জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ

রংবাহারি গ্রামীণ অভিজাত সমাজ: রায় সাহেব, খান্দান আর বেপারিদের সমাহার

মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যামিলি ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: বিটুইন মেমোরিজ অ্যান্ড হিস্ট্রি’-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ের অনুবাদের একাংশ। বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা স্ট্রিমের জন্য অনুবাদ করবেন জি এইচ হাবীব। এবার প্রকাশিত হলো সপ্তম কিস্তি।

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ২১: ১৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

আমার জন্মস্থান ও তার আশেপাশের এলাকাগুলো ছিল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। সেখানে আইনশৃঙ্খলার যেকোনো ধরনের অবনতি ও সাম্প্রদায়িক রক্তপাতজনিত আকস্মিক কোনো ঘটনা ঘটলে তা মোকাবিলার জন্য হিন্দু অভিজাত লোকজন মুসলমান নেতাদের কাছে এক ধরনের ন্যূনতম সহযোগিতা কামনা করতেন। স্থানীয় হিন্দু অভিজাতরা যে নিজ সম্প্রদায়ের শান্তি রক্ষা জন্য তাঁদের মুসলমান সমকক্ষদের সঙ্গে বাস্তবসম্মতভাবে সহযোগিতা করতে পারতেন, সেটা একটা ভালো দৃষ্টান্ত ছিল বৈকি। তবে, গ্রামীণ রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় মুসলমান নেতাদেরও একটি ছোট কিন্তু একনিষ্ঠ দল ছিল। এই দলের সদস্যদের মধ্যে অনেকেই কুলীন পরিবার থেকে এসেছিলেন অথবা তাঁরা ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে নতুন প্রজন্মের শিক্ষক, মোক্তার, আইনজীবী, মৌলভি, চিকিৎসক, দলিল লেখক, সচ্ছল কৃষক, মাঝারি বা বড় ভূস্বামী এবং ছোটোখাটো ব্যবসায়ী।

এ ধরনের গ্রামীণ নেতাদের অবকাঠামোগত দায়িত্ব বণ্টন অর্থাৎ রাস্তা, ব্রিজ বা স্কুলের মতো সরকারি উন্নয়ন কাজগুলো কোথায় এবং কীভাবে তৈরি হবে, সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়াতে তাঁরা তাঁদের রাজনৈতিকভাবে অনুগত বা সমর্থকদের পুরস্কৃত করার এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার একটি দারুণ হাতিয়ার পেয়ে গিয়েছিলেন।

এসব মুসলমান নেতাদের মধ্যে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, আইনজীবী, কেরানি, মৌলভি, এবং মোক্তার হিসেবে ঢাকায় কাজ করতেন। সপ্তাহ শেষে ও ছুটির দিনে ফিরে আসতেন। আমার বাবার মনে ছিল যে ঊনবিংশ শতকের চতুর্থ দশকের গোড়ার দিকে তাঁর স্কুলে মূলত রায়ত ও কৃষক শ্রেণি থেকে আসা মুসলিম ছাত্রদের একটি ছোট কিন্তু স্থিতিশীল প্রবাহ ছিল। যদিও কুলীন পরিবার থেকে আসা ছাত্র ছিল মাত্র অল্প ক’জন। ধীরে ধীরে, এ ধরনের তরুণরাও গ্রামীণ নেতৃত্বে উঠে আসতে শুরু করে, যা গ্রামীণ পটভূমিতে একটি পরিবর্তনের সূচনা করে। এদের কয়েক জনের সঙ্গে ১৯৪০ এবং ১৯৫০-এর দশকের যথাক্রমে শেষ ও শুরুর দিকে আমার পরিচয় ঘটে। রাজনীতি, সম্প্রদায়ের নানা খবরাখবর অথবা পারিবারিক বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনার কাহিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে ভাগ করে নেওয়ার নতুন মিলনস্থল হিসেবে গড়ে-ওঠা বাজার, ফুটবল মাঠ, গ্রামের বিভিন্ন উৎসব-আয়োজন, নদীর ঘাট এবং চায়ের দোকানে ।

