
প্রতি বর্ষায় বাংলাদেশ যেন একই গল্পের পুনরাবৃত্তি দেখে। নদীর পানি উপচে পড়ে। গ্রাম তলিয়ে যায়। সড়ক ভেঙে যায়। ফসল ডুবে যায়। হাজারো পরিবার আশ্রয় নেয় বাঁধে, স্কুলে কিংবা উঁচু জমিতে। সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলায়, কিন্তু গল্প বদলায় না। শুধু বদলে যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলার সংখ্যা, পানিবন্দি মানুষ কিংবা ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ির হিসাব।
বর্ষা আমাদের নিয়তি। কিন্তু মানবিক বিপর্যয় কোনো নিয়তি নয়। বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি বন্যাপ্রবণ। তাই বন্যা অনিবার্য। কিন্তু বন্যাকে জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত করা অনিবার্য নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অথবা তার অভাবের প্রতিফলন।
এই সত্যটি উপলব্ধি করা জরুরি। কারণ, তখন আমাদের দৃষ্টি কেবল ত্রাণ বিতরণ থেকে সরে এসে দুর্যোগ প্রতিরোধে নিবদ্ধ হবে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে একটি সফল উদাহরণ। আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি, স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে লাগানো এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণে গত কয়েক দশকে আমরা লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পেরেছি। একসময়ের ভয়াবহ বিপর্যয় আজ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
এখন সেই একই অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা বন্যা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করার সময় এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন বর্ষার চরিত্র বদলে দিয়েছে। অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, উজানে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, নদীর অপ্রত্যাশিত আচরণ, জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। যে বন্যাকে একসময় দশকের ঘটনা মনে করা হতো, তা এখন প্রায় নিয়মিত বাস্তবতা।
কিন্তু একই পরিমাণ বৃষ্টিতে এক অঞ্চলে সীমিত ক্ষতি, আর অন্য অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয়—এর ব্যাখ্যা কেবল জলবায়ু পরিবর্তন নয়। এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতায়।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি দুর্যোগের পরে কত দ্রুত ত্রাণ পৌঁছায়, তা দিয়ে নয়; বরং দুর্যোগ আসার আগেই কতটা প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।
প্রস্তুতির প্রথম শর্ত তথ্য। বাংলাদেশে আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পূর্বাভাস তখনই কার্যকর, যখন তা সময়মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে এবং মানুষ সেই তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মোবাইল ফোন, কমিউনিটি রেডিও, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে একীভূত করে একটি সমন্বিত জাতীয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। সড়ক, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ কিংবা ড্রেনেজ ব্যবস্থা—এসবকে আলাদা উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে নয়, জাতীয় সহনশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের সময় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিবেচনায় নিতে হবে। নগর সম্প্রসারণের আগে জলাধার ও খাল সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পরে নয়, ভাঙার আগেই তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
প্রকৃতি কোনো মন্ত্রণালয়ের সীমারেখা মানে না। অথচ আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো খণ্ডিত দায়িত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ। স্থানীয় সরকারও এই লড়াইয়ের সম্মুখসারির সৈনিক। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং জেলা প্রশাসনই দুর্যোগের প্রথম প্রতিক্রিয়াকারী। তাদের পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত না করলে ঢাকায় বসে জাতীয় সহনশীলতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
কৃষিখাতেও নতুন করে ভাবতে হবে। অনিশ্চিত বর্ষা মানে অনিশ্চিত ফসল। কৃষকদের জন্য জলবায়ু-সহনশীল বীজ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, কৃষি বিমা এবং নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া তথ্য নিশ্চিত করা এখন বিলাসিতা নয়; অপরিহার্য প্রয়োজন।
বেসরকারি খাতও এর বাইরে নয়। বন্যা মানেই উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া, বন্দর কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি। তাই দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সুশাসন। প্রতিটি বন্যা আমাদের সেই দুর্বলতাগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে, যেগুলো বছরের পর বছর অদৃশ্য থেকে যায়—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, রক্ষণাবেক্ষণের অবহেলা, সমন্বয়ের অভাব এবং জবাবদিহিতার দুর্বলতা।
অতএব, বন্যা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর অবকাঠামোর নাম সুশাসন।
নেদারল্যান্ডস কিংবা জাপানের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, পানির সঙ্গে যুদ্ধ নয়—পানির সঙ্গে বসবাসের জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী, অভিযোজনক্ষম এবং শেখার মানসিকতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশকে তাদের মডেল অনুকরণ করতে হবে না; কিন্তু তাদের দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
জলবায়ু অভিযোজন কেবল পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও কেবল দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। অর্থ, কৃষি, স্থানীয় সরকার, সড়ক, শিক্ষা, গৃহায়ন—রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সহনশীলতার দর্শনকে নিজেদের নীতির কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে।
কারণ, সহনশীলতা কোনো খাত নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দর্শন।
বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন জলবায়ু-সহনশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তি। ভবিষ্যতের বিশ্বে এগিয়ে থাকবে সেই দেশ, যাদের দুর্যোগ কম নয়; বরং যাদের প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে শক্তিশালী।
প্রকৃতি বাংলাদেশকে বারবার পরীক্ষা নেবে। ভূগোল তাই বলে। জলবায়ু পরিবর্তন সেই পরীক্ষাকে আরও কঠিন করে তুলবে। কিন্তু আমরা কীভাবে সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হব, সেটি সম্পূর্ণ আমাদের সিদ্ধান্ত।
আমরা বর্ষাকে থামাতে পারব না। কিন্তু বর্ষার আগে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারি। আমরা নদীকে তার গতিপথ বদলাতে বাধ্য করতে পারব না। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা, অবকাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে গড়ে তুলতে পারি, যাতে নদীর উত্থান আর জাতির পতনের কারণ না হয়।
আগামী বছরও বর্ষা আসবে। প্রশ্ন হলো, তখনও কি আমরা শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করব, নাকি দেখাতে পারব—প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে আমরা বিপর্যয়কে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছি? বন্যা প্রকৃতির সৃষ্টি। কিন্তু জাতীয় বিপর্যয়—সেটি মানুষের সৃষ্টি। আর তাই, সেটি মানুষের পক্ষেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
.png)

বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়বে। আর সেখানেই নতুন অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—যা বেতন বৃদ্ধির দুর্নীতিবিরোধী যুক্তিকেই শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে দিতে পারে।
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যেকোনো সরকারি ই-মেইল থেকে কখনো কখনো দুই দেশের সম্পর্কের গোপন বার্তা বোঝা যায়। এ মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে পাঠানো একটি ই-মেইল তেমনই একটি ঘটনা ঘটায়। সেই ই-মেইলে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রতি সপ্তাহে যে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান হয়, তা এবার হবে না। কারণ হিসেবে জানানো হয়, বাংলাদে
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮ বছর পূর্ণ হচ্ছে। দীর্ঘ এই যাত্রায় দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক। বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে। তবে সেই সম্পর্ক এখন আগের মতো নেই। বরং একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে। তরুণরা কেন বিএনপি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? প্রশ্নটি বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আরও গ
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-2d6530-720x405-cf1efb.webp)
গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি কিংবা অনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা নতুন কোনো বিষয় না হলেও এই ধরনের অনৈতিক চর্চা একাডেমিক পরিসরে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আমরা সেই অনৈতিক চর্চা বারবার দেখতে পাই? বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে এবং বুঝতে হলে বাংলাদেশের একাডেমিক পরিসরে আমরা যে
৩১ আগস্ট ২০২৬