার্চ টুলে একই ভিডিও এবং প্রায় একই ভাষার তিনটি সংশ্লিষ্ট পোস্ট পাওয়া যায়। তিনটি পোস্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ এপ্রিল রাতে একটি পেজ ও দুটি ব্যক্তিগত আইডি থেকে ফেসবুকে একই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। পোস্টগুলোর সময়, ভাষা, ভিডিওর ফ্রেম ও প্রতিক্রিয়ার ধরন মিলিয়ে সমন্বিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি চিত্র পাওয়া যায়।

সত্যের সন্ধানে ফিলিপ নগর পেজ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশটের কোলাজ
সত্যের সন্ধানে ফিলিপ নগর পেজ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশটের কোলাজ

সবচেয়ে আগে ভিডিওটি পোস্ট করে সত্যের সন্ধানে ফিলিপ নগর নামের একটি ফেসবুক পেজ। পোস্টের সময় ১০ এপ্রিল রাত ৮টা ৪২ মিনিট। পেজের তথ্য অনুযায়ী, এতে ৭ হাজারের বেশি ফলোয়ার, শূন্য ফলোয়িং এবং বায়ো অংশে ‘আমিরুল ইসলাম’ লেখা দেখা যায়।

এই পোস্টের ক্যাপশনে শামীম রেজাকে ঘিরে তীব্র আক্রমণাত্মক, অবমাননাকর ও উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয়ভাবে স্পর্শকাতর অভিযোগ আনা হয়েছে, প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের কথা বলা হয়েছে এবং মানুষকে তাঁর বিরুদ্ধে একত্র হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ভাষা শুধু অভিযোগ তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং প্রতিক্রিয়া তৈরি ও ক্ষোভ সংগঠিত করার মতো সরাসরি আহ্বানও এতে ছিল।

ক্যাপশনে লেখা হয়, মাজারের ঠিকানা দিয়ে ওইসব পোস্টে ‘ইবলিশের অনুসারী’, ‘ইসকনের দালাল’ ও ‘ভণ্ড শামীম’ ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করে। আরও লেখা হয়, শামীম নিজেকে ‘ভগবান’ ও ‘নবী’ দাবি করতেন, তাঁর অনুসারীরা মৃত্যুর পর ইসলামি নিয়মে নয়, ‘হরে শামীম কৃষ্ণ শামীম’ বলে কবর দিত।

সবচেয়ে বেশি সাড়া কোন পোস্টে

তিনটি পোস্টের মধ্যে সত্যের সন্ধানে ফিলিপ নগর পেজ থেকে আপলোড করা পোস্টটিই সবচেয়ে বেশি সাড়া পায়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এতে ৬৩৫টি রিঅ্যাকশন, ২১২টি মন্তব্য এবং ৩১২টি শেয়ার দেখা যায়। তিনটি পোস্টের মধ্যে এটিই সেদিন সবচেয়ে বেশি শেয়ার হওয়া পোস্ট।

ভিডিওর কমেন্ট সেকশনের মন্তব্য
ভিডিওর কমেন্ট সেকশনের মন্তব্য

এই পোস্টের মন্তব্য ঘরেও উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ছিঃ ধিক্কার জানাই পবিত্র কুরআনকে নিয়ে কটুক্তি করে আর ফিলিপ নগরের মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় তামাশা দেখে।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘এর বিচার ফিলিপনগরের মাটিতেই হবে।’ আরেকটি মন্তব্যে লেখা হয়েছে, ‘দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করার আহ্বান জানাচ্ছি গ্রামবাসীকে।’

দুই মিনিট পর দ্বিতীয় পোস্ট

এর ঠিক দুই মিনিট পর, রাত ৮টা ৪৪ মিনিটে, আনাসুল্লাহ মোজাহিদ নামের একটি ব্যক্তিগত আইডি থেকেও একই ভিডিও ও প্রায় হুবহু একই ভাষার ক্যাপশন পোস্ট করা হয়। প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, এই আইডিতে সাড়ে পাঁচ হাজার ফলোয়ার দেখা যায়। ব্যক্তিগত তথ্যের অংশে বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ‘দৌলতপুর, খুলনা, বাংলাদেশ’ এবং নিজ শহর হিসেবে ‘কুষ্টিয়া, ঢাকা, বাংলাদেশ’ লেখা রয়েছে।

এই পোস্টের ক্যাপশন প্রথম পোস্টের সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি মিলে যায়। একই অভিযোগ, একই শব্দচয়ন, একই আহ্বান এবং একই সুর এখানে দেখা যায়। এতে বিষয়টি জোরালো হয় যে এটি আলাদা করে লেখা কোনো পোস্ট নয়, বরং একই বয়ান পুনরায় ব্যবহার করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পোস্টে ১২টি রিঅ্যাকশন এবং ১১টি শেয়ার দেখা যায়। প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম হলেও, প্রথম পোস্টের মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে এটি প্রকাশিত হওয়ায় ছড়ানোর ধরনে এই পোস্টের গুরুত্ব রয়েছে।

আনাসুল্লাহ মোজাহিদ-এর আইডির স্ক্রিনশট
আনাসুল্লাহ মোজাহিদ-এর আইডির স্ক্রিনশট

রাতের শেষে তৃতীয় পোস্ট

১০ এপ্রিল দিন রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে আরেকটি ব্যক্তিগত আইডি থেকেও একই ভিডিও পোস্ট করা হয়। এখানেও আগের দুই পোস্টের মতো প্রায় একই ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। ক্যাপশনের মূল অংশ প্রথম দুটি পোস্টের সঙ্গে মিলে যায়। পোস্টের শেষে ‘Pinaki Bhattacharya - @highlight’ যুক্ত দেখা যায়।

এই পোস্টে ৯৯টি রিঅ্যাকশন, ২৮টি মন্তব্য এবং ১২টি শেয়ার ছিল। অর্থাৎ, এটি প্রথম দুই পোস্টের পরে এলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া টেনেছে। তা থেকে বোঝা যায়, রাতের পরের ভাগেও একই ভিডিও নতুন করে ব্যবহারকারীদের সামনে আনা হচ্ছিল।

একই ভিডিও, একই বয়ান

তিনটি পোস্টের ভিডিও ফ্রেমে দৃশ্যমান কোনো পার্থক্য নেই–একই মঞ্চ, একই ব্যাকড্রপ, একই পোশাক, একই বসার ভঙ্গি এবং একই অনুষ্ঠানমঞ্চ দেখা যায়। ভিডিওর দৃশ্য থেকে বোঝা যায়, আলাদা কোনো উৎসের কনটেন্ট নয়, বরং একই ভিডিও একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত ক্যাপশনগুলোও এক, যা কপি-পেস্ট করা বা আগেভাগে প্রস্তুত করা বয়ানের ইঙ্গিত দেয়।

সম্পর্কিত