কাজী নিশাত তাবাসসুম

মুসলিম বিশ্বে ভাস্কর্য নিয়ে নানা ধরনের মতভেদ দেখা যায়। কোথাও ধর্মীয় ব্যাখ্যার কারণে মানবমূর্তি নির্মাণে সংযম দেখা যায়, কোথাও আবার জাতীয় বীর, স্বাধীনতা সংগ্রাম বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে স্মরণ করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ। ফলে ‘মুসলিম দুনিয়ায় ভাস্কর্য নেই’—এমন ধারণা যেমন সঠিক নয়, তেমনি ‘সবখানেই ভাস্কর্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য’—এ কথাও সত্য নয়।
সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইরান, ইরাকসহ প্রায় সকল মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে। ইসলামে জীবন্ত প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক থাকলেও আধুনিক সময়ে অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়, স্বাধীনতা সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও পর্যটনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে।

তুরস্ক: আতাতুর্কের ভাস্কর্য যেন রাষ্ট্রের প্রতীক
প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ তুরস্কে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দেশটির প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য। তাঁর নেতৃত্বে খেলাফত শাসনের অবসান ঘটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এক আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হয়। তিনি আধুনিক তুরস্কের জনক। তুর্কি ভাষায় ‘আতা’ মানে জনক। ‘তুর্ক’ মানে তুরস্ক। তাই তিনি আতাতুর্ক। ইস্তাম্বুলের তাকসিম স্কয়ারের রিপাবলিক মনুমেন্ট, আঙ্কারা, ইজমিরসহ প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই আতাতুর্কের বিভিন্ন ভাস্কর্য রয়েছে।
এসব ভাস্কর্য আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতীয় স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলোর সংরক্ষণ করা হয়। কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য ছাড়াও তুরস্কের উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো মর্মর সাগর তীরে পোতাশ্রয়ে অপূর্ব মর্মর মূর্তি, আঙ্কারাতে ইন্ডিপেনডেন্স টাওয়ারের পাদদেশে তুরস্কের জাতীয় সংস্কৃতির ধারক তিন নারী মূর্তি ও আন্তালিয়ায় এডুকেশন অ্যাক্টিভিস্ট তুরকান সায়লানের মূর্তি। তুরস্ক ভ্রমণে এসব মূর্তি ভ্রমণপিপাসুদের নজর কাড়ে।

ইরান: মহাকবি, বীর ও ইতিহাসের ভাস্কর্য
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর অনেক রাজকীয় প্রতীক সরিয়ে ফেলা হলেও দেশটির জাতীয় ইতিহাস ও পারস্য সংস্কৃতিকে ঘিরে বহু ভাস্কর্য এখনো রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় পারস্যের ইতিহাসের সূচনা প্রায় লক্ষ বছরের পুরনো। ইরানে আছে একটি বিশাল স্বাধীনতাস্তম্ভ, যার নাম ‘আজাদি’। এ স্থাপত্যটির ডিজাইনার হোসেন আমানত একজন মুসলমান। তেহরানে পারস্যের মহাকবি ফেরদৌসীর বিশাল ভাস্কর্য দেশটির অন্যতম পরিচিত নিদর্শন।
এছাড়া কিংবদন্তি নায়ক আরাশ দ্য আর্চার, নাদির শাহ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য বিভিন্ন শহরে স্থাপন করা হয়েছে। ইরানের হামাদানে ইবনে সিনার মূর্তি, তেহরানের লালেহ পার্কে রয়েছে ওমর খৈয়ামের ভাস্কর্য, কবি হাফিজের ভাস্কর্য। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি বা ইমাম খোমেনির একাধিক ভাস্কর্য ও ম্যুরাল রয়েছে ইরানে।