১৯৪৬-১৯৪৭ সাল থেকে জমি-জমা কেনাবেচার মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে, যখন হিন্দুরা ভারতে চলে যাওয়ার আগে তাঁদের সম্পত্তি বিক্রি করতে শুরু করে। এ ধরনের লেনদেনে যারা অর্থ-কড়ি উপার্জন করেছিল তাঁরা পরবর্তী সময়ে সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে।

দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে আমাদের এলাকা থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন মুসলমান কর্মকর্তাকে ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানি আমলাতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়। বিভিন্ন করণিক পদ এবং আইন ও চিকিৎসাসংক্রান্ত পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ছাড়া, অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা তাঁদের গ্রামীণ সমাজে ডেপুটি সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচিত হওয়াটা সেকালে মর্যাদার প্রতীক ছিল। আমি স্কুলের ছাত্র থাকার সময়েই এক চাচা আমাকে মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে বড় হয়ে আমি যেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি করি! ১৯৪০-এর দশকে আমার বিদ্যালয়ের যাঁরা জ্যেষ্ঠ সহপাঠী ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্তত দুজন ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন। এই সহপাঠীদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন, বিশেষ করে যাঁরা চূড়ান্ত কলেজ ডিগ্রি অর্জন করেননি। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের সেইসব স্কুল-বন্ধুর মধ্যে অল্প কয়েকজন কলেজ ডিগ্রি অর্জনের পর আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে, বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ছাত্র স্কুল ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, এবং আমার যতদূর মনে পড়ে, ১৯৪৫-৪৬ সালের মধ্যে তাঁরা বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। ১৯৪২-১৯৪৩ সালের মহা দুর্ভিক্ষের পুরোটা সময় (যদিও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, কিছু এলাকায় তীব্র খাদ্য সংকট আরো আগেই শুরু হয়েছিল) বেশ কিছু কলেজ স্নাতক বা এমনকি যারা স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেননি, তারাও খাদ্য ও সরবরাহ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন—এটা ছিল দুর্ভিক্ষ ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের একটি বিশেষ ক্যাডার। এ ধরনের অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা যখন গ্রামে যেতেন, তখন তাঁরা দাবি করতেন যে তাঁদের কাজ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের সমতুল্য, যদিও কাজটা ছিল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বাড়তি সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য নেহাতই এক রকমের ভান। পাকিস্তান সৃষ্টির গোড়ার দিকের কয়েক বছর ধরে লাভজনক চাকরি লাভের উদ্দেশ্যে উচ্চশিক্ষা ত্যাগ করার এই প্রবণতা বজায় ছিল: আমার আগের সহপাঠীদের মধ্যে অন্তত দুজন ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে কলেজের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

তাছাড়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চলাকালীন বেশকিছু যুবক কুর্মিটোলা, তেজগাঁও ও কুমিল্লার সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ছোটখাটো নির্মাণ ও সরবরাহ সংক্রান্ত ঠিকাদারির কাজ করত। পরিবারের বেশিরভাগ বয়স্ক সদস্যেরই একথা মনে ছিল যে, সেই যুদ্ধের সময় এই তরুণ সামরিক সরবরাহকারীরাই ছিল আমাদের এলাকায় নতুন নির্মাণ ব্যবসায়ীদের দল। ঢাকা ও তার আশেপাশের যুদ্ধকালীন সামরিক স্থাপনাগুলোতে অসংখ্য কেরানি, নার্স ও সহায়তাকারী কর্মীর প্রয়োজন ছিল; কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ অন্য কয়েকটি সেনা প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের জনবলের চাহিদা ছিল। আমার এক খ্রিষ্টান বন্ধুর বড় বোন ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করতেন এবং শুনেছিলাম তিনি পরে একজন মার্কিন সৈন্যকে বিয়ে করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। অবশ্য, সেসময়ে তরুণ-তরুণীরা ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় পাড়ি জমানোর ব্যাপারে এত উদগ্রীব ছিল না।

মনে আছে, আমার প্রায় বারোজন দূর সম্পর্কের আত্মীয় সেসব সামরিক ব্যারাকে কাজ করতেন; এদের মধ্যে কয়েকজন ঢাকা যাওয়ার পথে আমাদের বাড়িতে যাত্রাবিরতি করতেন। আমাদের গ্রামের উপকণ্ঠ থেকে ঢাকা যাওয়ার সরাসরি ট্রেন ধরা তাঁদের জন্য সুবিধাজনক ছিল। পরে তাঁদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন। যুদ্ধের সময় পাটের বাজার ফুলে ফেঁপে উঠেছিল: একদল মধ্যস্বত্বভোগী, ওপরের কাতারের পাইকারি ক্রেতা ও নীচের দিককার উৎপাদক-খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করত। পাট চাষের জন্য যেসব কৃষকের যথেষ্ট জমি ছিল, তাঁদের হাতে ধীরে ধীরে টাকা আসতে শুরু করে। গ্রামগুলোতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়তে থাকে, যদিও চারদিকে তখন খাদ্যের বেশ অভাব। আমার মায়ের কয়েকজন জ্ঞাতি ভাই পাটের ব্যবসা করে প্রচুর নগদ অর্থের মালিক হয়েছিলেন। আমাদের এলাকার প্রধান পাট ক্রয়কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে তাঁরা প্রায়ই যাতায়াত করতেন।

বড় পাট ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই ছিল বড় নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জ কিংবা কলকাতায় থাকা মাড়োয়ারি বা ইউরোপীয়রা। কিন্তু আমার নিজের শহর নারায়ণগঞ্জ ও পাট ব্যবসার অন্যান্য কেন্দ্রে দালালদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান; (এই মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের বেপারীও বলা হতো); যুদ্ধের সময় এবং এমনকি ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকেও এই দালালরা যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করত। পরিচিত পাট ব্যবসায়ী দালাল/বেপারীদের মধ্যে হিন্দু ভদ্রলোক বা খানদানি মুসলমানদের কাউকে দেখা যেত না। অথচ মুসলিম ব্যবসায়ীদের জন্য বরং বেপারী হওয়া বেশি সহজ ছিল। কারণ দালাল হিসেবে বিনিয়োগ করতে খুব বেশি পুঁজি বা শিক্ষার দরকার হতো না। কিন্তু আমি শুনেছিলাম যে, এই ব্যবসাতে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত কারো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া নতুনদের পক্ষে পাটের দালালদের ঘনিষ্ঠ পরিমণ্ডলে প্রবেশ করা বেশ কঠিন ছিল। সেখানে অল্প কিছু মুসলমান পাট ব্যবসায়ীর প্রাধান্যের জন্য নারায়ণগঞ্জ পরিচিত ছিল; পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বছরগুলিতেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। এমন কথাও বলা হয়ে থাকে যে, আমাদের এলাকার এ ধরনের গুটি কতেক ব্যবসায়ীর কাছে যে পরিমাণ নগদ অর্থ ছিল তা হিন্দু-মুসলিম যে কোনো সাধারণ ভূম্যধিকারী, ধনী কৃষক এবং ভদ্রলোকদের কারো কাছে ছিল না। এ ধরনের ব্যক্তিরা দ্রুতই স্থানীয় ও প্রাদেশিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচিত হওয়াটা সেকালে মর্যাদার প্রতীক ছিল। আমি স্কুলের ছাত্র থাকার সময়েই এক চাচা আমাকে মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে বড় হয়ে আমি যেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি করি!

