মান্টো: যিনি সমাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন

লেখা:
লেখা:
ড. অরুণ মানস

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ১৭: ০১
সাদাত হাসান মান্টো। ছবি: সংগৃহীত

সাদাত হাসান মান্টোর জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, তিনি পাঠককে স্বস্তি দেওয়ার জন্য বাস্তবতাকে কখনো হালকাভাবে উপস্থাপন করেননি।

১৯১২ সালে অবিভক্ত ভারতের লুধিয়ানার কাছে সামরালা নামের শান্ত শহরে মান্টোর জন্ম। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা মান্টো পরবর্তী সময়ে উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে দুঃসাহসী কণ্ঠে পরিণত হন। তাঁর জীবনকাল ছিল মাত্র ৪২ বছর, কিন্তু তাঁর গল্পগুলো আজও মানবতার অন্ধকার দিকগুলোর—যেমন দেশভাগের নৃশংসতা, তথাকথিত ভদ্রসমাজের ভণ্ডামি এবং প্রান্তিক মানুষের নিঃশব্দ হাহাকারের এক জীবন্ত দলিল হয়ে টিকে আছে।

মান্টো সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য লিখতেন না। তিনি লিখতেন সমাজকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য, যাতে পাঠকরা তাদের নিজস্ব সমাজের অতল গহ্বরের দিকে তাকাতে বাধ্য হন।

মান্টোর শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তাঁর আপসহীন সাহসিকতায়। এমন এক যুগে যখন লেখকরা বাস্তবতাকে কাব্যিক আবরণে ঢেকে রাখতেন, মান্টো তাকে নগ্ন করে তুলে ধরতেন। রক্তভেজা সীমান্ত দিয়ে হেঁটে আসা উদ্বাস্তু, ঘৃণা ও অবজ্ঞার নিয়ে বেঁচে থাকা পতিতা, সস্তা মদে দুঃখ ভুলে থাকা মাতাল কিংবা সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার আড়ালে থাকা ধর্ষক—এসবই ছিল তাঁর চরিত্র। আর এই চরিত্রগুলো কাল্পনিক ছিল না, তারা ছিল ইতিহাসের যাতাকলে পিষ্ট রক্তমাংসের মানুষ।

মান্টো দুঃখ-কষ্টকে কখনো রোমান্টিক রূপ দেননি। কিংবা নৈতিক উপদেশ দেননি। তাঁর ‘বু’ (গন্ধ) গল্পে দেখা যায় এক যুবকের আচ্ছন্নতা কীভাবে ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়। আবার ‘হাতাক’ (অপমান) গল্পে দৈনন্দিন ক্ষমতার লড়াইয়ের তুচ্ছ নিষ্ঠুরতা প্রকাশিত হয়। মান্টো দেখিয়েছিলেন, অশ্লীলতা গল্পে নয়, বরং খোদ সমাজ বা পৃথিবীর মধ্যেই রয়েছে। তিনি যেন বলতে চেয়েছিলেন, ‘যদি আপনি এই গল্পগুলো সহ্য করতে না পারেন, তবে এই গল্পে বলা সমাজটাকে পরিবর্তন করুন।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঘটনার মতো আর কোনো ঘটনা মান্টোর সাহিত্যিক জীবনকে এত গভীরভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। তিনি একে রাজনৈতিক চাল হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন মানবিক বিপর্যয় বা ‘অ্যাপোক্যালিপস’ হিসেবে। ‘টোবা টেক সিং’ গল্পে লাহোরের পাগলাগারদের এক শিখ কয়েদি দেশভাগের উন্মাদনার প্রতীক হয়ে ওঠে। ধর্মের ভিত্তিতে জীবন উপড়ে ফেলার এবং সীমান্ত দিয়ে পরিবার ছিঁড়ে ফেলার সেই অর্থহীন পাগলামি এই গল্পে ফুটে উঠেছে। ‘খোল দো’ গল্পে বিশৃঙ্খলার মধ্যে নারীর ওপর হওয়া পৈশাচিকতা উন্মোচিত হয়েছে, যেখানে একজন বাবা অজান্তেই তাঁর মেয়ের ওপর হওয়া চরম লাঞ্ছনার করুণ সাক্ষী হন। ‘ঠান্ডা গোশত’ সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা থেকে জন্ম নেওয়া এক বিকৃত যৌন লালসা ও মানসিক পঙ্গুত্বকে ব্যবচ্ছেদ করে। তাঁর ‘তিতওয়াল কা কুত্তা’ গল্পটি অর্থহীন যুদ্ধে নিরপরাধের বিনাশকে তুলে ধরে, আর ‘শাহ দুলহে কা চুহা’ বিশ্বাসের নামে শোষণ, কুসংস্কার এবং অসহায় মানুষের প্রতি সমাজের অবহেলার কঠোর সমালোচনা করে।

মান্টোর লেখার শৈলী ছিল তাঁর সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। সরাসরি, অলঙ্কারহীন এবং সংক্ষিপ্তভাবে লিখতেন তিনি। যখন রাস্তা রক্তে ভেসে যেত, তখন তিনি অলঙ্কৃত উর্দু ভাষার ব্যবহারকে ঘৃণা করতেন। তাঁর ‘গঞ্জয় ফারিস্তয়’ (ন্যাড়া ফেরেশতা) প্রবন্ধগুলোতে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ‘যখন সমাজ রক্তাক্ত হয়, সাহিত্যকেও তখন রক্ত ঝরাতে হবে।’ সেই অভিজাত শ্রেণির মুখোশ তিনি খুলে দিয়েছিলেন, যারা নিজেরা অনাহারে থাকা মানুষদের উপেক্ষা করে ধর্মের বাণী প্রচার করত। পাকিস্তানে চারবার অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েও তিনি নির্ভীক যুক্তিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সমাজ তার নিজের নোংরামি এড়াতেই সাহিত্যকে অশ্লীলতার তকমা দেয়। আদালতের কাঠগড়ায় তাঁর সেই বলিষ্ঠ উত্তর আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সেন্সরশিশের জন্ম মূলত অস্বস্তি থেকেই।

মান্টো কেন চিরকালীন? কারণ তিনি মানুষের যন্ত্রণাকে কোনো আদর্শ বা মতাদর্শের ছাঁচে ফেলেননি। আজকের মেরুকরণের যুগে, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া কেবল ক্ষোভ ছড়ায় কিন্তু আত্মদর্শন করায় না, সেখানে মান্টো আমাদের বাধ্য করেন মানুষের দুর্বলতা, নিষ্ঠুরতা ও কোমলতার সহাবস্থানকে প্রত্যক্ষ করতে। ‘১৯১৯ কি এক বাত’ গল্পে তিনি স্বাধীনতার পরেও টিকে থাকা ঔপনিবেশিক মানসিকতার সমালোচনা করেছেন, আবার ‘সও পাত্র’ (একশ চিঠি) গল্পে আমলাতন্ত্রকে ব্যঙ্গ করেছেন। উর্দু সাহিত্যে নারীরা যেখানে অবহেলিত ছিল, মান্টো সেখানে শক্তিশালী নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন—যেমন ‘নয়া কানুন’-এর নার্গিস কিংবা ‘কালী সালোয়ার’-এর সুগন্ধী, যারা ভণ্ডামির মাঝেও নিজেদের অস্তিত্ব ও লড়াই বজায় রেখেছে।

সাদাত হাসান মান্টোকে প্রায়ই ‘উর্দু সাহিত্যের চেকভ’ বলা হয়। আন্তন চেকভের মতোই তিনি সাধারণ মানুষকে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, বাস্তবতা এবং সহমর্মিতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। ইংরেজি, হিন্দি এবং অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে তিনি আজ বিশ্বপাঠকের কাছে কাফকা বা কামুর সমতুল্য একজন অস্তিত্ববাদী লেখক হিসেবে স্বীকৃত।

জন্মবার্ষিকীতে মান্টোকে স্মরণ করা কেবল একটি সাহিত্যিক শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়। আজকের এই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, লিঙ্গবৈষম্য এবং বাস্তুচ্যুতির যুগে মান্টোর কাজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি পাঠকদের মনে করিয়ে দেন যে, সাহিত্যের আসল পরীক্ষা সমাজকে সান্ত্বনা দেওয়া নয়, সমাজকে তার নিজের আসল চেহারা পরিষ্কারভাবে দেখতে সাহায্য করেই সাহিত্যের কাজ। এই কারণেই প্রতিটি নতুন প্রজন্ম অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হতে বারবার মান্টোর কাছে ফিরে আসে।

মান্টোর গল্প বলার ধরনটি প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি জাভেদ আখতারের এই পংক্তির সাথে হুবহু মিলে যায়:

‘জো বাত ক্যাহতে ডরতে হ্যায় সব, তু ওহ বাত লিখ...’

(যে কথা বলতে সবাই ভয় পায়, তুমি সেই কথাটিই লেখো...)

  • ড. অরুণ মানস: জম্মু সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক

(গ্রেটার কাশ্মীর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত)

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত