অনুবাদক যুগে যুগে
জি এইচ হাবীব

নবম এবং দশম শতকে ইরাকের বাগদাদ শহর ছিল একটি বিপুল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী অনুবাদ যজ্ঞের কেন্দ্র। এর লক্ষ্য ছিল নব্য মুসলিম সাম্রাজ্যের ভাষা আরবিতে প্রাচীন গ্রিসের বিজ্ঞান ও দর্শনবিষয়ক কাজগুলো অনুবাদ করা। অবশ্য সেই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক সিরিয়াক, ফারসি, এবং সংস্কৃত টেক্সট-ও অনূদিত হয়েছিল।
অঞ্চলটি সে-সময়ে জাতিগত, সাংস্কৃতিক, ও বুদ্ধিগত যে উত্থানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল তা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে মুসলিম জগতের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তার বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলা এই প্রকল্পটিকে বোঝা যাবে না।
অবশ্য এর আগে থেকেই প্রাচীন গ্রিসের সম্পদগুলো অধ্যয়নের ও সিরিয়াক (প্রাচীন আরামায়িক) ভাষায় তা অনুবাদের একটি দীর্ঘকালব্যাপী ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন খলিফা ও সহায়তা দানকারী উদ্যোক্তা এই ঐতিহ্যকে নিরবচ্ছিন্নতা দিয়েছিলেন এবং অনুবাদকে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। আরব ইতিহাস-লেখকদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় অনুবাদকদের তাঁরা উদারভাবে পুরস্কৃত করতেন, এমনকি তাঁদের বেতনও প্রদান করতেন। গোটা ইসলামী সভ্যতাজুড়ে লেখালেখির বিস্তারও আরবিতে অনুবাদের ব্যাপারটিকে পুষ্টি যুগিয়েছে।
আরব ইতিহাস-লেখকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন আল-ফিহরিস্ত (ক্যাটালগ)-এর রচয়িতা ইবনে আল-নাদিম। সে-সময়ের প্রধান অনুবাদকেরা প্রতি মাসে ৫০০ সোনার দিরহাম করে পেতেন। বলা হয়ে থাকে খলিফা আল-মামুন হুনাইন ইবনে ইশাককে তাঁর আরবি অনুবাদের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ প্রদান করেছিলেন, এবং বিশেষ রকমের ভারী কাগজে কাজ করে হুনাইন ধনকুবের বনে গিয়েছিলেন।
অষ্টম শতকের মাঝামাঝি নাগাদ, আব্বাসীয় রাজবংশ ইসলামিক সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতায় আসে। ৭৬২ খৃষ্টাব্দে খলিফা আল-মনসুর বাগদাদ নির্মাণ করেন, এবং শহরটিকে তাঁর রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। আব্বাসীয় শাসনামলে ভিনদেশী রচনা অনুবাদসহ বহু পারসিক প্রথা গ্রহণ করা হয়। প্রাক-ইসলামী পারসিক সময়ের সাসানিড রাজ গ্রন্থাগারের আদলে একটি প্রাসাদ গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়। ‘বায়েত আল হিকমা’ বা জ্ঞান/প্রজ্ঞাগৃহ নামে পরিচিত এই গ্রন্থাগার ছিল, নিশ্চিতভাবেই, একটি সংগ্রহশালা বা মহাফেজখানা (আর্কাইভ); সেই সঙ্গে এটাকে অনুবাদ কর্মকাণ্ডের স্থান বলেও মনে করা হয়।
এই জ্ঞান বা প্রজ্ঞাগৃহ বা আসলে সার্বিকভাবে বাগদাদ আন্দোলনকে কতটা একটা ‘স্কুল’ বা ‘ঘরানা’ বলে অভিহিত করা যায় তা নিয়ে বিতর্ক আছে, অনেকটা যেমন তলোদো ‘স্কুল’ নিয়ে নানান আলোচনা রয়েছে। হিস্পানি ভাষাতাত্ত্বিক হুলিও-সেজার সান্তোয়ো তাঁর ‘অনুবাদের ইতিহাসে শূন্যস্থানসমূহ’ শিরোনামের রচনায় সালামা কার, অ্যান্থনি পিম ও দিমিত্রি গুতাসের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘তলোদো’ সম্পর্কে ‘স্কুল’ কথাটার সমালোচনা করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
দিমিত্রি গুতাস লিখছেন, ‘বেশিরভাগই কাল্পনিক এবং কখনো কখনো আধুনিক ইনস্টিটিউশন বা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা প্রকল্পগুলোর ইচ্ছাপূরণমূলক ব্যাপার সেই অষ্টম শতকে আরোপ করে বায়েত আল-হিকমা-র বর্ণনায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রচুর কালি খরচ করা হয়েছে।’ তিনি যেটাকে নেহাতই একটি গ্রন্থাগার বলে বিশ্বাস করেন, যেখানে গ্রীক পাণ্ডুলিপির নয় বরং ফারসি রচনার অনুবাদও হতো, সেটার একটি ‘মিনিমালিস্ট ব্যাখ্যা’-র পক্ষপাতী তিনি। অবশ্য তিনি স্বীকার করেছেন যে বায়েত আল-হিকমা এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যেখানে নিম্নে বর্ণিত গ্রেকো-আরবি তরজমা আন্দোলনের সমৃদ্ধি লাভ করা অসম্ভব ছিল না।
সপ্তম শতকের শেষ দিকে ইসলাম নানা দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে নতুন শাসকেরা কিছু কিছু কাঠামো বা ভবন নির্মাণ এবং আরবিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আরোপ করার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলেন। আরবিতে অনূদিত প্রথম টেক্সটগুলো ছিল প্রশাসনিক: আর্কাইভাল নথিপত্র ও রেজিস্টার বা বিভিন্ন তথ্যসম্ভার।
বিজ্ঞানবিষয়ক লেখাপত্র অনুবাদের বিষয়টি আসে পরে। গ্রীক সংস্কৃতি আত্মসাতের ব্যাপারটি—প্রায়ই যা সিরিয়াক সংস্করণগুলোর মাধ্যমে ঘটত— নবম ও দশম শতকে বাগদাদের অনুবাদকদের কল্যাণে ঘটেছিল। আর এই অনুবাদকদের মধ্যে সেরা ছিলেন হুনাইন ইবনে ইশাক (৮০৯-৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি অবশ্য জোহানিতিউস (Johannitius)– এই লাতিন নামেও পরিচিত।
আরবরা সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল চিকিৎসাশাস্ত্র ও দর্শনের ব্যাপারে। তবে জ্যোতির্বিদ্যাও বেশ জনপ্রিয় ছিল, আর তা থেকে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের বিষয়টি বোঝা যায়। কোন কোন রচনা অনূদিত হবে না-হবে সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রই ঠিক করে দিলেও (এই যেমন, রাজকীয় ও সাম্রাজ্যিক কাঠামোর আরবিকরণই উদ্দেশ্যে) একজন খলিফা বা বা রাজপুরুষের আগ্রহ ও রুচিও সমান গুরুত্ব বহন করত।
আল মনসুর ৭৫৩ খৃষ্টাব্দে ক্ষমতাসীন হন। জ্যোতির্বিদ্যা ছিল তাঁর অত্যন্ত আগ্রহের জায়গা। সম্ভবত এই বিষয়ের ওপর লেখা বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি তিনি ভারত থেকে সংগ্রহ করেন এবং অনুবাদ করান। হারুন অর-রশীদের উত্তরাধিকারী আল মামুন, যিনি কিনা আরব্য রজনী বা সহস্র এক রজনীর বেশ কিছু কাহিনীর নায়ক, মুতাযিলা আন্দোলনের সদস্য ছিলেন। অ্যারিস্টটল যুক্তি-বুদ্ধি (রিযন) বলতে যা বুঝিয়েছিলেন তার সঙ্গে বিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটাবার প্রয়াসে আল-মামুন গ্রীক দার্শনিক রচনা আর সেগুলোর টীকা ভাষ্য আরবিতে অনুবাদে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন।
হুনাইন ও তাঁর বেশ কয়েকজন সহযোগীকে অসংখ্য অনুবাদের কৃতিত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। প্লেটোর সংলাপ এবং রিপাব্লিক, অরগানন নামে পরিচিত অ্যারিস্টটলের যুক্তিবাদী প্রবন্ধাবলি, যার মধ্যে রয়েছে ক্যাটাগরিজ, টপিক্স, অ্যানালিটিক্স এবং মেটাফিজিক্স; অ্যারিস্টটলের ক্যাটাগরিজ-এর পরফিরির রচিত ভূমিকা ইসাগগ (উল্লেখ্য, এই পরফিরি ছিলেন নব্যপ্লেটোবাদের অন্যতম প্রবর্তক); আর মধ্যযুগে যে বইটি অ্যারিস্টটলের লেখা বলে মনে করা হতো– বুক অভ কজেস (লিবার ডি কসিস); কিন্তু পরে জানা গেছে, সেটি নব্যপ্লেটোবাদী ও গ্রিসের শেষ প্রধান দার্শনিক প্রক্লাসের লেখা।
মূল গ্রীক পাণ্ডুলিপি আর প্রয়োজনীয় ভাষাতাত্ত্বিক দক্ষতাসম্পন্ন অনুবাদক পাওয়া সাপেক্ষে আরবিতে কিছু কিছু অনুবাদ সরাসরি গ্রীক থেকে করা হতো। অবশ্য, গ্রীক ও আরবি দুই ভাষাতেই পারদর্শী অনুবাদক তেমন একটা ছিল না, বিশেষ করে এই কালপর্বের গোড়ার দিকে। গ্রীক রচনাগুলো কখনো কখনো আবার অনুবাদ করা হতো, হয় আগের কোনো আরবি বা আরো পুরানো কোনো সিরিয়াক সংস্করণ থেকে, যে-অনুবাদগুলোর কিছু কিছু পঞ্চম শতকে বাইজেন্টিয়াম থেকে নির্বাসিত নেস্টোরীয়রা করেছিলেন। মধ্যস্থতাকারী একটি ভাষা হিসেবে সিরিয়াক তখন প্রায়ই ব্যবহৃত হতো।
অনুবাদক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল হিপোক্রিটাস ও গ্যালনের যেসব লেখাপত্র পাওয়া যায় তার পুরোটা। সেই সঙ্গে ইউক্লিডের এলিমেন্টস ও টলেমির আলমাজেস্ট-এর মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ সব রচনা। বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ক রচনার আদিতম অনুবাদকেরা— ইয়ুহান্না মাসাওয়াহ, ইবনে আল বিতরিক এবং ইবনে জিব্রিল ছিলেন অষ্টম শতকের। পরের শতকের গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদকদের মধ্যে রয়েছেন আল হাজ্জাজ ইবনে মাতার (আনু. ৭৮৬-৮৩৫), ইবনে লুকা (৫২০-৯১২), ইবনে নাঈমা আল হুনসি (আনু. ৮৩৫), ও ইবনে কুরা (৮৩৪-৯০১)।
