মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ
তামান্না আনজুম

১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় ব্যঙ্গপত্র অচলপত্র একটি কার্টুন প্রকাশ করেছিল। নাম ‘বেঙ্গলের হিরো’। সেখানে হাঁটতে থাকা একটি শিশুর মুখে বসানো হয়েছিল এক নবাগত অভিনেতার চেহারা। প্রেমিকার গলায় ঝুলে সে বলছে, ‘ডার্লিং, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’ সেই মুখটি ছিল উত্তম কুমার চট্টোপাধ্যায়ের। যাকে আমরা চিনি ‘উত্তম কুমার’ নামে। পশ্চিমবঙ্গের দ্য ওয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে এই তথ্য পাওয়া যায়।
তখন উত্তম কুমার ক্যালকাটা পোর্ট কমিশনার অফিসে কেরানির চাকরি করতেন। দিনের কাজ শেষ করেই ছুটতেন স্টুডিওপাড়ায়। অভিনয়ের সুযোগ খুঁজতেন নিরলসভাবে। প্রথম দিকের ছবিগুলোর কোনটিই সাফল্যের মুখ দেখেনি। জানা যায়, স্টুডিওপাড়ায় তাঁর নাম হয়ে যায় ‘ফ্লপ মাস্টার’। কিন্তু হার মানেননি উত্তম কুমার। তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দৃষ্টিদান’। এর আগে ‘মায়াডোর’ ছবিতে অভিনয় করলেও পরে আর ছবিটি মুক্তি পায়নি। ‘বসু পরিবার’ ছবিতে অভিনয় করে প্রথম দর্শকের নজরে আসেন। সেই পরিচয় আরও পাকাপোক্ত হয় ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ। এই সিনেমাতেই প্রথমবারের মতো উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে একসঙ্গে অভিনয় করতে দেখা যায়।
১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে উত্তম কুমার কিংবা সুচিত্রা সেন কেউই প্রধান চরিত্রে ছিলেন না। কমেডি ধাঁচের এই ছবির পোস্টারেও তাঁদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল না। ব্যবসায়িক বিচারে প্রদর্শকেরা অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীকেই পোস্টারের প্রধান মুখ করেছিলেন। কিন্তু ছবি মুক্তির পর হিসাব বদলে যায়। দর্শক আবিষ্কার করেন নতুন এক রোমান্টিক জুটি। উত্তম ও সুচিত্রার অভিনয় মুগ্ধ করে সবাইকে। কলকাতার বাংলা সিনেমা যেন খুঁজে পায় নতুন প্রাণ। বহুদিন ধরে একটি আদর্শ রোমান্টিক জুটির অপেক্ষায় থাকা চলচ্চিত্রশিল্প যেন ফিরে পায় নতুন গতি।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘পথে হলো দেরী’, ‘মরণের পর’, ‘শাপমোচন’, ‘শিল্পী’, ‘সাগরিকা’, ‘হারানো সুর’, ‘সবার উপরে’, ‘সূর্যতোরণ’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘সপ্তপদী’, ‘জীবনতৃষ্ণা’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘আলো আমার আলো’-সহ ত্রিশটিরও বেশি ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেন তাঁরা। এই জুটি কলকাতার বাংলা সিনেমায় বদলে দেয় প্রণয়ের ভাষা। নারী-পুরুষের সম্পর্কের রোমান্টিক ধারণায় তাঁরা হয়ে ওঠেন বাঙালির আইকন।
১৯৫৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হারানো সুর’ বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ছবিটি জাতীয় পুরস্কারও জিতে নেয়। পুরস্কার নিতে উত্তম কুমারকে দিল্লি যেতে হবে। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই হাওড়া স্টেশনে ভিড় করেন হাজার-হাজার অনুরাগী। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে এগিয়ে আসতে হয়। শেষ পর্যন্ত স্টেশনের উল্টো গেট দিয়ে তাঁকে ট্রেনে তোলা হয়। যে মানুষকে একসময় স্টুডিওপাড়ায় ‘ফ্লপ মাস্টার’ নাম দেওয়া হয়েছিল, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনিই হয়ে ওঠেন ‘উত্তম কুমার’।
পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকের উত্তম কুমারের এই উত্থান ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। শুধু পশ্চিমবাংলায় নয়, বাংলাদেশেও উত্তম কুমার জনপ্রিয় ছিল। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, উত্তম কুমার দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের অভিনেতা। দেশভাগের দগদগে ক্ষত আর টানাপোড়েনে দুই বাংলাই ধুকছে। ঠিক তখনই উত্তম কুমার পর্দায় এলেন ‘নায়ক’ হিসেবে। যে নায়কটি দেখতে ঠিক ‘নায়কের’ মতো নয়। কখনও মনে হয়, তিনি পাশের বাড়ির ছেলে, কখনও বাসে-ট্রামে ঝুলতে থাকা সাধারণ যাত্রী, মধ্যবিত্ত সংসারের টানাপোড়েনে ক্লান্ত যুবক।

সেই রূপকথাকেই অন্য আলোয় দেখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। উত্তম কুমারকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রেখে নির্মাণ করেন ‘নায়ক’। ছবির গল্পে দেখা যায়, কলকাতা থেকে দিল্লি যাচ্ছেন জনপ্রিয় অভিনেতা অরিন্দম মুখার্জি। বাইরে তিনি সুপারস্টার। কিন্তু ভেতরে ভীষণ একা। সাফল্যের ঝলকানির আড়ালে তাঁকে তাড়া করে বেড়ায় ভয়, অপরাধবোধ, দ্বিধা আর নিঃসঙ্গতা। বাস্তবের উত্তম কুমারের সঙ্গে এই চরিত্রের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন অনেকেই। সত্যজিৎ রায়ের ভাবনায় এই চরিত্র জন্ম নিয়েছিল উত্তম কুমারকে সামনে রেখেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের এক অভিনয়পাগল যুবক। সিনেমায় নেমে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠেন। এরপর তার মানসিক জগতে কী পরিবর্তন আসে, সেই প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয় গল্প। সত্যজিৎ রায় পরে লিখেছিলেন, তাঁকে আগেই বলা হয়েছিল, এটি প্রচলিত প্রেমের গল্প নয়। তাই পরিচিত অভিনয়ভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছবিতে প্রেম থাকলেও তা প্রচ্ছন্ন। এই নায়কের গুণ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে দুর্বলতাও।
ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর অভিনয় করেছিলেন তরুণী সাংবাদিকের ভূমিকায়। ট্রেনেই প্রথম দেখা হয় অরিন্দমের। সেই প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্যে দেখা যায়, শর্মিলা এগিয়ে গিয়ে অটোগ্রাফ চান। উত্তম কুমার পকেট থেকে কলম বের করেন। কাগজে সই করার সময় দেখা যায়, কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। তা দেখে সত্যজিৎ রায় যখনই ‘কাট’ বলতে যাবেন, তখনই উত্তম কুমার সংলাপ বলতে বলতেই কলম ঝাঁকিয়ে নেন যাতে কালি বের হয়। তাতেও কালি না বের হওয়ায় সামনে রাখা পানির গ্লাসে কলম ভিজিয়ে আবার অটোগ্রাফ দেন। অথচ কলম ঝাঁকানোর এই পুরো ঘটনাই ছিল অপরিকল্পিত। অর্থাৎ স্ক্রিপ্টে এমনকিছু লেখা ছিল না।

পরে এক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, অনেক অভিনেতা দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও এমন দৃশ্য একবারে শেষ করতে পারেন না। উত্তম কুমারের মতো গুণী অভিনেতার পক্ষেই এমন স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় সম্ভব।
উত্তম কুমার যে মৃণাল সেনের সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন এই কথা হয়তো অনেকেই জানেন না। সিনেমার নাম ‘রাত-ভোর’। এরপরে আর দুইজনকে এক সিনেমায় কাজ করতে দেখা যায়নি। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর মুক্তি পায় সিনেমাটি। এর মাত্র দুই মাস আগে মুক্তি পেয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’। সময়টাও ছিল কলকাতার বাংলা সিনেমার পরিবর্তনের সময়।
এস বি প্রোডাকশনসের ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, ছায়াদেবী, ছবি বিশ্বাস এবং জহর রায়ের মতো নামজাদা অভিনেতারা। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন সলিল চৌধুরী। গানে ছিলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্র। এত জনপ্রিয় শিল্পী ও অভিনেতা থাকার পরও ছবিটি দর্শক টানতে পারেনি।
ফলে বক্স অফিসে মৃণাল সেনের ‘রাত-ভোর’ মুখ থুবড়ে পড়ে। একুশ দিন চলার পর প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। মজার বিষয়, একই বছরে উত্তম কুমারের আরও এগারোটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল। সেই তালিকায় ছিল সুপারহিট ‘সবার উপরে’। অর্থাৎ একই বছরে তিনি যেমন সাফল্যের মুখ দেখেছেন, তেমনি ব্যর্থতার স্বাদও পেয়েছেন।
মৃণাল সেন নিজেও পরে এই ছবি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাতকারে মৃণাল সেন বলেছিলেন, ‘আমাকে যে গল্পটা দেওয়া হয়েছিল সেটা ভীষণ সেন্টিমেন্টাল, খুব বাজে। সবকিছু মিলে… এটা এত বড়, এত বাজে একটা ব্যর্থতা, আমি ওই ফিল্মটার নাম পর্যন্ত মনে করতে চাই না।’

১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় ব্যঙ্গপত্র অচলপত্র একটি কার্টুন প্রকাশ করেছিল। নাম ‘বেঙ্গলের হিরো’। সেখানে হাঁটতে থাকা একটি শিশুর মুখে বসানো হয়েছিল এক নবাগত অভিনেতার চেহারা। প্রেমিকার গলায় ঝুলে সে বলছে, ‘ডার্লিং, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’ সেই মুখটি ছিল উত্তম কুমার চট্টোপাধ্যায়ের। যাকে আমরা চিনি ‘উত্তম কুমার’ নামে। পশ্চিমবঙ্গের দ্য ওয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে এই তথ্য পাওয়া যায়।
তখন উত্তম কুমার ক্যালকাটা পোর্ট কমিশনার অফিসে কেরানির চাকরি করতেন। দিনের কাজ শেষ করেই ছুটতেন স্টুডিওপাড়ায়। অভিনয়ের সুযোগ খুঁজতেন নিরলসভাবে। প্রথম দিকের ছবিগুলোর কোনটিই সাফল্যের মুখ দেখেনি। জানা যায়, স্টুডিওপাড়ায় তাঁর নাম হয়ে যায় ‘ফ্লপ মাস্টার’। কিন্তু হার মানেননি উত্তম কুমার। তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দৃষ্টিদান’। এর আগে ‘মায়াডোর’ ছবিতে অভিনয় করলেও পরে আর ছবিটি মুক্তি পায়নি। ‘বসু পরিবার’ ছবিতে অভিনয় করে প্রথম দর্শকের নজরে আসেন। সেই পরিচয় আরও পাকাপোক্ত হয় ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ। এই সিনেমাতেই প্রথমবারের মতো উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে একসঙ্গে অভিনয় করতে দেখা যায়।
১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে উত্তম কুমার কিংবা সুচিত্রা সেন কেউই প্রধান চরিত্রে ছিলেন না। কমেডি ধাঁচের এই ছবির পোস্টারেও তাঁদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল না। ব্যবসায়িক বিচারে প্রদর্শকেরা অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীকেই পোস্টারের প্রধান মুখ করেছিলেন। কিন্তু ছবি মুক্তির পর হিসাব বদলে যায়। দর্শক আবিষ্কার করেন নতুন এক রোমান্টিক জুটি। উত্তম ও সুচিত্রার অভিনয় মুগ্ধ করে সবাইকে। কলকাতার বাংলা সিনেমা যেন খুঁজে পায় নতুন প্রাণ। বহুদিন ধরে একটি আদর্শ রোমান্টিক জুটির অপেক্ষায় থাকা চলচ্চিত্রশিল্প যেন ফিরে পায় নতুন গতি।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘পথে হলো দেরী’, ‘মরণের পর’, ‘শাপমোচন’, ‘শিল্পী’, ‘সাগরিকা’, ‘হারানো সুর’, ‘সবার উপরে’, ‘সূর্যতোরণ’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘সপ্তপদী’, ‘জীবনতৃষ্ণা’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘আলো আমার আলো’-সহ ত্রিশটিরও বেশি ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেন তাঁরা। এই জুটি কলকাতার বাংলা সিনেমায় বদলে দেয় প্রণয়ের ভাষা। নারী-পুরুষের সম্পর্কের রোমান্টিক ধারণায় তাঁরা হয়ে ওঠেন বাঙালির আইকন।
