শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। সংগঠনটি মুসলমান সমাজকে আধুনিক মনন, বহুমাত্রিক চিন্তা ও বৃহত্তর মানবিক জগতে প্রবেশের পথ সুগম করে। মুসলিম সমাজের শিক্ষিত অংশ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে নিজেদের বাঙালি সত্তা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিশ্বজনীন মানবপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজস্ব বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
হানিফ রাশেদীন

তখন, বিশ শতকের প্রথম ভাগে ঢাকার মুসলিম সমাজে জীবন সম্পর্কে নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছিল—ধর্ম ও যুক্তির সম্পর্ক কী, সাহিত্য ও সমাজের দায়িত্ব কী, ব্যক্তি কি কেবল সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এ সময়, ১৯২০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ তারই এক সংগঠিত প্রকাশ। সামাজিক পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে এই সংগঠন সাহিত্য, শিক্ষা ও মুক্ত চিন্তাকে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তাদের ব্যতিক্রমী চিন্তাধারা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল জীবনবোধ, চিন্তাপদ্ধতি, ইতিহাসচেতনা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের চিন্তাগত রূপান্তরের সূতিকাগার।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ আধুনিক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে মুসলিম সমাজের সংযোগ স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও সাহিত্যসহ জ্ঞানের নানা শাখায় আলোচনার মাধ্যমে মুক্তচিন্তার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে; যা তৎকালীন মুসলমান সমাজে ছিল বিরল। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংগঠনটি মুসলমান সমাজকে আধুনিক মনন, বহুমাত্রিক চিন্তা ও বৃহত্তর মানবিক জগতে প্রবেশের পথ সুগম করে। মুসলিম সমাজের শিক্ষিত অংশ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে নিজেদের বাঙালি সত্তা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিশ্বজনীন মানবপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজস্ব বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
‘শিখা’ ছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর মুখপত্র। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই শিখাগোষ্ঠীর চিন্তা, কর্মসূচি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান সুসংহত রূপ পায়। পত্রিকাটির নামে মুসলিম সাহিত্য সমাজকে ‘শিখাগোষ্ঠী’ বলেও অভিহিত করা হয়; আবার, তাদের কার্যক্রম ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামেও পরিচিতি লাভ করে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন আবুল হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন।
নামের প্রথমে যদিও ‘মুসলিম’ শব্দ ছিল। তবে সংগঠনটি চিন্তা-চেতনা, বক্তব্য ও কার্যক্রমে ছিল উদার ও অসাম্প্রদায়িক। এই সংগঠন কখনো ধর্মীয় পরিচয়কে সংকীর্ণতার সীমারেখায় আবদ্ধ করেনি; বরং মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও মুক্তচিন্তাকেই প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। সাহিত্য সমাজের সভা, পাঠচক্র ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে অমুসলিম সাহিত্যসেবী ও শিক্ষাবিদরা আমন্ত্রিত ও সাদরে গৃহীত হতেন। এই বহুত্ববাদী ও সহনশীল চর্চার মধ্য দিয়েই মুসলিম সাহিত্য সমাজ বাঙালি সমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি প্রগতিশীল ও মানবিক সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণে সক্ষম হয়েছিল।

ঔপনিবেশিক বাংলায় মুসলিম সমাজ দীর্ঘদিন শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার ফলে হীনম্মন্যতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতার সংকটে ভুগছিল। তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশ্নহীন অনুশীলনে সীমিত ছিল। মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রচলিত এই সংকীর্ণ ধারাকে ভেঙে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় যুক্তি, প্রশ্ন ও বিশ্লেষণকে কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়। এই বাস্তবতায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ বাংলা ভাষায় প্রবন্ধ, সাহিত্যসমালোচনা, গবেষণাধর্মী লেখা এবং সভা-সেমিনারের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মমর্যাদার চেতনা জাগ্রত করে।