পরে বিষয়বস্তু ও ফর্ম বা রূপকাঠামোর উন্নতি ঘটানোর জন্য ইয়াহিয়া ইবনে আদি ও মাত্তা ইবনে ইউুনুস পরবর্তী অনুবাদগুলোর পরিমার্জনায় হাত দেন। এ সবই আরবিকে একটি বৈজ্ঞানিক ভাষা হিসেবে সমৃদ্ধ ও সংহত করতে সহায়তা করেছিল।
অনুবাদকেরা প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের অনুবাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতেন, যদিও যে-সময় জ্ঞান এখনকার চাইতে অনেক কম খণ্ড-বিখণ্ড ছিল সে-সময়ের পরিপেক্ষিতে বিশেষজ্ঞ শব্দটা সম্ভবত যথার্থ নয়। ইয়ুহান্না মাসাওয়াথ এবং হুনাইন ইবনে ইশাক নিজেরাই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। সত্যি বলতে, চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর ভালো দখলকেই হুনাইনের উঁচু মানের অনুবাদের কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। গ্যালেন অনুবাদের কৃতিত্ব তাঁর, সেই সঙ্গে রয়েছে কিছু মৌলিক কাজ: চিকিৎসাশাস্ত্রীয় প্রশ্নাবলি, চোখ ও দাঁত সম্পর্কিত গবেষণাপত্র। তাছাড়া, তিনি চক্ষুচিকিৎসাশাস্ত্রের গোড়া পত্তন করেন, আর সেটার ওপর ভিত্তি করেই রাজেস তাঁর গবেষণা পরিচালনা করেন।
এই নির্দিষ্ট কালপর্বে, জ্ঞান হস্তান্তরে অনুবাদকদের ভূমিকার তুলনায় তাঁদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব-ও কোনো অংশে কম ছিল না, যদিও উল্লেখ্য যে তাদের অনুবাদের পরিমাণও প্রকৃতপক্ষে নেহাত কম ছিল না। অনূদিত রচনাটি যে চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল তা নয়, বরং সেটা ছিল একটি অনুঘটক যা মৌলিক ভাবনা এবং জ্ঞান সৃষ্টিতে উদ্দীপনা জোগাত। প্রায় ক্ষেত্রেই অনুবাদের সঙ্গে থাকত ভাষ্য, সারাংশ, বা ব্যাখ্যাসূচক টীকাটিপ্পনী, যার উদ্দেশ্য ছিল মূল রচনাকে আরও বোধগম্য করে তোলা এবং সেগুলো যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করত তার উত্তর দিয়ে সেগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করা।
নিজেদের উৎস রচনাগুলোর সাহায্য নিযে অনুবাদকেরা তাঁদের নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন, নতুন ধ্যান-ধারণা প্রবর্তন করতেন এবং নতুন বিতর্ক উসকে দিতেন। এভাবে অনুবাদ একটি নতুন চিন্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল যা পরে আরবি-ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তি হয়ে ওঠে—ধারণাগত এবং পরিভাষাগত, এই দুই স্তরেই।
এক বা দুই শতক আগে, সিরিয়াক অনুবাদকেরা গ্রীক দার্শনিক রচনার অনুবাদে সমান্তরাল ভাষ্য যোগ করেছিলেন এবং তার মাধ্যমে তাঁদের নিজস্ব নিওপ্লেটোনিক ধ্যান-ধারণার একটি স্তর যুক্ত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দ্বাদশ শতাব্দীর দার্শনিক আবু রুশদ (১১২৬-৯৮ খৃ.) পূর্ববর্তী সিরিয়াক ও আরবি অনুবাদকদের জবরজং সংযোজন বাদ দিয়ে মূল পাঠ্যগুলো আবার অনুবাদ করার মাধ্যমে অ্যারিস্টটলীয় চিন্তাধারাকে সেটার বিশুদ্ধ ও আদি রূপে ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করেন।
নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা সৃষ্টির ক্ষেত্রে—বিশেষ করে যখন অনূদিত টেক্সট একটি নির্দিষ্ট চিন্তাপদ্ধতির মধ্যে একীভূত করা হয়, অনুবাদ বেশ কার্যকর। ইশাক ইবনে হুনান প্রোক্লাসের একটি অনুবাদে কার্যকারণ সূত্রের বা ধারণার হেলেনিস্টিক ধারণা অথবা ‘দ্য ওয়ান’-এর নীতি ব্যবহারের বদলে ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বর’-এর কথা উল্লেখ করেন। এই পদ্ধতিটিকে তলেদো স্কুলের অনুবাদকদের পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তাঁদের কাছে কোনো রেফারেন্স ‘অ-রক্ষণশীল’ বা ‘গোঁড়ামিমুক্ত’ মনে হলে তাঁরা সেটি এড়িয়ে যেতেন, যাতে তাঁদের খৃষ্টান পাঠকেরা আহত না হন।
যথাযথ পরিভাষা তৈরির ক্ষেত্রেও অনুবাদকেরা তাঁদের সৃজনশীলতা প্রয়োগ করেছিলেন। গোড়ার দিককার আরবি অনুবাদকেরা প্রতিবরর্ণীকরণ ব্যবহারেও বাধ্য হয়েছিলেন, অংশত তাঁর কারণ ছিল আরবি ভাষায় তাঁদের দক্ষতা সবসময় যে যথেষ্ট ছিল তা নয়। তবে তা এজন্যেও যে, ভাষাটি তখনো প্রয়োজনীয় দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক শব্দরাজি (লেক্সিকন) অর্জন করে উঠতে পারেনি।
এই আদি অনুবাদগুলো পরিমার্জনা করার মাত্র শ খানেক বছর পর প্রতিবর্ণীকৃত শব্দগুলো নতুন তৈরি-করা কিছু শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হলো এবং সেগুলো আরবি ভাষার শব্দগঠনবিদ্যার কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
অনুবাদক হুনাইন তাঁর পেডানিয়াস দিওসকরিদেস রচিত মেটেরিয়া মেডিকার আরবি অনুবাদে গ্রীক প্রতিশব্দগুলোর জায়গায় তুলনীয় আরবি শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলেন, যেগুলো আসলে মূল বা আদি অনুবাদক ইসতিফান ইবনে বাসিল প্রয়োগ করেছিলেন।
মূল্যবান পাণ্ডুলিপি সন্ধানের মাধ্যমে অনুবাদকেরা জ্ঞান বিতরণে কিছুটা হলেও সাহায্য করেছিলেন। বিভিন্ন অনুবাদক ও তাদের সহযোগিতাকারী সমর্থকেরা যে গ্রীক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, ও সেগুলোর অনুবাদে হাত দেবার আগে সেসব পাণ্ডুলিপির নির্ভেজালত্ব নিরূপণে বহুদূর অব্দি অগ্রসর হয়েছিলেন সেকথা ইতিহাসে বার বার উল্লিখিত হয়েছে।
আরবি অনুবাদকেদের কাজগুলো যে সবসময় একান্তভাবেই পণ্ডিত পাঠকদের উদ্দেশে নিবেদিত হয়েছে তা নয়। যদিও তাঁরা সাধারণত কোনো পৃষ্ঠপোষক বা পণ্ডিতের ফরমায়েশে কাজগুলো করতেন, তারপরেও মাঝে মধ্যে তা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যেই করা হতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হুনাইন কখনো সখনো চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নরত তাঁর ছাত্রদের উপকারের জন্য অনুবাদ করতেন এবং তিনি তাঁর সহযোগীদের বোধগম্যতা ও প্রাঞ্জলতার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করতেন।
হুনাইন তাঁর পত্রাবলির একটিতে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি হিপোক্রেটিক শপথ-এর ওপর রচিত একটি ভাষ্যের সিরিয়াক অনুবাদে ‘কঠিন অনুচ্ছেদগুলোর ব্যাখ্যা’ যোগ করেছিলেন। তিনি তাঁর অনুবাদে এমন একটি শৈলী অবলম্বন করার দিকে লক্ষ্য রাখতেন যা ‘চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ নন, বা দর্শনের সঙ্গে অপরিচিত’ এমন যে কেউ বুঝতে পারে।
নবম শতাব্দীতে বাগদাদে অনুবাদ নিয়ে যে সমৃদ্ধ কর্মউদ্যোগ গড়ে উঠেছিল তা চীন, ভারত, পারস্য এবং সর্বোপরি গ্রিসের সাংস্কৃতিক সম্পদের আরবীয় আত্মীকরণে একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। ত্রয়োদশ শতকে আরব আধিপত্যের অবসান না হওয়া অব্দি সাম্রাজ্যজুড়ে ব্যাপক অনুবাদ কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।
অনূদিত রচনাগুলি কাঁচামাল হিসাবে কাজ করেছিল, আর সেই কাঁচামাল আরব অনুবাদকদের সৃজনশীল প্রতিভাকে পুষ্টি যোগাচ্ছিল এবং সেই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে বিজ্ঞানের বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছিল। জ্ঞান সঞ্চালনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি ঘটেছিল দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, যখন অনুবাদের প্রধান কেন্দ্রটি পশ্চিম দিকে সরে গিয়েছিল।
অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

নবম এবং দশম শতকে ইরাকের বাগদাদ শহর ছিল একটি বিপুল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী অনুবাদ যজ্ঞের কেন্দ্র। এর লক্ষ্য ছিল নব্য মুসলিম সাম্রাজ্যের ভাষা আরবিতে প্রাচীন গ্রিসের বিজ্ঞান ও দর্শনবিষয়ক কাজগুলো অনুবাদ করা। অবশ্য সেই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক সিরিয়াক, ফারসি, এবং সংস্কৃত টেক্সট-ও অনূদিত হয়েছিল।
অঞ্চলটি সে-সময়ে জাতিগত, সাংস্কৃতিক, ও বুদ্ধিগত যে উত্থানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল তা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে মুসলিম জগতের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তার বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলা এই প্রকল্পটিকে বোঝা যাবে না।
অবশ্য এর আগে থেকেই প্রাচীন গ্রিসের সম্পদগুলো অধ্যয়নের ও সিরিয়াক (প্রাচীন আরামায়িক) ভাষায় তা অনুবাদের একটি দীর্ঘকালব্যাপী ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন খলিফা ও সহায়তা দানকারী উদ্যোক্তা এই ঐতিহ্যকে নিরবচ্ছিন্নতা দিয়েছিলেন এবং অনুবাদকে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। আরব ইতিহাস-লেখকদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় অনুবাদকদের তাঁরা উদারভাবে পুরস্কৃত করতেন, এমনকি তাঁদের বেতনও প্রদান করতেন। গোটা ইসলামী সভ্যতাজুড়ে লেখালেখির বিস্তারও আরবিতে অনুবাদের ব্যাপারটিকে পুষ্টি যুগিয়েছে।
আরব ইতিহাস-লেখকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন আল-ফিহরিস্ত (ক্যাটালগ)-এর রচয়িতা ইবনে আল-নাদিম। সে-সময়ের প্রধান অনুবাদকেরা প্রতি মাসে ৫০০ সোনার দিরহাম করে পেতেন। বলা হয়ে থাকে খলিফা আল-মামুন হুনাইন ইবনে ইশাককে তাঁর আরবি অনুবাদের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ প্রদান করেছিলেন, এবং বিশেষ রকমের ভারী কাগজে কাজ করে হুনাইন ধনকুবের বনে গিয়েছিলেন।
অষ্টম শতকের মাঝামাঝি নাগাদ, আব্বাসীয় রাজবংশ ইসলামিক সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতায় আসে। ৭৬২ খৃষ্টাব্দে খলিফা আল-মনসুর বাগদাদ নির্মাণ করেন, এবং শহরটিকে তাঁর রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। আব্বাসীয় শাসনামলে ভিনদেশী রচনা অনুবাদসহ বহু পারসিক প্রথা গ্রহণ করা হয়। প্রাক-ইসলামী পারসিক সময়ের সাসানিড রাজ গ্রন্থাগারের আদলে একটি প্রাসাদ গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়। ‘বায়েত আল হিকমা’ বা জ্ঞান/প্রজ্ঞাগৃহ নামে পরিচিত এই গ্রন্থাগার ছিল, নিশ্চিতভাবেই, একটি সংগ্রহশালা বা মহাফেজখানা (আর্কাইভ); সেই সঙ্গে এটাকে অনুবাদ কর্মকাণ্ডের স্থান বলেও মনে করা হয়।
এই জ্ঞান বা প্রজ্ঞাগৃহ বা আসলে সার্বিকভাবে বাগদাদ আন্দোলনকে কতটা একটা ‘স্কুল’ বা ‘ঘরানা’ বলে অভিহিত করা যায় তা নিয়ে বিতর্ক আছে, অনেকটা যেমন তলোদো ‘স্কুল’ নিয়ে নানান আলোচনা রয়েছে। হিস্পানি ভাষাতাত্ত্বিক হুলিও-সেজার সান্তোয়ো তাঁর ‘অনুবাদের ইতিহাসে শূন্যস্থানসমূহ’ শিরোনামের রচনায় সালামা কার, অ্যান্থনি পিম ও দিমিত্রি গুতাসের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘তলোদো’ সম্পর্কে ‘স্কুল’ কথাটার সমালোচনা করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
দিমিত্রি গুতাস লিখছেন, ‘বেশিরভাগই কাল্পনিক এবং কখনো কখনো আধুনিক ইনস্টিটিউশন বা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা প্রকল্পগুলোর ইচ্ছাপূরণমূলক ব্যাপার সেই অষ্টম শতকে আরোপ করে বায়েত আল-হিকমা-র বর্ণনায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রচুর কালি খরচ করা হয়েছে।’ তিনি যেটাকে নেহাতই একটি গ্রন্থাগার বলে বিশ্বাস করেন, যেখানে গ্রীক পাণ্ডুলিপির নয় বরং ফারসি রচনার অনুবাদও হতো, সেটার একটি ‘মিনিমালিস্ট ব্যাখ্যা’-র পক্ষপাতী তিনি। অবশ্য তিনি স্বীকার করেছেন যে বায়েত আল-হিকমা এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যেখানে নিম্নে বর্ণিত গ্রেকো-আরবি তরজমা আন্দোলনের সমৃদ্ধি লাভ করা অসম্ভব ছিল না।
সপ্তম শতকের শেষ দিকে ইসলাম নানা দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে নতুন শাসকেরা কিছু কিছু কাঠামো বা ভবন নির্মাণ এবং আরবিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আরোপ করার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলেন। আরবিতে অনূদিত প্রথম টেক্সটগুলো ছিল প্রশাসনিক: আর্কাইভাল নথিপত্র ও রেজিস্টার বা বিভিন্ন তথ্যসম্ভার।
বিজ্ঞানবিষয়ক লেখাপত্র অনুবাদের বিষয়টি আসে পরে। গ্রীক সংস্কৃতি আত্মসাতের ব্যাপারটি—প্রায়ই যা সিরিয়াক সংস্করণগুলোর মাধ্যমে ঘটত— নবম ও দশম শতকে বাগদাদের অনুবাদকদের কল্যাণে ঘটেছিল। আর এই অনুবাদকদের মধ্যে সেরা ছিলেন হুনাইন ইবনে ইশাক (৮০৯-৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি অবশ্য জোহানিতিউস (Johannitius)– এই লাতিন নামেও পরিচিত।
আরবরা সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল চিকিৎসাশাস্ত্র ও দর্শনের ব্যাপারে। তবে জ্যোতির্বিদ্যাও বেশ জনপ্রিয় ছিল, আর তা থেকে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের বিষয়টি বোঝা যায়। কোন কোন রচনা অনূদিত হবে না-হবে সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রই ঠিক করে দিলেও (এই যেমন, রাজকীয় ও সাম্রাজ্যিক কাঠামোর আরবিকরণই উদ্দেশ্যে) একজন খলিফা বা বা রাজপুরুষের আগ্রহ ও রুচিও সমান গুরুত্ব বহন করত।
আল মনসুর ৭৫৩ খৃষ্টাব্দে ক্ষমতাসীন হন। জ্যোতির্বিদ্যা ছিল তাঁর অত্যন্ত আগ্রহের জায়গা। সম্ভবত এই বিষয়ের ওপর লেখা বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি তিনি ভারত থেকে সংগ্রহ করেন এবং অনুবাদ করান। হারুন অর-রশীদের উত্তরাধিকারী আল মামুন, যিনি কিনা আরব্য রজনী বা সহস্র এক রজনীর বেশ কিছু কাহিনীর নায়ক, মুতাযিলা আন্দোলনের সদস্য ছিলেন। অ্যারিস্টটল যুক্তি-বুদ্ধি (রিযন) বলতে যা বুঝিয়েছিলেন তার সঙ্গে বিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটাবার প্রয়াসে আল-মামুন গ্রীক দার্শনিক রচনা আর সেগুলোর টীকা ভাষ্য আরবিতে অনুবাদে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন।
হুনাইন ও তাঁর বেশ কয়েকজন সহযোগীকে অসংখ্য অনুবাদের কৃতিত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। প্লেটোর সংলাপ এবং রিপাব্লিক, অরগানন নামে পরিচিত অ্যারিস্টটলের যুক্তিবাদী প্রবন্ধাবলি, যার মধ্যে রয়েছে ক্যাটাগরিজ, টপিক্স, অ্যানালিটিক্স এবং মেটাফিজিক্স; অ্যারিস্টটলের ক্যাটাগরিজ-এর পরফিরির রচিত ভূমিকা ইসাগগ (উল্লেখ্য, এই পরফিরি ছিলেন নব্যপ্লেটোবাদের অন্যতম প্রবর্তক); আর মধ্যযুগে যে বইটি অ্যারিস্টটলের লেখা বলে মনে করা হতো– বুক অভ কজেস (লিবার ডি কসিস); কিন্তু পরে জানা গেছে, সেটি নব্যপ্লেটোবাদী ও গ্রিসের শেষ প্রধান দার্শনিক প্রক্লাসের লেখা।
মূল গ্রীক পাণ্ডুলিপি আর প্রয়োজনীয় ভাষাতাত্ত্বিক দক্ষতাসম্পন্ন অনুবাদক পাওয়া সাপেক্ষে আরবিতে কিছু কিছু অনুবাদ সরাসরি গ্রীক থেকে করা হতো। অবশ্য, গ্রীক ও আরবি দুই ভাষাতেই পারদর্শী অনুবাদক তেমন একটা ছিল না, বিশেষ করে এই কালপর্বের গোড়ার দিকে। গ্রীক রচনাগুলো কখনো কখনো আবার অনুবাদ করা হতো, হয় আগের কোনো আরবি বা আরো পুরানো কোনো সিরিয়াক সংস্করণ থেকে, যে-অনুবাদগুলোর কিছু কিছু পঞ্চম শতকে বাইজেন্টিয়াম থেকে নির্বাসিত নেস্টোরীয়রা করেছিলেন। মধ্যস্থতাকারী একটি ভাষা হিসেবে সিরিয়াক তখন প্রায়ই ব্যবহৃত হতো।
অনুবাদক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল হিপোক্রিটাস ও গ্যালনের যেসব লেখাপত্র পাওয়া যায় তার পুরোটা। সেই সঙ্গে ইউক্লিডের এলিমেন্টস ও টলেমির আলমাজেস্ট-এর মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ সব রচনা। বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ক রচনার আদিতম অনুবাদকেরা— ইয়ুহান্না মাসাওয়াহ, ইবনে আল বিতরিক এবং ইবনে জিব্রিল ছিলেন অষ্টম শতকের। পরের শতকের গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদকদের মধ্যে রয়েছেন আল হাজ্জাজ ইবনে মাতার (আনু. ৭৮৬-৮৩৫), ইবনে লুকা (৫২০-৯১২), ইবনে নাঈমা আল হুনসি (আনু. ৮৩৫), ও ইবনে কুরা (৮৩৪-৯০১)।
পরে বিষয়বস্তু ও ফর্ম বা রূপকাঠামোর উন্নতি ঘটানোর জন্য ইয়াহিয়া ইবনে আদি ও মাত্তা ইবনে ইউুনুস পরবর্তী অনুবাদগুলোর পরিমার্জনায় হাত দেন। এ সবই আরবিকে একটি বৈজ্ঞানিক ভাষা হিসেবে সমৃদ্ধ ও সংহত করতে সহায়তা করেছিল।
