প্রকাশের ১৪০ বছর
মীর মশাররফের আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে যে ইউরোপীয় মডেল অনুসরণ করেছেন, সেখানে মশাররফের অবস্থান কোথায়? এই প্রশ্নটি ধরেই মূলত মীর মশাররফ হোসেনের খোঁজ করা দরকার। সেক্ষেত্রে তাঁর ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসটিকে গ্রহণ করা যাক।
মাসুদ পারভেজ

মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নাম। বর্তমান সময়ে তাঁর সাহিত্য কীর্তিসমূহকে ইউরোপীয় সাহিত্যতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ বা সমালোচনার ক্ষেত্রে সমালোচক ও তাত্ত্বিকগণ হয়তো-বা বলতে পারেন, আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য তাঁর লেখনীতে নেই। কিংবা মীর মশাররফ হোসেন আর চলে না! কিংবা তুলনার ক্ষেত্রে তাঁরা বলতে পারেন, মীর মশাররফের আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে যে ইউরোপীয় মডেল অনুসরণ করেছেন, সেখানে মশাররফের অবস্থান কোথায়? এই প্রশ্নটি ধরেই মূলত মীর মশাররফ হোসেনের খোঁজ করা দরকার। সেক্ষেত্রে তাঁর ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসটিকে গ্রহণ করা যাক।
বাংলার কৃষিভিত্তিক মুসলমান সমাজে বইপত্রের কদর কিংবা সংগ্রহের রেওয়াজ সেভাবে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু তারপরেও খোঁজ করলে, একেবারে পল্লী অঞ্চলের কৃষক পরিবারে দুই-চারটি ধর্মীয় কিতাব পাওয়া যে যায় না, তা কিন্তু নয়। খেয়াল করা যায়, গ্রামীণ পরিবারগুলোতে লালসালু ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেও সেইসব কিতাবকে আবৃত রাখে দিনের পর দিন।
সেইসব কিতাবের মধ্যে থাকে নিউজপ্রিন্টে ছাপানো ‘কোরআন শরীফ’, ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘পাঞ্জেগানা ওয়াজিফা’ আর ‘বিষাদ-সিন্ধু’। এই সব গ্রন্থের এক ধরনের ধর্মীয় পরিচয় আছে—যা ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ‘বিষাদ-সিন্ধু’ ধর্ম ও সাহিত্য উভয়ক্ষেত্রে প্রভাব তৈরি করেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাঙালি মুসলমান কৃষক চৈতন্য মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’কে সাহিত্যকীর্তি হিসেবে নয় বরং ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, কেন একটি সাহিত্যগ্রন্থ বাঙালি মুসলমান কৃষক সমাজে ধর্মগ্রন্থের আবেগ ও মর্যাদা পেল?
এই প্রশ্নের জবাবে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বিশ্লেষণ করা জরুরি। তবে তার আগে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচনার সাহিত্যিক ঐতিহাসিকতার খোঁজ করা যাক।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের নিদর্শন ‘চর্যাপদ’, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, ‘মঙ্গলকাব্য’ এসবে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় প্রভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু মুসলমানি বাংলা সাহিত্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে মধ্যযুগের হিন্দি ও অবধি সাহিত্যের ক্ষেত্রে ফিরুজ শাহ তোগলকের রাজত্বকালে মোল্লা দাউদের ‘লোরকা আওর চন্দা’, শাহ শর্কীর শাসনামলে কুতবনের ‘মৃগাবতী’, শেরশাহের আমলে মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবত’, সলিম শাহ শূরের রাজত্বকালে মনঝনের ‘মধুমালত’, উসমানের ‘চিত্রাবলী’, শেখ নবীর ‘জ্ঞানদীপ’, নূর মুহাম্মদের ‘ইন্দ্রাবত’ প্রভৃতি কাব্যে সুফিপ্রেমগাথামূলক বিষয়বস্তুসমৃদ্ধ উপাদান পাওয়া যায়। এই সব ভিন্নভাষী কাব্য অবলম্বনে বাংলা ভাষার কবিগণ কাব্য রচনা শুরু করেন।
মোল্লা দাউদের ‘লোরকা আওর চন্দা’ অবলম্বনে দৌলত কাজী রচনা করেন ‘সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী’, মনঝনের ‘মধুমালত’ অবলম্বনে মুহাম্মদ কবীর ‘মধুমালতী’, মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবত অবলম্বনে আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ রচনার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ থেকে বলা যায়, বাঙালি মুসলমান কবিগণ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে চর্যাপদ কিংবা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে অনুসরণ না করে হিন্দিভাষার সাহিত্যকে অবলম্বন করে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক আত্মপরিচয় নির্মাণের কসরত করেছেন।
বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের চলমান এই ধারায় লক্ষ করা যায়: দৌলত উজির বাহরাম খানের ‘লায়লী-মজনু’, আলাওল; দোনাগাজী ও মালে মুহম্মদ বিরচিত ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল’, শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জোলেখা’, আবদুল হাকিমের ‘ইউসুফ জোলেখা’; ‘হানিফার লড়াই’, ফকীর গরীরবুল্লাহর ‘ইউসুফ জোলেখা’; ‘জঙ্গনামা’ প্রভৃতি কাব্য। এ সকল কাব্যের বিষয়বস্তু হিন্দি, আরবি, ফারসি সাহিত্য থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে শেখ ফয়জুল্লাহ, মুহাম্মদ খান, মুজাম্মিল, শেখ চান্দ, হেয়াত মামুদ প্রমুখ কবিগণ বাঙালি মুসলমানের কাব্যচর্চার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। এদের সাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসেবে সুফি, মর্সিয়া, নীতিকথা, জঙ্গনামা প্রভৃতি স্থান পায়। তখন প্রশ্ন জাগে, বাঙালি মুসলমানের কাব্যচর্চার যে ধারাটি গড়ে ওঠে গদ্য বা কথাসাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে, এর রূপটি কেমন? আর তখনই খোঁজ পাওয়া যায় একটি নাম—মীর মশাররফ হোসেন।
বাল্যকাল থেকে আরবি ও ফারসি ভাষাচর্চা আর পুথিসাহিত্য পাঠ-অভ্যাস মশাররফের সাহিত্য মনন সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলে। তাঁর প্রথম গদ্যগ্রন্থ ‘রত্নবতী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। তবে ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত ‘জমিদার দর্পন’ নাটকের মধ্য দিয়ে তাঁর খ্যাতি তৈরি হয়। এই নাটক সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বলেন, ‘জনৈক কৃতবিদ্য মুসলমান কর্তৃক এই নাটকখানি বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষায় প্রণীত হইয়াছে। মুসলমানি বাঙ্গালার চিহ্নমাত্র ইহাতে নাই। বরং অনেক হিন্দুর প্রণীত বাঙ্গালার অপেক্ষা এই মুসলমান লেখকের বাঙ্গালা পরিশুদ্ধ।... আমাদিগের বলা কর্তব্য যে নাটকখানি অনেকাংশে ভাল হইয়াছে।’
এখানে বঙ্কিমের উদ্ধৃতি থেকে একটি বিষয় নজরে পড়ে, তা হলো ‘মুসলমানি বাঙ্গালা’। বঙ্কিম উদ্ধৃত এই মুসলমানি বাঙ্গালা ভাষাটা আসলে কোনটা? সেক্ষেত্রে বলা যায়, মধ্যযুগের কাব্যসাহিত্যে বাঙালি মুসলমান লেখকেরা যে ভাষায় কাব্যচর্চা করেছেন। তবে পরবর্তী পর্যায়ের গদ্যচর্চায় অর্থাৎ ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে পুঁথি সাহিত্যের ভাষা ও ফারসি শব্দের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। মশাররফ সম্পর্কে বঙ্কিমের এই ভাষাগত বিচার ‘কালচারাল আইডেনটিটিধর্মী’। সেক্ষেত্রে মুসলমানি বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক সাহিত্যিকগোষ্ঠী এবং বৃহৎ পরিসরে যা কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী পরিচয় সৃষ্টি করে। অবশ্য নিজেদের এই সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী পরিচয় বাঙালি মুসলমান কবিগণ মধ্যযুগের কাব্যেই শুরু করেন। এই যে বাঙালি মুসলমান সাহিত্যচর্চার ভেতর দিয়ে একটি মুসলমানি বাংলা সাহিত্যের পরিক্রমা তৈরি করলেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’র অবস্থান সেখানে কেমন? এবার সে বিষয়ের খোঁজ করা যাক।
মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে তিনটি পর্বে প্রকাশিত হয়। অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সময়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তখন ‘সর্বভারতীয় কংগ্রেস পার্টি’ গঠিত হয়—যা ঔপনিবেশিক ভারতে জাতীয় চেতনার বিকাশের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। সমকালীন সাহিত্যে লক্ষ করা যায়, উনিশ শতকে রমেশচন্দ্র দত্তের বঙ্গবিজেতা (১৮৭৪), ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৮৭৫), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ (১৮৮২); দেবী চৌধুরানী (১৮৮৪); সীতারাম (১৮৮৭) ও রাজসিংহ (১৮৯৩) আখ্যানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছে। ফলে মীর মশাররফ হোসেন এই সময়ে খুব সহজে উনিশ শতকীয় বাংলা উপন্যাসে হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার বৈশিষ্ট্য নির্মাণের জন্য কারবালার মতো বিয়োগাত্মক ঘটনাকে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করেন।
‘বিষাদ-সিন্ধু’ হলো ‘উনিশ শতকের ভারতবর্ষে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ মুসলমান জাতিকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস’। তখন প্রশ্ন জাগে, ইংরেজ উপনিবেশে ভারতীয় মুসলমানের অবস্থা কেমন ছিল? ভারতের উপনিবেশিত মুসলমানেরা রাজক্ষমতা হারিয়ে, ইংরেজি-শিক্ষা থেকে নিজেদের বিচ্যুত রেখে দিগভ্রান্ত অবস্থায় পড়েছিল। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কৃষিজীবী বাঙালি মুসলমানের ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে—একদিকে ইংরেজ শাসন আরেকদিকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে নব্য-হিন্দু জমিদারদের শোষণ। ‘জমিদার দর্পন’ নাটকে মশাররফ তা দেখিয়েছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে আরবীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের ইতিহাস, কাহিনি ও মিথ প্রভৃতি ঘটনাবলি অবলম্বন করে বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাস রচনা করেন। তিনি মূলত ‘কিংবদন্তি ও ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর গৌরবময় অতীতকে তাদের অন্ধকারময় বাস্তবতার সামনে উত্তরণের সিঁড়ি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।’
এক্ষেত্রে মুসলমানের সামনে আদর্শ হিসেবে হাজির করা হয়েছে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনকে। তাঁরা নিজের জীবনের বিনিময়ে ইসলামের আদর্শকে সমুন্নত রাখে এবং মদিনার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শহিদ হয়। তখন প্রশ্ন জগে, বাঙালি মুসলমানের জন্য যে স্বাধীনতার প্রয়োজন ছিল, তা আখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য কোনো বাঙালি মুসলমান চরিত্র জাতীয় বীর হিসেবে উপস্থিত হবে এরকম চরিত্র কি বঙ্গভূমিতে ছিল না? সেক্ষেত্রে দুটি বিষয় উল্লেখ করা যায়:
ক. মীর মশাররফের পূর্বসূরী বাঙালি মুসলমান কবিগণের আরবি, ফারসি সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক—যা দ্বারা তাঁরা বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য ও সাহিত্যিক আইডেনটিটি তৈরি করতে চেয়েছেন এবং
খ. মীর মশাররফের পূর্ববর্তী বাঙালি হিন্দু ঔপন্যাসিকগণ হিন্দু জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরার জন্য আখ্যানে বাঙালি বীর চরিত্রের বাইরে দক্ষিণ ভারতীয় চরিত্র শিবাজী, রামচন্দ্র, বালাজী প্রমুখকে নায়ক বানিয়েছেন। আর তিনি এর কাউন্টার হিসেবে আরবীয় মুসলমানকে বেছে নিয়েছেন।
ঔপন্যাসিক নিজেও উপনিবেশিত-পরাধীন হওয়ায় তাঁর মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু তিনি কোনো বাঙালি মুসলমানকে জাতীয় বীর হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেননি বা করেননি। এক্ষেত্রে তিনি বাঙালি মুসলমান পাঠকের ধর্মীয় আবেগ বা সেন্টিমেন্টকে ধারণ করতে চেয়েছেন। আর সেটা ঘটেছেও বটে! যার ফলে কৃষক চৈতন্যে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ সাহিত্যকর্মের চেয়ে ধর্মীয় গ্রন্থের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই যে, ইসলাম-ধর্মীয় ঘটনাকে উপজীব্য করে উপন্যাস নির্মিত হলো এতে তো শুধু কারবালার বিয়োগান্তক কাহিনি দিয়েই বাঙালি মুসলমানের আবেগকে ধারণ করা যেত। তবে স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তিনি কেন আনলেন? ঔপন্যাসিকের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আখ্যানের মন্ত্রী হামান চরিত্রটির মধ্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়। স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী হামান বলে:
রাজার অভাব হইলে রাজা পাওয়া যায়, রাজ-বিপ্লব ঘটিলে তাহারও শান্তি হয়, রাজ্যমধ্যে ঘোর বিদ্রোহনল প্রজ্জ্বলিত হইলেও যথাসময়ে অবশ্যই নির্ব্বাণ হয়, উপযুক্ত দাবী বুঝাইয়া দিলে সে দুর্দমনীয় তেজও একেবারে বিলীন হইয়া উড়িয়া যায়। মহামারী, জলপ্লাবন ইত্যাদি দৈবদুর্ব্বিপাকে রাজ্য ধ্বংসের উপক্রম বোধ হইলেও নিরাশাসাগরে ভাসিতে হয় না—আশা থাকে। রাজার মজ্জাদোষে, কি মন্ত্রণার অভাবে রাজ্যশাসনে অকৃতকার্য্য হইলেও আশা থাকে। মূর্খ রাজার প্রিয়পাত্র হইবার আশায় মন্ত্রণাদাতাগণ অবিচার, অত্যাচার নিবারণে উপদেশ না দিয়া অহরহ তোষামোদের ডালি মাথায় করিয়া প্রতি আজ্ঞা অনুমোদন করাতেই যদি রাজা প্রজায় মনান্তর ঘটে, তাহাতেও আশা থাকে। সে ক্ষেত্রেও আশা থাকে। কিন্তু স্বাধীনতা-ধনে একবার বঞ্চিত হইলে সহজে সে মহামণির মুখ আর দেখা যায় না। বহু আয়াসেও আর সে মহামূল্য রত্ন হস্তগত হয় না। স্বাধীনতা-সূর্য্য একবার অস্তমিত হইলে পুনরুদয় হওয়া বড়ই ভাগ্যের কথা।
এই যে, ‘স্বাধীনতা-সূর্য্য একবার অস্তমিত হইলে পুনরুদয় হওয়া বড়ই ভাগ্যের কথা।’ এখানেই মীর মশাররফ উপনিবেশিত-পরাধীন জনগোষ্ঠীকে সজাগ করলেন। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা ভূখণ্ড যখন অন্যভূখণ্ডের শাসকের দ্বারা অধীকৃত বা দখল হয় আর সেই দখলীকৃত ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী দখলকারী দ্বারা শাসিত হয় এবং তাদের নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার হারায়, তখন তারা পরাধীন হিসেবে পরিচিতি পায়। ঔপন্যাসিক জাতিগতভাবে পরাধীন হওয়ায় স্বাধীনতার বিষয়টি প্রসঙ্গ হিসেবে এনেছেন এবং আখ্যানে ধর্মীয় ঘটনার অভ্যন্তরে স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি বারবার উত্থাপন করেছেন:
ক. ‘…জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করিতে বিধর্মীর অস্ত্রে যদি আত্মবিসর্জন হয়, তাহাতেও অক্ষয় স্বর্গলাভ। হয় জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করিয়া মোহাম্মদীয় ধর্ম্মের উৎকর্ষ সাধন করিব, না হয় অকাতরে রক্তস্রোতে আমাদের এই অস্থায়ী দেহ খণ্ডে খণ্ডে ভাসাইয়া দিব।’
খ. ‘এলাহি! আজ আপনার নামের উপর নির্ভর করিয়া হাসানকে শত্রু-সম্মুখে দিলাম। হাসানের প্রাণ, পবিত্র ভূমি মদিনার স্বাধীনতা এবং ধর্ম রক্ষা করিতে ভ্রাতা, পুত্র ও স্বামীহারা হইলে আমরা কাতরা হইব না।’
গ. ‘স্বাধীনতা কি মধুমাখা কথা! স্বাধীন জীবন কি আনন্দময়! স্বাধীন দেশ কি আরামের স্থান! স্বাধীন ভাবের কথাগুলি কর্ণকুহরে প্রবেশ করিলে হৃদয়ের সৃাশিরা পর্যন্ত আনন্দোচ্ছ্বাসে স্ফীত হইয়া উঠে এবং অন্তরে বিবিধ ভাবের উদয় হয়। হয় মহাহর্ষে মন নাচিতে থাকে, না হয় মহাদুঃখে অন্তর ফাটিয়া যায়। স্বাধীন মন, স্বাধীন জীবন, পরাধীনতা স্বীকার করিতে যেরূপ কষ্টবোধ করে, আবার অন্যকে অধীনতা স্বীকার করাইতে পারিলে ঐ অন্তরেই অসীম আনন্দ অনুভব হয়।’
ঘ. ‘... পবিত্র ভূমি মদিনার স্বাধীনতা-সূর্য্য হরণ করিয়া চিরপরাধীনতার অন্ধকার-অমানিশায় অবারিত করিতে [এজিদ বাহিনী] সসৈন্যে মদিনায় আসিয়াছিল।’
এই যে, ঔপন্যাসিক ধর্ম রক্ষার পাশাপাশি ‘জন্মভূমির স্বাধীনতা’, ‘মদিনার স্বাধীনতা’, ‘পবিত্র ভূমি মদিনার স্বাধীনতা-সূর্য্য’ রক্ষা করার কথা পাঠকের সামনে তুলে ধরলেন তাতে ধর্মের সঙ্গে জন্মভূমির গুরুত্ব সমানভাবে উপস্থাপিত হলো। বলা যায়, জাতীয় চেতনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—স্বদেশপ্রেম। আর ব্যক্তিমনে স্বদেশ, মাতৃভূমি বা জন্মভূমির সংকটে শহিদ হওয়ার নিঃস্বার্থ আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতি থেকে জাতীয় চেতনার উন্মীলন ঘটে। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসে এই চিত্র লক্ষ করা যায়। দামেস্কর শাসনকর্তা এজিদ মদিনা দখল করে শাসন জারির জন্য সৈন্য পাঠালে তার বাহিনির হাত থেকে মদিনাকে রক্ষার জন্য মদিনাবাসীর সম্মিলিতভাবে আত্মত্যাগের যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে তাদের জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আর এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয় হয়ে ওঠে:
ক. ধর্মরক্ষা ও
খ. জন্মভূমি/ স্বদেশ রক্ষা।
এই দুটোই জাতীয়তাবাদী উপাদান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, জন্মভূমি বা স্বদেশ বহিঃশত্রু দ্বারা দখল হলে দখলদার শাসকের ধর্ম প্রাধান্য পায় ও তার আইন দ্বারা শাসিত হয়। এ দৃশ্য ভারতবর্ষেও লক্ষ করা যায়। সেক্ষেত্রে বলা যায়, ভারতীয় মুসলমানদের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মদিনাবাসীর বীরত্ব ও স্বদেশ চেতনাকে ঔপন্যাসিক তুলে ধরেছেন। আর দখলদারি বহিঃশত্রু এজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে মদিনাবাসীর যুদ্ধ যেন ভারতীয়দের ইংরেজের বিরুদ্ধে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার আহ্বান। ঔপন্যাসিক স্বদেশচেতনার পাশাপাশি জাতীয় ধর্মের বিষয়টিকেও উপন্যাসে তুলে ধরেছেন এভাবে:
ভাতৃগণ! যদি জাতীয় ধর্ম্ম-রক্ষার বাসনা থাকে, জগতে মোহাম্মদীয় ধর্ম্মের স্থায়িত্ব রাখিতে ইচ্ছা থাকে, কাফেরের রক্তে ইসলাম অস্ত্র রঞ্জিত করিতে ইচ্ছা থাকে, আর প্রভু মোহাম্মদের প্রতি যদি অটল ভক্তি থাকে, তবে এই পত্র প্রাপ্তি মাত্র আপন আপন সৈন্যসহ মদিনা প্রান্তরে আসিয়া উপস্থিত হউন।
উদ্ধৃতির ‘জাতীয় ধর্ম’ হলো ইসলাম। যেহেতু ঔপন্যাসিক ইসলাম ধর্মীয় ঘটনাকে আখ্যানের পটভূমি হিসেবে নিয়েছেন এবং তার নিজস্ব ধর্মীয় আইডেনটিটির সঙ্গে তা মিলে তাই ‘বিষাদ-সিন্ধু’ খুব সহজে বাঙালি কৃষক মুসলমান সমাজে সমাদৃত হয় এবং তাদের চৈতন্যে ইসলাম জাতীয় ধর্ম হিসেবে পরিচিতি পায়। যদিও তা ছিল আরবের প্রেক্ষাপট। আখ্যানে ইসলামকে জাতীয় ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নগর, রাজ্য বা দেশের মোহাম্মদীয় উম্মতদের মধ্যে সংহতি স্থাপনের যে চিত্র— তা ইসলামি জাতীয়তাবাদ নির্দেশক।
এক্ষেত্রে বলা যায়, জাতীয় ধর্ম প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে হিন্দু জাতীয়তাবাদের যে ‘রেপ্রিজেন্টেশেন’ তার ‘কাউন্টার’ হিসেবে মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসে মুসলিম জাতীয়তাবাদী প্রবণতাকে হাজির করলেন। সমালোচকের মতে, ‘আসলে ঊনবিংশ শতাব্দীর স্বল্পশিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের মানস-জগতের মৌলিক-বিন্দুকে’ এ আখ্যান এমনভাবে ধারণ করেছিল যে—‘‘বাঙালি হিন্দু সমাজে যেমন ‘রামায়ণ’ ঠিক তেমনি বাঙালি মুসলমান সমাজে ছিল ‘বিষাদ-সিন্ধু’।” বলা যায়, বাঙালি মুসলমান বিষাদ-সিন্ধুর কারবালার হৃদয় বিদীর্ণ ঘটনা, ইসলামি মিথ, কাহিনি ও বীররস ইত্যাদি অনুষঙ্গ দ্বারা নিজের ভেতর একধরনের ‘কল্পিত-বন্ধন’ তৈরি করেছে। এ বিষয়ে বেনেডিক্ট এন্ডারসন জাতিকে ‘ইমাজিনড পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ হিসেবে ধরে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
এন্ডারসনের ভাষ্য-অনুযায়ী বলা যায়, কারবালার হৃদয় বিদারক করুণ ঘটনা মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাতৃত্বের কল্পিত-বন্ধনের অনুভূতি ও বোধ জাগ্রত করে। এ বিষয়টি ভারতবর্ষের মুসলমানের মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন খেলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লক্ষ করা যায়, যা ছিল সাধারণ মুসলমানের অনুভূতিপ্রসূত। এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমর বলেন:
১৯১৪ সালে ব্রিটেন ও জার্মানীর মধ্যেকার যুদ্ধে তুর্কী জার্মানীর পক্ষ অবলম্বন করায় [ভারতীয়] মুসলমানদের চেতনার মধ্যে এক নিদারুণ টানা-পোড়েন ইতিপূর্বেই শুরু হয়েছিলো। একদিকে নিজেদের স্বার্থের জন্য ব্রিটেনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের খলিফা হিসেবে তুর্কীর সুলতানের প্রতি আনুগত্য— এই দুই-এর দ্বন্দ্ব মুসলিম রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তনের সূচনা করে এবং শেষপর্যন্ত মুসলমানদের ব্যাপকতম অংশ সুলতানের নেতৃত্বাধীন খেলাফতকে রক্ষার জন্য ব্রিটিশ-বিরোধিতার পথ গ্রহণ করে।
মুসলমানের পক্ষ অবলম্বনের এই বিষয়টিতে ধর্মীয় চেতনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেন এই অনুভূতিকে আশ্রয় করে ইমাম হোসেন ও এজিদ সম্পর্কে সাধারণ বাঙালি মুসলমানের মনে প্রচলিত ধারণাকে আখ্যানের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর ফলে সৃষ্ট ধর্মীয় আবেগ মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সঞ্চালিত হয়েছে—যা ইসলামী জাতীয় চেতনার রূপ ধারণ করেছে। যদিও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী চেতনা যেকোনো জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে খণ্ডিত করে।

মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নাম। বর্তমান সময়ে তাঁর সাহিত্য কীর্তিসমূহকে ইউরোপীয় সাহিত্যতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ বা সমালোচনার ক্ষেত্রে সমালোচক ও তাত্ত্বিকগণ হয়তো-বা বলতে পারেন, আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য তাঁর লেখনীতে নেই। কিংবা মীর মশাররফ হোসেন আর চলে না! কিংবা তুলনার ক্ষেত্রে তাঁরা বলতে পারেন, মীর মশাররফের আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে যে ইউরোপীয় মডেল অনুসরণ করেছেন, সেখানে মশাররফের অবস্থান কোথায়? এই প্রশ্নটি ধরেই মূলত মীর মশাররফ হোসেনের খোঁজ করা দরকার। সেক্ষেত্রে তাঁর ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসটিকে গ্রহণ করা যাক।
বাংলার কৃষিভিত্তিক মুসলমান সমাজে বইপত্রের কদর কিংবা সংগ্রহের রেওয়াজ সেভাবে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু তারপরেও খোঁজ করলে, একেবারে পল্লী অঞ্চলের কৃষক পরিবারে দুই-চারটি ধর্মীয় কিতাব পাওয়া যে যায় না, তা কিন্তু নয়। খেয়াল করা যায়, গ্রামীণ পরিবারগুলোতে লালসালু ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেও সেইসব কিতাবকে আবৃত রাখে দিনের পর দিন।
সেইসব কিতাবের মধ্যে থাকে নিউজপ্রিন্টে ছাপানো ‘কোরআন শরীফ’, ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘পাঞ্জেগানা ওয়াজিফা’ আর ‘বিষাদ-সিন্ধু’। এই সব গ্রন্থের এক ধরনের ধর্মীয় পরিচয় আছে—যা ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ‘বিষাদ-সিন্ধু’ ধর্ম ও সাহিত্য উভয়ক্ষেত্রে প্রভাব তৈরি করেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাঙালি মুসলমান কৃষক চৈতন্য মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’কে সাহিত্যকীর্তি হিসেবে নয় বরং ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, কেন একটি সাহিত্যগ্রন্থ বাঙালি মুসলমান কৃষক সমাজে ধর্মগ্রন্থের আবেগ ও মর্যাদা পেল?
এই প্রশ্নের জবাবে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বিশ্লেষণ করা জরুরি। তবে তার আগে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচনার সাহিত্যিক ঐতিহাসিকতার খোঁজ করা যাক।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের নিদর্শন ‘চর্যাপদ’, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, ‘মঙ্গলকাব্য’ এসবে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় প্রভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু মুসলমানি বাংলা সাহিত্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে মধ্যযুগের হিন্দি ও অবধি সাহিত্যের ক্ষেত্রে ফিরুজ শাহ তোগলকের রাজত্বকালে মোল্লা দাউদের ‘লোরকা আওর চন্দা’, শাহ শর্কীর শাসনামলে কুতবনের ‘মৃগাবতী’, শেরশাহের আমলে মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবত’, সলিম শাহ শূরের রাজত্বকালে মনঝনের ‘মধুমালত’, উসমানের ‘চিত্রাবলী’, শেখ নবীর ‘জ্ঞানদীপ’, নূর মুহাম্মদের ‘ইন্দ্রাবত’ প্রভৃতি কাব্যে সুফিপ্রেমগাথামূলক বিষয়বস্তুসমৃদ্ধ উপাদান পাওয়া যায়। এই সব ভিন্নভাষী কাব্য অবলম্বনে বাংলা ভাষার কবিগণ কাব্য রচনা শুরু করেন।
মোল্লা দাউদের ‘লোরকা আওর চন্দা’ অবলম্বনে দৌলত কাজী রচনা করেন ‘সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী’, মনঝনের ‘মধুমালত’ অবলম্বনে মুহাম্মদ কবীর ‘মধুমালতী’, মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবত অবলম্বনে আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ রচনার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ থেকে বলা যায়, বাঙালি মুসলমান কবিগণ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে চর্যাপদ কিংবা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে অনুসরণ না করে হিন্দিভাষার সাহিত্যকে অবলম্বন করে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক আত্মপরিচয় নির্মাণের কসরত করেছেন।
বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের চলমান এই ধারায় লক্ষ করা যায়: দৌলত উজির বাহরাম খানের ‘লায়লী-মজনু’, আলাওল; দোনাগাজী ও মালে মুহম্মদ বিরচিত ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল’, শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জোলেখা’, আবদুল হাকিমের ‘ইউসুফ জোলেখা’; ‘হানিফার লড়াই’, ফকীর গরীরবুল্লাহর ‘ইউসুফ জোলেখা’; ‘জঙ্গনামা’ প্রভৃতি কাব্য। এ সকল কাব্যের বিষয়বস্তু হিন্দি, আরবি, ফারসি সাহিত্য থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে শেখ ফয়জুল্লাহ, মুহাম্মদ খান, মুজাম্মিল, শেখ চান্দ, হেয়াত মামুদ প্রমুখ কবিগণ বাঙালি মুসলমানের কাব্যচর্চার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। এদের সাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসেবে সুফি, মর্সিয়া, নীতিকথা, জঙ্গনামা প্রভৃতি স্থান পায়। তখন প্রশ্ন জাগে, বাঙালি মুসলমানের কাব্যচর্চার যে ধারাটি গড়ে ওঠে গদ্য বা কথাসাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে, এর রূপটি কেমন? আর তখনই খোঁজ পাওয়া যায় একটি নাম—মীর মশাররফ হোসেন।
বাল্যকাল থেকে আরবি ও ফারসি ভাষাচর্চা আর পুথিসাহিত্য পাঠ-অভ্যাস মশাররফের সাহিত্য মনন সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলে। তাঁর প্রথম গদ্যগ্রন্থ ‘রত্নবতী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। তবে ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত ‘জমিদার দর্পন’ নাটকের মধ্য দিয়ে তাঁর খ্যাতি তৈরি হয়। এই নাটক সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বলেন, ‘জনৈক কৃতবিদ্য মুসলমান কর্তৃক এই নাটকখানি বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষায় প্রণীত হইয়াছে। মুসলমানি বাঙ্গালার চিহ্নমাত্র ইহাতে নাই। বরং অনেক হিন্দুর প্রণীত বাঙ্গালার অপেক্ষা এই মুসলমান লেখকের বাঙ্গালা পরিশুদ্ধ।... আমাদিগের বলা কর্তব্য যে নাটকখানি অনেকাংশে ভাল হইয়াছে।’
এখানে বঙ্কিমের উদ্ধৃতি থেকে একটি বিষয় নজরে পড়ে, তা হলো ‘মুসলমানি বাঙ্গালা’। বঙ্কিম উদ্ধৃত এই মুসলমানি বাঙ্গালা ভাষাটা আসলে কোনটা? সেক্ষেত্রে বলা যায়, মধ্যযুগের কাব্যসাহিত্যে বাঙালি মুসলমান লেখকেরা যে ভাষায় কাব্যচর্চা করেছেন। তবে পরবর্তী পর্যায়ের গদ্যচর্চায় অর্থাৎ ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে পুঁথি সাহিত্যের ভাষা ও ফারসি শব্দের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। মশাররফ সম্পর্কে বঙ্কিমের এই ভাষাগত বিচার ‘কালচারাল আইডেনটিটিধর্মী’। সেক্ষেত্রে মুসলমানি বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক সাহিত্যিকগোষ্ঠী এবং বৃহৎ পরিসরে যা কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী পরিচয় সৃষ্টি করে। অবশ্য নিজেদের এই সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী পরিচয় বাঙালি মুসলমান কবিগণ মধ্যযুগের কাব্যেই শুরু করেন। এই যে বাঙালি মুসলমান সাহিত্যচর্চার ভেতর দিয়ে একটি মুসলমানি বাংলা সাহিত্যের পরিক্রমা তৈরি করলেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’র অবস্থান সেখানে কেমন? এবার সে বিষয়ের খোঁজ করা যাক।
মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে তিনটি পর্বে প্রকাশিত হয়। অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সময়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তখন ‘সর্বভারতীয় কংগ্রেস পার্টি’ গঠিত হয়—যা ঔপনিবেশিক ভারতে জাতীয় চেতনার বিকাশের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। সমকালীন সাহিত্যে লক্ষ করা যায়, উনিশ শতকে রমেশচন্দ্র দত্তের বঙ্গবিজেতা (১৮৭৪), ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৮৭৫), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ (১৮৮২); দেবী চৌধুরানী (১৮৮৪); সীতারাম (১৮৮৭) ও রাজসিংহ (১৮৯৩) আখ্যানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছে। ফলে মীর মশাররফ হোসেন এই সময়ে খুব সহজে উনিশ শতকীয় বাংলা উপন্যাসে হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার বৈশিষ্ট্য নির্মাণের জন্য কারবালার মতো বিয়োগাত্মক ঘটনাকে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করেন।
‘বিষাদ-সিন্ধু’ হলো ‘উনিশ শতকের ভারতবর্ষে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ মুসলমান জাতিকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস’। তখন প্রশ্ন জাগে, ইংরেজ উপনিবেশে ভারতীয় মুসলমানের অবস্থা কেমন ছিল? ভারতের উপনিবেশিত মুসলমানেরা রাজক্ষমতা হারিয়ে, ইংরেজি-শিক্ষা থেকে নিজেদের বিচ্যুত রেখে দিগভ্রান্ত অবস্থায় পড়েছিল। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কৃষিজীবী বাঙালি মুসলমানের ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে—একদিকে ইংরেজ শাসন আরেকদিকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে নব্য-হিন্দু জমিদারদের শোষণ। ‘জমিদার দর্পন’ নাটকে মশাররফ তা দেখিয়েছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে আরবীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের ইতিহাস, কাহিনি ও মিথ প্রভৃতি ঘটনাবলি অবলম্বন করে বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাস রচনা করেন। তিনি মূলত ‘কিংবদন্তি ও ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর গৌরবময় অতীতকে তাদের অন্ধকারময় বাস্তবতার সামনে উত্তরণের সিঁড়ি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।’
এক্ষেত্রে মুসলমানের সামনে আদর্শ হিসেবে হাজির করা হয়েছে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনকে। তাঁরা নিজের জীবনের বিনিময়ে ইসলামের আদর্শকে সমুন্নত রাখে এবং মদিনার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শহিদ হয়। তখন প্রশ্ন জগে, বাঙালি মুসলমানের জন্য যে স্বাধীনতার প্রয়োজন ছিল, তা আখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য কোনো বাঙালি মুসলমান চরিত্র জাতীয় বীর হিসেবে উপস্থিত হবে এরকম চরিত্র কি বঙ্গভূমিতে ছিল না? সেক্ষেত্রে দুটি বিষয় উল্লেখ করা যায়:
ক. মীর মশাররফের পূর্বসূরী বাঙালি মুসলমান কবিগণের আরবি, ফারসি সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক—যা দ্বারা তাঁরা বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য ও সাহিত্যিক আইডেনটিটি তৈরি করতে চেয়েছেন এবং
খ. মীর মশাররফের পূর্ববর্তী বাঙালি হিন্দু ঔপন্যাসিকগণ হিন্দু জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরার জন্য আখ্যানে বাঙালি বীর চরিত্রের বাইরে দক্ষিণ ভারতীয় চরিত্র শিবাজী, রামচন্দ্র, বালাজী প্রমুখকে নায়ক বানিয়েছেন। আর তিনি এর কাউন্টার হিসেবে আরবীয় মুসলমানকে বেছে নিয়েছেন।
ঔপন্যাসিক নিজেও উপনিবেশিত-পরাধীন হওয়ায় তাঁর মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু তিনি কোনো বাঙালি মুসলমানকে জাতীয় বীর হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেননি বা করেননি। এক্ষেত্রে তিনি বাঙালি মুসলমান পাঠকের ধর্মীয় আবেগ বা সেন্টিমেন্টকে ধারণ করতে চেয়েছেন। আর সেটা ঘটেছেও বটে! যার ফলে কৃষক চৈতন্যে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ সাহিত্যকর্মের চেয়ে ধর্মীয় গ্রন্থের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই যে, ইসলাম-ধর্মীয় ঘটনাকে উপজীব্য করে উপন্যাস নির্মিত হলো এতে তো শুধু কারবালার বিয়োগান্তক কাহিনি দিয়েই বাঙালি মুসলমানের আবেগকে ধারণ করা যেত। তবে স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তিনি কেন আনলেন? ঔপন্যাসিকের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আখ্যানের মন্ত্রী হামান চরিত্রটির মধ্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়। স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী হামান বলে:
রাজার অভাব হইলে রাজা পাওয়া যায়, রাজ-বিপ্লব ঘটিলে তাহারও শান্তি হয়, রাজ্যমধ্যে ঘোর বিদ্রোহনল প্রজ্জ্বলিত হইলেও যথাসময়ে অবশ্যই নির্ব্বাণ হয়, উপযুক্ত দাবী বুঝাইয়া দিলে সে দুর্দমনীয় তেজও একেবারে বিলীন হইয়া উড়িয়া যায়। মহামারী, জলপ্লাবন ইত্যাদি দৈবদুর্ব্বিপাকে রাজ্য ধ্বংসের উপক্রম বোধ হইলেও নিরাশাসাগরে ভাসিতে হয় না—আশা থাকে। রাজার মজ্জাদোষে, কি মন্ত্রণার অভাবে রাজ্যশাসনে অকৃতকার্য্য হইলেও আশা থাকে। মূর্খ রাজার প্রিয়পাত্র হইবার আশায় মন্ত্রণাদাতাগণ অবিচার, অত্যাচার নিবারণে উপদেশ না দিয়া অহরহ তোষামোদের ডালি মাথায় করিয়া প্রতি আজ্ঞা অনুমোদন করাতেই যদি রাজা প্রজায় মনান্তর ঘটে, তাহাতেও আশা থাকে। সে ক্ষেত্রেও আশা থাকে। কিন্তু স্বাধীনতা-ধনে একবার বঞ্চিত হইলে সহজে সে মহামণির মুখ আর দেখা যায় না। বহু আয়াসেও আর সে মহামূল্য রত্ন হস্তগত হয় না। স্বাধীনতা-সূর্য্য একবার অস্তমিত হইলে পুনরুদয় হওয়া বড়ই ভাগ্যের কথা।
এই যে, ‘স্বাধীনতা-সূর্য্য একবার অস্তমিত হইলে পুনরুদয় হওয়া বড়ই ভাগ্যের কথা।’ এখানেই মীর মশাররফ উপনিবেশিত-পরাধীন জনগোষ্ঠীকে সজাগ করলেন। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা ভূখণ্ড যখন অন্যভূখণ্ডের শাসকের দ্বারা অধীকৃত বা দখল হয় আর সেই দখলীকৃত ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী দখলকারী দ্বারা শাসিত হয় এবং তাদের নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার হারায়, তখন তারা পরাধীন হিসেবে পরিচিতি পায়। ঔপন্যাসিক জাতিগতভাবে পরাধীন হওয়ায় স্বাধীনতার বিষয়টি প্রসঙ্গ হিসেবে এনেছেন এবং আখ্যানে ধর্মীয় ঘটনার অভ্যন্তরে স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি বারবার উত্থাপন করেছেন:
ক. ‘…জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করিতে বিধর্মীর অস্ত্রে যদি আত্মবিসর্জন হয়, তাহাতেও অক্ষয় স্বর্গলাভ। হয় জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করিয়া মোহাম্মদীয় ধর্ম্মের উৎকর্ষ সাধন করিব, না হয় অকাতরে রক্তস্রোতে আমাদের এই অস্থায়ী দেহ খণ্ডে খণ্ডে ভাসাইয়া দিব।’
খ. ‘এলাহি! আজ আপনার নামের উপর নির্ভর করিয়া হাসানকে শত্রু-সম্মুখে দিলাম। হাসানের প্রাণ, পবিত্র ভূমি মদিনার স্বাধীনতা এবং ধর্ম রক্ষা করিতে ভ্রাতা, পুত্র ও স্বামীহারা হইলে আমরা কাতরা হইব না।’
গ. ‘স্বাধীনতা কি মধুমাখা কথা! স্বাধীন জীবন কি আনন্দময়! স্বাধীন দেশ কি আরামের স্থান! স্বাধীন ভাবের কথাগুলি কর্ণকুহরে প্রবেশ করিলে হৃদয়ের সৃাশিরা পর্যন্ত আনন্দোচ্ছ্বাসে স্ফীত হইয়া উঠে এবং অন্তরে বিবিধ ভাবের উদয় হয়। হয় মহাহর্ষে মন নাচিতে থাকে, না হয় মহাদুঃখে অন্তর ফাটিয়া যায়। স্বাধীন মন, স্বাধীন জীবন, পরাধীনতা স্বীকার করিতে যেরূপ কষ্টবোধ করে, আবার অন্যকে অধীনতা স্বীকার করাইতে পারিলে ঐ অন্তরেই অসীম আনন্দ অনুভব হয়।’
ঘ. ‘... পবিত্র ভূমি মদিনার স্বাধীনতা-সূর্য্য হরণ করিয়া চিরপরাধীনতার অন্ধকার-অমানিশায় অবারিত করিতে [এজিদ বাহিনী] সসৈন্যে মদিনায় আসিয়াছিল।’
এই যে, ঔপন্যাসিক ধর্ম রক্ষার পাশাপাশি ‘জন্মভূমির স্বাধীনতা’, ‘মদিনার স্বাধীনতা’, ‘পবিত্র ভূমি মদিনার স্বাধীনতা-সূর্য্য’ রক্ষা করার কথা পাঠকের সামনে তুলে ধরলেন তাতে ধর্মের সঙ্গে জন্মভূমির গুরুত্ব সমানভাবে উপস্থাপিত হলো। বলা যায়, জাতীয় চেতনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—স্বদেশপ্রেম। আর ব্যক্তিমনে স্বদেশ, মাতৃভূমি বা জন্মভূমির সংকটে শহিদ হওয়ার নিঃস্বার্থ আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতি থেকে জাতীয় চেতনার উন্মীলন ঘটে। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসে এই চিত্র লক্ষ করা যায়। দামেস্কর শাসনকর্তা এজিদ মদিনা দখল করে শাসন জারির জন্য সৈন্য পাঠালে তার বাহিনির হাত থেকে মদিনাকে রক্ষার জন্য মদিনাবাসীর সম্মিলিতভাবে আত্মত্যাগের যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে তাদের জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আর এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয় হয়ে ওঠে:
ক. ধর্মরক্ষা ও
খ. জন্মভূমি/ স্বদেশ রক্ষা।
এই দুটোই জাতীয়তাবাদী উপাদান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, জন্মভূমি বা স্বদেশ বহিঃশত্রু দ্বারা দখল হলে দখলদার শাসকের ধর্ম প্রাধান্য পায় ও তার আইন দ্বারা শাসিত হয়। এ দৃশ্য ভারতবর্ষেও লক্ষ করা যায়। সেক্ষেত্রে বলা যায়, ভারতীয় মুসলমানদের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মদিনাবাসীর বীরত্ব ও স্বদেশ চেতনাকে ঔপন্যাসিক তুলে ধরেছেন। আর দখলদারি বহিঃশত্রু এজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে মদিনাবাসীর যুদ্ধ যেন ভারতীয়দের ইংরেজের বিরুদ্ধে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার আহ্বান। ঔপন্যাসিক স্বদেশচেতনার পাশাপাশি জাতীয় ধর্মের বিষয়টিকেও উপন্যাসে তুলে ধরেছেন এভাবে:
ভাতৃগণ! যদি জাতীয় ধর্ম্ম-রক্ষার বাসনা থাকে, জগতে মোহাম্মদীয় ধর্ম্মের স্থায়িত্ব রাখিতে ইচ্ছা থাকে, কাফেরের রক্তে ইসলাম অস্ত্র রঞ্জিত করিতে ইচ্ছা থাকে, আর প্রভু মোহাম্মদের প্রতি যদি অটল ভক্তি থাকে, তবে এই পত্র প্রাপ্তি মাত্র আপন আপন সৈন্যসহ মদিনা প্রান্তরে আসিয়া উপস্থিত হউন।
উদ্ধৃতির ‘জাতীয় ধর্ম’ হলো ইসলাম। যেহেতু ঔপন্যাসিক ইসলাম ধর্মীয় ঘটনাকে আখ্যানের পটভূমি হিসেবে নিয়েছেন এবং তার নিজস্ব ধর্মীয় আইডেনটিটির সঙ্গে তা মিলে তাই ‘বিষাদ-সিন্ধু’ খুব সহজে বাঙালি কৃষক মুসলমান সমাজে সমাদৃত হয় এবং তাদের চৈতন্যে ইসলাম জাতীয় ধর্ম হিসেবে পরিচিতি পায়। যদিও তা ছিল আরবের প্রেক্ষাপট। আখ্যানে ইসলামকে জাতীয় ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নগর, রাজ্য বা দেশের মোহাম্মদীয় উম্মতদের মধ্যে সংহতি স্থাপনের যে চিত্র— তা ইসলামি জাতীয়তাবাদ নির্দেশক।
এক্ষেত্রে বলা যায়, জাতীয় ধর্ম প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে হিন্দু জাতীয়তাবাদের যে ‘রেপ্রিজেন্টেশেন’ তার ‘কাউন্টার’ হিসেবে মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসে মুসলিম জাতীয়তাবাদী প্রবণতাকে হাজির করলেন। সমালোচকের মতে, ‘আসলে ঊনবিংশ শতাব্দীর স্বল্পশিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের মানস-জগতের মৌলিক-বিন্দুকে’ এ আখ্যান এমনভাবে ধারণ করেছিল যে—‘‘বাঙালি হিন্দু সমাজে যেমন ‘রামায়ণ’ ঠিক তেমনি বাঙালি মুসলমান সমাজে ছিল ‘বিষাদ-সিন্ধু’।” বলা যায়, বাঙালি মুসলমান বিষাদ-সিন্ধুর কারবালার হৃদয় বিদীর্ণ ঘটনা, ইসলামি মিথ, কাহিনি ও বীররস ইত্যাদি অনুষঙ্গ দ্বারা নিজের ভেতর একধরনের ‘কল্পিত-বন্ধন’ তৈরি করেছে। এ বিষয়ে বেনেডিক্ট এন্ডারসন জাতিকে ‘ইমাজিনড পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ হিসেবে ধরে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
এন্ডারসনের ভাষ্য-অনুযায়ী বলা যায়, কারবালার হৃদয় বিদারক করুণ ঘটনা মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাতৃত্বের কল্পিত-বন্ধনের অনুভূতি ও বোধ জাগ্রত করে। এ বিষয়টি ভারতবর্ষের মুসলমানের মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন খেলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লক্ষ করা যায়, যা ছিল সাধারণ মুসলমানের অনুভূতিপ্রসূত। এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমর বলেন:
১৯১৪ সালে ব্রিটেন ও জার্মানীর মধ্যেকার যুদ্ধে তুর্কী জার্মানীর পক্ষ অবলম্বন করায় [ভারতীয়] মুসলমানদের চেতনার মধ্যে এক নিদারুণ টানা-পোড়েন ইতিপূর্বেই শুরু হয়েছিলো। একদিকে নিজেদের স্বার্থের জন্য ব্রিটেনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের খলিফা হিসেবে তুর্কীর সুলতানের প্রতি আনুগত্য— এই দুই-এর দ্বন্দ্ব মুসলিম রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তনের সূচনা করে এবং শেষপর্যন্ত মুসলমানদের ব্যাপকতম অংশ সুলতানের নেতৃত্বাধীন খেলাফতকে রক্ষার জন্য ব্রিটিশ-বিরোধিতার পথ গ্রহণ করে।
মুসলমানের পক্ষ অবলম্বনের এই বিষয়টিতে ধর্মীয় চেতনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেন এই অনুভূতিকে আশ্রয় করে ইমাম হোসেন ও এজিদ সম্পর্কে সাধারণ বাঙালি মুসলমানের মনে প্রচলিত ধারণাকে আখ্যানের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর ফলে সৃষ্ট ধর্মীয় আবেগ মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সঞ্চালিত হয়েছে—যা ইসলামী জাতীয় চেতনার রূপ ধারণ করেছে। যদিও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী চেতনা যেকোনো জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে খণ্ডিত করে।

বাজার করা, বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা, ঘুরতে যাওয়া, ঘরের কাজ—সবকিছু যেন এই একদিনের জন্য। ফলে শুক্রবার শুরু হওয়ার আগেই দিনটি হয়ে যায় ‘লোডেড’। গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক জীবনে সপ্তাহান্তকে মানুষ বিশ্রামের জন্য ভেবে রাখলেও বাস্তবে তা হয়ে ওঠে অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার দিন।
৪ ঘণ্টা আগে
সকালবেলায় ঘুম ভাঙার পরেই আমাদের হাত চলে যায় স্মার্টফোনে। নিউজফিড খুললেই চোখের সামনে ভেসে আসে একের পর এক খারাপ খবর। কোথাও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে, কোথাও যুদ্ধ, আবার কোথাও ভয়ংকর কোনো অপরাধের খবর।
১ দিন আগে
তবে এবার সেই রেকর্ড ভেঙেছেন আর্টেমিস ২-এর ক্রু’রা। চাঁদের উল্টো পাশ থেকেও সফলভাবে ঘুরে এসেছেন তাঁরা। সেখান থেকে পাঠিয়েছেন চাঁদের পৃষ্ঠের চমৎকার সব ছবি। এই সাফল্যের পেছনে মহাকাশচারীদের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
১ দিন আগে
ট্রাম্প যখন ইরানের সভ্যতাকে এক রাতের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, ইরানের জনগন তখন নিজ দেশের পতাকা নিয়ে ভীড় করেছে সম্ভাব্য আক্রমণস্থলে—সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি শোধনাগারে। সেই ভয়হীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইরানিদের বিদ্রুপ। এই বিদ্রুপের ঝড়ে যুক্ত হয়েছে শুধু ব্যক্তি নাগরিক নয়, খোদ বিভিন্ন দেশে থ
২ দিন আগে