জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব

চর্যাপদ থেকে চব্বিশ: ভাষা যখন জাতীয় শক্তি

সৈয়দ মিজবাহ উদ্দিন আহমদ
সৈয়দ মিজবাহ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৪৫
এআই জেনারেটেড ছবি

১৯৫২ সাল পৃথিবীর সকল ভাষার ইতিহাসে একটি অগ্ন্যূৎপাত বা ভূমিকম্প। এখানে ভাষা কেবল সাহিত্য বা সংস্কৃতির বিষয় ছিল না, এ যেন ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে বৈধতার এক পাহাড়সমান প্রশ্ন। মানুষ যখন মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দেয়, তখন ভাষা হয়ে যায় সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

বায়ান্নের শহীদের রক্ত বাংলা ভাষাকে অন্য মাত্রায়, অনন্য উচ্চতায় একটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। বৈশ্বিক আসরে এখানেই ভাষা প্রথমবার প্রমাণ করে: ভাষা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের চেয়েও শক্তিশালী বৈধতা সৃষ্টি করতে পারে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন জাতিকে শিখিয়েছে যে, স্বকীয় ভাষা পরিচয় ছাড়া রাষ্ট্র টিকে না। অনেক ইতিহাসবিদের মতে এই ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তাই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মানসিক ভিত গড়ে দেয়।

বাংলা ভাষার ইতিহাসের ললাটে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি স্থায়ী রাজতিলক। আদি চর্যাপদ ও নজরুলের বিদ্রোহী শব্দ থেকে শুরু হওয়া অভিযাত্রা বায়ান্নতে এসে বাস্তব রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপ নেয়। এই সময়ে দেখা যায়, ভাষা কেবল সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মাধ্যম নয়; এটি হয়ে যায় জাতীয় শক্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ বিভাজন এবং পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের গঠন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনপদ পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আসে। পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষ প্রধানত বাংলা ভাষাভাষী ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের মদদপুষ্ট পাকিস্তান সরকার উর্দুকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে। বাংলাভাষী জনগণের জন্য ওটা কোনো ঘোষণা ছিলনা। ওটা ছিল আমাদের স্বকীয়তায়, আমাদের অস্তিত্বে তুমুল মানসিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও সর্বোপরি রাজনৈতিক আঘাত। এমন পরিস্থিতিতে ভাষা শুধু কথার মাধ্যম থাকেনা, বরং তা মানুষের পরিচয়, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার অস্ত্র হয়ে যায়।

শহীদদের আত্মত্যাগ ও ভাষার শক্তি

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল ৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বাংলা। এ কারণেই ২১ ফেব্রুয়ারিকে আমরা প্রায়ই “আটই ফাল্গুন” বলেও স্মরণ করি। দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত। ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য রাস্তায় নামে।

শহীদদের রক্ত বাংলা ভাষাকে জাতীয় চেতনার কেন্দ্রে স্থাপন করে। ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে, ভাষা কেবল সাহিত্য বা সংস্কৃতির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও জাতির জন্য অসাধারণ রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করতে পারে।

এই আন্দোলন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভাষার জন্য করা এ সংগ্রাম নজিরবিহীন ছিল। অর্থাৎ, কেবল মুখের ভাষা বা কথার জন্য নয়; এ সংগ্রাম ছিল জাতির অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার। শহীদদের আত্মত্যাগ বাংলা ভাষাকে একটি জাতীয় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। যার ফলে আজ আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি স্বীকৃত ও গভীর শ্রদ্ধাভরে পালিত।

ভাষা হল সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিরোধ

ভাষা আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত কবিতা, গান ও বক্তৃতা ছিল সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ইস্পাতকঠিন বঙ্গীয় শক্তি। যেমন :

  • ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে রচিত কবিতা ও স্লোগান এখনও মানুষের মনোবল জাগিয়ে তোলে।
  • গণসংগীত ও বিদ্রোহী গানসমূহ আন্দোলনের এক ঐক্যবদ্ধ ভাষা তৈরিতে এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
  • বাংলা ভাষায় তৈরি reel, vlog, blog, গীতিনাট্য, নাটক, উপন্যাস ও প্রবন্ধ সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগের এই আধুনিক সময়েও অব্যর্থ অস্ত্র।

মাতৃভাষা বাংলাকে কেবল বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের ঘটনায় সীমাবদ্ধ রাখলে তার ঐতিহাসিক শক্তিকে খাটো করা হয়। একে বৃহত্তর ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়—জাতির চেতনা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ সেতুবন্ধন হিসেবে মূল্যায়ন করা জরুরি। বায়ান্ন আমাদের শিখিয়েছে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি জাতিসত্তার নৈতিক ভিত্তি, মানসিক ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের মূল শক্তি।

শহীদ ও সাধারণ জনগণের আত্মত্যাগ আমাদের শেখায়, যখন মানুষ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, তখন তা শুধুই ভাষা রক্ষার জন্য ছিল না; তারা রক্ষার চেষ্টা করেছেন জাতির আত্মা, চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। ভাষা হারালে শুধু শব্দই হারায় না, হারায় জাতির অতীত, ইতিহাস, পরিচয় ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব।

বায়ান্নর সেই তরুণ আত্মত্যাগ চব্বিশের বর্ষা-জাগরণে নতুন প্রজন্মকে শতাব্দী-প্রাচীন চর্যাপদের আদি চেতনা স্রোতের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এ ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, বাংলা ভাষা আমাদের জন্য কেবল ঐতিহ্য নয়, এক স্বর্গীয় বাহন, যা জাতিকে অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ করে এবং বহিরাগত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক সুসংহত প্রতিরোধ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ভাষাই এখানে ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও জাতীয় শক্তির মিলিত রূপ।

সফট পাওয়ার থেকে থেকে কৌশলগত শক্তি

ভাষা আন্দোলন দেখিয়েছে, ‘সফট পাওয়ার’ কখনও কখনও ‘হার্ড পাওয়ার’ থেকেও বেশি প্রভাবশালী হতে পারে। শহীদদের আত্মত্যাগ, ছাত্র ও সাধারণ জনগণের ঐক্য, সাহিত্য ও সংগীত—সব মিলিয়ে ভাষাকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

একটি রাষ্ট্র বা জাতি তখনই স্থায়ীভাবে শক্তিশালী হয়, যখন তার ভেতরের চেতনা ও সংস্কৃতির ভিত্তি দৃঢ় হয়। ১৯৫২ সালের ঘটনাবলি এই সত্যকে নিশ্চিত করে—ভাষা জাতির সফট পাওয়ার, যা রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর।

ভাষা ও জাতীয় পরিচয়

ভাষা আন্দোলন আরও প্রমাণ করে, ভাষা কেবল কথার মাধ্যম বা মুখের ভাষা নয়; এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিচয়। কারণ হল :

  • ভাষার ক্ষয়ে জাতি হারিয়ে যায়।
  • ভাষা রক্ষা মানে জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষা।
  • ভাষা আন্দোলন শিক্ষা দেয়—জাতির শক্তি কেবল অস্ত্র বা রাজনৈতিক ক্ষমতায় নয়, সাংস্কৃতিক চেতনায়ও নিহিত।

অতএব, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চব্বিশে পুনরাবৃত্তি করে জাতিকে শিখিয়েছে—ভাষা মানে অস্তিত্ব, ভাষা মানে চেতনা; ভাষা মানে শক্তি; ভাষা মানে জাতীয় ঐক্য।

শহীদদের দৃষ্টান্ত ও তরুণ প্রজন্মের শিক্ষা

আজকের প্রজন্মকে স্পষ্টভাবে বোঝা উচিত, বায়ান্ন বা চব্বিশের শহীদরা কেবল একটি ভাষার জন্য বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জন্য লড়েননি। তারা লড়েছেন জাতীয় চেতনা, পরিচয়, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের জন্য। বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান ও সচেতনতা মানে কেবল সাহিত্যিক মূল্যায়ন নয়; এটি জাতির আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরোধের নির্দেশনা।

নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা নিতে হবে যে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি রাষ্ট্র ও জাতির মৌলিক শক্তি। ভাষা মানুষের মধ্যে ঐক্যবোধ তৈরি করে, জাতীয় সচেতনতা জাগায় এবং স্বাধীনতা রক্ষায় সক্ষম করে। শহীদদের ত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভাষা সংরক্ষণ মানে কেবল অতীতের প্রতি সম্মান নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করার এক নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।

পরিশেষে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছে যে বাংলা ভাষা কেবল কথার বা লেখার মাধ্যম নয়; এটি জাতির অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক চেতনার শক্তিশালী প্রতীক। বায়ান্নের শহীদরা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভাষা মানে কেবল সাহিত্যিক সৃজনশীলতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও জাতির জন্য একটি কৌশলগত শক্তি, যা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, জাতীয় পরিচয় সুদৃঢ় করে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

শহীদ ও সাধারণ জনগণের আত্মত্যাগ আমাদের শেখায়, যখন মানুষ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, তখন তা শুধুই ভাষা রক্ষার জন্য ছিল না; তারা রক্ষার চেষ্টা করেছেন জাতির আত্মা, চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। ভাষা হারালে শুধু শব্দই হারায় না, হারায় জাতির অতীত, ইতিহাস, পরিচয় ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব। তাই ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা মানে জাতির অতীতকে সম্মান করা, বর্তমানকে সচেতন রাখা এবং ভবিষ্যৎকে নিরাপদে রক্ষা করা।

বাংলা ভাষা ১৯৫২ সালে প্রমাণ করেছিল যে তা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; বরং ছিল জাতির অস্তিত্ব, ঐক্য, মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চেতনার মূল শক্তি। আমাদের নতুন প্রজন্মকে এই শিক্ষা নিতে হবে—ভাষার প্রতি সম্মান মানে জাতিকে শক্তিশালী করা, সংস্কৃতি রক্ষা করা এবং প্রতিকূলতা ও বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। বাংলা ভাষা আমাদের এক অদম্য শক্তি, যা চিরকাল জাতিকে একত্রিত রাখবে এবং আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রাখবে।

  • সৈয়দ মিজবাহ উদ্দিন আহমদ: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

সম্পর্কিত