অনুবাদকেরা প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের অনুবাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতেন, যদিও যে-সময় জ্ঞান এখনকার চাইতে অনেক কম খণ্ড-বিখণ্ড ছিল সে-সময়ের পরিপেক্ষিতে বিশেষজ্ঞ শব্দটা সম্ভবত যথার্থ নয়। ইয়ুহান্না মাসাওয়াথ এবং হুনাইন ইবনে ইশাক নিজেরাই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। সত্যি বলতে, চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর ভালো দখলকেই হুনাইনের উঁচু মানের অনুবাদের কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। গ্যালেন অনুবাদের কৃতিত্ব তাঁর, সেই সঙ্গে রয়েছে কিছু মৌলিক কাজ: চিকিৎসাশাস্ত্রীয় প্রশ্নাবলি, চোখ ও দাঁত সম্পর্কিত গবেষণাপত্র। তাছাড়া, তিনি চক্ষুচিকিৎসাশাস্ত্রের গোড়া পত্তন করেন, আর সেটার ওপর ভিত্তি করেই রাজেস তাঁর গবেষণা পরিচালনা করেন।
এই নির্দিষ্ট কালপর্বে, জ্ঞান হস্তান্তরে অনুবাদকদের ভূমিকার তুলনায় তাঁদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব-ও কোনো অংশে কম ছিল না, যদিও উল্লেখ্য যে তাদের অনুবাদের পরিমাণও প্রকৃতপক্ষে নেহাত কম ছিল না। অনূদিত রচনাটি যে চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল তা নয়, বরং সেটা ছিল একটি অনুঘটক যা মৌলিক ভাবনা এবং জ্ঞান সৃষ্টিতে উদ্দীপনা জোগাত। প্রায় ক্ষেত্রেই অনুবাদের সঙ্গে থাকত ভাষ্য, সারাংশ, বা ব্যাখ্যাসূচক টীকাটিপ্পনী, যার উদ্দেশ্য ছিল মূল রচনাকে আরও বোধগম্য করে তোলা এবং সেগুলো যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করত তার উত্তর দিয়ে সেগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করা।
নিজেদের উৎস রচনাগুলোর সাহায্য নিযে অনুবাদকেরা তাঁদের নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন, নতুন ধ্যান-ধারণা প্রবর্তন করতেন এবং নতুন বিতর্ক উসকে দিতেন। এভাবে অনুবাদ একটি নতুন চিন্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল যা পরে আরবি-ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তি হয়ে ওঠে—ধারণাগত এবং পরিভাষাগত, এই দুই স্তরেই।
এক বা দুই শতক আগে, সিরিয়াক অনুবাদকেরা গ্রীক দার্শনিক রচনার অনুবাদে সমান্তরাল ভাষ্য যোগ করেছিলেন এবং তার মাধ্যমে তাঁদের নিজস্ব নিওপ্লেটোনিক ধ্যান-ধারণার একটি স্তর যুক্ত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দ্বাদশ শতাব্দীর দার্শনিক আবু রুশদ (১১২৬-৯৮ খৃ.) পূর্ববর্তী সিরিয়াক ও আরবি অনুবাদকদের জবরজং সংযোজন বাদ দিয়ে মূল পাঠ্যগুলো আবার অনুবাদ করার মাধ্যমে অ্যারিস্টটলীয় চিন্তাধারাকে সেটার বিশুদ্ধ ও আদি রূপে ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করেন।
নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা সৃষ্টির ক্ষেত্রে—বিশেষ করে যখন অনূদিত টেক্সট একটি নির্দিষ্ট চিন্তাপদ্ধতির মধ্যে একীভূত করা হয়, অনুবাদ বেশ কার্যকর। ইশাক ইবনে হুনান প্রোক্লাসের একটি অনুবাদে কার্যকারণ সূত্রের বা ধারণার হেলেনিস্টিক ধারণা অথবা ‘দ্য ওয়ান’-এর নীতি ব্যবহারের বদলে ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বর’-এর কথা উল্লেখ করেন। এই পদ্ধতিটিকে তলেদো স্কুলের অনুবাদকদের পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তাঁদের কাছে কোনো রেফারেন্স ‘অ-রক্ষণশীল’ বা ‘গোঁড়ামিমুক্ত’ মনে হলে তাঁরা সেটি এড়িয়ে যেতেন, যাতে তাঁদের খৃষ্টান পাঠকেরা আহত না হন।
যথাযথ পরিভাষা তৈরির ক্ষেত্রেও অনুবাদকেরা তাঁদের সৃজনশীলতা প্রয়োগ করেছিলেন। গোড়ার দিককার আরবি অনুবাদকেরা প্রতিবরর্ণীকরণ ব্যবহারেও বাধ্য হয়েছিলেন, অংশত তাঁর কারণ ছিল আরবি ভাষায় তাঁদের দক্ষতা সবসময় যে যথেষ্ট ছিল তা নয়। তবে তা এজন্যেও যে, ভাষাটি তখনো প্রয়োজনীয় দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক শব্দরাজি (লেক্সিকন) অর্জন করে উঠতে পারেনি।
এই আদি অনুবাদগুলো পরিমার্জনা করার মাত্র শ খানেক বছর পর প্রতিবর্ণীকৃত শব্দগুলো নতুন তৈরি-করা কিছু শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হলো এবং সেগুলো আরবি ভাষার শব্দগঠনবিদ্যার কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