ইন্দোনেশিয়া: বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্মারক ভাস্কর্যের দেশ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় অসংখ্য ভাস্কর্য রয়েছে। জাকার্তার ডিরগানতারা মনুমেন্ট, ওয়েলকাম মনুমেন্ট এবং ওয়েস্ট ইরিয়ান লিবারেশন মনুমেন্ট জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। অন্যদিকে বালির গরুড় বিষ্ণু কেনচানা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাস্কর্য। যদিও এটি হিন্দু পুরাণভিত্তিক, তবুও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ইন্দোনেশিয়ায় এটি জাতীয় পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া মানাডো শহরে আছে খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিস্টের ভাস্কর্য ‘দ্য স্ট্যাচু অব ক্রাইস্ট ব্লেসিং’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫০ মিটার পাহাড়ি উচ্চতায় এই ভাস্কর্যের অবস্থান।
২০১০ সালে এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। অন্যান্য ভাস্কর্যের মতো এটি সাধারণভাবে দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় বানানো হয়নি। ২০ ডিগ্রি কোণে বাঁকানো অবস্থায় ভাস্কর্যটি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, দেখে মনে হবে যেন যিশুখ্রিস্ট শূন্যে সবার উদ্দেশে শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

মালয়েশিয়া: আধুনিক রাষ্ট্র ও জাতীয় স্মৃতির ভাস্কর্য
মালয়েশিয়ার জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ তুগু নেগারা (ন্যাশনাল মনুমেন্ট) দেশটির সবচেয়ে পরিচিত ভাস্কর্যগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রামে নিহত সেনাদের স্মরণে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভে কয়েকজন সৈনিকের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য রয়েছে। প্রতীকীভাবে সাতজন বীরের প্রতিমূর্তির মাধ্যমে বিশ্বস্ততা, আত্মত্যাগ আর বন্ধুত্বের বিষয়টি এই ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার ভাস্কর্যশিল্প সনাতন ও আধুনিক ধারার এক স্বতন্ত্র মেলবন্ধন।
দেশটির বিভিন্ন শহরে স্বাধীনতা, ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরতে আরও বহু ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হয় এবং জাতীয় দিবসে সেখানে রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা জানানো হয়। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যগুলো হলো বাতু কেভসের বিখ্যাত মুরুগান মূর্তি, কুচিং হলিডে ইন হোটেলের সামনে মার্জার মূর্তি এবং কনফুসিয়াসের মূর্তি। এখানে এসব ভাস্কর্য পরিদর্শনে পর্যটকরা নিয়মিত এসে থাকেন। ন্যাশনাল মনুমেন্টই এখানে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত।

সৌদি আরব: বদলে যাওয়া শিল্পচর্চা
দীর্ঘ সময় সৌদি আরবে মানব আকৃতির ভাস্কর্য নির্মাণ সীমিত ছিল। তবে জনশিল্প বা পাবলিক আর্ট হিসেবে বিমূর্ত ও নান্দনিক ভাস্কর্যের প্রচলন ছিল, বিশেষ করে জেদ্দায়। বর্তমানে জেদ্দা ওপেন এয়ার মিউজিয়ামে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পীর শত শত ভাস্কর্য রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো আধুনিক বিমূর্ত শিল্পকর্ম, যা আন্তর্জাতিক পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির পর দেশটিতে শিল্প, সংস্কৃতি ও পর্যটনে বিনিয়োগ বেড়েছে। ফলে নতুন পাবলিক আর্ট প্রকল্পও বাস্তবায়িত হচ্ছে। সভ্যতার অংশ হিসেবে শুরু থেকেই দেশটিতে উট ও ঘোড়ার প্রচলন ছিল। বিভিন্ন ভাস্কর্যের মাধ্যমে অতীতের এসব চিহ্ন দেশটি ধরে রেখেছে। সাত বছর আগে সৌদি আরবের তায়েফে কিং ফয়সাল নামের পার্কে নির্মাণ করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উটের ভাস্কর্য। এছাড়া রাজধানী জেদ্দার উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যের মধ্যে আরও রয়েছে নগরীতে মুষ্টিবদ্ধ হাত, হাংরি হর্স, মানব চোখ, মরুর বুকে উটের ভাস্কর্য।

কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত: আধুনিক শিল্পের প্রদর্শনী
কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও মুসলিম প্রধান দেশ হয়েও আধুনিক ভাস্কর্য স্থাপনে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। দেশটির উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো আরবীয় যুগলের মূর্তি, দুবাইয়ের ওয়াফি অঞ্চলের প্রবেশপথে পাহারাদারের প্রতিমূর্তি হিসেবে সংস্থাপিত কুকুরের মূর্তি, দুবাইয়ের ইবনে বতুতা মার্কেটে স্থাপিত মূর্তি।
মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে যেসব ভাস্কর্য দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে, সেগুলোর অধিকাংশই সে দেশে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে মূলত জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, কোন উপাসনার বস্তু হিসেবে নয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে এগুলো নির্মিত। পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজ এগুলোকে ধর্মীয় প্রতীক নয়, সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখে।
অবশ্য সব মুসলিম দেশের অবস্থান এক নয়। কোথাও মানব আকৃতির ভাস্কর্য সীমিত, কোথাও বিমূর্ত শিল্প বেশি, আবার কোথাও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্যও রয়েছে। স্থানীয় ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রাষ্ট্রীয় নীতির ভিত্তিতে এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: মুসলি নেটওয়ার্ক টিভি, দ্য টেলিগ্রাফ, মিডল ইস্ট মনিটর

মুসলিম বিশ্বে ভাস্কর্য নিয়ে নানা ধরনের মতভেদ দেখা যায়। কোথাও ধর্মীয় ব্যাখ্যার কারণে মানবমূর্তি নির্মাণে সংযম দেখা যায়, কোথাও আবার জাতীয় বীর, স্বাধীনতা সংগ্রাম বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে স্মরণ করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ। ফলে ‘মুসলিম দুনিয়ায় ভাস্কর্য নেই’—এমন ধারণা যেমন সঠিক নয়, তেমনি ‘সবখানেই ভাস্কর্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য’—এ কথাও সত্য নয়।
সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইরান, ইরাকসহ প্রায় সকল মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে। ইসলামে জীবন্ত প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক থাকলেও আধুনিক সময়ে অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়, স্বাধীনতা সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও পর্যটনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে।

তুরস্ক: আতাতুর্কের ভাস্কর্য যেন রাষ্ট্রের প্রতীক
প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ তুরস্কে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দেশটির প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য। তাঁর নেতৃত্বে খেলাফত শাসনের অবসান ঘটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এক আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হয়। তিনি আধুনিক তুরস্কের জনক। তুর্কি ভাষায় ‘আতা’ মানে জনক। ‘তুর্ক’ মানে তুরস্ক। তাই তিনি আতাতুর্ক। ইস্তাম্বুলের তাকসিম স্কয়ারের রিপাবলিক মনুমেন্ট, আঙ্কারা, ইজমিরসহ প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই আতাতুর্কের বিভিন্ন ভাস্কর্য রয়েছে।
এসব ভাস্কর্য আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতীয় স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলোর সংরক্ষণ করা হয়। কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য ছাড়াও তুরস্কের উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো মর্মর সাগর তীরে পোতাশ্রয়ে অপূর্ব মর্মর মূর্তি, আঙ্কারাতে ইন্ডিপেনডেন্স টাওয়ারের পাদদেশে তুরস্কের জাতীয় সংস্কৃতির ধারক তিন নারী মূর্তি ও আন্তালিয়ায় এডুকেশন অ্যাক্টিভিস্ট তুরকান সায়লানের মূর্তি। তুরস্ক ভ্রমণে এসব মূর্তি ভ্রমণপিপাসুদের নজর কাড়ে।

ইরান: মহাকবি, বীর ও ইতিহাসের ভাস্কর্য
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর অনেক রাজকীয় প্রতীক সরিয়ে ফেলা হলেও দেশটির জাতীয় ইতিহাস ও পারস্য সংস্কৃতিকে ঘিরে বহু ভাস্কর্য এখনো রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় পারস্যের ইতিহাসের সূচনা প্রায় লক্ষ বছরের পুরনো। ইরানে আছে একটি বিশাল স্বাধীনতাস্তম্ভ, যার নাম ‘আজাদি’। এ স্থাপত্যটির ডিজাইনার হোসেন আমানত একজন মুসলমান। তেহরানে পারস্যের মহাকবি ফেরদৌসীর বিশাল ভাস্কর্য দেশটির অন্যতম পরিচিত নিদর্শন।
এছাড়া কিংবদন্তি নায়ক আরাশ দ্য আর্চার, নাদির শাহ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য বিভিন্ন শহরে স্থাপন করা হয়েছে। ইরানের হামাদানে ইবনে সিনার মূর্তি, তেহরানের লালেহ পার্কে রয়েছে ওমর খৈয়ামের ভাস্কর্য, কবি হাফিজের ভাস্কর্য। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি বা ইমাম খোমেনির একাধিক ভাস্কর্য ও ম্যুরাল রয়েছে ইরানে।

ইন্দোনেশিয়া: বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্মারক ভাস্কর্যের দেশ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় অসংখ্য ভাস্কর্য রয়েছে। জাকার্তার ডিরগানতারা মনুমেন্ট, ওয়েলকাম মনুমেন্ট এবং ওয়েস্ট ইরিয়ান লিবারেশন মনুমেন্ট জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। অন্যদিকে বালির গরুড় বিষ্ণু কেনচানা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাস্কর্য। যদিও এটি হিন্দু পুরাণভিত্তিক, তবুও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ইন্দোনেশিয়ায় এটি জাতীয় পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া মানাডো শহরে আছে খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিস্টের ভাস্কর্য ‘দ্য স্ট্যাচু অব ক্রাইস্ট ব্লেসিং’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫০ মিটার পাহাড়ি উচ্চতায় এই ভাস্কর্যের অবস্থান।
২০১০ সালে এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। অন্যান্য ভাস্কর্যের মতো এটি সাধারণভাবে দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় বানানো হয়নি। ২০ ডিগ্রি কোণে বাঁকানো অবস্থায় ভাস্কর্যটি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, দেখে মনে হবে যেন যিশুখ্রিস্ট শূন্যে সবার উদ্দেশে শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

মালয়েশিয়া: আধুনিক রাষ্ট্র ও জাতীয় স্মৃতির ভাস্কর্য
মালয়েশিয়ার জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ তুগু নেগারা (ন্যাশনাল মনুমেন্ট) দেশটির সবচেয়ে পরিচিত ভাস্কর্যগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রামে নিহত সেনাদের স্মরণে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভে কয়েকজন সৈনিকের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য রয়েছে। প্রতীকীভাবে সাতজন বীরের প্রতিমূর্তির মাধ্যমে বিশ্বস্ততা, আত্মত্যাগ আর বন্ধুত্বের বিষয়টি এই ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার ভাস্কর্যশিল্প সনাতন ও আধুনিক ধারার এক স্বতন্ত্র মেলবন্ধন।
দেশটির বিভিন্ন শহরে স্বাধীনতা, ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরতে আরও বহু ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হয় এবং জাতীয় দিবসে সেখানে রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা জানানো হয়। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যগুলো হলো বাতু কেভসের বিখ্যাত মুরুগান মূর্তি, কুচিং হলিডে ইন হোটেলের সামনে মার্জার মূর্তি এবং কনফুসিয়াসের মূর্তি। এখানে এসব ভাস্কর্য পরিদর্শনে পর্যটকরা নিয়মিত এসে থাকেন। ন্যাশনাল মনুমেন্টই এখানে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত।