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ ধর্ম ও আধুনিকতার মাঝে যুক্তিনির্ভর, মানবিক ও প্রগতিশীল পথ নির্মাণ করেছিল—মানবকল্যাণ ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মকে অনুধাবনের প্রয়াস। সামাজিক বা রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার না করে কীভাবে ধর্ম নৈতিক প্রেরণা, আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের উৎস হতে পারে—সে দৃষ্টিভঙ্গিকেই সামনে আনে শিখাগোষ্ঠী। আজকের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষার তাৎপর্য আরও গভীর ও অধিক প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সমকালীন সমাজে আমাদের প্রয়োজন ধর্মকে ব্যক্তিগত নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মসংযমের উৎস হিসেবে মর্যাদা দেওয়া; একই সঙ্গে তা যেন ক্ষমতা, বিভাজন কিংবা আধিপত্যের ভাষায় রূপান্তরিত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই আধুনিক মুসলিম জীবনবোধকে সহনশীল, যুক্তিবাদী ও বহুত্ববাদী করে গড়ে তুলতে পারে এবং সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মকে গঠনমূলক, ইতিবাচক ও মানবিক ভূমিকা পালনে সক্ষম করে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন মুসলমান সমাজকে আবেগ, কুসংস্কার, অনুকরণনির্ভরতা ও সামাজিক পশ্চাৎপদতা থেকে বের করে আধুনিক মননশীলতার অভিমুখে রূপান্তর ঘটাতে চেয়েছিল। সাহিত্য, জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ককে তারা নিছক শৈল্পিক অনুশীলন হিসেবে নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে সমাজ রূপান্তরে নতুন বোধের ভিত্তিস্থাপন করেছিল; যা তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় অত্যন্ত প্রগতিশীল ও যুগান্তকারী উদ্যোগ। যার ঐতিহাসিক পরিণত রূপই আজকের বাংলাদেশ—একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু এই রাষ্ট্র শিক্ষাগোষ্ঠির বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনাকে ধারাবাহিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের চিন্তকরা মনে করতেন রাজনৈতিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত হলো মননের স্বাধীনতা, আর মননের স্বাধীনতার প্রধান ক্ষেত্র শিক্ষা। এই চিন্তার পরিণত রূপ হিসেবে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলন। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও, প্রত্যাশিত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা এখনো পূর্ণতা পায়নি। এই ব্যর্থতা কেবল রাজনৈতিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতাও সমানভাবে দায়ী।

মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রার সূচনা করেছিল, তার মূল দর্শন ছিল শিক্ষা; যা কেবল পেশাগত দক্ষতা নয়—নৈতিকতা, মানবিকতা ও যুক্তিবাদে সমৃদ্ধ সচেতন মানুষ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। এই শিক্ষাদর্শ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই এই মানবিক ও মননশীল চর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৈতিক বিচারবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে ওঠার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে মানুষ বৈষম্য, ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতির সক্রিয় অংশ হয়ে উঠছে। শিক্ষা যেখানে মানুষকে সাম্যের চেতনায় উজ্জীবিত করার কথা, সেখানে তা উল্টো ক্ষমতা, পরিচয় ও আধিপত্যের রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিচ্যুতি একটি সাম্যভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে বড় অন্তরায়।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ঔপনিবেশিক বাংলার মুসলমান সমাজে মুক্তবুদ্ধির এক প্রজ্জ্বলিত আলোকবর্তিকা। ধর্মীয় আবেগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার আবরণ ভেদ করে এই সমাজ যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও আত্মসমালোচনার যে সাহসী চর্চা শুরু করেছিল, তা ছিল যুগান্তকারী। তাদের মূল আহ্বান ছিল বিশ্বাসকে অন্ধ অনুসরণে নয়, বরং যুক্তি ও জ্ঞানের আলোতে যাচাই করা; সাহিত্যকে অলংকারমাত্র না ভেবে সমাজ রূপান্তরের বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। ‘শিখা’সহ বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রশ্ন করার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। কীভাবে আধুনিক বিশ্বে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে দাঁড়ানো যায়। এই মুক্তচিন্তার চর্চা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়লেও, সেটিই প্রমাণ করে যে তারা স্থবিরতার অন্ধকারে আলো জ্বালাতে পেরেছিল। ফলে মুসলিম সাহিত্য সমাজ কেবল একটি সাহিত্যগোষ্ঠী নয়; এটি ছিল মুসলমান সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির পথে আহ্বান জানানো এক ঐতিহাসিক বুদ্ধিবৃত্তিক দিশারি।
কোনো সমাজ যদি জ্ঞানকে সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখে, যদি প্রশ্ন করাকে অপরাধ মনে করে, তবে সেখানে বুদ্ধি অনিবার্যভাবে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে এবং সেই আড়ষ্টতা থেকেই জন্ম নেয় সামাজিক স্থবিরতা, বৈষম্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরাধীনতা। এ কারণেই শতবর্ষ পরেও ‘শিখা’ গোষ্ঠীর উচ্চারিত মন্ত্র—‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—আমাদের কানে এক অমোঘ সতর্কবাণীর মতো প্রতিধ্বনিত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব সমাজে জ্ঞানচর্চা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, পাঠ্যক্রম একমাত্রিক হয়েছে, ভিন্নমতকে দমন করা হয়েছে; সেসব সমাজ বাহ্যিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জন করলেও ভেতরে ভেতরে রয়ে গেছে চিন্তার দাসত্ব।
‘শিখা’র অনির্বাণ আলো আমাদের আজও মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কোনো একদিনের অর্জন নয়; এটি প্রতিদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম। একটি জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা তার পতাকা, মানচিত্র বা সার্বভৌম ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নিহিত থাকে নাগরিকদের চিন্তার স্বাধীনতায়, প্রশ্ন করার অধিকারে, যুক্তিকে ভয় না পাওয়ার সংস্কৃতিতে। যতদিন জ্ঞান হবে ক্ষমতার অনুগত, ততদিন মুক্তির দাবি থাকবে অসম্পূর্ণ। এই অর্থে ‘শিখা’ কেবল অতীতের স্মারক নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য এক অবিরাম নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আহ্বান।
আমাদের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধ তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনার গভীরে যে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভ্রূণ কাজ করেছে, তার সূত্রপাত হয়েছিল অনেক আগেই—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই নিভৃত কক্ষগুলোতে; যেখানে মুসলিম সাহিত্য সমাজ যুক্তি, ভাষা ও আত্মপরিচয় নিয়ে নিরলস আলোচনা চালিয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে, জনতার কোলাহল থেকে দূরে বসে তারা যে প্রশ্নগুলো তুলেছিল—আমরা কে? আমাদের ভাষা কী? আমাদের চিন্তার স্বাধীনতা কোথায়?—এগুলোই পরবর্তীকালে গণআন্দোলনের ভাষায় রূপ নেয়।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রথমবারের মতো মুসলমান সমাজকে শেখায় যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির মর্যাদা, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের আধার। নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করলে মানুষ কেবল শব্দ হারায় না, হারায় ইতিহাস ও আত্মসম্মানও। এই উপলব্ধিই ভাষা আন্দোলনের মূল সত্তা—যেখানে মাতৃভাষার স্বীকৃতি ছিল রাজনৈতিক দাবির চেয়েও গভীর এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। ১৯৫২ সালে রাজপথে যে তরুণেরা বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের চেতনার পেছনে কাজ করছিল এই দীর্ঘদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি, যা মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তার ধারাবাহিক পরিমণ্ডলে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল।
একইভাবে, ১৯৭১ ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে দীর্ঘদিনের অবদমন ও প্রতিরোধের চূড়ান্ত রূপ। মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে নির্ভীক আত্মপরিচয়ের উচ্চারণ করেছিল—নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোর যে সাহস তারা জাগিয়ে তুলেছিল—সেটিই একসময় রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন মানুষকে শিখিয়েছিল ভয়কে অতিক্রম করে নিজের সত্য উচ্চারণ করতে; আর সেই সাহসই মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্রধারণের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।
