এক্সপ্লেইনার
তুফায়েল আহমদ

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই চড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। রাস্তায় সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় মিছিল থেকে শুরু করে টিভি স্টুডিও—সব জায়গাতেই এখন একটাই প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গে কি আবার ক্ষমতায় আসবে তৃণমূল, নাকি ঘুরে দাঁড়াবে বিজেপি?
আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং ফলাফল ঘোষণা হবে ৪ মে। রাজ্যের ২৯৪ আসনের লড়াইয়ে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি।
ওপার বাংলার এই ক্ষমতার লড়াই শুধু কলকাতার রাজপথের বিষয় নয়। এই নির্বাচনের দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গের মসনদে কে বসবেন, তার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের অনেক কিছু। নির্ভর করছে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং কোটি টাকার সীমান্ত বাণিজ্য। নির্ভর করছে তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টনের ভবিষ্যৎ। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জনগণের মনে প্রশ্ন জাগছে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার মসনদে কোন দল বসলে আমাদের লাভ?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস যদি চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফেরে, ঢাকার জন্য এক মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হবে। তৃণমূলের প্রচারণার প্রধান অস্ত্র হলো ‘বাঙালি অস্মিতা’ বা বাঙালি আবেগ। দ্য হিন্দু পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃণমূল বিজেপিকে উত্তর ভারতীয় বহিরাগত দল হিসেবে তকমা দিচ্ছে। তারা বাংলার সংস্কৃতি রক্ষার ডাক দিচ্ছে। তৃণমূলের এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ান অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন তৈরি করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনআরসি বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জির চরম বিরোধী। ফলে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলে সীমান্তে বড় ধরনের পুশ-ব্যাক বা অনুপ্রবেশকারী খেদাও অভিযানের আতঙ্ক কিছুটা স্তিমিত থাকবে।
অন্যদিকে ২০১১ সাল থেকে তিস্তা চুক্তি মমতার আপত্তির কারণেই হিমঘরে পড়ে আছে। সিকিমের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং উত্তরবঙ্গের কৃষকদের স্বার্থের কথা বলে তিনি বাংলাদেশকে পানি দিতে নারাজ। তৃণমূল আবার ক্ষমতায় এলে তিস্তা চুক্তির জট খোলার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি।
সীমান্তে কড়াকড়ির ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। স্ক্রল ডট ইন-এর এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রায়ই সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার এবং অনুপ্রবেশ নিয়ে নমনীয় থাকার অভিযোগ ওঠে। তাই তারা ক্ষমতায় থাকলে সীমান্তে কড়াকড়ি কিছুটা কম থাকতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকার গড়লে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ঝাঁকুনি লাগবে। বিজেপির কাছে এই নির্বাচন আদ্যোপান্ত জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শুভেন্দু অধিকারী বারবার দাবি করছেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত দিয়ে লাখ লাখ অনুপ্রবেশকারী ভারতে ঢুকছে। দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিজেপি নেতারা কড়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁরা ক্ষমতায় এলে একটি শক্তিশালী ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি গ্রিড’ তৈরি করবেন। রাজ্যে এনআরসি এবং সিএএ কার্যকর করার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
এই আক্রমণাত্মক সীমান্ত রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। এনআরসি কার্যকর হলে ভারত থেকে দলে দলে মানুষ বাংলাদেশে পুশ-ব্যাকের শিকার হতে পারেন। রোহিঙ্গা সংকটে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দেবে এমন পদক্ষেপ। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন সময় যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ‘ইসরায়েল যেমন শিক্ষা দিয়েছে গাজাকে’ সেভাবে বাংলাদেশকে সবক শেখানোর পক্ষে শুভেন্দু। এই ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের ভেতরে তীব্র ভারতবিরোধী ক্ষোভ উসকে দিচ্ছে।
অন্ধকারের মধ্যেও একটু আলোর রেখা আছে। বিজেপি রাজ্যে এবং কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকলে পানিবণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে জট খুলতেও পারে। দিল্লি যদি মনে করে কৌশলগত কারণে ঢাকাকে পাশে রাখা জরুরি, তারা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে রাজি করাতে পারে। সে ক্ষেত্রে তিস্তা বা গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশ কিছুটা ছাড় পেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ধর্মের রাজনীতি বড় আকার ধারণ করেছে। বিজেপি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত নির্যাতনের কথা প্রচার করে ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে। তারা বলছে, তৃণমূল ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশে পরিণত হবে।
অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ওপর সহিংসতার খবর প্রায়ই শোনা যায়। কলকাতায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে তেমন দৃশ্য দেখা যেতে পারে। সেখানে রাজনৈতিক অবস্থা বুঝে মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ট্যাগ দেওয়া হতে পারে। এরপর তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশে পড়বে। কলকাতায় এমন কিছু ঘটলে বাংলাদেশের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ জন্ম নেবে। ভারত ও বিজেপিবিদ্বেষ তখন হিন্দুবিদ্বেষে রূপ নিতে পারে। ওপার বাংলার রাজনৈতিক ফায়দা লোটার মাশুল গুনতে হতে পারে এপার বাংলার নিরীহ হিন্দুদের।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গা ও তিস্তা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। থিংক গ্লোবাল হেলথ-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি চুক্তির ত্রিশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা নদীতে পানির প্রবাহ ১৭ শতাংশ কমে গেছে। ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গেও বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
নতুন গঙ্গা চুক্তি নবায়ন বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশের জন্য আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মরণ প্রশ্ন। তৃণমূল ক্ষমতায় এলে তারা গঙ্গার পলি সমস্যা এবং মালদা-মুর্শিদাবাদের নদীভাঙনের কথা তুলে চুক্তি নবায়নে কালক্ষেপণ করতে পারে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে তারা হয়তো অববাহিকা-ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে হাঁটবে। মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই ঢাকার এই স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে।
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণে এই অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। দ্য ওয়্যার এবং গ্লোবাল ভয়েসেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করত। এখন তা কমে ২৫০-এ ঠেকেছে। ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা বাংলাদেশের এলসি খোলা এবং পেমেন্ট নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
কলকাতার সদর স্ট্রিট এবং নিউ মার্কেট এলাকাকে একসময় ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলা হতো। চিকিৎসা ও কেনাকাটা করতে যাওয়া বাংলাদেশিদের পদচারণায় এলাকাটি দিনরাত মুখর থাকত। ভিসা জটিলতার কারণে এখন সেখানে ভুতুড়ে নীরবতা বিরাজ করছে। গ্লোবাল ভয়েসেস জানিয়েছে, বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। হোটেলগুলোর বুকিং ৮০ শতাংশ থেকে নেমে মাত্র ৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। নিউ মার্কেট ও বড়বাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনগুলোও নিরাপত্তার অভাবে বন্ধ রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস জয়লাভ করলে তারা হয়তো কলকাতার অর্থনীতি বাঁচাতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে। বিজেপি জয়ী হলে নিরাপত্তা তল্লাশি আরও কঠোর হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ বাংলাদেশি রোগী ও পর্যটকদের জন্য ওপারে যাওয়ার পথ আরও দুর্গম হয়ে উঠবে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল কেবল ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ঢেউ বেইজিং পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাবে। তিস্তা চুক্তি না হওয়ার সুযোগে চীন বাংলাদেশে বিশাল বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। ন্যাশনাল হেরাল্ডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে পানিবণ্টন আটকে দিলে বাংলাদেশ আরও বেশি করে চীনের দিকে ঝুঁকবে। ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য এমন পরিস্থিতি মোটেও সুখকর হবে না। বিজেপি জয়ী হলে তারা সম্ভবত এই চীনা প্রভাব রুখতে দ্রুত কোনো বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে হাজির হবে।
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা সবার আগে বাংলাদেশ নীতি ঘোষণা করেছেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চান না। ইন্ডিয়াস ওয়ার্ল্ড নামের একটি ওয়েবসাইটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিগত ১৫ বছর দিল্লি কেবল আওয়ামী লীগ-কেন্দ্রিক একমুখী নীতি অনুসরণ করেছে। এখন নতুন বাস্তবতায় তাদের সেই নীতি বদলাতে হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আগামী মে মাসে যে রায় দেবেন, তা কেবল মমতা বা শুভেন্দুর ব্যক্তিগত জয়-পরাজয় নয়। সেই রায় নির্ধারণ করবে গঙ্গা ও পদ্মা পাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবন। নির্ধারণ করবে খাদ্য, পানীয় জলের অধিকার এবং আগামী দশকের পারস্পরিক সহাবস্থানের গতিপথ। রাজনৈতিক নেতারা ভোটের মাঠে অনেক কথাই বলেন। শেষ পর্যন্ত কাঁটাতারের ওপারের মসনদে কে বসছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে ঢাকার আগামী দিনের স্বস্তি বা অস্বস্তি।

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই চড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। রাস্তায় সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় মিছিল থেকে শুরু করে টিভি স্টুডিও—সব জায়গাতেই এখন একটাই প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গে কি আবার ক্ষমতায় আসবে তৃণমূল, নাকি ঘুরে দাঁড়াবে বিজেপি?
আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং ফলাফল ঘোষণা হবে ৪ মে। রাজ্যের ২৯৪ আসনের লড়াইয়ে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি।
ওপার বাংলার এই ক্ষমতার লড়াই শুধু কলকাতার রাজপথের বিষয় নয়। এই নির্বাচনের দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গের মসনদে কে বসবেন, তার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের অনেক কিছু। নির্ভর করছে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং কোটি টাকার সীমান্ত বাণিজ্য। নির্ভর করছে তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টনের ভবিষ্যৎ। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জনগণের মনে প্রশ্ন জাগছে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার মসনদে কোন দল বসলে আমাদের লাভ?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস যদি চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফেরে, ঢাকার জন্য এক মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হবে। তৃণমূলের প্রচারণার প্রধান অস্ত্র হলো ‘বাঙালি অস্মিতা’ বা বাঙালি আবেগ। দ্য হিন্দু পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃণমূল বিজেপিকে উত্তর ভারতীয় বহিরাগত দল হিসেবে তকমা দিচ্ছে। তারা বাংলার সংস্কৃতি রক্ষার ডাক দিচ্ছে। তৃণমূলের এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ান অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন তৈরি করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনআরসি বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জির চরম বিরোধী। ফলে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলে সীমান্তে বড় ধরনের পুশ-ব্যাক বা অনুপ্রবেশকারী খেদাও অভিযানের আতঙ্ক কিছুটা স্তিমিত থাকবে।
অন্যদিকে ২০১১ সাল থেকে তিস্তা চুক্তি মমতার আপত্তির কারণেই হিমঘরে পড়ে আছে। সিকিমের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং উত্তরবঙ্গের কৃষকদের স্বার্থের কথা বলে তিনি বাংলাদেশকে পানি দিতে নারাজ। তৃণমূল আবার ক্ষমতায় এলে তিস্তা চুক্তির জট খোলার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি।
সীমান্তে কড়াকড়ির ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। স্ক্রল ডট ইন-এর এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রায়ই সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার এবং অনুপ্রবেশ নিয়ে নমনীয় থাকার অভিযোগ ওঠে। তাই তারা ক্ষমতায় থাকলে সীমান্তে কড়াকড়ি কিছুটা কম থাকতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকার গড়লে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ঝাঁকুনি লাগবে। বিজেপির কাছে এই নির্বাচন আদ্যোপান্ত জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শুভেন্দু অধিকারী বারবার দাবি করছেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত দিয়ে লাখ লাখ অনুপ্রবেশকারী ভারতে ঢুকছে। দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিজেপি নেতারা কড়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁরা ক্ষমতায় এলে একটি শক্তিশালী ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি গ্রিড’ তৈরি করবেন। রাজ্যে এনআরসি এবং সিএএ কার্যকর করার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
এই আক্রমণাত্মক সীমান্ত রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। এনআরসি কার্যকর হলে ভারত থেকে দলে দলে মানুষ বাংলাদেশে পুশ-ব্যাকের শিকার হতে পারেন। রোহিঙ্গা সংকটে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দেবে এমন পদক্ষেপ। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন সময় যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ‘ইসরায়েল যেমন শিক্ষা দিয়েছে গাজাকে’ সেভাবে বাংলাদেশকে সবক শেখানোর পক্ষে শুভেন্দু। এই ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের ভেতরে তীব্র ভারতবিরোধী ক্ষোভ উসকে দিচ্ছে।
অন্ধকারের মধ্যেও একটু আলোর রেখা আছে। বিজেপি রাজ্যে এবং কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকলে পানিবণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে জট খুলতেও পারে। দিল্লি যদি মনে করে কৌশলগত কারণে ঢাকাকে পাশে রাখা জরুরি, তারা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে রাজি করাতে পারে। সে ক্ষেত্রে তিস্তা বা গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশ কিছুটা ছাড় পেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ধর্মের রাজনীতি বড় আকার ধারণ করেছে। বিজেপি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত নির্যাতনের কথা প্রচার করে ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে। তারা বলছে, তৃণমূল ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশে পরিণত হবে।
অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ওপর সহিংসতার খবর প্রায়ই শোনা যায়। কলকাতায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে তেমন দৃশ্য দেখা যেতে পারে। সেখানে রাজনৈতিক অবস্থা বুঝে মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ট্যাগ দেওয়া হতে পারে। এরপর তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশে পড়বে। কলকাতায় এমন কিছু ঘটলে বাংলাদেশের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ জন্ম নেবে। ভারত ও বিজেপিবিদ্বেষ তখন হিন্দুবিদ্বেষে রূপ নিতে পারে। ওপার বাংলার রাজনৈতিক ফায়দা লোটার মাশুল গুনতে হতে পারে এপার বাংলার নিরীহ হিন্দুদের।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গা ও তিস্তা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। থিংক গ্লোবাল হেলথ-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি চুক্তির ত্রিশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা নদীতে পানির প্রবাহ ১৭ শতাংশ কমে গেছে। ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গেও বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
নতুন গঙ্গা চুক্তি নবায়ন বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশের জন্য আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মরণ প্রশ্ন। তৃণমূল ক্ষমতায় এলে তারা গঙ্গার পলি সমস্যা এবং মালদা-মুর্শিদাবাদের নদীভাঙনের কথা তুলে চুক্তি নবায়নে কালক্ষেপণ করতে পারে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে তারা হয়তো অববাহিকা-ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে হাঁটবে। মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই ঢাকার এই স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে।
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণে এই অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। দ্য ওয়্যার এবং গ্লোবাল ভয়েসেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করত। এখন তা কমে ২৫০-এ ঠেকেছে। ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা বাংলাদেশের এলসি খোলা এবং পেমেন্ট নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
কলকাতার সদর স্ট্রিট এবং নিউ মার্কেট এলাকাকে একসময় ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলা হতো। চিকিৎসা ও কেনাকাটা করতে যাওয়া বাংলাদেশিদের পদচারণায় এলাকাটি দিনরাত মুখর থাকত। ভিসা জটিলতার কারণে এখন সেখানে ভুতুড়ে নীরবতা বিরাজ করছে। গ্লোবাল ভয়েসেস জানিয়েছে, বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। হোটেলগুলোর বুকিং ৮০ শতাংশ থেকে নেমে মাত্র ৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। নিউ মার্কেট ও বড়বাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনগুলোও নিরাপত্তার অভাবে বন্ধ রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস জয়লাভ করলে তারা হয়তো কলকাতার অর্থনীতি বাঁচাতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে। বিজেপি জয়ী হলে নিরাপত্তা তল্লাশি আরও কঠোর হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ বাংলাদেশি রোগী ও পর্যটকদের জন্য ওপারে যাওয়ার পথ আরও দুর্গম হয়ে উঠবে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল কেবল ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ঢেউ বেইজিং পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাবে। তিস্তা চুক্তি না হওয়ার সুযোগে চীন বাংলাদেশে বিশাল বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। ন্যাশনাল হেরাল্ডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে পানিবণ্টন আটকে দিলে বাংলাদেশ আরও বেশি করে চীনের দিকে ঝুঁকবে। ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য এমন পরিস্থিতি মোটেও সুখকর হবে না। বিজেপি জয়ী হলে তারা সম্ভবত এই চীনা প্রভাব রুখতে দ্রুত কোনো বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে হাজির হবে।
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা সবার আগে বাংলাদেশ নীতি ঘোষণা করেছেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চান না। ইন্ডিয়াস ওয়ার্ল্ড নামের একটি ওয়েবসাইটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিগত ১৫ বছর দিল্লি কেবল আওয়ামী লীগ-কেন্দ্রিক একমুখী নীতি অনুসরণ করেছে। এখন নতুন বাস্তবতায় তাদের সেই নীতি বদলাতে হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আগামী মে মাসে যে রায় দেবেন, তা কেবল মমতা বা শুভেন্দুর ব্যক্তিগত জয়-পরাজয় নয়। সেই রায় নির্ধারণ করবে গঙ্গা ও পদ্মা পাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবন। নির্ধারণ করবে খাদ্য, পানীয় জলের অধিকার এবং আগামী দশকের পারস্পরিক সহাবস্থানের গতিপথ। রাজনৈতিক নেতারা ভোটের মাঠে অনেক কথাই বলেন। শেষ পর্যন্ত কাঁটাতারের ওপারের মসনদে কে বসছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে ঢাকার আগামী দিনের স্বস্তি বা অস্বস্তি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির নানা প্রস্তাব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। দুই সপ্তাহের এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দুই পক্ষের কর্মকর্তারা চুক্তির বিভিন্ন শর্ত ও প্রস্তাব নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলছেন।
১৯ ঘণ্টা আগে
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুভেন্দু অধিকারী একটি আলোচিত নাম। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম সেনাপতি থেকে আজ তিনি রাজ্যের প্রধান বিরোধী মুখ হয়ে উঠেছেন।
১ দিন আগে
প্রায় ছয় সপ্তাহের তীব্র সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শর্তসাপেক্ষ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এই সংঘাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়।
২ দিন আগে
ইরানি সভ্যতা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার দেড় ঘণ্টা আগেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন তিনি। প্রাথমিকভাবে মেনে নিয়েছেন ইরানের দেওয়া ১০টি শর্ত।
২ দিন আগে