সৌদি আরব: বদলে যাওয়া শিল্পচর্চা
দীর্ঘ সময় সৌদি আরবে মানব আকৃতির ভাস্কর্য নির্মাণ সীমিত ছিল। তবে জনশিল্প বা পাবলিক আর্ট হিসেবে বিমূর্ত ও নান্দনিক ভাস্কর্যের প্রচলন ছিল, বিশেষ করে জেদ্দায়। বর্তমানে জেদ্দা ওপেন এয়ার মিউজিয়ামে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পীর শত শত ভাস্কর্য রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো আধুনিক বিমূর্ত শিল্পকর্ম, যা আন্তর্জাতিক পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির পর দেশটিতে শিল্প, সংস্কৃতি ও পর্যটনে বিনিয়োগ বেড়েছে। ফলে নতুন পাবলিক আর্ট প্রকল্পও বাস্তবায়িত হচ্ছে। সভ্যতার অংশ হিসেবে শুরু থেকেই দেশটিতে উট ও ঘোড়ার প্রচলন ছিল। বিভিন্ন ভাস্কর্যের মাধ্যমে অতীতের এসব চিহ্ন দেশটি ধরে রেখেছে। সাত বছর আগে সৌদি আরবের তায়েফে কিং ফয়সাল নামের পার্কে নির্মাণ করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উটের ভাস্কর্য। এছাড়া রাজধানী জেদ্দার উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যের মধ্যে আরও রয়েছে নগরীতে মুষ্টিবদ্ধ হাত, হাংরি হর্স, মানব চোখ, মরুর বুকে উটের ভাস্কর্য।

কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত: আধুনিক শিল্পের প্রদর্শনী
কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও মুসলিম প্রধান দেশ হয়েও আধুনিক ভাস্কর্য স্থাপনে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। দেশটির উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো আরবীয় যুগলের মূর্তি, দুবাইয়ের ওয়াফি অঞ্চলের প্রবেশপথে পাহারাদারের প্রতিমূর্তি হিসেবে সংস্থাপিত কুকুরের মূর্তি, দুবাইয়ের ইবনে বতুতা মার্কেটে স্থাপিত মূর্তি।
মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে যেসব ভাস্কর্য দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে, সেগুলোর অধিকাংশই সে দেশে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে মূলত জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, কোন উপাসনার বস্তু হিসেবে নয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে এগুলো নির্মিত। পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজ এগুলোকে ধর্মীয় প্রতীক নয়, সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখে।
অবশ্য সব মুসলিম দেশের অবস্থান এক নয়। কোথাও মানব আকৃতির ভাস্কর্য সীমিত, কোথাও বিমূর্ত শিল্প বেশি, আবার কোথাও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্যও রয়েছে। স্থানীয় ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রাষ্ট্রীয় নীতির ভিত্তিতে এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: মুসলি নেটওয়ার্ক টিভি, দ্য টেলিগ্রাফ, মিডল ইস্ট মনিটর
.png)

এরই মধ্যে র্যাপ এই আন্দোলনের অন্যতম প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক নতুন গান প্রকাশ হচ্ছে, যা মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে লাখো মানুষের কাছে। অনেক পরিচিত র্যাপারও সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন।
৩ ঘণ্টা আগে
পৃথিবীর শিল্পচর্চার সবচেয়ে পুরোনো মাধ্যমগুলোর একটি ভাস্কর্য। এর মাধ্যমে কোনো ঘটনা, ব্যক্তি বা সময়কে আটকে দেওয়া যায়। হাজার বছর থেকেই মানুষ পাথর কেটে বানিয়েছে বিখ্যাত সব ভাস্কর্য। উদ্দেশ্য, মানুষের মনে সেই স্মৃতি জাগিয়ে রাখা।
৫ ঘণ্টা আগে
বিশ শতকের মার্কিন সাহিত্যে অন্যতম প্রভাববিস্তারকারী লেখক ছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। আজ তাঁর জন্মদিন। এক জীবনে বহু ঘটনা, দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি।
১ দিন আগে
১৯৮৬ সালের ২১শে জুলাই। আসামের করিমগঞ্জের বিক্ষোভ মিছিলে জড়ো হয়েছে প্রতিবাদী জনতা। সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস।
২১ জুলাই ২০২৬