অনুবাদক হুনাইন তাঁর পেডানিয়াস দিওসকরিদেস রচিত মেটেরিয়া মেডিকার আরবি অনুবাদে গ্রীক প্রতিশব্দগুলোর জায়গায় তুলনীয় আরবি শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলেন, যেগুলো আসলে মূল বা আদি অনুবাদক ইসতিফান ইবনে বাসিল প্রয়োগ করেছিলেন।
মূল্যবান পাণ্ডুলিপি সন্ধানের মাধ্যমে অনুবাদকেরা জ্ঞান বিতরণে কিছুটা হলেও সাহায্য করেছিলেন। বিভিন্ন অনুবাদক ও তাদের সহযোগিতাকারী সমর্থকেরা যে গ্রীক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, ও সেগুলোর অনুবাদে হাত দেবার আগে সেসব পাণ্ডুলিপির নির্ভেজালত্ব নিরূপণে বহুদূর অব্দি অগ্রসর হয়েছিলেন সেকথা ইতিহাসে বার বার উল্লিখিত হয়েছে।
আরবি অনুবাদকেদের কাজগুলো যে সবসময় একান্তভাবেই পণ্ডিত পাঠকদের উদ্দেশে নিবেদিত হয়েছে তা নয়। যদিও তাঁরা সাধারণত কোনো পৃষ্ঠপোষক বা পণ্ডিতের ফরমায়েশে কাজগুলো করতেন, তারপরেও মাঝে মধ্যে তা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যেই করা হতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হুনাইন কখনো সখনো চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নরত তাঁর ছাত্রদের উপকারের জন্য অনুবাদ করতেন এবং তিনি তাঁর সহযোগীদের বোধগম্যতা ও প্রাঞ্জলতার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করতেন।
হুনাইন তাঁর পত্রাবলির একটিতে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি হিপোক্রেটিক শপথ-এর ওপর রচিত একটি ভাষ্যের সিরিয়াক অনুবাদে ‘কঠিন অনুচ্ছেদগুলোর ব্যাখ্যা’ যোগ করেছিলেন। তিনি তাঁর অনুবাদে এমন একটি শৈলী অবলম্বন করার দিকে লক্ষ্য রাখতেন যা ‘চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ নন, বা দর্শনের সঙ্গে অপরিচিত’ এমন যে কেউ বুঝতে পারে।
নবম শতাব্দীতে বাগদাদে অনুবাদ নিয়ে যে সমৃদ্ধ কর্মউদ্যোগ গড়ে উঠেছিল তা চীন, ভারত, পারস্য এবং সর্বোপরি গ্রিসের সাংস্কৃতিক সম্পদের আরবীয় আত্মীকরণে একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। ত্রয়োদশ শতকে আরব আধিপত্যের অবসান না হওয়া অব্দি সাম্রাজ্যজুড়ে ব্যাপক অনুবাদ কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।
অনূদিত রচনাগুলি কাঁচামাল হিসাবে কাজ করেছিল, আর সেই কাঁচামাল আরব অনুবাদকদের সৃজনশীল প্রতিভাকে পুষ্টি যোগাচ্ছিল এবং সেই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে বিজ্ঞানের বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছিল। জ্ঞান সঞ্চালনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি ঘটেছিল দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, যখন অনুবাদের প্রধান কেন্দ্রটি পশ্চিম দিকে সরে গিয়েছিল।
অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

কোরবানির ঈদ মানেই যেন গরুর হাঁকডাক আর মাংস কাটাকাটির বিশাল আয়োজন। যদিও ইসলাম ধর্মে কোরবানির জন্য শুধু গরু নয় ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, উট কিংবা মহিষও বৈধ পশু। তবুও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে গরুই কোরবানির সবচেয়ে জনপ্রিয় পশু।
৪ ঘণ্টা আগে
কোরবানির ঈদ মাংস কাটার পর হাতে মাংসের কড়া গন্ধ থেকে যায়। কাঁচা মাংসের এই আঁশটে গন্ধ সহজে পিছু ছাড়তে চায় না। অনেক সময় সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধোয়ার পরও এই অস্বস্তিকর গন্ধ দূর হয়
৪ ঘণ্টা আগে
মানুষ সম্ভবত কথা বলার আগেই সুর চিনেছিল। পৃথিবীর শব্দ শুনেছিল। নদীর গর্জন, বাতাসের চলন, পাখির ডাক, বৃষ্টির ছন্দ—এসবের মধ্যেই মানুষ প্রথম উপলব্ধি করেছিল যে অস্তিত্ব নিছক নীরব নয়; বরং সবকিছুই এক গভীর অনুরণনের অংশ।
৫ ঘণ্টা আগে
একবার বেশ তোপের মুখে পড়েছিলেন বিষাদ-সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন। তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন প্রতিবেশী মুসলমানেরা। যদিও তখন তিনি মুসলমানের ইতিহাস থেকেই লিখছিলেন কারবালার কাহিনি। কিন্তু উপন্যাসটির শেষ খণ্ড বের হবার আগেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই লেখককে পড়তে হয় বিতর্কের মুখে।
১৫ ঘণ্টা আগে