হুমায়ূনকে লেখা মিসির আলির চিঠি

প্রিয় লেখক, হিমুকে কেন অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বড় করেছেন

হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম আলোচিত ও জনপ্রিয় চরিত্র মিসির আলি। জগতের নানা রহস্যের অন্তসারশূন্যতা প্রমাণ করাই তাঁর কাজ। তিনি যদি হিমু চরিত্রের রহস্য উন্মোচন করতে চাইতেন, তাহলে কীভাবে করতেন, সেই চেষ্টাই করা হয়েছে এই কাল্পনিক চিঠিতে।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ,

আপনার সৃষ্টি হিমুকে নিয়ে আমার দীর্ঘদিনের কৌতূহল। পাঠক হিসেবে নয়, একজন মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে অভ্যস্ত ব্যক্তি হিসেবে আমার এই কৌতূহল। আমি বহুবার চেষ্টা করেছি হিমুকে বিশ্লেষণ করতে। পাঠকদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে নানা মতামত।

আপনি একবার হিমুর সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দিয়েছিলেন, মনে আছে নিশ্চয়? তাছাড়া তাঁকে নিয়ে আপনার সব লেখাই আমি পড়েছি। ফলে হিমুর চরিত্রের বিভিন্ন দিক বুঝতে পেরেছি বলেই আমার ধারণা। সেগুলো মিলিয়ে নিতেই এই চিঠি।

প্রথমেই একটা কথা স্বীকার করি। আমি মনে করি না, হিমু পাগল। আবার সে সম্পূর্ণ সুস্থ, এমনও মনে করি না। তার মানসিক অবস্থাকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। কারণ তাকে ছোট থেকেই মানুষ করা হয়েছে এক অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। কেন তাকে এভাবে বড় করলেন, প্রিয় লেখক?

অনেকেই ভাবেন, হিমুর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তার বাবাকে নিয়ে। একজন বাবা সন্তানের মধ্যে একটি ‘প্রকল্প’ দেখলেন। সন্তানের ওপর নিজের দর্শন চাপিয়ে দিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হলো, সে সাধারণ মানুষ নয়, সে হবে ‘মহামানব’। এই ধারণাটি কি আপনার কাছে সমস্যাজনক মনে হয়নি?

আপনি হিমুর বাবার চরিত্র এমনভাবে তৈরি করেছেন, যে বাবা ভুলে গেলেন যে, নিজের দর্শনের ‘এক্সপেরিমেন্ট’ নিজের সন্তানের ওপর করা যায় না। এ অনৈতিক। আপনার কি মনে হয় না, আপনি হিমুর বাবাকে একটু অপ্রকৃতিস্থভাবে সৃষ্টি করেছেন?

প্রিয় লেখক, আপনি নিশ্চয় জানেন, একটি শিশু যখন নিজের পরিচয় নিজে গড়ে তোলার আগেই অন্যের তৈরি পরিচয় বহন করতে বাধ্য হয়, তখন তার ভেতরে দ্বৈত সত্তা জন্ম নেয়। একটি সত্তা নিজের মতো বাঁচতে চায়, অন্যটি অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়। আমি সন্দেহ করি, হিমুর ভেতরে এই দ্বন্দ্ব কোনো দিন শেষ হয়নি।

তার হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পায়ে হাঁটা, অর্থবিত্তকে অস্বীকার করা, সংসারকে এড়িয়ে চলা—এসবকে অনেকেই দর্শন বলে। আমি এগুলোর মধ্যে আত্মপরিচয় রক্ষার মরিয়া প্রচেষ্টা দেখি। সে যেন প্রতিদিন নিজেকে মনে করিয়ে দেয়—‘আমি আলাদা। আমি সাধারণ নই।’

প্রিয় লেখক, আপনি কি অস্বীকার করবেন, হিমুর বাবা তার ছেলেকে মহাপুরুষ বানাতে গিয়ে এক ছোট্ট শিশুকে ভয়াবহ সব যন্ত্রণা দিয়েছেন? তাকে শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছেন। পানিতে উল্টো করে ডুবিয়ে রেখেছেন, তার সামনে পোষা পাখি মেরে ফেলেছেন। এসবের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর কাজটি করেছেন হিমুর মাকে নিয়ে। তিনি নিজ হাতে স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। কারণ? যেন তাঁর ছেলে মায়ের মায়া-ভালোবাসায় আটকে না যায়। এ নিয়ে তাঁর মনে কোনো অনুশোচনাও দেখা যায়নি। সুস্থ্ কারও মাথায় এই ধরনের বুদ্ধি আসা সম্ভব না তা শুধু আমি না, পুরো মেডিকেল সায়েন্সই বলবে। প্রিয় লেখক, আপনি কি ইচ্ছে করেই হিমুর বাবাকে এমন অস্বাভাবিক চরিত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন?

যাইহোক। এত চেষ্টার পরেও আমরা দেখি, হিমুর বাবার চেষ্টা সফল হয়নি। কারণ হিমু মায়ায় পড়ে, ভীষণভাবেই পড়ে। সে কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেমে জড়ায় না, তবে সে মায়া অনুভব করে, করার পরে যখন তাঁর বাবার উপদেশের কথা মনে পড়ে যায়, তখন সে সরে আসে। মায়ায় না পড়লে মায়া থেকে সরে আসা যায় না।

‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহর’ বইয়ের ভূমিকা; যে বইয়ে হিমুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে মিসির আলির
‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহর’ বইয়ের ভূমিকা; যে বইয়ে হিমুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে মিসির আলির

হিমুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমি বুঝেছি, তার বাবা তাকে যেসব থেকে দূরে থাকতে বলেছেন, তার কোনোটি থেকেই সে দূরে থাকতে পারেনি। হিমু ভয় পেয়েছে, মায়ায় পড়েছে, ভালোবেসেছে। তবে ঘটনায় ঢুকে যাওয়ার পরে সরে এসেছে। তাঁর নিজের মনেও বাবাকে নিয়ে সন্দেহ ছিল। বড় হওয়ার পর সে বিষয়ে হিমু নিশ্চিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সব বুঝলেও কেন সে বাবার আদেশ পালন থেকে সরে আসেনি?

মানুষকে বিশ্লেষণ করার সামান্য প্রতিভা থেকে বলতে পারি, এর কারণ তার মা। তাকে নিয়ে লেখা আপনার প্রথম বইয়েই এই তথ্য আমি পেয়েছি। মন খারাপ হলেই বা অবসর পেলেই সে ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে চলে যায়। সেখানে শাড়ি পরা এক কিশোরী থাকে। হিমু বলেছে, সে হিমুর মা। মন খারাপ হলেই মায়ের কোলে ফিরে যাওয়ার সেই আবেগ তার মধ্যে প্রবল। যেহেতু সে নিজের মাকে দেখেনি, তাই যেকোনোভাবেই কল্পনা করে নেওয়া তার জন্য সহজ। হিমুর চরিত্র সে নিজেই বিশ্লেষণ করেছে। বইতে বলেছে, সে মহাপুরুষ না হলে তাঁর মায়ের মৃত্যু বৃথা যাবে।

তাই হিমু আসলে বাবার উপদেশ মানতে নয়, নিজের না-দেখা মায়ের মমতায় আটকে আছে। ছেলেকে মায়া থেকে দূরে রাখতে তাঁর বাবা হিমুর মাকে হত্যা করেছে। তাই সে মহাপুরুষ না হলে তাঁর মার মৃত্যুর কী দরকার ছিল?

এছাড়াও সারাজীবন দ্বৈত জীবন কাটিয়ে সে সাধারণ জীবনযাপনে ভয় পায় বলেই আমার ধারণা। দায়িত্বহীন জীবন সহজ। আমার ধারণা, সে কাজ করলে তার পুরো সত্তাই ভেঙে পড়ত। কারণ সে এতদিন ধরে যে পরিচয়টিকে আঁকড়ে বেঁচে আছে, সেটিই বিলীন হয়ে যেত।

আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবায়। হিমুর চারপাশে মানুষ ভিড় করে। সবাই তার মধ্যে রহস্য খোঁজে। কেউ অলৌকিক শক্তি দেখে, কেউ সাধু দেখে, কেউ দার্শনিক।

কিন্তু আমি তাঁর মধ্যে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ দেখেছি। সে কখনোই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে না। অন্যের কষ্ট শোনে, কিন্তু নিজের কষ্ট কাউকে বলে না। সে সম্পর্ক তৈরি করে, আবার সেই সম্পর্কের গভীরতম মুহূর্তে সরে যায়। এটি কেবল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নয়, এটি ঘনিষ্ঠতার ভয়ও।

যে মানুষ ছোটবেলায় নিরাপদ আবেগীয় সম্পর্ক পায় না, সে বড় হয়ে ভালোবাসা চাইলেও তার স্থায়িত্বকে ভয় পায়। কারণ স্থায়িত্ব মানে আবার হারানোর আশঙ্কা। রূপা বা মারিয়া—এদের কাছ থেকে বারবার দূরে সরে যাওয়াকে আমি সেই আলোতেই দেখি। হিমু ভালোবাসার চেয়ে বেশি ভয় পায় তাকে হারাতে। তাই হারানোর আগেই নিজেই দূরে সরে যায়।

আরেকটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেছি। হিমু প্রায়ই এমন সব পরিস্থিতিতে উপস্থিত হয়, যেখানে মানুষের সংকট রয়েছে। সে যেন অন্যদের জীবনের সমস্যা সমাধান করে বেড়ায়। মনোবিজ্ঞানে একে কখনো কখনো বলা হয় নিজের যন্ত্রণা থেকে মন সরানোর একটি পদ্ধতি। নিজের ক্ষত নিয়ে না ভেবে অন্যের ক্ষত সারাতে থাকা। অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে ভুলে থাকা। এতে মানুষ সাময়িক শান্তি পায়।

হিমু তার সমস্যায় জর্জরিত শৈশবের কিছুই সমাধান করতে পারেনি। সবার থেকে সে ছিল আলাদা। তাই অসহায়ের প্রতি সে গভীর টান অনুভব করে। নিজের জীবনের যে সমস্যা সে সমাধান করতে পারেনি, অন্যদের তা থেকে মুক্তি দিতে চায়।

এবার একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ। আপনি কখনোই হিমুকে মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হতে দেননি। হয়তো ইচ্ছা করেই দেননি। কারণ সুস্থ হয়ে গেলে সে আর হিমু থাকত না।

কিন্তু একজন মনোবিশ্লেষক হিসেবে আমার আফসোস থেকে যায়। আমি চাইতাম, একবার অন্তত তাকে নিজের বাবার তৈরি পরিচয়ের বাইরে দাঁড়াতে দেখতে। আমার বিশ্বাস—‘আমি মহামানব নই, আমি শুধু একজন মানুষ’— এই কথাটি ভাবতে পারলে সেই দিনই হিমুর প্রকৃত মুক্তি হতো।

শ্রদ্ধা ও কৌতূহলসহ

মিসির আলি

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত