গল্প
নাহিদা নাহিদ

বারিধারার এই ডুপলেক্স ভবনের দক্ষিণের মাস্টার বেডরুমটা বুড়ো আমজাদ সাহেবের এখন স্থায়ী ঠিকানা। পাশের ঝকঝকে টয়লেট আর লেক ভিউ বারান্দাটাও তার। শরীর আর মনের যে অবস্থা, তাতে জুম্মার নামাজে মসজিদে যাওয়ার সামর্থ্যটুকুও হারিয়েছেন তিনি। জায়নামাজে বসে তসবিহ গোনা আর শেলফের উপরে রাখা পবিত্র কোরআনের ক্যালিগ্রাফি করা মলাটটুকু আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখাই এখন তার বড় প্রার্থনা।
রুহিন একটা রুপালি ফটোফ্রেম রেখে গেছে পাশে। আমজাদ সাহেবের কাঁধে ছোট্ট রুহিন। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে লাল কাঁকড়া দেখে হাসছিলো বাপ-বেটি। আমজাদ সাহেব ভেবে অবাক হন, এই মেয়েটা তখন কত ছোট ছিল। ফ্রক পরে ঘুরতো, থপথপ করে হাঁটতো। তেলাপোকা দেখলে দৌড়ে ছুটে আসত বাবার বুকে, ঝাপিয়ে পড়ে আধো-আধো বোলে বলতো ‘পাপা পাপা ভয়অঅয়’! রুহিনের মা সুরাইয়া মারা যায় বাচ্চাটাকে এই এইটুকুন রেখে, ঠিক যেন বিড়ালের ছানা। আমজাদ সাহেবের শখ হলে আঙুল চুবিয়ে দুধ তুলে দিতেন ওর ঠোঁটে। চুকচুক করে খেতো কেমন। বারিধারার এই যান্ত্রিক নাগরিক এলাকায় উৎসব এলে কেবল মুশকিল হতো। কেউ ছিল না রুহিনকে সাজাবার। আমজাদ সাহেব নিজেই মেয়ের লম্বা গাউনে ফিতা বেঁধে দিতেন আর গুনগুন করে গাইতেন কোনো পুরনো দিনের গান।
আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী
সাথী মোদের নীল পরী
সেই ছোট্ট রুহিন। একসময় আমজাদ সাহেব ছিলেন এই শহরের নামকরা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। চাইলে যৌবনের পুরোটা খরচ করে দিতে পারতেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অলিতে-গলিতে। তার পছন্দও ছিল ওসব রোমহর্ষক কাজ, তারপরও সুরাইয়ার অনুপস্থিতিতে সে রুহিনের ‘সুপার ড্যাড’ হওয়ার চেষ্টা করেছেন পুরোদমে। ক্যাঙারুর থলের মত বুকে-কাঁধে-পেটে বাচ্চা বেঁধে নিয়ে ঘুরেছেন এদিক-সেদিক। পৈত্রিক এই বাড়িটার এককোনা সংস্কার করে মেয়েকে বানিয়ে দিয়েছিলেন বিশাল প্লে-জোন। ঘোড়া, দোলনা আর স্লাইডারের হুলুস্থুল। রুহিনকে কখনো একা হতে দেননি তিনি। রুহিন একটু বড় হলে তার বন্ধুদের সাথে আড্ডা, দামি পারফিউমের ঘ্রাণ আর তার ও তার বন্ধুর আবছায়া যৌথ শরীর, আলিঙ্গন ও হাসির শব্দ শুনেও তথাকথিত কড়া বাঙালি বাবার মত তর্জনীর শাসন তুলে বিব্রত করতে চাননি মেয়েকে। মেয়ে যা করতে চেয়েছে, করেছে। আমজাদ কেবল কলুর বলদের মত মুখে রক্ত তুলে যুগিয়ে গেছেন প্রাচুর্যের যোগান।
রুহিন তার অচেনা হয়েছে সেই কবেই যেদিন ওই হুলোমুখো ছেলেটাকে বিয়ে করলো, আবার বছর ঘুরতেই ডিভোর্স হয়ে মেয়েটা যখন খিটখিটে হয়ে একা হয়ে গেল সেই সময় থেকেই। নিঃসঙ্গ রুহিন যখন রাত হলে ড্রয়িংরুমে বসে হরর কিংবা অ্যাডাল্ট মুভি নিয়ে বসতো, সময় সময় আমজাদ সাহেব চাইতেন আলগোছে ওর পাশে বসতে, পিঠে হাত রেখে বলতে কিছু স্নেহের কথা। অথচ ওই বুড়ো বাবাকে রুহিনের মন আর ঠিক বন্ধু হিসেবে নিতে পারতো না। আমজাদ বুঝতেন তার উপস্থিতি রুহিনকে আর আনন্দ দেয় না একটুও। সেই ড্রয়িংরুমের আবছা আলোতেও সে টের পেত মেয়ের কুঁচকানো ভ্রু আর তোবড়ানো গালে বিরক্তি।
এখন আর ওসবের বালাই নেই। সব দুঃশ্চিন্তা একদম হঠাৎ করেই ফুরিয়েছে তার। নিজেকে খুব ভারহীন লাগে এখন। তার নাকি অ্যালঝাইমার্স নামের এক ভয়াবহ স্মৃতিভক্ষক ভাইরাস ওলট-পালট করে দিচ্ছে তার মস্তিষ্ক, একা করে দিচ্ছে মানুষ—তার এখন ভালোই লাগছে। পৃথিবীতে কেন শুধু সে একাই বিস্মৃত হবে? সবাই হোক। সবাই আটকে থাকুক নিজের মগজের কুঠুরিতে। চেনা মানুষের অচেনা চাহনির তাপে পুড়ুক আমলা-কামলা সব। কারো কিছুতে তার আর কিচ্ছু যায় আসে না।
