সাহিত্য
অর্থী দাস

কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা জন্মের দায় পরিশোধ করেন জীবনজুড়ে। আফ্রিকান সাহিত্যের অন্যতম মহীরুহ নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো তেমনই একজন। যদিও শুধু লেখা নয়, জীবন ধারণের মধ্যেই তিনি স্বাধীনতার অর্থ খুঁজেছেন। স্বাধীনতা তাঁর কাছে কেবল মানচিত্রের মুক্তি নয়; বরং ভাষা ও সংস্কৃতির এবং চেতনার পুনর্জাগরণ।
ঔপনিবেশিক প্রতিকূল পরিবেশে নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো ১৯৩৮ সালে এক দরিদ্র কৃষিজীবী কেনিয়ান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব কেটেছিল রাজধানী নাইরোবি থেকে মাত্র ১৮ মাইল দূরের লিমুরুতে, যা এক সময় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আফ্রিকান অর্থনীতির কেন্দ্র ছিল। ১৮০০-এর দশকের শেষভাগে ব্রিটিশরা কেনিয়াকে প্রটেকটরেট বা সংরক্ষণাধীন রাজ্য ঘোষণা করে। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে লিমুরুর মতো এলাকায় স্থানীয় আফ্রিকানদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিয়ে সেগুলোয় চা ও কফির চাষ করা হতো।
এই দখলদারির ধাক্কায় নগুগির পরিবার ভূমিহীন ও দারিদ্র্যক্লিষ্ট হয়ে পড়ে। তাঁর বাবা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চার স্ত্রী এবং তাদের ২৪ জন সন্তানের ওপর শুরু করেন নির্মম আচরণ। এই কঠোর বাস্তবতার মধ্যেও নগুগির মা, ওয়াঞ্জিকু ওয়া নগুগি তাঁর অনমনীয় আশার আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে আসেন। সন্তানদের শিক্ষিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। ১৯৪০-এর দশকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গেরিলা প্রতিরোধ তৈরি হলে তাঁর এই শিক্ষানিষ্ঠা ও মানসিক দৃঢ়তাই ছিল নগুগির ভবিষ্যতের বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রাথমিক ভিত্তি।
নগুগির জন্মের সময় কেনিয়ার সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থাসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ব্রিটিশদের প্রবল আধিপত্য ছিল। এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালে ‘কেনিয়া ল্যান্ড এন্ড ফ্রিডম আর্মি’ তথা ‘মাউ মাউ’য়ের মতো স্বাধীনতাকামী দলগুলো যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীরা বেশিরভাগই ছিলেন সাধারণ কৃষক অথবা শ্রমজীবী মানুষ।
যখন আফ্রিকাজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সাহিত্যের নবতর ধারা নির্মাণের ডঙ্কা বাজছিল, নগুগি তখন একজন তরুণ-তুর্কী, মেকেরেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন আফ্রিকার দুটি দেশ উগান্ডা (১৯৬২) এবং কেনিয়ার (১৯৬৩) স্বাধীনতা অর্জন। একই সাথে এটাও দেখেছেন যে, আফ্রিকার বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বপ্ন পরবর্তী বছরগুলোয় কীভাবে বিশ্বাসঘাতক শাসকের নেতৃত্বের কারণে ধুলিসাৎ হয়ে গেছে!
২.
নানান ঘটনা মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। অনেক সময় নিজের কাছের মানুষদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা বেশি দাগকাটে মানুষের জীবনে। নগুগির সমাজ, পরিবার তথা স্বয়ং নগুগির ওপর হওয়া ঔপনিবেশিক শোষণ তাঁকে বিঔপনিবেশিক চিন্তক হিসেবে শক্ত ভিত দিয়েছে।
নগুগি তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁর শৈশব বেশ অন্য রকম। সব ভাইবোনদের সাথে ভালো সম্পর্ক যেমন ছিল, তেমনই ছিল মতানৈক্য। বড়ভাই গুড ওয়ালেস সশস্ত্র সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন। আরেক সৎভাই টুম্বো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতেন। কেউ আবার কাজ করতেন জুতার কারখানায়। নগুগি তাঁর স্বভাবসুলভ রসিকতার সুরে বলেছেন, ‘এক রাতে তারা দুজনেই আমার আরেক ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য মনঃস্থির করে, সে ভাইটি কাজ করত একটি জুতার কারখানায়। হঠাৎ করে দরজায় তাদের মুখোমুখি দেখা হলে দুজনেই উল্টোদিকে দৌড়াতে শুরু করে। একজন পালাচ্ছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছ থেকে, অন্যজন ভেবেছিল ‘মাউ মাউ’ বিপ্লবীরা তাকে হয়ত মেরে ফেলবে। মূলত এমন প্রতিদ্বন্দ্বীতার মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা।’
ঔপনিবেশিকরা তাদের অমানবিক রূপটি দেখিয়েছে কেনিয়ায়। একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, পুলিশি চেকপোস্টের এলএফএ যোদ্ধাদের খোঁজে তল্লাশির সময় থামার আদেশ শুনতে না পেয়ে সামনে এগিয়ে যান। পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। সেই ব্যক্তিটি নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর ভাই গিতোগো। নিজের পরিবারের সাথে ঘটা এই অঘটন নগুগিকে কেন ধাক্কা দিবে না!
১৯৭৭ সালে গিকুয়ু ভাষায় রচিত Ngaahika Ndeenda বা I Will Marry When I Want নাটক লেখার জন্য নগুগিকে কারাবরণ করতে হয়৷ নাটকটি কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির ওপর শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে লিখিত হয়, যেখানে দরিদ্রদের জীবন নিয়ন্ত্রণে ধনিক শ্রেণি ও বিদেশি প্রভাবের ভূমিকা চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত নাটকটির রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে নগুগি কারাবন্দি হন। আশ্চর্যই বটে, ইংরেজি ভাষায় নাটক লেখার জন্য জেরার সম্মুখীন হলেও, কখনোই কারারুদ্ধ হননি যিনি, তিনিই কি না নিজের ভূমিতে, নিজের ভাষায়, নিজেদের মানুষের জন্য নাটক লিখে কারাজীবন বরণ করেছেন!
পরিতাপের বিষয় এই যে, যে শাসক নগুগিকে গ্রেপ্তার করে, তারা নগুগিরই দেশের শাসক। এমনকি যিনি তৎকালীন আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তিনি নিজেও গিকুয়ু ভাষার ভালো বক্তা ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর নিজ মাতৃভাষায় লেখার বিষয়টি নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। কারাগারে বসে টয়লেট পেপারের ওপর গিকুয়ু ভাষায় লিখে ফেলেন Devil on the Cross নামক জনপ্রিয় রচনা, যা এই ভাষায় তাঁর প্রথম উপন্যাস। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির নায়িকা ওয়ারিঙ্গা সমাজের দুর্নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। এখানে লোভী ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাবানদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের নেতা, যিনি পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেন, ক্ষমতায় বসার পর তার আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এই উপন্যাস।
৩.
আফ্রিকার আরেক বিখ্যাত সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবের (১৯৫৮-২০১৩) থিংস ফল অ্যাপার্ট উপন্যাসে দেখা যায় ঔপনিবেশিক শাসকরা হাতে বাইবেল নিয়ে শিক্ষার প্রচার করতে আসে আর আফ্রিকানরা সেই ডিসকোর্স আর শিক্ষায় সর্বশান্ত হয়ে একসময় নিজের ভাষা, লোকাচার আর জমি সবকিছু থেকে উপন্যাসের নায়ক ওকোনকো তার গ্রামের বাসিন্দাদের মতোই উৎখাত হয়। আর তাদের হাতে থেকে যায় কেবল বাইবেলই!
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ প্রমুখসহ অনেকেই ঔপনিবেশিক থিয়েটার চর্চার ইতিহাসকে বাঙালির থিয়েটার চর্চার ইতিহাস বলে অস্বীকার করে প্রমাণ করেছেন এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যরীতির অস্তিত্ব। নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো তেমন ঔপনিবেশিকতার জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজের মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। নিজের সর্বশেষ প্রকাশিত Decolonizing Language and Other Revolutionary Ideas গ্রন্থের ‘দ্য বডি অব নলেজ’ (অনুবাদ: নূরুল কবীর) প্রবন্ধে নগুগি বলেছেন:
‘‘জ্ঞানার্জন একটি সরল প্রক্রিয়া। আপনি যদি কোথাও ঘুরতে যেতে চান, আপনি এখন যে জায়গাটিতে আছেন, ঠিক সে জায়গা থেকেই আপনাকে যাত্রা শুরু করতে হবে। আপনি যদি নাইরোবিতে থাকেন, আর নাকুরু যেতে চান, তাহলে আপনাকে প্রথমে মোমবাসা গিয়ে নাকুরুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে হবে না। জ্ঞানার্জনের ব্যাপারটিও ঠিক এরকম। পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়াটি আমাদের আপন শরীর সম্পর্কিত ধারণা থেকেই শুরু হয়।”
ঔপনিবেশিক শোষণকে অস্বীকার করার প্রথম ধাপ হিসেবে নগুগি বর্জন করেছিলেন নিজের নাম। আফ্রিকান সংস্কৃতির ওপর ঔপনিবেশিক প্রভাব ও ধর্মান্তরের প্রতিবাদ হিসেবে তিনি তাঁর খ্রিস্টান নাম জেমস নগুগি থেকে ১৯৭৬ সালে ‘জেমস’ বর্জন করেন। এরপর থেকে তিনি নিজের মাতৃভাষা এবং নিজ গোত্রীয় নাম Ngugi wa Thiong'o ব্যবহার করতে শুরু করেন।
৪.
নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, উপনিবেশ-পরবর্তী আফ্রিকান সাহিত্যবীক্ষার এক অনন্য কণ্ঠস্বর। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি পরিণত হয়েছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য আলোচনায় এডওয়ার্ড সাঈদ, ফ্রানৎস ফানোঁ, হোমি কে. ভাভার পাশাপাশি তাঁর নামটিও সমস্বরে উচ্চারিত হয়। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে আফ্রিকার সাহিত্য-জাগরণে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের একজন দিকপাল নগুগির যাপিত জীবন উপনিবেশিত মানুষের ভোগান্তির এক অনন্য দলিল।
১৯৮৬ সালে নগুগি প্রকাশ করেন তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ Decolonising the Mind, যেখানে ভাষা ও উপনিবেশবাদের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। নগুগি যুক্তি দেন যে, ইউরোপ আফ্রিকান সংস্কৃতিকে দমন করেছে। গ্রন্থটিতে ধাপে ধাপে দেখিয়েছেন কতভাবে একটি অঞ্চলের মানুষের মনোজগত দখল করে ঐ অঞ্চলের নিজস্বতাকে চিরতরে কফিনে পুঁতে দাফন করতে পারে উপনিবেশবাদীরা।
নগুগিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘ভালো ঔপনিবেশিক’ বলে কিছু কি আদৌ আছে? ঔপনিবেশিক সহিংসতাকে মানবিকতার মুখোশের আড়ালে খাটো করে দেখতে চাওয়ার মানসিকতাকে সরাসরি নাকচ করে নগুগি সপ্রতিভ ও স্পষ্ট উচ্চারণ করেন:
“ও মাই গড! এমন কিছুর অস্তিত্ব নেই। ঔপনিবেশিকতা একটি প্রবণতা। আপনি বন্দুক বহন করেন কিংবা বাইবেল, তাতে কিছুই যায় আসে না, আপনি একজন ঔপনিবেশিকই থাকবেন। অবশ্যই আমি বন্দুকওয়ালা ঔপনিবেশিকের চেয়ে বাইবেলওয়ালার মুখোমুখি হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব। কিন্তু আখেরে দুজনই তো এক জিনিস প্রচার করছে।”
এডওয়ার্ড সাঈদ (১৯৩৫-২০০৩) তাঁর ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থে জোরালোভাবে দেখিয়েছিলেন কীভাবে উপনিবেশ একটি শোষণমূলক ফ্রেমওয়ার্কের মধ্য দিয়ে উপনিবেশিত জাতির ওপর কঠিন দখলদারিত্ব কায়েম করেছিল। সাঈদ দেখান, কেবল ভূমি দখল করে উপনিবেশ স্থাপন নয়, ভাষা ও চিন্তাকে দখল করে নেয়ার ভানুমতির খেল দেখতে পাওয়া যায় উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোতে। ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা সৃষ্ট আত্মবিচ্ছিন্নতার বেদনাকে ধারণ করেছিলেন চিনুয়া আচেবে আর আফ্রিকান ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য মুক্তির ধারণার সংঘাত বিশ্লেষণ করেছিলেন ওলে সোয়িঙ্কা (১৯৩৪)।
অন্যদিকে, নগুগি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন প্রতিবাদী কষ্ঠস্বর হয়ে, যিনি নির্ভীক ও আমৃত্যু আপসহীন। শক্তিশালী লেখনীর ভাষিকঅস্ত্র দিয়ে তিনি আঘাত করেছিলেন নিপীড়নমূলক শাসন ব্যবস্থাকে। প্রথমে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে, পরে স্বাধীন কেনিয়ার স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসককে। যার ফলে করেছিলেন কারাবরণ। শাসকের রোষানলে পড়ে প্রথমে ছিলেন নিজভূমে পরবাসী। পরবর্তীকালে নিজ বাসভূমে নিষিদ্ধ। আমৃত্যু তিনি পরবাস জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। যেন এক আপাদমস্তক সন্যাস-জীবন তাঁর। ঘরছাড়া, দেশছাড়া সন্ত যেমন, তিনিও তেমনই ছিলেন এক সন্ত-সাহিত্যিক!
নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর সাহিত্য জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ল্যান্ড অ্যান্ড ফ্রিডম আর্মি বা এলএফএ, ব্রিটিশরা অবজ্ঞা করে যাকে বলতো ‘মাউ মাউ’। আফ্রিকার একেবারে শ্রমজীবী, কৃষিজীবী মানুষের প্রতিরোধ আন্দোলনের কাহিনী উঠে এসেছে নগুগির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলোতে। এই আন্দোলনকে নগুগি কেবল কেনিয়ার স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার দলিল হিসেবেই দেখেছেন। এর এক উৎকৃষ্ট প্রমাণ তাঁর A Grain of Wheat (১৯৬৭) উপন্যাসটি।
কেনিয়ার স্বাধীনতার পূর্বমুহুর্তে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা, ত্যাগ ও অপরাধবোধের কাহিনি এই উপন্যাসে উঠে এসেছে। মুগো নামের চরিত্রটি জাতীয় বীর হিসেবে পরিচিত হলেও তার গোপন অপরাধ রয়েছে। মূলত নগুগি উপন্যাসটিতে স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কৈশোরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভয়াবহ দমন-পীড়নের সাক্ষী হওয়া নগুগি জানতেন তাঁর ও বন্ধুদের অভিজ্ঞতার কথা, যে সময়ে চোখ খোলা আপাদমস্তক সাদা হুড পরা গুপ্তচরেরা, ব্রিটিশ সৈন্য এবং হোম গার্ডরা মিলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতেই লোকজনকে ধরে নিয়ে যেত। তাদের বিবেচনা করা হতো এলএফএ সদস্য বা সমর্থক হিসেবে। বয়স কিংবা নিরাপরাধ প্রমাণের কোনো গুরুত্ব ছিল না। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে জীবন কাটাত। নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেই এই উপন্যাসটি রচনা করেন নগুগি।
৫.
নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ২৮ মে। ২০২৫ সালের এই দিনে, ৮৭ বছর বয়সে চলে যান একুশের শতকের অসামান্য আর্টিস্ট কাম অ্যাক্টিভিস্ট। একাধারে একজন লেখক, নাট্যকার, চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন তিনি। তাঁর সাহিত্য তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেমন জীবন তাঁর সাহিত্যের। এখানে নগুগি অপ্রতিরোধ্য ও অম্লান, যিনি ইতিহাসের কঙ্কালের উপর দাঁড়িয়ে মুখোশ খুলে দিতে পেরেছিলেন শাসক শ্রেণির।
এই মুখোশ উন্মোচন করা লেখালেখি কখনও তীব্র শ্লেষাত্মক, আবার কখনও ব্যঙ্গাত্মক হাসির। এই সহজাত স্বভাবই তাঁর অভীপ্সিত। এই শক্তিতেই নগুগি অনেক কিছুই বলে গেছেন, বলে যান আমাদের! জীবনকে তিনি লড়াইয়ের সমানুপাতে গড়ে তুলেছিলেন। উপনিবেশবিরোধী, ক্ষমতাবিরোধী সে লড়াকু জীবন অন্ধকারের বিপরীতে আমাদের দেখায় প্রতিরোধপ্রত্যয়ী আলোর সন্ধান। সংগ্রামের আলোকদিশারী এই মহাত্মার প্রতি কুর্ণিশ!

কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা জন্মের দায় পরিশোধ করেন জীবনজুড়ে। আফ্রিকান সাহিত্যের অন্যতম মহীরুহ নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো তেমনই একজন। যদিও শুধু লেখা নয়, জীবন ধারণের মধ্যেই তিনি স্বাধীনতার অর্থ খুঁজেছেন। স্বাধীনতা তাঁর কাছে কেবল মানচিত্রের মুক্তি নয়; বরং ভাষা ও সংস্কৃতির এবং চেতনার পুনর্জাগরণ।
ঔপনিবেশিক প্রতিকূল পরিবেশে নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো ১৯৩৮ সালে এক দরিদ্র কৃষিজীবী কেনিয়ান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব কেটেছিল রাজধানী নাইরোবি থেকে মাত্র ১৮ মাইল দূরের লিমুরুতে, যা এক সময় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আফ্রিকান অর্থনীতির কেন্দ্র ছিল। ১৮০০-এর দশকের শেষভাগে ব্রিটিশরা কেনিয়াকে প্রটেকটরেট বা সংরক্ষণাধীন রাজ্য ঘোষণা করে। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে লিমুরুর মতো এলাকায় স্থানীয় আফ্রিকানদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিয়ে সেগুলোয় চা ও কফির চাষ করা হতো।
এই দখলদারির ধাক্কায় নগুগির পরিবার ভূমিহীন ও দারিদ্র্যক্লিষ্ট হয়ে পড়ে। তাঁর বাবা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চার স্ত্রী এবং তাদের ২৪ জন সন্তানের ওপর শুরু করেন নির্মম আচরণ। এই কঠোর বাস্তবতার মধ্যেও নগুগির মা, ওয়াঞ্জিকু ওয়া নগুগি তাঁর অনমনীয় আশার আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে আসেন। সন্তানদের শিক্ষিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। ১৯৪০-এর দশকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গেরিলা প্রতিরোধ তৈরি হলে তাঁর এই শিক্ষানিষ্ঠা ও মানসিক দৃঢ়তাই ছিল নগুগির ভবিষ্যতের বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রাথমিক ভিত্তি।
নগুগির জন্মের সময় কেনিয়ার সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থাসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ব্রিটিশদের প্রবল আধিপত্য ছিল। এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালে ‘কেনিয়া ল্যান্ড এন্ড ফ্রিডম আর্মি’ তথা ‘মাউ মাউ’য়ের মতো স্বাধীনতাকামী দলগুলো যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীরা বেশিরভাগই ছিলেন সাধারণ কৃষক অথবা শ্রমজীবী মানুষ।
যখন আফ্রিকাজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সাহিত্যের নবতর ধারা নির্মাণের ডঙ্কা বাজছিল, নগুগি তখন একজন তরুণ-তুর্কী, মেকেরেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন আফ্রিকার দুটি দেশ উগান্ডা (১৯৬২) এবং কেনিয়ার (১৯৬৩) স্বাধীনতা অর্জন। একই সাথে এটাও দেখেছেন যে, আফ্রিকার বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বপ্ন পরবর্তী বছরগুলোয় কীভাবে বিশ্বাসঘাতক শাসকের নেতৃত্বের কারণে ধুলিসাৎ হয়ে গেছে!
২.
নানান ঘটনা মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। অনেক সময় নিজের কাছের মানুষদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা বেশি দাগকাটে মানুষের জীবনে। নগুগির সমাজ, পরিবার তথা স্বয়ং নগুগির ওপর হওয়া ঔপনিবেশিক শোষণ তাঁকে বিঔপনিবেশিক চিন্তক হিসেবে শক্ত ভিত দিয়েছে।
নগুগি তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁর শৈশব বেশ অন্য রকম। সব ভাইবোনদের সাথে ভালো সম্পর্ক যেমন ছিল, তেমনই ছিল মতানৈক্য। বড়ভাই গুড ওয়ালেস সশস্ত্র সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন। আরেক সৎভাই টুম্বো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতেন। কেউ আবার কাজ করতেন জুতার কারখানায়। নগুগি তাঁর স্বভাবসুলভ রসিকতার সুরে বলেছেন, ‘এক রাতে তারা দুজনেই আমার আরেক ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য মনঃস্থির করে, সে ভাইটি কাজ করত একটি জুতার কারখানায়। হঠাৎ করে দরজায় তাদের মুখোমুখি দেখা হলে দুজনেই উল্টোদিকে দৌড়াতে শুরু করে। একজন পালাচ্ছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছ থেকে, অন্যজন ভেবেছিল ‘মাউ মাউ’ বিপ্লবীরা তাকে হয়ত মেরে ফেলবে। মূলত এমন প্রতিদ্বন্দ্বীতার মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা।’
ঔপনিবেশিকরা তাদের অমানবিক রূপটি দেখিয়েছে কেনিয়ায়। একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, পুলিশি চেকপোস্টের এলএফএ যোদ্ধাদের খোঁজে তল্লাশির সময় থামার আদেশ শুনতে না পেয়ে সামনে এগিয়ে যান। পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। সেই ব্যক্তিটি নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর ভাই গিতোগো। নিজের পরিবারের সাথে ঘটা এই অঘটন নগুগিকে কেন ধাক্কা দিবে না!
