স্টিভ সালগ্রা রেমা

সম্প্রতি একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী ও এক পুরুষের মধ্যে রাস্তার পাশে উত্তেজনা। ফেসবুকে ভিডিওটি ছড়িয়ে বলা হয়েছে, ভারতে বোরকা পরার অপরাধে এক নারীকে মারধর করা হয়েছে।
আরেকটি ভিডিওতে গাছের সঙ্গে বাঁধা এক যুবককে ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে বিএনপির সন্ত্রাসীরা যুবলীগ নেতাকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করছে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক কিশোরীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যেটিকে চট্টগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণী অপহরণের দৃশ্য বলে ছড়ানো হয়েছে।
তিনটি ভিডিও, দাবিও তিন ধরনের। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে প্রচারিত দাবির কোনো মিল নেই। প্রথমটি বাংলাদেশের কক্সবাজারের স্থানীয় মারামারির ঘটনা। দ্বিতীয়টি ভারতের ত্রিপুরায় ছাগল চুরির অভিযোগে গণপিটুনির পুরোনো ভিডিও। আর তৃতীয়টি পাকিস্তানের পাঞ্জাবের কিশোরী অপহরণের। অর্থাৎ, দৃশ্য একেক জায়গার। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে তা হয়ে গেল, আরেক দেশ, আরেক পরিচয়, আরেক দাবির।
অ্যাক্টিভেট রাইটসের গবেষণা প্রধান মিনহাজ আমান স্ট্রিমকে বলেছেন, ভুয়া তথ্য, ছবি বা ভিডিও আকারে ছড়ালে মানুষ সেটির সঙ্গে দ্রুত সংযোগ তৈরি করে। গুজব প্রচারকারীরা সাধারণত এমন ফুটেজ বেছে নেয়, যার সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার কিছু মিল থাকে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো কাছাকাছি অঞ্চলের দৃশ্য তাই অনেক সময় মানুষ নিজের দেশের ঘটনা বলে ধরে নেয়। এই মিলের সুযোগ নিয়েই নতুন নাম, নতুন স্থান ও নতুন পরিচয় বসিয়ে ভিডিও ছড়ানো হয়।
চলতি মাসে ছড়ানো এমন কয়েকটি ভিডিওর ফ্যাক্টচেক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফুটেজগুলো শুধু ভুল দাবিতে ছড়ায়নি। ভিডিওর ক্যাপশন, ভিডিওর ওপর বসানো লেখা দিয়ে সেগুলোকে নতুন অর্থ দেওয়া হয়েছে।
দেশ বদলে নতুন ঘটনা
ভারতে বোরকা পরার অপরাধে নারীকে মারধরের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি যাচাই করে স্ট্রিম দেখেছে, ঘটনাটি ভারতের নয়। প্রকৃতপক্ষে, কক্সবাজারে পুরুষ পথচারীকে নারী পথচারীর ইভটিজিংয়ের অভিযোগে সৃষ্ট মারামারির ভিডিওকে ওই দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে Telegram News নামের একটি ফেসবুক পেজে ৫ মে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যার সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর দৃশ্যের মিল রয়েছে। ভিডিওর ক্যাপশন ও দৃশ্যে থাকা বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি কক্সবাজারের। সেখানে নারী ও পুরুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শোনা যায়।
তবে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটির ওপর বসানো লেখা ও ক্যাপশনে ‘বোরকা পরার অপরাধে মারধর’ ধরনের বক্তব্য যুক্ত হওয়ায় ঘটনাটি ধর্মীয় নিপীড়নের রূপ পায়। বাস্তবে ওই ঘটনার সঙ্গে বোরকা পরা বা ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
আরেক ঘটনায় ভারতের ত্রিপুরার একটি পুরোনো গণপিটুনির ভিডিও বাংলাদেশি রাজনৈতিক সহিংসতার দাবি নিয়ে ছড়ানো হয়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, যুবলীগের এক নেতাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে প্রকাশ্যে নির্যাতন করছে বিএনপির সন্ত্রাসীরা। তবে স্ট্রিমের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি বাংলাদেশের নয় এবং বিএনপির নেতাকর্মীর হাতে কোনো যুবলীগ নেতাকে নির্যাতনের দৃশ্যও নয়।
ভিডিওটির সূত্র খুঁজতে গিয়ে সময় ত্রিপুরা নামে একটি ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ২৫ মে প্রকাশিত একই ভিডিও পাওয়া যায়। ওই পোস্টে বলা হয়েছে, সোনামুড়া হাসপাতাল রোড এলাকায় ছাগল চুরির অভিযোগে এক যুবককে ধরে জনতা আইন হাতে তুলে নেয়। পরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট টুডের ২৬ মে ২০২৫ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও ত্রিপুরার সিপাহিজলা জেলার সোনামুড়ার ওই ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়।
একটি স্থানীয় অপরাধের ভিডিও এভাবেই ক্যাপশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের দলীয় সংঘর্ষে বদলে দেওয়া হয়েছে।
সংখ্যালঘু, মসজিদ ও মুসলিম পরিচয়ের বয়ান
চট্টগ্রামে ১৪ বছর বয়সী এক হিন্দু তরুণীকে মাদক সেবন করিয়ে প্রকাশ্যে অপহরণের দাবিতে আরেকটি ভিডিও এক্স-হ্যান্ডেল, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ভারতীয় একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয় (১,২,৩)। ভিডিওর ওপর বসানো লেখায় বলা হয়, বাংলাদেশে এক হিন্দু কিশোরীকে দিনের আলোতে অপহরণ করা হয়েছে। ফলে ক্যাপশন না পড়লেও দর্শক ভিডিওটিকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
স্ট্রিমের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি চট্টগ্রামের নয়। এটি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রহিম ইয়ার খান শহরের একটি অপহরণের ফুটেজ। Global Vox নামের পাকিস্তানি সংবাদভিত্তিক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ১ মে প্রকাশিত ভিডিওর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। পরে পাকিস্তানের GTV-এর ৪ মে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ভিডিওটি পাকিস্তানের, বাংলাদেশের নয়।
ধর্মীয় আবেগ তৈরির আরেকটি উদাহরণ মসজিদকেন্দ্রিক। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে ‘মসজিদের ভেতর মূল্যবান ইসলামী বইয়ে অগ্নিসংযোগ উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের’ ক্যাপশনে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দৈনিক ইনকিলাবের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটিতে ৫০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মন্তব্য পড়েছে ১ হাজার ৭০০টির বেশি। আর ভিডিওটি শেয়ার হয়েছে ৭ হাজারের বেশি বার।
ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন বলছে, ভিডিওটি ভারতের নয়। প্রকৃতপক্ষে, নেপালের গৌড়ের মসজিদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ভিডিওকে ওই দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। একই দাবিতে ২০২৬ সালের এপ্রিলেও ভিডিওটি ছড়ালে সেটিও মিথ্যা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।
মিনহাজ আমানের মতে, ধর্মীয় পরিচয় যুক্ত হলে এ ধরনের গুজব দ্রুত ছড়ানোর পেছনে সামাজিক বিভাজন বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। তিনি বলেন, সমাজ ধর্মীয়ভাবে বিভাজিত হলে এক ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু ছড়ালে অন্য পক্ষের মানুষ সেটি দ্রুত গ্রহণ ও প্রচারে উৎসাহিত হতে পারে। বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া কনটেন্টকে সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও আরও ছড়াতে সাহায্য করে বলে জানান তিনি।
দৃশ্য এক, বয়ান আরেক
ভারতের মুসলিমদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরের দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত আরেক ভিডিওতেও একই কৌশল দেখা যায়। রিউমর স্ক্যানার বলছে, এটি ভারতের নয়; বাংলাদেশের যশোরে সরকারি খাস জমি উদ্ধারে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের ভিডিও। মাছরাঙা টেলিভিশনের ফেসবুক পেজে ১৪ মে প্রকাশিত একটি ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির দৃশ্যগত মিল পাওয়া যায়। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যশোরে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ দুই দিনব্যাপী অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করে। ওই অভিযানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তিনটি কার্যালয়সহ চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের একটি প্রশাসনিক অভিযানের ভিডিও ভারতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরের দাবিতে ছড়ানো হয়েছে। ভিডিওর দৃশ্য ছিল উচ্ছেদ অভিযানের। কিন্তু ক্যাপশন ও ভিডিওর ওপর বসানো লেখা সেটিকে ধর্মীয় নিপীড়নের দাবি বানায়।
মিনহাজ আমানের মতে, ভিডিওর ওপর বসানো লেখা, ক্যাপশন ও গ্রাফিক্স দর্শকের বোঝাপড়াকে প্রভাবিত করে। অনেক সময় ক্যাপশন নিজেই উত্তেজনামূলক হয়। কোথাও হিন্দু বাড়িতে হামলার কথা বলা হয়। কোথাও মুসলমানদের ঘরবাড়ি ভাঙার দাবি করা হয়। এ ধরনের লেখা মানুষকে আরও উত্তেজিত করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলপ্রকাশের পর আরেকটি ভিডিও ছড়ায় বিজেপি কর্তৃক মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের দাবিতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেটিও নির্বাচনের পর বিজেপির হাতে মুসলমান নির্যাতনের ভিডিও নয়। ভারতের মহারাষ্ট্রের নাসিকের শিবাজীনগর এলাকায় চাকরির প্রলোভনে অর্থ আত্মসাৎ ও টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে এক নারীকে মারধরের ঘটনা। Rajmaji Official নামের এক্স- হ্যান্ডেলে ২৬ মার্চ প্রকাশিত ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর মিল পাওয়া যায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম NewsX এর ২৮ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই ঘটনার বিবরণ পাওয়া গেছে।
ছয়টি ঘটনার মধ্যে একই ধারা দেখা যায়। ভিডিওর মূল ঘটনা আলাদা। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে তার দাবি বদলে গেছে। এক দেশের ঘটনা অন্য দেশের দাবি হয়েছে। পুরোনো ফুটেজ নতুন সময়ের উত্তেজনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ অপরাধ ধর্মীয় নির্যাতনের ভাষা পেয়েছে। এসব দাবির যাচাইয়ে বারবার সামনে এসেছে ভিডিওর উৎস, সময় ও স্থানের অমিল।
এ ধরনের বিভ্রান্তির প্রভাব অনলাইনেই থেমে থাকে না বলে মনে করেন মিনহাজ আমান। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর এ ধরনের বিভ্রান্তি জাতীয় পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে দেখা গেছে। তখন সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ডিসইনফরমেশন মোকাবিলার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। মিনহাজ আমানের মতে, এমন গুজব সামাজিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক সংহতির ওপরও চাপ তৈরি করে। এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানসিক প্রভাব রয়েছে।

সম্প্রতি একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী ও এক পুরুষের মধ্যে রাস্তার পাশে উত্তেজনা। ফেসবুকে ভিডিওটি ছড়িয়ে বলা হয়েছে, ভারতে বোরকা পরার অপরাধে এক নারীকে মারধর করা হয়েছে।
আরেকটি ভিডিওতে গাছের সঙ্গে বাঁধা এক যুবককে ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে বিএনপির সন্ত্রাসীরা যুবলীগ নেতাকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করছে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক কিশোরীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যেটিকে চট্টগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণী অপহরণের দৃশ্য বলে ছড়ানো হয়েছে।
তিনটি ভিডিও, দাবিও তিন ধরনের। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে প্রচারিত দাবির কোনো মিল নেই। প্রথমটি বাংলাদেশের কক্সবাজারের স্থানীয় মারামারির ঘটনা। দ্বিতীয়টি ভারতের ত্রিপুরায় ছাগল চুরির অভিযোগে গণপিটুনির পুরোনো ভিডিও। আর তৃতীয়টি পাকিস্তানের পাঞ্জাবের কিশোরী অপহরণের। অর্থাৎ, দৃশ্য একেক জায়গার। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে তা হয়ে গেল, আরেক দেশ, আরেক পরিচয়, আরেক দাবির।
অ্যাক্টিভেট রাইটসের গবেষণা প্রধান মিনহাজ আমান স্ট্রিমকে বলেছেন, ভুয়া তথ্য, ছবি বা ভিডিও আকারে ছড়ালে মানুষ সেটির সঙ্গে দ্রুত সংযোগ তৈরি করে। গুজব প্রচারকারীরা সাধারণত এমন ফুটেজ বেছে নেয়, যার সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার কিছু মিল থাকে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো কাছাকাছি অঞ্চলের দৃশ্য তাই অনেক সময় মানুষ নিজের দেশের ঘটনা বলে ধরে নেয়। এই মিলের সুযোগ নিয়েই নতুন নাম, নতুন স্থান ও নতুন পরিচয় বসিয়ে ভিডিও ছড়ানো হয়।
চলতি মাসে ছড়ানো এমন কয়েকটি ভিডিওর ফ্যাক্টচেক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফুটেজগুলো শুধু ভুল দাবিতে ছড়ায়নি। ভিডিওর ক্যাপশন, ভিডিওর ওপর বসানো লেখা দিয়ে সেগুলোকে নতুন অর্থ দেওয়া হয়েছে।
দেশ বদলে নতুন ঘটনা
ভারতে বোরকা পরার অপরাধে নারীকে মারধরের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি যাচাই করে স্ট্রিম দেখেছে, ঘটনাটি ভারতের নয়। প্রকৃতপক্ষে, কক্সবাজারে পুরুষ পথচারীকে নারী পথচারীর ইভটিজিংয়ের অভিযোগে সৃষ্ট মারামারির ভিডিওকে ওই দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে Telegram News নামের একটি ফেসবুক পেজে ৫ মে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যার সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর দৃশ্যের মিল রয়েছে। ভিডিওর ক্যাপশন ও দৃশ্যে থাকা বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি কক্সবাজারের। সেখানে নারী ও পুরুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শোনা যায়।
তবে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটির ওপর বসানো লেখা ও ক্যাপশনে ‘বোরকা পরার অপরাধে মারধর’ ধরনের বক্তব্য যুক্ত হওয়ায় ঘটনাটি ধর্মীয় নিপীড়নের রূপ পায়। বাস্তবে ওই ঘটনার সঙ্গে বোরকা পরা বা ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
আরেক ঘটনায় ভারতের ত্রিপুরার একটি পুরোনো গণপিটুনির ভিডিও বাংলাদেশি রাজনৈতিক সহিংসতার দাবি নিয়ে ছড়ানো হয়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, যুবলীগের এক নেতাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে প্রকাশ্যে নির্যাতন করছে বিএনপির সন্ত্রাসীরা। তবে স্ট্রিমের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি বাংলাদেশের নয় এবং বিএনপির নেতাকর্মীর হাতে কোনো যুবলীগ নেতাকে নির্যাতনের দৃশ্যও নয়।
ভিডিওটির সূত্র খুঁজতে গিয়ে সময় ত্রিপুরা নামে একটি ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ২৫ মে প্রকাশিত একই ভিডিও পাওয়া যায়। ওই পোস্টে বলা হয়েছে, সোনামুড়া হাসপাতাল রোড এলাকায় ছাগল চুরির অভিযোগে এক যুবককে ধরে জনতা আইন হাতে তুলে নেয়। পরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট টুডের ২৬ মে ২০২৫ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও ত্রিপুরার সিপাহিজলা জেলার সোনামুড়ার ওই ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়।
একটি স্থানীয় অপরাধের ভিডিও এভাবেই ক্যাপশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের দলীয় সংঘর্ষে বদলে দেওয়া হয়েছে।
সংখ্যালঘু, মসজিদ ও মুসলিম পরিচয়ের বয়ান
চট্টগ্রামে ১৪ বছর বয়সী এক হিন্দু তরুণীকে মাদক সেবন করিয়ে প্রকাশ্যে অপহরণের দাবিতে আরেকটি ভিডিও এক্স-হ্যান্ডেল, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ভারতীয় একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয় (১,২,৩)। ভিডিওর ওপর বসানো লেখায় বলা হয়, বাংলাদেশে এক হিন্দু কিশোরীকে দিনের আলোতে অপহরণ করা হয়েছে। ফলে ক্যাপশন না পড়লেও দর্শক ভিডিওটিকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
স্ট্রিমের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি চট্টগ্রামের নয়। এটি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রহিম ইয়ার খান শহরের একটি অপহরণের ফুটেজ। Global Vox নামের পাকিস্তানি সংবাদভিত্তিক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ১ মে প্রকাশিত ভিডিওর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। পরে পাকিস্তানের GTV-এর ৪ মে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ভিডিওটি পাকিস্তানের, বাংলাদেশের নয়।
ধর্মীয় আবেগ তৈরির আরেকটি উদাহরণ মসজিদকেন্দ্রিক। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে ‘মসজিদের ভেতর মূল্যবান ইসলামী বইয়ে অগ্নিসংযোগ উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের’ ক্যাপশনে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দৈনিক ইনকিলাবের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটিতে ৫০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মন্তব্য পড়েছে ১ হাজার ৭০০টির বেশি। আর ভিডিওটি শেয়ার হয়েছে ৭ হাজারের বেশি বার।
ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন বলছে, ভিডিওটি ভারতের নয়। প্রকৃতপক্ষে, নেপালের গৌড়ের মসজিদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ভিডিওকে ওই দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। একই দাবিতে ২০২৬ সালের এপ্রিলেও ভিডিওটি ছড়ালে সেটিও মিথ্যা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।
মিনহাজ আমানের মতে, ধর্মীয় পরিচয় যুক্ত হলে এ ধরনের গুজব দ্রুত ছড়ানোর পেছনে সামাজিক বিভাজন বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। তিনি বলেন, সমাজ ধর্মীয়ভাবে বিভাজিত হলে এক ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু ছড়ালে অন্য পক্ষের মানুষ সেটি দ্রুত গ্রহণ ও প্রচারে উৎসাহিত হতে পারে। বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া কনটেন্টকে সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও আরও ছড়াতে সাহায্য করে বলে জানান তিনি।
দৃশ্য এক, বয়ান আরেক
ভারতের মুসলিমদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরের দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত আরেক ভিডিওতেও একই কৌশল দেখা যায়। রিউমর স্ক্যানার বলছে, এটি ভারতের নয়; বাংলাদেশের যশোরে সরকারি খাস জমি উদ্ধারে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের ভিডিও। মাছরাঙা টেলিভিশনের ফেসবুক পেজে ১৪ মে প্রকাশিত একটি ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির দৃশ্যগত মিল পাওয়া যায়। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যশোরে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ দুই দিনব্যাপী অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করে। ওই অভিযানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তিনটি কার্যালয়সহ চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের একটি প্রশাসনিক অভিযানের ভিডিও ভারতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরের দাবিতে ছড়ানো হয়েছে। ভিডিওর দৃশ্য ছিল উচ্ছেদ অভিযানের। কিন্তু ক্যাপশন ও ভিডিওর ওপর বসানো লেখা সেটিকে ধর্মীয় নিপীড়নের দাবি বানায়।
মিনহাজ আমানের মতে, ভিডিওর ওপর বসানো লেখা, ক্যাপশন ও গ্রাফিক্স দর্শকের বোঝাপড়াকে প্রভাবিত করে। অনেক সময় ক্যাপশন নিজেই উত্তেজনামূলক হয়। কোথাও হিন্দু বাড়িতে হামলার কথা বলা হয়। কোথাও মুসলমানদের ঘরবাড়ি ভাঙার দাবি করা হয়। এ ধরনের লেখা মানুষকে আরও উত্তেজিত করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলপ্রকাশের পর আরেকটি ভিডিও ছড়ায় বিজেপি কর্তৃক মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের দাবিতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেটিও নির্বাচনের পর বিজেপির হাতে মুসলমান নির্যাতনের ভিডিও নয়। ভারতের মহারাষ্ট্রের নাসিকের শিবাজীনগর এলাকায় চাকরির প্রলোভনে অর্থ আত্মসাৎ ও টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে এক নারীকে মারধরের ঘটনা। Rajmaji Official নামের এক্স- হ্যান্ডেলে ২৬ মার্চ প্রকাশিত ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর মিল পাওয়া যায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম NewsX এর ২৮ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই ঘটনার বিবরণ পাওয়া গেছে।
ছয়টি ঘটনার মধ্যে একই ধারা দেখা যায়। ভিডিওর মূল ঘটনা আলাদা। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে তার দাবি বদলে গেছে। এক দেশের ঘটনা অন্য দেশের দাবি হয়েছে। পুরোনো ফুটেজ নতুন সময়ের উত্তেজনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ অপরাধ ধর্মীয় নির্যাতনের ভাষা পেয়েছে। এসব দাবির যাচাইয়ে বারবার সামনে এসেছে ভিডিওর উৎস, সময় ও স্থানের অমিল।
এ ধরনের বিভ্রান্তির প্রভাব অনলাইনেই থেমে থাকে না বলে মনে করেন মিনহাজ আমান। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর এ ধরনের বিভ্রান্তি জাতীয় পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে দেখা গেছে। তখন সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ডিসইনফরমেশন মোকাবিলার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। মিনহাজ আমানের মতে, এমন গুজব সামাজিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক সংহতির ওপরও চাপ তৈরি করে। এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানসিক প্রভাব রয়েছে।

আলোচিত ভিডিও বরিশাল থানায় ধর্ষণের বর্ণনা দেওয়ার কোনো দৃশ্য নয়। এটি কুমিল্লায় এনজিও কর্মীদের বিরুদ্ধে এক দম্পতিকে মারধর এবং লাঞ্ছনার অভিযোগের ঘটনার।
৪১ মিনিট আগে
সম্প্রতি ফেসবুকে ব্রাজিলের জনপ্রিয় ফুটবলার নেইমার জুনিয়রের নামে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা যায়, ব্রাজিলের হলুদ জার্সি, ক্যাপ ও সানগ্লাস পরা ব্যক্তি টয়লেটে আছেন এবং বাইরের কয়েকজন তা মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ছবির ব্যক্তি নেইমার।
২ দিন আগে
সম্প্রতি ফেসবুকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি যুক্ত করে দাবি করা হচ্ছে, ইতালি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলি পর্যটকদের দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।
৩ দিন আগে
সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, যুবলীগের এক নেতাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে প্রকাশ্যে নির্যাতন করছে বিএনপির সন্ত্রাসীরা। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘যুবলীগ নেতাকে গাছের সাথে বেঁধে প্রকাশ্য নি"র্যা"তন করছে বিএনপির স'ন্ত্রাসীরা।’
৪ দিন আগে