কোনো মহৎ আন্দোলনের সার্থকতা শুধু তার সমসাময়িক সাফল্যে বিচার করা যায় না। অনেক আন্দোলন তৎক্ষণাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা বদলাতে পারে না; কিন্তু তারা মানুষের চিন্তার ভিত নড়িয়ে দেয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন তেমনই এক আন্দোলন, যার আলো তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষীণ মনে হলেও উত্তরকালে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ এক শ বছর আগে বুদ্ধির মুক্তি বা মুক্তচিন্তার যে আদর্শ প্রচার করেছিল, আজ সেই আদর্শকে সমকালীন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই হবে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ। একটা সময়ের চিন্তাধারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থ, প্রয়োগ ও দায়বদ্ধতা নতুনভাবে নির্ধারিত হয়। এই প্রেক্ষিতে অতীতের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে কেবল স্মৃতিচারণ বা ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ যথেষ্ট নয়, সমকালে সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতার সঙ্গে পাঠ ও পুনর্নির্মাণ করা অপরিহার্য। অতীতের চিন্তাধারা বর্তমানের বাস্তবতায় পুনর্নির্মিত হলে, তা কেবল ঐতিহাসিক স্মারক না থেকে জীবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিতে রূপ নেয়। মুসলিম সাহিত্য সমাজের বুদ্ধির মুক্তির আহ্বান আর শতবর্ষ আগের কোনো উচ্চারণ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা আজকের সমাজকে প্রশ্ন করতে, বদলাতে এবং আরও মানবিক ও যুক্তিবাদী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম এক সক্রিয় প্রেরণায় পরিণত হবে।

তখন, বিশ শতকের প্রথম ভাগে ঢাকার মুসলিম সমাজে জীবন সম্পর্কে নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছিল—ধর্ম ও যুক্তির সম্পর্ক কী, সাহিত্য ও সমাজের দায়িত্ব কী, ব্যক্তি কি কেবল সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এ সময়, ১৯২০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ তারই এক সংগঠিত প্রকাশ। সামাজিক পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে এই সংগঠন সাহিত্য, শিক্ষা ও মুক্ত চিন্তাকে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তাদের ব্যতিক্রমী চিন্তাধারা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল জীবনবোধ, চিন্তাপদ্ধতি, ইতিহাসচেতনা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের চিন্তাগত রূপান্তরের সূতিকাগার।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ আধুনিক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে মুসলিম সমাজের সংযোগ স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও সাহিত্যসহ জ্ঞানের নানা শাখায় আলোচনার মাধ্যমে মুক্তচিন্তার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে; যা তৎকালীন মুসলমান সমাজে ছিল বিরল। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংগঠনটি মুসলমান সমাজকে আধুনিক মনন, বহুমাত্রিক চিন্তা ও বৃহত্তর মানবিক জগতে প্রবেশের পথ সুগম করে। মুসলিম সমাজের শিক্ষিত অংশ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে নিজেদের বাঙালি সত্তা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিশ্বজনীন মানবপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজস্ব বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
‘শিখা’ ছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর মুখপত্র। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই শিখাগোষ্ঠীর চিন্তা, কর্মসূচি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান সুসংহত রূপ পায়। পত্রিকাটির নামে মুসলিম সাহিত্য সমাজকে ‘শিখাগোষ্ঠী’ বলেও অভিহিত করা হয়; আবার, তাদের কার্যক্রম ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামেও পরিচিতি লাভ করে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন আবুল হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন।
নামের প্রথমে যদিও ‘মুসলিম’ শব্দ ছিল। তবে সংগঠনটি চিন্তা-চেতনা, বক্তব্য ও কার্যক্রমে ছিল উদার ও অসাম্প্রদায়িক। এই সংগঠন কখনো ধর্মীয় পরিচয়কে সংকীর্ণতার সীমারেখায় আবদ্ধ করেনি; বরং মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও মুক্তচিন্তাকেই প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। সাহিত্য সমাজের সভা, পাঠচক্র ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে অমুসলিম সাহিত্যসেবী ও শিক্ষাবিদরা আমন্ত্রিত ও সাদরে গৃহীত হতেন। এই বহুত্ববাদী ও সহনশীল চর্চার মধ্য দিয়েই মুসলিম সাহিত্য সমাজ বাঙালি সমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি প্রগতিশীল ও মানবিক সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণে সক্ষম হয়েছিল।

ঔপনিবেশিক বাংলায় মুসলিম সমাজ দীর্ঘদিন শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার ফলে হীনম্মন্যতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতার সংকটে ভুগছিল। তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশ্নহীন অনুশীলনে সীমিত ছিল। মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রচলিত এই সংকীর্ণ ধারাকে ভেঙে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় যুক্তি, প্রশ্ন ও বিশ্লেষণকে কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়। এই বাস্তবতায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ বাংলা ভাষায় প্রবন্ধ, সাহিত্যসমালোচনা, গবেষণাধর্মী লেখা এবং সভা-সেমিনারের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মমর্যাদার চেতনা জাগ্রত করে।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ ধর্ম ও আধুনিকতার মাঝে যুক্তিনির্ভর, মানবিক ও প্রগতিশীল পথ নির্মাণ করেছিল—মানবকল্যাণ ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মকে অনুধাবনের প্রয়াস। সামাজিক বা রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার না করে কীভাবে ধর্ম নৈতিক প্রেরণা, আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের উৎস হতে পারে—সে দৃষ্টিভঙ্গিকেই সামনে আনে শিখাগোষ্ঠী। আজকের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষার তাৎপর্য আরও গভীর ও অধিক প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সমকালীন সমাজে আমাদের প্রয়োজন ধর্মকে ব্যক্তিগত নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মসংযমের উৎস হিসেবে মর্যাদা দেওয়া; একই সঙ্গে তা যেন ক্ষমতা, বিভাজন কিংবা আধিপত্যের ভাষায় রূপান্তরিত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই আধুনিক মুসলিম জীবনবোধকে সহনশীল, যুক্তিবাদী ও বহুত্ববাদী করে গড়ে তুলতে পারে এবং সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মকে গঠনমূলক, ইতিবাচক ও মানবিক ভূমিকা পালনে সক্ষম করে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন মুসলমান সমাজকে আবেগ, কুসংস্কার, অনুকরণনির্ভরতা ও সামাজিক পশ্চাৎপদতা থেকে বের করে আধুনিক মননশীলতার অভিমুখে রূপান্তর ঘটাতে চেয়েছিল। সাহিত্য, জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ককে তারা নিছক শৈল্পিক অনুশীলন হিসেবে নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে সমাজ রূপান্তরে নতুন বোধের ভিত্তিস্থাপন করেছিল; যা তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় অত্যন্ত প্রগতিশীল ও যুগান্তকারী উদ্যোগ। যার ঐতিহাসিক পরিণত রূপই আজকের বাংলাদেশ—একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু এই রাষ্ট্র শিক্ষাগোষ্ঠির বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনাকে ধারাবাহিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের চিন্তকরা মনে করতেন রাজনৈতিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত হলো মননের স্বাধীনতা, আর মননের স্বাধীনতার প্রধান ক্ষেত্র শিক্ষা। এই চিন্তার পরিণত রূপ হিসেবে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলন। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও, প্রত্যাশিত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা এখনো পূর্ণতা পায়নি। এই ব্যর্থতা কেবল রাজনৈতিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতাও সমানভাবে দায়ী।

মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রার সূচনা করেছিল, তার মূল দর্শন ছিল শিক্ষা; যা কেবল পেশাগত দক্ষতা নয়—নৈতিকতা, মানবিকতা ও যুক্তিবাদে সমৃদ্ধ সচেতন মানুষ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। এই শিক্ষাদর্শ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই এই মানবিক ও মননশীল চর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৈতিক বিচারবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে ওঠার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে মানুষ বৈষম্য, ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতির সক্রিয় অংশ হয়ে উঠছে। শিক্ষা যেখানে মানুষকে সাম্যের চেতনায় উজ্জীবিত করার কথা, সেখানে তা উল্টো ক্ষমতা, পরিচয় ও আধিপত্যের রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিচ্যুতি একটি সাম্যভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে বড় অন্তরায়।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ঔপনিবেশিক বাংলার মুসলমান সমাজে মুক্তবুদ্ধির এক প্রজ্জ্বলিত আলোকবর্তিকা। ধর্মীয় আবেগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার আবরণ ভেদ করে এই সমাজ যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও আত্মসমালোচনার যে সাহসী চর্চা শুরু করেছিল, তা ছিল যুগান্তকারী। তাদের মূল আহ্বান ছিল বিশ্বাসকে অন্ধ অনুসরণে নয়, বরং যুক্তি ও জ্ঞানের আলোতে যাচাই করা; সাহিত্যকে অলংকারমাত্র না ভেবে সমাজ রূপান্তরের বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। ‘শিখা’সহ বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রশ্ন করার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। কীভাবে আধুনিক বিশ্বে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে দাঁড়ানো যায়। এই মুক্তচিন্তার চর্চা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়লেও, সেটিই প্রমাণ করে যে তারা স্থবিরতার অন্ধকারে আলো জ্বালাতে পেরেছিল। ফলে মুসলিম সাহিত্য সমাজ কেবল একটি সাহিত্যগোষ্ঠী নয়; এটি ছিল মুসলমান সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির পথে আহ্বান জানানো এক ঐতিহাসিক বুদ্ধিবৃত্তিক দিশারি।
কোনো সমাজ যদি জ্ঞানকে সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখে, যদি প্রশ্ন করাকে অপরাধ মনে করে, তবে সেখানে বুদ্ধি অনিবার্যভাবে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে এবং সেই আড়ষ্টতা থেকেই জন্ম নেয় সামাজিক স্থবিরতা, বৈষম্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরাধীনতা। এ কারণেই শতবর্ষ পরেও ‘শিখা’ গোষ্ঠীর উচ্চারিত মন্ত্র—‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—আমাদের কানে এক অমোঘ সতর্কবাণীর মতো প্রতিধ্বনিত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব সমাজে জ্ঞানচর্চা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, পাঠ্যক্রম একমাত্রিক হয়েছে, ভিন্নমতকে দমন করা হয়েছে; সেসব সমাজ বাহ্যিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জন করলেও ভেতরে ভেতরে রয়ে গেছে চিন্তার দাসত্ব।
‘শিখা’র অনির্বাণ আলো আমাদের আজও মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কোনো একদিনের অর্জন নয়; এটি প্রতিদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম। একটি জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা তার পতাকা, মানচিত্র বা সার্বভৌম ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নিহিত থাকে নাগরিকদের চিন্তার স্বাধীনতায়, প্রশ্ন করার অধিকারে, যুক্তিকে ভয় না পাওয়ার সংস্কৃতিতে। যতদিন জ্ঞান হবে ক্ষমতার অনুগত, ততদিন মুক্তির দাবি থাকবে অসম্পূর্ণ। এই অর্থে ‘শিখা’ কেবল অতীতের স্মারক নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য এক অবিরাম নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আহ্বান।
আমাদের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধ তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনার গভীরে যে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভ্রূণ কাজ করেছে, তার সূত্রপাত হয়েছিল অনেক আগেই—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই নিভৃত কক্ষগুলোতে; যেখানে মুসলিম সাহিত্য সমাজ যুক্তি, ভাষা ও আত্মপরিচয় নিয়ে নিরলস আলোচনা চালিয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে, জনতার কোলাহল থেকে দূরে বসে তারা যে প্রশ্নগুলো তুলেছিল—আমরা কে? আমাদের ভাষা কী? আমাদের চিন্তার স্বাধীনতা কোথায়?—এগুলোই পরবর্তীকালে গণআন্দোলনের ভাষায় রূপ নেয়।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রথমবারের মতো মুসলমান সমাজকে শেখায় যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির মর্যাদা, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের আধার। নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করলে মানুষ কেবল শব্দ হারায় না, হারায় ইতিহাস ও আত্মসম্মানও। এই উপলব্ধিই ভাষা আন্দোলনের মূল সত্তা—যেখানে মাতৃভাষার স্বীকৃতি ছিল রাজনৈতিক দাবির চেয়েও গভীর এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। ১৯৫২ সালে রাজপথে যে তরুণেরা বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের চেতনার পেছনে কাজ করছিল এই দীর্ঘদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি, যা মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তার ধারাবাহিক পরিমণ্ডলে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল।
