সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের অটোনমিক নিউরোপ্যাথি, জানুন রোগটি সম্পর্কে

রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। পদত্যাগপত্রে সদ্য সাবেক এই রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, ‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানিং স্বাস্থ্য পরিক্ষায় Autonomic Neuropathy নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই…’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৮: ০০
সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের অটোনমিক নিউরোপ্যাথি, জানুন রোগটি সম্পর্কে। স্ট্রিম গ্রাফিক

অটোনমিক নিউরোপ্যাথি এমন একটি রোগ, যেখানে শরীরের স্বয়ংক্রিয় কাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণভাবে আমাদের হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, হজম, মূত্রথলির কাজ, ঘাম হওয়া বা চোখের আলো-অন্ধকারে মানিয়ে নেওয়ার মতো কাজগুলো আমরা সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করি না। এসব কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করে অটোনমিক স্নায়ুতন্ত্র। এই স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এই রোগে হৃদ্‌যন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, মূত্রথলি, ঘামগ্রন্থি, চোখ এবং রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার লক্ষণ অনুভব করার ক্ষমতাও আক্রান্ত হতে পারে।

কেন হয়

ডায়াবেটিস এই সমস্যার সবচেয়ে সাধারণ কারণ। দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে এবং রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মতো চর্বির পরিমাণ বেশি হলে স্নায়ু এবং স্নায়ুকে পুষ্টি জোগানো ছোট রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে অটোনমিক নিউরোপ্যাথি দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া আরও কিছু কারণে এই রোগ হতে পারে। যেমন—ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, অস্বাভাবিক প্রোটিন জমা হওয়া (অ্যামাইলয়েডোসিস), অটোইমিউন রোগ, কিছু বংশগত রোগ এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কেমোথেরাপির ওষুধ।

এ ছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে পরোক্ষভাবে স্নায়ু ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে

অটোনমিক নিউরোপ্যাথির লক্ষণ নির্ভর করে শরীরের কোন স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ওপর। তাই সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যা দেখা যায় না।

হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুয়ে বা বসে থাকার পর হঠাৎ দাঁড়ালে মাথা ঘুরতে পারে, দুর্বল লাগতে পারে বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে। কাজকর্ম বা ব্যায়ামের সময়ও এমন হতে পারে। হৃৎস্পন্দন কখনও খুব দ্রুত, আবার কখনও খুব ধীরে চলতে পারে। এমনকি হৃদপেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছালে বা হার্ট অ্যাটাক হলেও বুকে ব্যথা অনুভূত নাও হতে পারে।

হজমের স্নায়ু আক্রান্ত হলে পেট ফাঁপা, অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া, বমি বমি ভাব, বমি, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, বিশেষ করে রাতে ডায়রিয়া, কখনও ডায়রিয়া আবার কখনও কোষ্ঠকাঠিন্য, খাবার গিলতে সমস্যা হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে পাকস্থলী থেকে ক্ষুদ্রান্ত্রে খাবার যাওয়ার গতি ধীর হয়ে যায়, যাকে গ্যাস্ট্রোপেরেসিস বলা হয়। এতে গ্লুকোজ শোষণ ও ইনসুলিনের কার্যকারিতা বিঘ্নিত হতে পারে এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মূত্রথলির স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে কখন প্রস্রাবের চাপ এসেছে বা প্রস্রাব পুরোপুরি হয়েছে কি না, তা বোঝা কঠিন হতে পারে। ফলে প্রস্রাব জমে থেকে সংক্রমণ হতে পারে। আবার কারও প্রস্রাব ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে।

ঘাম নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাতে বা খাওয়ার সময় অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। আবার শরীরের কিছু অংশে ঘাম হলেও অন্য অংশ শুকনো থাকতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ঘাম একেবারেই না-ও হতে পারে। এতে শরীরের তাপমাত্রা ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।

চোখের মণির স্নায়ু আক্রান্ত হলে আলো থেকে অন্ধকারে বা অন্ধকার থেকে আলোতে চোখ মানিয়ে নিতে বেশি সময় লাগে। রাতে গাড়ি চালানোর সময়ও অন্য গাড়ির আলো দেখতে অসুবিধা হতে পারে। যৌন অঙ্গের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে নারী ও পুরুষ উভয়েরই যৌনস্বাস্থ্যে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া রক্তে শর্করা কমে গেলেও অনেক সময় তার স্বাভাবিক লক্ষণ বোঝা যায় না। সাধারণত মাথা ঘোরা, ক্ষুধা লাগা, অস্থিরতা বা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলেও অটোনমিক নিউরোপ্যাথিতে এগুলো অনুভূত নাও হতে পারে। ফলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এতে রক্তে শর্করা খুব বেশি কমে গিয়ে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। তখন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

চিকিৎসা কী

এই রোগের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো, যে কারণে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা এবং রোগীর নির্দিষ্ট লক্ষণগুলোর চিকিৎসা করা। যদি ডায়াবেটিসের কারণে এই সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে রক্তে শর্করা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে স্নায়ুর ক্ষতি আরও বাড়ার ঝুঁকি কমানো যায়।

হজমের সমস্যায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, পর্যাপ্ত আঁশ ও তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার জন্যও আলাদা চিকিৎসা রয়েছে। মূত্রথলির সমস্যায় নির্দিষ্ট সময় মেনে পানি পান ও প্রস্রাব করার অভ্যাস গড়ে তোলা, প্রয়োজনে ওষুধ বা ক্যাথেটারের সাহায্য নেওয়া হতে পারে।

এ ছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার খাওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ধূমপান এড়িয়ে চলার পরামর্শও দেওয়া হয়। এসব অভ্যাস উপসর্গের অগ্রগতি ধীর করতে এবং নতুন জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ, মায়ো ক্লিনিক, সায়েন্স ডিরেক্ট, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন জার্নাল

Ad 300x250

সম্পর্কিত