১৯৫৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হারানো সুর’ বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ছবিটি জাতীয় পুরস্কারও জিতে নেয়। পুরস্কার নিতে উত্তম কুমারকে দিল্লি যেতে হবে। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই হাওড়া স্টেশনে ভিড় করেন হাজার-হাজার অনুরাগী। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে এগিয়ে আসতে হয়। শেষ পর্যন্ত স্টেশনের উল্টো গেট দিয়ে তাঁকে ট্রেনে তোলা হয়। যে মানুষকে একসময় স্টুডিওপাড়ায় ‘ফ্লপ মাস্টার’ নাম দেওয়া হয়েছিল, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনিই হয়ে ওঠেন ‘উত্তম কুমার’।
পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকের উত্তম কুমারের এই উত্থান ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। শুধু পশ্চিমবাংলায় নয়, বাংলাদেশেও উত্তম কুমার জনপ্রিয় ছিল। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, উত্তম কুমার দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের অভিনেতা। দেশভাগের দগদগে ক্ষত আর টানাপোড়েনে দুই বাংলাই ধুকছে। ঠিক তখনই উত্তম কুমার পর্দায় এলেন ‘নায়ক’ হিসেবে। যে নায়কটি দেখতে ঠিক ‘নায়কের’ মতো নয়। কখনও মনে হয়, তিনি পাশের বাড়ির ছেলে, কখনও বাসে-ট্রামে ঝুলতে থাকা সাধারণ যাত্রী, মধ্যবিত্ত সংসারের টানাপোড়েনে ক্লান্ত যুবক।

সেই রূপকথাকেই অন্য আলোয় দেখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। উত্তম কুমারকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রেখে নির্মাণ করেন ‘নায়ক’। ছবির গল্পে দেখা যায়, কলকাতা থেকে দিল্লি যাচ্ছেন জনপ্রিয় অভিনেতা অরিন্দম মুখার্জি। বাইরে তিনি সুপারস্টার। কিন্তু ভেতরে ভীষণ একা। সাফল্যের ঝলকানির আড়ালে তাঁকে তাড়া করে বেড়ায় ভয়, অপরাধবোধ, দ্বিধা আর নিঃসঙ্গতা। বাস্তবের উত্তম কুমারের সঙ্গে এই চরিত্রের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন অনেকেই। সত্যজিৎ রায়ের ভাবনায় এই চরিত্র জন্ম নিয়েছিল উত্তম কুমারকে সামনে রেখেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের এক অভিনয়পাগল যুবক। সিনেমায় নেমে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠেন। এরপর তার মানসিক জগতে কী পরিবর্তন আসে, সেই প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয় গল্প। সত্যজিৎ রায় পরে লিখেছিলেন, তাঁকে আগেই বলা হয়েছিল, এটি প্রচলিত প্রেমের গল্প নয়। তাই পরিচিত অভিনয়ভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছবিতে প্রেম থাকলেও তা প্রচ্ছন্ন। এই নায়কের গুণ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে দুর্বলতাও।
ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর অভিনয় করেছিলেন তরুণী সাংবাদিকের ভূমিকায়। ট্রেনেই প্রথম দেখা হয় অরিন্দমের। সেই প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্যে দেখা যায়, শর্মিলা এগিয়ে গিয়ে অটোগ্রাফ চান। উত্তম কুমার পকেট থেকে কলম বের করেন। কাগজে সই করার সময় দেখা যায়, কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। তা দেখে সত্যজিৎ রায় যখনই ‘কাট’ বলতে যাবেন, তখনই উত্তম কুমার সংলাপ বলতে বলতেই কলম ঝাঁকিয়ে নেন যাতে কালি বের হয়। তাতেও কালি না বের হওয়ায় সামনে রাখা পানির গ্লাসে কলম ভিজিয়ে আবার অটোগ্রাফ দেন। অথচ কলম ঝাঁকানোর এই পুরো ঘটনাই ছিল অপরিকল্পিত। অর্থাৎ স্ক্রিপ্টে এমনকিছু লেখা ছিল না।

পরে এক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, অনেক অভিনেতা দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও এমন দৃশ্য একবারে শেষ করতে পারেন না। উত্তম কুমারের মতো গুণী অভিনেতার পক্ষেই এমন স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় সম্ভব।
উত্তম কুমার যে মৃণাল সেনের সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন এই কথা হয়তো অনেকেই জানেন না। সিনেমার নাম ‘রাত-ভোর’। এরপরে আর দুইজনকে এক সিনেমায় কাজ করতে দেখা যায়নি। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর মুক্তি পায় সিনেমাটি। এর মাত্র দুই মাস আগে মুক্তি পেয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’। সময়টাও ছিল কলকাতার বাংলা সিনেমার পরিবর্তনের সময়।
এস বি প্রোডাকশনসের ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, ছায়াদেবী, ছবি বিশ্বাস এবং জহর রায়ের মতো নামজাদা অভিনেতারা। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন সলিল চৌধুরী। গানে ছিলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্র। এত জনপ্রিয় শিল্পী ও অভিনেতা থাকার পরও ছবিটি দর্শক টানতে পারেনি।
ফলে বক্স অফিসে মৃণাল সেনের ‘রাত-ভোর’ মুখ থুবড়ে পড়ে। একুশ দিন চলার পর প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। মজার বিষয়, একই বছরে উত্তম কুমারের আরও এগারোটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল। সেই তালিকায় ছিল সুপারহিট ‘সবার উপরে’। অর্থাৎ একই বছরে তিনি যেমন সাফল্যের মুখ দেখেছেন, তেমনি ব্যর্থতার স্বাদও পেয়েছেন।
মৃণাল সেন নিজেও পরে এই ছবি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাতকারে মৃণাল সেন বলেছিলেন, ‘আমাকে যে গল্পটা দেওয়া হয়েছিল সেটা ভীষণ সেন্টিমেন্টাল, খুব বাজে। সবকিছু মিলে… এটা এত বড়, এত বাজে একটা ব্যর্থতা, আমি ওই ফিল্মটার নাম পর্যন্ত মনে করতে চাই না।’
.png)

মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যা
৩ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। পদত্যাগপত্রে সদ্য সাবেক এই রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, ‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানিং স্বাস্থ্য পরিক্ষায় Autonomic Neuropathy নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণ
৭ ঘণ্টা আগে
আজ বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী শাফিন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৪ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু চলে যাওয়ায় থেমে যায়নি তাঁর গান। আজও ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘নীলা’ কিংবা ‘জ্বালা জ্বালা’ শুনে নস্টালজিয়ায় ভাসেন পুরোনো শ্রোতারা। আবার নতুন প্রজন্মও ইউটিউব, স্পটিফাইস
৮ ঘণ্টা আগে
প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট ঘিরে চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলন দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। নিট পরীক্ষার অনিয়ম ঘিরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন শুধু সাধারণ কোনো ‘দাবি মানার’ আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকটের প্রতিচ্ছবি এটি। ইতিমধ্যে আন্দোলনে সমর্থন জানিয়
২৩ জুলাই ২০২৬