একইভাবে, ১৯৭১ ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে দীর্ঘদিনের অবদমন ও প্রতিরোধের চূড়ান্ত রূপ। মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে নির্ভীক আত্মপরিচয়ের উচ্চারণ করেছিল—নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোর যে সাহস তারা জাগিয়ে তুলেছিল—সেটিই একসময় রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন মানুষকে শিখিয়েছিল ভয়কে অতিক্রম করে নিজের সত্য উচ্চারণ করতে; আর সেই সাহসই মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্রধারণের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।
কোনো মহৎ আন্দোলনের সার্থকতা শুধু তার সমসাময়িক সাফল্যে বিচার করা যায় না। অনেক আন্দোলন তৎক্ষণাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা বদলাতে পারে না; কিন্তু তারা মানুষের চিন্তার ভিত নড়িয়ে দেয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন তেমনই এক আন্দোলন, যার আলো তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষীণ মনে হলেও উত্তরকালে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ এক শ বছর আগে বুদ্ধির মুক্তি বা মুক্তচিন্তার যে আদর্শ প্রচার করেছিল, আজ সেই আদর্শকে সমকালীন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই হবে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ। একটা সময়ের চিন্তাধারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থ, প্রয়োগ ও দায়বদ্ধতা নতুনভাবে নির্ধারিত হয়। এই প্রেক্ষিতে অতীতের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে কেবল স্মৃতিচারণ বা ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ যথেষ্ট নয়, সমকালে সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতার সঙ্গে পাঠ ও পুনর্নির্মাণ করা অপরিহার্য। অতীতের চিন্তাধারা বর্তমানের বাস্তবতায় পুনর্নির্মিত হলে, তা কেবল ঐতিহাসিক স্মারক না থেকে জীবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিতে রূপ নেয়। মুসলিম সাহিত্য সমাজের বুদ্ধির মুক্তির আহ্বান আর শতবর্ষ আগের কোনো উচ্চারণ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা আজকের সমাজকে প্রশ্ন করতে, বদলাতে এবং আরও মানবিক ও যুক্তিবাদী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম এক সক্রিয় প্রেরণায় পরিণত হবে।

কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু একক কোনো চরিত্র বা সিরিজের স্রষ্টা নয়, তিনি বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ যুগের রূপকার। মাসুদ রানা ও কুয়াশা সিরিজের মাধ্যমে তিনি থ্রিলার, গুপ্তচর ও রহস্য সাহিত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন; রহস্য পত্রিকার মাধ্যমে পাঠকের কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসাকে লালন করেছেন
৩ মিনিট আগে
আজ ১৯ জানুয়ারি কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুদিন। তিনি বাংলাদেশে রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের পথিকৃৎ। সেবা প্রকাশনী নামে একটি বই প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। সেখান থেকে প্রকাশ করেছেন শিশু–কিশোর উপযোগী অসংখ্য ধ্রুপদি বিদেশি সাহিত্য।
৪১ মিনিট আগে
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি গড়ে ওঠা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বাঙালি মুসলমানের মানসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে। এই সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘শিখা’। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর গঠন প্রক্রিয়া কেমন ছিল? আদর্শ কারা, কর্মপন্থা কেমন ছিল?
৪ ঘণ্টা আগে
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। সংগঠনের মূল স্লোগান ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় 'শিখা' পত্রিকা।
৬ ঘণ্টা আগে