পরে আমি জানতে পারি, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ১৯৪০-এর দশকে মুসলিম লীগ দলের অর্থ-কড়ির জোগান দিতেন। তাঁরা স্বভাবতই নগদ আয় ভূসম্পত্তিতে বিনিয়োগ করতেন; এবং স্পষ্টতই, তাঁদের মধ্যে অনেকেই পুত্রদের স্কুল-কলেজে পাঠাতেন। আমার এক আত্মীয় পাটের ব্যবসা থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে ঢাকায় একটি ছোট বাড়ি কিনেছিলেন, যাতে তাঁর ছেলে কলেজে পড়ার সময় একটি সুন্দর থাকার জায়গা পায়। পাকিস্তান যুগের পরবর্তী সময় পর্যন্ত মুসলিম গ্রামীণ অভিজাতদের মধ্যে এটা কিন্তু কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। ১৯৪৬-১৯৪৭ সাল থেকে জমি-জমা কেনাবেচার মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে, যখন হিন্দুরা ভারতে চলে যাওয়ার আগে তাঁদের সম্পত্তি বিক্রি করতে শুরু করে। এ ধরনের লেনদেনে যারা অর্থ-কড়ি উপার্জন করেছিল তাঁরা পরবর্তী সময়ে সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তানের নতুন রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ ধরনের উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েই চলছিল। তাছাড়া, এই নতুন কুশীলব তথা হঠাৎ বাদশারা গ্রাম্য রাজনীতিতে হিন্দু ভদ্রলোকদের পাশাপাশি মুসলিম কুলীনদের চিরাচরিত আধিপত্যকেও হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।

আমার বাবার একদল সহপাঠী এবং তাঁর চেয়ে একটু ছোটরা ম্যাট্রিকুলেশন বা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ পরীক্ষা শেষ করেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ১৯২০-এর দশকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ-বিরোধী খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তী কালে, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে তাঁরা শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়ের অধীনে প্রাথমিক/জুনিয়র স্কুলশিক্ষক হয়েছিলেন। কারণ তাঁরা এর চাইতে ভালো কোনো পেশা বেছে নেবার সুযোগ পাননি। গ্রামের স্কুলশিক্ষক এবং ওলেমারাও গ্রামীণ নেতৃত্বের বিকাশে অবদান রেখেছিলেন; গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে তাঁরা আরো বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ছাত্রদের পড়ানোর পাশাপাশি, তাঁরা নিজেদের সন্তানদেরকেও শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের জন্য প্রস্তুত করতেন; আমি এমন দুজন প্রতিবেশীকে চিনতাম। পাশের গ্রামে একটি বড় মাদ্রাসা ছিল; সেটি ইসলামি শিক্ষার একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং অধুনা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ইসলামি পণ্ডিত ও ছাত্র সেখানে পড়াতে ও পড়তে যেত।

আমার বাবার সমসাময়িকদের মধ্যে অল্প কয়েকজন পড়াশোনা অথবা চাকরির জন্য কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন কলকাতায় ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিলেন: বাংলার রাজধানী হওয়ায় শহরটি ছিল বিভিন্ন শিক্ষাগত ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধার কেন্দ্র। কিন্তু ১৯২০-এর দশকের গোড়ার দিকে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি একটি চাকরি নিতে বাধ্য হলে আমার বাবার সেই বন্ধু শেষ অব্দি ডাক্তারি পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তিনি তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বেশিরভাগ সময় কলকাতাতেই কাটিয়েছিলেন। আমার তিন জ্ঞাতি ভাইও চাকরির খোঁজে কলকাতা গিয়েছিলেন; সেটা ১৯৪৪-১৯৪৫-এর দিকের কথা। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে আমাদের পাশের গ্রামগুলোর যাঁরা পেশাগত কারণে কলকাতায় থাকতেন তাঁদের অনেককেই আমার বাবা চিনতেন না। যাঁরা ঢাকা এবং এর আশেপাশে কাজ করতেন তাঁরাই তখনো আমার পৈতৃক গ্রাম ও—ভৌগলিক কারণে শহরের কাছাকাছি হওয়াতে—সেই গ্রামের নিকটবর্তী এলাকায় সমাজের স্বীকৃত নেতা ছিলেন।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত