মাহমুদ নেওয়াজ জয়

কলকাতার এক পুরোনো বাড়ি। ছাদের কার্নিশে জমে থাকা বৃষ্টি। ভাঙা সিঁড়ির কোণে ধুলো। একসময় এখানে মানুষ ছিল, হাসি ছিল, রাগ ছিল, সংসার ছিল। এখন শুধু কিছু স্মৃতিরা ঘুরে বেড়ায়। তারা কেউ পুরোপুরি মৃত নয়, আবার পুরোপুরি জীবিতও নয়। অনীক দত্তের সিনেমা ঠিক এই জায়গা থেকেই শুরু হয়। জীবনের এমন এক করিডর থেকে, যেখানে হাসতে হাসতে হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে আসে।
অনীক দত্ত বাংলা সিনেমায় এসেছিলেন খুব ধীরে, খুব নিরীহ ভঙ্গিতে। কিন্তু তাঁর সিনেমা কখনো নিরীহ ছিল না। সেখানে ব্যঙ্গ আছে, বিষণ্নতা আছে, রাজনৈতিক ক্ষোভ আছে, আবার অদ্ভুত কোমলতাও আছে। তিনি এমন এক নির্মাতা, যিনি ভূতের গল্প বলতে বলতে আসলে শহরের গল্প বলেন। পুরোনো বাড়ির গল্প বলতে বলতে বলেন সভ্যতার গল্প। আর হাসির ভেতর ঢুকিয়ে দেন ভয়ানক এক শূন্যতা।
'ভূতের ভবিষ্যৎ' মুক্তি পাওয়ার সময় বাংলা সিনেমা যেন এক ক্লান্ত নদী। চারদিকে রিমেকের ভিড়, নিরাপদ গল্পের ভিড়, নভেল্টিহীন অভিনয়ের ভিড়। সেই সময়ে অনীক দত্ত একটি ভাঙা বাড়ির ভেতর কিছু ভূতকে বসিয়ে দিলেন। তারা কেউ ব্রিটিশ আমলের, কেউ জমিদার, কেউ ব্যর্থ অভিনেতা, কেউ বিপ্লবী। তারা ঝগড়া করে, গান গায়, স্মৃতি রোমন্থন করে। আর বাইরে থেকে এক নির্মম শহর তাদের উচ্ছেদ করতে আসে।
এই সিনেমার সবচেয়ে বড় জাদু হলো, এটি ভূতের সিনেমা নয়। এটি আসলে উচ্ছেদের সিনেমা। শহর যখন নিজের অতীতকে চিনতে পারে না, তখন সেই অতীত ভূত হয়ে ফিরে আসে। কলকাতা এখানে শুধু একটি শহর নয়, একটি মানসিক অবস্থা। যেখানে পুরোনো সিনেমা হল ভেঙে শপিং মল ওঠে, পুরোনো বাড়ি ভেঙে কাচের টাওয়ার ওঠে, আর মানুষ ধীরে ধীরে স্মৃতিহীন হয়ে যায়।
অনীক দত্ত এই ট্র্যাজেডিকে কখনো বক্তৃতা বানান না। তিনি এটিকে হাসির মধ্যে গলিয়ে দেন। তাঁর ব্যঙ্গ কখনো চিৎকার করে না। বরং খুব শান্তভাবে এসে বসে। দর্শক প্রথমে হাসে, তারপর হঠাৎ টের পায়— এই হাসির ভেতর কোথাও খুব নিঃসঙ্গ একটা শব্দ লুকিয়ে আছে।
'ভূতের ভবিষ্যৎ'-এর বাড়িটি আসলে এক প্রতীক। সেখানে যারা থাকে, তারা কেবল মৃত মানুষ নয়; তারা হারিয়ে যাওয়া সময়। পুরোনো বাংলা সিনেমা, পুরোনো কলকাতা, পুরোনো ভদ্রতা, পুরোনো সংস্কৃতি— সব যেন সেই বাড়ির ভেতর আশ্রয় নিয়েছে। আর বাইরের পৃথিবী তাদের জায়গা দিতে রাজি নয়। এই দ্বন্দ্বটিকেই অনীক দত্ত এমন দক্ষতায় সিনেমাটিক করে তুলেছিলেন যে, সিনেমাটি ধীরে ধীরে কাল্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে সাহসী কাজ সম্ভবত ‘ভবিষ্যতের ভূত'।
এই সিনেমা নিয়ে যতটা বিতর্ক হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর অস্তিত্ব। কারণ খুব কম নির্মাতা আছেন, যারা ব্যঙ্গকে এত দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেন। ‘ভবিষ্যতের ভূত' যেন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক কার্নিভাল। এখানে ভূতেরা আর শুধু অতীতের প্রতিনিধি নয়; তারা ভবিষ্যতের আতঙ্কও।
সিনেমাটি দেখতে দেখতে মনে হয়, আমরা যেন এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে কথা বলতে ভুলে যাচ্ছে। সবাই ভদ্র, সবাই নিয়ন্ত্রিত, সবাই নিরাপদ— অথচ কোথাও ভয় জমে আছে। অনীক দত্ত এই ভয়কে সরাসরি দেখান না। তিনি এটিকে হাস্যরসের পোশাক পরিয়ে দেন। ফলে দর্শক কখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারে না।
এই জায়গাটিই তাঁকে আলাদা করে। তিনি জানেন, ব্যঙ্গের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অস্বস্তি। যদি দর্শক শুধু হাসে, তাহলে ব্যঙ্গ অসম্পূর্ণ। দর্শককে হাসতে হাসতে হঠাৎ থেমে যেতে হবে। নিজের চারপাশকে নতুন করে দেখতে হবে। অনীক দত্ত সেই কাজটি বারবার করেন।
তাঁর সিনেমায় কলকাতা এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিন্তু এটি পোস্টকার্ডের কলকাতা নয়। এটি নস্টালজিয়ার চকচকে শহরও নয়। এটি ক্লান্ত, ভাঙা, উদ্বিগ্ন এক শহর। এখানে পুরোনো ট্রামের শব্দ আছে, কিন্তু সেই শব্দের সঙ্গে আছে বিলুপ্তির আভাস। এখানে পুরোনো বাড়ি আছে, কিন্তু তার দেয়ালে ফাটলও আছে। এই শহর নিজের ইতিহাস বয়ে বেড়াতে বেড়াতে হাঁপিয়ে উঠেছে।
অনীক দত্তের ক্যামেরা এই হাঁপিয়ে ওঠা শহরকে খুব ভালোবাসে। তাঁর সিনেমা দেখলে মনে হয়, তিনি আসলে হারিয়ে যাওয়া জিনিসের খোঁজে থাকা এক নির্মাতা। তিনি বিলুপ্তির আর্কাইভ তৈরি করেন। এমন সব মানুষকে পর্দায় আনেন, যাদের আর কেউ মনে রাখে না। ব্যর্থ অভিনেতা, বিস্মৃত গায়ক, ভেঙে যাওয়া বনেদি পরিবার, পুরোনো আদর্শ— এরা সবাই তাঁর সিনেমায় ফিরে আসে। যেন সিনেমা না হলে তারা সত্যিই মরে যেত।
এই কারণেই তাঁর হাস্যরস এত মানবিক। তিনি কখনো চরিত্রকে অপমান করেন না। তিনি তাদের দুর্বলতা দেখান, কিন্তু ভালোবাসাও দেন। ফলে তাঁর ব্যঙ্গ নিষ্ঠুর হয় না। বরং বিষণ্ন হয়ে ওঠে।
বাংলা সিনেমায় ব্যঙ্গের ঐতিহ্য নতুন নয়। কিন্তু অনীক দত্ত সেটিকে এক নতুন নগর-সংবেদনা দিয়েছেন। তাঁর ব্যঙ্গ শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। তিনি দেখান, কীভাবে একটি সমাজ ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতি হারায়। কীভাবে বাজার সংস্কৃতিকে গ্রাস করে। কীভাবে মানুষ বিনোদনের ভিড়ে থেকেও একা হয়ে যায়।
আর এই সবকিছুই তিনি করেন অবিশ্বাস্য সহজ ভাষায়।
তাঁর সংলাপ কখনো ভারী নয়। চরিত্রগুলো এমনভাবে কথা বলে, যেন তারা আমাদের পাশের বাড়ির মানুষ। কিন্তু সেই সাধারণ কথার মধ্যেই হঠাৎ তীক্ষ্ণ কিছু এসে পড়ে। যেন চায়ের কাপের ভেতর কেউ খুব নিঃশব্দে বিষ মিশিয়ে দিল।
'ভূতের ভবিষ্যৎ' ও ‘ভবিষ্যতের ভূত'— এই দুই সিনেমার নামের মধ্যেও এক অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। প্রথমটি অতীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। দ্বিতীয়টি ভবিষ্যতের আতঙ্ক নিয়ে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান। আর সেই বর্তমানটাই সম্ভবত অনীক দত্তের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।
তিনি জানেন, সময় কেবল এগোয় না; সময় অনেককিছু মুছেও দেয়।
তাই তাঁর সিনেমায় এত স্মৃতি। এত পুরোনো গান। এত ভাঙা বাড়ি। এত অন্ধকার করিডর। তিনি যেন বারবার বলতে চান— মানুষ যদি নিজের অতীতকে ভুলে যায়, তাহলে একদিন নিজেই ভূত হয়ে যাবে।
এই কথাটি তিনি কোনো স্লোগানে বলেন না। তিনি বলেন সিনেমার ভাষায়। আলো-ছায়ায়। শব্দে। নীরবতায়। একটি পুরোনো ঘরের ভেতর ধীরে ঘুরতে থাকা ক্যামেরায়।
অনীক দত্তের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এটাই— তিনি দর্শককে বুদ্ধিমান মনে করেন। তিনি সব ব্যাখ্যা করে দেন না। তিনি ফাঁক রাখেন। ইঙ্গিত রাখেন। দর্শককে ভাবতে দেন। ফলে তাঁর সিনেমা শেষ হওয়ার পরও মাথার ভেতর চলতে থাকে।
অনেক নির্মাতা আছেন, যারা সময়কে ধরতে চান। অনীক দত্ত সময়ের ক্ষয়কে ধরেন।
আর সেই কারণেই তাঁর সিনেমায় এত ভূত থকে। কারণ ভূত আসলে মৃত্যু নয়। ভূত হলো থেকে যাওয়ার চেষ্টা। পৃথিবী যখন কাউকে ভুলে যেতে চায়, তখন সে ভূত হয়ে ফিরে আসে। অনীক দত্ত সেই ফিরে আসার নির্মাতা।
রাত গভীর হলে কলকাতার কোনো পুরোনো বাড়িতে হয়তো এখনও বাতাস ঢোকে। ধুলো উড়ে। দূরে কোথাও ট্রামের ঘণ্টা বাজে। আর অন্ধকারের ভেতর কয়েকটি বিস্মৃত মানুষ ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করে। তারা জানে, শহর তাদের আর চায় না। তবু তারা যায় না। কারণ স্মৃতিরও এক ধরনের জেদ আছে।
অনীক দত্ত ছিলেন সেই জেদকে বহন করা চলচ্চিত্রকার।

কলকাতার এক পুরোনো বাড়ি। ছাদের কার্নিশে জমে থাকা বৃষ্টি। ভাঙা সিঁড়ির কোণে ধুলো। একসময় এখানে মানুষ ছিল, হাসি ছিল, রাগ ছিল, সংসার ছিল। এখন শুধু কিছু স্মৃতিরা ঘুরে বেড়ায়। তারা কেউ পুরোপুরি মৃত নয়, আবার পুরোপুরি জীবিতও নয়। অনীক দত্তের সিনেমা ঠিক এই জায়গা থেকেই শুরু হয়। জীবনের এমন এক করিডর থেকে, যেখানে হাসতে হাসতে হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে আসে।
অনীক দত্ত বাংলা সিনেমায় এসেছিলেন খুব ধীরে, খুব নিরীহ ভঙ্গিতে। কিন্তু তাঁর সিনেমা কখনো নিরীহ ছিল না। সেখানে ব্যঙ্গ আছে, বিষণ্নতা আছে, রাজনৈতিক ক্ষোভ আছে, আবার অদ্ভুত কোমলতাও আছে। তিনি এমন এক নির্মাতা, যিনি ভূতের গল্প বলতে বলতে আসলে শহরের গল্প বলেন। পুরোনো বাড়ির গল্প বলতে বলতে বলেন সভ্যতার গল্প। আর হাসির ভেতর ঢুকিয়ে দেন ভয়ানক এক শূন্যতা।
'ভূতের ভবিষ্যৎ' মুক্তি পাওয়ার সময় বাংলা সিনেমা যেন এক ক্লান্ত নদী। চারদিকে রিমেকের ভিড়, নিরাপদ গল্পের ভিড়, নভেল্টিহীন অভিনয়ের ভিড়। সেই সময়ে অনীক দত্ত একটি ভাঙা বাড়ির ভেতর কিছু ভূতকে বসিয়ে দিলেন। তারা কেউ ব্রিটিশ আমলের, কেউ জমিদার, কেউ ব্যর্থ অভিনেতা, কেউ বিপ্লবী। তারা ঝগড়া করে, গান গায়, স্মৃতি রোমন্থন করে। আর বাইরে থেকে এক নির্মম শহর তাদের উচ্ছেদ করতে আসে।
এই সিনেমার সবচেয়ে বড় জাদু হলো, এটি ভূতের সিনেমা নয়। এটি আসলে উচ্ছেদের সিনেমা। শহর যখন নিজের অতীতকে চিনতে পারে না, তখন সেই অতীত ভূত হয়ে ফিরে আসে। কলকাতা এখানে শুধু একটি শহর নয়, একটি মানসিক অবস্থা। যেখানে পুরোনো সিনেমা হল ভেঙে শপিং মল ওঠে, পুরোনো বাড়ি ভেঙে কাচের টাওয়ার ওঠে, আর মানুষ ধীরে ধীরে স্মৃতিহীন হয়ে যায়।
অনীক দত্ত এই ট্র্যাজেডিকে কখনো বক্তৃতা বানান না। তিনি এটিকে হাসির মধ্যে গলিয়ে দেন। তাঁর ব্যঙ্গ কখনো চিৎকার করে না। বরং খুব শান্তভাবে এসে বসে। দর্শক প্রথমে হাসে, তারপর হঠাৎ টের পায়— এই হাসির ভেতর কোথাও খুব নিঃসঙ্গ একটা শব্দ লুকিয়ে আছে।
'ভূতের ভবিষ্যৎ'-এর বাড়িটি আসলে এক প্রতীক। সেখানে যারা থাকে, তারা কেবল মৃত মানুষ নয়; তারা হারিয়ে যাওয়া সময়। পুরোনো বাংলা সিনেমা, পুরোনো কলকাতা, পুরোনো ভদ্রতা, পুরোনো সংস্কৃতি— সব যেন সেই বাড়ির ভেতর আশ্রয় নিয়েছে। আর বাইরের পৃথিবী তাদের জায়গা দিতে রাজি নয়। এই দ্বন্দ্বটিকেই অনীক দত্ত এমন দক্ষতায় সিনেমাটিক করে তুলেছিলেন যে, সিনেমাটি ধীরে ধীরে কাল্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে সাহসী কাজ সম্ভবত ‘ভবিষ্যতের ভূত'।
এই সিনেমা নিয়ে যতটা বিতর্ক হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর অস্তিত্ব। কারণ খুব কম নির্মাতা আছেন, যারা ব্যঙ্গকে এত দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেন। ‘ভবিষ্যতের ভূত' যেন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক কার্নিভাল। এখানে ভূতেরা আর শুধু অতীতের প্রতিনিধি নয়; তারা ভবিষ্যতের আতঙ্কও।
সিনেমাটি দেখতে দেখতে মনে হয়, আমরা যেন এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে কথা বলতে ভুলে যাচ্ছে। সবাই ভদ্র, সবাই নিয়ন্ত্রিত, সবাই নিরাপদ— অথচ কোথাও ভয় জমে আছে। অনীক দত্ত এই ভয়কে সরাসরি দেখান না। তিনি এটিকে হাস্যরসের পোশাক পরিয়ে দেন। ফলে দর্শক কখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারে না।
এই জায়গাটিই তাঁকে আলাদা করে। তিনি জানেন, ব্যঙ্গের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অস্বস্তি। যদি দর্শক শুধু হাসে, তাহলে ব্যঙ্গ অসম্পূর্ণ। দর্শককে হাসতে হাসতে হঠাৎ থেমে যেতে হবে। নিজের চারপাশকে নতুন করে দেখতে হবে। অনীক দত্ত সেই কাজটি বারবার করেন।
তাঁর সিনেমায় কলকাতা এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিন্তু এটি পোস্টকার্ডের কলকাতা নয়। এটি নস্টালজিয়ার চকচকে শহরও নয়। এটি ক্লান্ত, ভাঙা, উদ্বিগ্ন এক শহর। এখানে পুরোনো ট্রামের শব্দ আছে, কিন্তু সেই শব্দের সঙ্গে আছে বিলুপ্তির আভাস। এখানে পুরোনো বাড়ি আছে, কিন্তু তার দেয়ালে ফাটলও আছে। এই শহর নিজের ইতিহাস বয়ে বেড়াতে বেড়াতে হাঁপিয়ে উঠেছে।
অনীক দত্তের ক্যামেরা এই হাঁপিয়ে ওঠা শহরকে খুব ভালোবাসে। তাঁর সিনেমা দেখলে মনে হয়, তিনি আসলে হারিয়ে যাওয়া জিনিসের খোঁজে থাকা এক নির্মাতা। তিনি বিলুপ্তির আর্কাইভ তৈরি করেন। এমন সব মানুষকে পর্দায় আনেন, যাদের আর কেউ মনে রাখে না। ব্যর্থ অভিনেতা, বিস্মৃত গায়ক, ভেঙে যাওয়া বনেদি পরিবার, পুরোনো আদর্শ— এরা সবাই তাঁর সিনেমায় ফিরে আসে। যেন সিনেমা না হলে তারা সত্যিই মরে যেত।
এই কারণেই তাঁর হাস্যরস এত মানবিক। তিনি কখনো চরিত্রকে অপমান করেন না। তিনি তাদের দুর্বলতা দেখান, কিন্তু ভালোবাসাও দেন। ফলে তাঁর ব্যঙ্গ নিষ্ঠুর হয় না। বরং বিষণ্ন হয়ে ওঠে।
বাংলা সিনেমায় ব্যঙ্গের ঐতিহ্য নতুন নয়। কিন্তু অনীক দত্ত সেটিকে এক নতুন নগর-সংবেদনা দিয়েছেন। তাঁর ব্যঙ্গ শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। তিনি দেখান, কীভাবে একটি সমাজ ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতি হারায়। কীভাবে বাজার সংস্কৃতিকে গ্রাস করে। কীভাবে মানুষ বিনোদনের ভিড়ে থেকেও একা হয়ে যায়।
আর এই সবকিছুই তিনি করেন অবিশ্বাস্য সহজ ভাষায়।
তাঁর সংলাপ কখনো ভারী নয়। চরিত্রগুলো এমনভাবে কথা বলে, যেন তারা আমাদের পাশের বাড়ির মানুষ। কিন্তু সেই সাধারণ কথার মধ্যেই হঠাৎ তীক্ষ্ণ কিছু এসে পড়ে। যেন চায়ের কাপের ভেতর কেউ খুব নিঃশব্দে বিষ মিশিয়ে দিল।
'ভূতের ভবিষ্যৎ' ও ‘ভবিষ্যতের ভূত'— এই দুই সিনেমার নামের মধ্যেও এক অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। প্রথমটি অতীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। দ্বিতীয়টি ভবিষ্যতের আতঙ্ক নিয়ে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান। আর সেই বর্তমানটাই সম্ভবত অনীক দত্তের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।
তিনি জানেন, সময় কেবল এগোয় না; সময় অনেককিছু মুছেও দেয়।
তাই তাঁর সিনেমায় এত স্মৃতি। এত পুরোনো গান। এত ভাঙা বাড়ি। এত অন্ধকার করিডর। তিনি যেন বারবার বলতে চান— মানুষ যদি নিজের অতীতকে ভুলে যায়, তাহলে একদিন নিজেই ভূত হয়ে যাবে।
এই কথাটি তিনি কোনো স্লোগানে বলেন না। তিনি বলেন সিনেমার ভাষায়। আলো-ছায়ায়। শব্দে। নীরবতায়। একটি পুরোনো ঘরের ভেতর ধীরে ঘুরতে থাকা ক্যামেরায়।
অনীক দত্তের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এটাই— তিনি দর্শককে বুদ্ধিমান মনে করেন। তিনি সব ব্যাখ্যা করে দেন না। তিনি ফাঁক রাখেন। ইঙ্গিত রাখেন। দর্শককে ভাবতে দেন। ফলে তাঁর সিনেমা শেষ হওয়ার পরও মাথার ভেতর চলতে থাকে।
অনেক নির্মাতা আছেন, যারা সময়কে ধরতে চান। অনীক দত্ত সময়ের ক্ষয়কে ধরেন।
আর সেই কারণেই তাঁর সিনেমায় এত ভূত থকে। কারণ ভূত আসলে মৃত্যু নয়। ভূত হলো থেকে যাওয়ার চেষ্টা। পৃথিবী যখন কাউকে ভুলে যেতে চায়, তখন সে ভূত হয়ে ফিরে আসে। অনীক দত্ত সেই ফিরে আসার নির্মাতা।
রাত গভীর হলে কলকাতার কোনো পুরোনো বাড়িতে হয়তো এখনও বাতাস ঢোকে। ধুলো উড়ে। দূরে কোথাও ট্রামের ঘণ্টা বাজে। আর অন্ধকারের ভেতর কয়েকটি বিস্মৃত মানুষ ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করে। তারা জানে, শহর তাদের আর চায় না। তবু তারা যায় না। কারণ স্মৃতিরও এক ধরনের জেদ আছে।
অনীক দত্ত ছিলেন সেই জেদকে বহন করা চলচ্চিত্রকার।

কেবল ভালো মানের ফোন থাকলেই চমৎকার ছবি পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন কিছু কৌশল আর সৃজনশীলতা। কিছু নিয়ম মেনে চললে আপনার সাধারণ স্মার্টফোন দিয়েই এই ঈদে প্রফেশনাল মানের সব ছবি তোলা সম্ভব।
৫ ঘণ্টা আগেবাস থেকে নেমে, বিপত্তি বাধলো হোটেলের রিসিপশনে এসে। বিপত্তি না বলে ‘বিপদ’ বলা ভালো—‘মহা বিপদ’। রিসিপশনিস্ট ছেলেটা জানাল, তাদের হোটেলে আজকের তারিখে আমার নামে কোনো রিজার্ভেশন নেই।
৬ ঘণ্টা আগে
কোরবানির ঈদে বাড়িতে বানানো হয় মাংসের বিভিন্ন পদ। সকালে মাংস-রুটি, দুপুরে কালাভুনা বা মেজবানি গরুর মাংস আর রাতে পোলাও-কোরমা কিংবা বিরিয়ানি। ঈদের সময়টায় কখনও নিজের ঘরে, কখনও দাওয়াতে মাংস খাওয়ার ধুম চলতেই থাকে। তবে উৎসবের আনন্দে অনেকেই হিসাব ছাড়া মাংস খেয়ে ফেলেন। এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
৯ ঘণ্টা আগে
কলম আমার বয়সী মানুষের কাছে খুব পছন্দ আর শখের বস্তু। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মই চক বা পেন্সিল থেকে শুরু করে বলপেন হয়ে স্মার্টপেনের বিবর্তন দেখতে পেয়েছে। এর আগে ঘড়ি নিয়ে আমার একটা লেখা সম্পর্কে অনেকেই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কলম নিয়ে লেখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সে সূত্রে আজ বলা যাক কলমের গল্প।
৯ ঘণ্টা আগে