১৯৭৭ সালে গিকুয়ু ভাষায় রচিত Ngaahika Ndeenda বা I Will Marry When I Want নাটক লেখার জন্য নগুগিকে কারাবরণ করতে হয়৷ নাটকটি কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির ওপর শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে লিখিত হয়, যেখানে দরিদ্রদের জীবন নিয়ন্ত্রণে ধনিক শ্রেণি ও বিদেশি প্রভাবের ভূমিকা চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত নাটকটির রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে নগুগি কারাবন্দি হন। আশ্চর্যই বটে, ইংরেজি ভাষায় নাটক লেখার জন্য জেরার সম্মুখীন হলেও, কখনোই কারারুদ্ধ হননি যিনি, তিনিই কি না নিজের ভূমিতে, নিজের ভাষায়, নিজেদের মানুষের জন্য নাটক লিখে কারাজীবন বরণ করেছেন!
পরিতাপের বিষয় এই যে, যে শাসক নগুগিকে গ্রেপ্তার করে, তারা নগুগিরই দেশের শাসক। এমনকি যিনি তৎকালীন আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তিনি নিজেও গিকুয়ু ভাষার ভালো বক্তা ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর নিজ মাতৃভাষায় লেখার বিষয়টি নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। কারাগারে বসে টয়লেট পেপারের ওপর গিকুয়ু ভাষায় লিখে ফেলেন Devil on the Cross নামক জনপ্রিয় রচনা, যা এই ভাষায় তাঁর প্রথম উপন্যাস। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির নায়িকা ওয়ারিঙ্গা সমাজের দুর্নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। এখানে লোভী ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাবানদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের নেতা, যিনি পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেন, ক্ষমতায় বসার পর তার আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এই উপন্যাস।
৩.
আফ্রিকার আরেক বিখ্যাত সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবের (১৯৫৮-২০১৩) থিংস ফল অ্যাপার্ট উপন্যাসে দেখা যায় ঔপনিবেশিক শাসকরা হাতে বাইবেল নিয়ে শিক্ষার প্রচার করতে আসে আর আফ্রিকানরা সেই ডিসকোর্স আর শিক্ষায় সর্বশান্ত হয়ে একসময় নিজের ভাষা, লোকাচার আর জমি সবকিছু থেকে উপন্যাসের নায়ক ওকোনকো তার গ্রামের বাসিন্দাদের মতোই উৎখাত হয়। আর তাদের হাতে থেকে যায় কেবল বাইবেলই!
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ প্রমুখসহ অনেকেই ঔপনিবেশিক থিয়েটার চর্চার ইতিহাসকে বাঙালির থিয়েটার চর্চার ইতিহাস বলে অস্বীকার করে প্রমাণ করেছেন এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যরীতির অস্তিত্ব। নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো তেমন ঔপনিবেশিকতার জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজের মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। নিজের সর্বশেষ প্রকাশিত Decolonizing Language and Other Revolutionary Ideas গ্রন্থের ‘দ্য বডি অব নলেজ’ (অনুবাদ: নূরুল কবীর) প্রবন্ধে নগুগি বলেছেন:
‘‘জ্ঞানার্জন একটি সরল প্রক্রিয়া। আপনি যদি কোথাও ঘুরতে যেতে চান, আপনি এখন যে জায়গাটিতে আছেন, ঠিক সে জায়গা থেকেই আপনাকে যাত্রা শুরু করতে হবে। আপনি যদি নাইরোবিতে থাকেন, আর নাকুরু যেতে চান, তাহলে আপনাকে প্রথমে মোমবাসা গিয়ে নাকুরুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে হবে না। জ্ঞানার্জনের ব্যাপারটিও ঠিক এরকম। পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়াটি আমাদের আপন শরীর সম্পর্কিত ধারণা থেকেই শুরু হয়।”
ঔপনিবেশিক শোষণকে অস্বীকার করার প্রথম ধাপ হিসেবে নগুগি বর্জন করেছিলেন নিজের নাম। আফ্রিকান সংস্কৃতির ওপর ঔপনিবেশিক প্রভাব ও ধর্মান্তরের প্রতিবাদ হিসেবে তিনি তাঁর খ্রিস্টান নাম জেমস নগুগি থেকে ১৯৭৬ সালে ‘জেমস’ বর্জন করেন। এরপর থেকে তিনি নিজের মাতৃভাষা এবং নিজ গোত্রীয় নাম Ngugi wa Thiong'o ব্যবহার করতে শুরু করেন।
৪.
নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, উপনিবেশ-পরবর্তী আফ্রিকান সাহিত্যবীক্ষার এক অনন্য কণ্ঠস্বর। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি পরিণত হয়েছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য আলোচনায় এডওয়ার্ড সাঈদ, ফ্রানৎস ফানোঁ, হোমি কে. ভাভার পাশাপাশি তাঁর নামটিও সমস্বরে উচ্চারিত হয়। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে আফ্রিকার সাহিত্য-জাগরণে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের একজন দিকপাল নগুগির যাপিত জীবন উপনিবেশিত মানুষের ভোগান্তির এক অনন্য দলিল।
১৯৮৬ সালে নগুগি প্রকাশ করেন তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ Decolonising the Mind, যেখানে ভাষা ও উপনিবেশবাদের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। নগুগি যুক্তি দেন যে, ইউরোপ আফ্রিকান সংস্কৃতিকে দমন করেছে। গ্রন্থটিতে ধাপে ধাপে দেখিয়েছেন কতভাবে একটি অঞ্চলের মানুষের মনোজগত দখল করে ঐ অঞ্চলের নিজস্বতাকে চিরতরে কফিনে পুঁতে দাফন করতে পারে উপনিবেশবাদীরা।
নগুগিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘ভালো ঔপনিবেশিক’ বলে কিছু কি আদৌ আছে? ঔপনিবেশিক সহিংসতাকে মানবিকতার মুখোশের আড়ালে খাটো করে দেখতে চাওয়ার মানসিকতাকে সরাসরি নাকচ করে নগুগি সপ্রতিভ ও স্পষ্ট উচ্চারণ করেন:
“ও মাই গড! এমন কিছুর অস্তিত্ব নেই। ঔপনিবেশিকতা একটি প্রবণতা। আপনি বন্দুক বহন করেন কিংবা বাইবেল, তাতে কিছুই যায় আসে না, আপনি একজন ঔপনিবেশিকই থাকবেন। অবশ্যই আমি বন্দুকওয়ালা ঔপনিবেশিকের চেয়ে বাইবেলওয়ালার মুখোমুখি হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব। কিন্তু আখেরে দুজনই তো এক জিনিস প্রচার করছে।”
এডওয়ার্ড সাঈদ (১৯৩৫-২০০৩) তাঁর ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থে জোরালোভাবে দেখিয়েছিলেন কীভাবে উপনিবেশ একটি শোষণমূলক ফ্রেমওয়ার্কের মধ্য দিয়ে উপনিবেশিত জাতির ওপর কঠিন দখলদারিত্ব কায়েম করেছিল। সাঈদ দেখান, কেবল ভূমি দখল করে উপনিবেশ স্থাপন নয়, ভাষা ও চিন্তাকে দখল করে নেয়ার ভানুমতির খেল দেখতে পাওয়া যায় উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোতে। ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা সৃষ্ট আত্মবিচ্ছিন্নতার বেদনাকে ধারণ করেছিলেন চিনুয়া আচেবে আর আফ্রিকান ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য মুক্তির ধারণার সংঘাত বিশ্লেষণ করেছিলেন ওলে সোয়িঙ্কা (১৯৩৪)।
অন্যদিকে, নগুগি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন প্রতিবাদী কষ্ঠস্বর হয়ে, যিনি নির্ভীক ও আমৃত্যু আপসহীন। শক্তিশালী লেখনীর ভাষিকঅস্ত্র দিয়ে তিনি আঘাত করেছিলেন নিপীড়নমূলক শাসন ব্যবস্থাকে। প্রথমে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে, পরে স্বাধীন কেনিয়ার স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসককে। যার ফলে করেছিলেন কারাবরণ। শাসকের রোষানলে পড়ে প্রথমে ছিলেন নিজভূমে পরবাসী। পরবর্তীকালে নিজ বাসভূমে নিষিদ্ধ। আমৃত্যু তিনি পরবাস জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। যেন এক আপাদমস্তক সন্যাস-জীবন তাঁর। ঘরছাড়া, দেশছাড়া সন্ত যেমন, তিনিও তেমনই ছিলেন এক সন্ত-সাহিত্যিক!
নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর সাহিত্য জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ল্যান্ড অ্যান্ড ফ্রিডম আর্মি বা এলএফএ, ব্রিটিশরা অবজ্ঞা করে যাকে বলতো ‘মাউ মাউ’। আফ্রিকার একেবারে শ্রমজীবী, কৃষিজীবী মানুষের প্রতিরোধ আন্দোলনের কাহিনী উঠে এসেছে নগুগির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলোতে। এই আন্দোলনকে নগুগি কেবল কেনিয়ার স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার দলিল হিসেবেই দেখেছেন। এর এক উৎকৃষ্ট প্রমাণ তাঁর A Grain of Wheat (১৯৬৭) উপন্যাসটি।
কেনিয়ার স্বাধীনতার পূর্বমুহুর্তে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা, ত্যাগ ও অপরাধবোধের কাহিনি এই উপন্যাসে উঠে এসেছে। মুগো নামের চরিত্রটি জাতীয় বীর হিসেবে পরিচিত হলেও তার গোপন অপরাধ রয়েছে। মূলত নগুগি উপন্যাসটিতে স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কৈশোরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভয়াবহ দমন-পীড়নের সাক্ষী হওয়া নগুগি জানতেন তাঁর ও বন্ধুদের অভিজ্ঞতার কথা, যে সময়ে চোখ খোলা আপাদমস্তক সাদা হুড পরা গুপ্তচরেরা, ব্রিটিশ সৈন্য এবং হোম গার্ডরা মিলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতেই লোকজনকে ধরে নিয়ে যেত। তাদের বিবেচনা করা হতো এলএফএ সদস্য বা সমর্থক হিসেবে। বয়স কিংবা নিরাপরাধ প্রমাণের কোনো গুরুত্ব ছিল না। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে জীবন কাটাত। নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেই এই উপন্যাসটি রচনা করেন নগুগি।
৫.
নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ২৮ মে। ২০২৫ সালের এই দিনে, ৮৭ বছর বয়সে চলে যান একুশের শতকের অসামান্য আর্টিস্ট কাম অ্যাক্টিভিস্ট। একাধারে একজন লেখক, নাট্যকার, চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন তিনি। তাঁর সাহিত্য তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেমন জীবন তাঁর সাহিত্যের। এখানে নগুগি অপ্রতিরোধ্য ও অম্লান, যিনি ইতিহাসের কঙ্কালের উপর দাঁড়িয়ে মুখোশ খুলে দিতে পেরেছিলেন শাসক শ্রেণির।
এই মুখোশ উন্মোচন করা লেখালেখি কখনও তীব্র শ্লেষাত্মক, আবার কখনও ব্যঙ্গাত্মক হাসির। এই সহজাত স্বভাবই তাঁর অভীপ্সিত। এই শক্তিতেই নগুগি অনেক কিছুই বলে গেছেন, বলে যান আমাদের! জীবনকে তিনি লড়াইয়ের সমানুপাতে গড়ে তুলেছিলেন। উপনিবেশবিরোধী, ক্ষমতাবিরোধী সে লড়াকু জীবন অন্ধকারের বিপরীতে আমাদের দেখায় প্রতিরোধপ্রত্যয়ী আলোর সন্ধান। সংগ্রামের আলোকদিশারী এই মহাত্মার প্রতি কুর্ণিশ!

১৯৫৩ সালের ২৯ মের সেই সকালে, যখন তেনজিং নোরগে ও আমি প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করলাম, তখন থেকেই আমাকে এক মহান অভিযাত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হতে থাকে। কিন্তু আমি আসলে স্রেফ এক পোড় খাওয়া কিউয়ী, যে জীবনের বহু প্রতিকূলতাকে উপভোগ করেছে মনে-প্রাণে।
৩ ঘণ্টা আগে
খাদ্যসংস্কৃতি গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের আঞ্চলিক রান্নার বৈচিত্র্য মূলত ভৌগোলিক পরিবেশ, কৃষি, মসলা ব্যবহার ও স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। আর কোরবানির ঈদ সেই বৈচিত্র্যকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।
৩ ঘণ্টা আগে
ভারতের সংসদীয় রাজনীতির চত্বরে বাগযুদ্ধ নতুন কিছু নয়। তাতে উর্দু কবিদের কবিতাও সেই জওহারলাল নেহরুর আমল থেকেই হয়ে আসছে। ২০১৮ সালে লোকসভায় কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে মোদী সরকারকে লক্ষ্য করে বশির বদ্রের শের আওড়ান—
৫ ঘণ্টা আগে
ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ভৌগোলিক পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে একেক দেশে কোরবানির পশু একেক রকম হয়। কোথাও গরু সবচেয়ে জনপ্রিয়, কোথাও ভেড়া বা দুম্বা, আবার কোথাও উট ছাড়া ঈদ যেন কল্পনাই করা যায় না।
৭ ঘণ্টা আগে