আমজাদ সাহেবের এই ‘অন্তরীণবাস’ রুহিনের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হয়েছে। কী করেছিলেন তিনি? ভুল করে একদিন গ্যাস ওভেন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, আরেকদিন বারিধারার রাস্তায় লুঙ্গি পরে বেরিয়ে পড়েছিলেন নিজের হারিয়ে যাওয়া অফিস খুঁজতে। প্রতিবেশীরা যখন তাকে উদ্ধার করে আনলো, রুহিনের আভিজাত্যে বড় চোট লাগলো। ব্যস, রুমটা লকডাউন হয়ে গেল। আর মাঝখান থেকে অসংলগ্ন কথাবার্তা আর হ্যালুসিনেশনের বদৌলতে আমজাদ সাহেবও খেলেন মেয়ের কাছে ধরা। যাক কী আর করা। মেয়ে গৃহবন্দি করেছে করুক, এটাও হয়তো ওর পূর্বেকার মত উচ্ছ্বাসহীন একপ্রকার ভালোবেসে ফেলে রাখাই।
প্রথম-প্রথম খুব ভালো আছেন—ভালো আছেন এমন একটা ভাব করেছেন তিনি। কার কাছে করেছেন তিনি জানেন না, হয়তো নিজের কাছেই। একা থাকার অভ্যেস তো তার হয়েই আছে, এখন আর কি! এখন বরং নিজেকে খুব আপন লাগছে, কারো কথা ভাবতেই হচ্ছে না—না বিজনেস, না মেয়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বেশি সময় এই ভাবটা থাকে না তার। রাত হলেই তৃষ্ণা জেগে ওঠে, কীসের যে তৃষ্ণা? অবরুদ্ধ দিনের একেকটা দিন যাচ্ছে আর তার তৃষ্ণার বোধটা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে কত দীর্ঘকাল সে পানি খায় না। কতদিন হলো?
দুদিন ধরে যখনই তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে শূন্যতার অদৃশ্য পোকা কামড় দিচ্ছে, তখনই তার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে—হাউমাউ করে কান্না। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘রুহিন রুহিন তুই কইরে মা, কাছে আয়, এই দেখ তোর পাপা সব ভুলে যাচ্ছে, পাপা মরে যাচ্ছে, আয়।’
কেউ আসে না। কেউ না। স্মৃতির উত্তাপে পুড়তে পুড়তে তবু সে স্বপ্ন দেখে যায় আবার তার সেই প্রথম যৌবন; সুরাইয়া আবার ফিরে এসেছে, তাদের ঘর ভরা ছেলেপুলে। সে অফিস যায়, সুরাইয়া ব্রেকফাস্ট গোছায়। তাদের বড় মেয়ে, ছোট মেয়ে মায়ের ওড়না নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। ছেলেবাবুরা হাফপ্যান্ট পরে বাবল ফোলায়, ক্রিসক্রস খেলে। তাদের মেয়েরা বড় হয়, তাদের ছেলেরা হাতে বাড়ে, পায়ে বাড়ে। আর তারা দুই বুড়োবুড়ি পার্কে হাঁটতে-হাঁটতে স্বপ্ন দেখতে-দেখতে দিন ফুরিয়ে ফেলে।
তারপর বাতাস এসে নিয়ে যায় সব। সুরাইয়া হারিয়ে যায়, রুহিন হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় বাবল ফোলানো সেই ক্রিসক্রস দিন। সময় আর কাটে না। একেকটা মুহূর্ত পরে আমজাদ সাহেব ভয়ে সেধিয়ে যান নিজের শরীরের ভেতরে। শব্দ শুনতে পান হৃৎপিণ্ডের। ধুকপুক ধুকপুক ধুকপুক। এত জোরে বাজে মনে হয় স্নেক গেমসের সেই রেগে থাকা অজগর। নিজেকে প্রবোধ দেন তিনি, ভয় পেলে চলবে না এখন, সে একা নয়; আজ হোক কাল হোক রুহিন আসবেই, মাথায় হাত রেখে বলবে—ভয় নেই পাপা, আমি আছি তো, এই দেখ রাত জেগে বসে আছি তোমার পাশে। ভয় নেই একদম। তোমার পানি লাগবে পাপা? বাতাস? অক্সিজেন? এই নাও, হা করো হা।
আমজাদ সাহেব হা করে শ্বাস নেন। কোথায় পানি, কোথায় মমতা? রুহিন বলেছিল ক্ষুধার্ত হলে দরজায় টোকা দিতে। দিয়েছেন তো কতদিন। রুহিন কিছু শুনেছে, কিছু শোনেনি। এই টোকাহীন দরজায় রুহিন কী টের পায় না তার পাপার ক্ষুধা ফুরিয়েছে, ফুরিয়েছে বোধ? মগজের পোকারা, গলার পোকারা গলে গলে যাচ্ছে তার, আর কিছু দিন হয়তো। কাল অথবা হয়তো আজই—
তারপর? আমজাদ সাহেব খুব চান এইসব নিঃসঙ্গতার পোকারা উল্লাস আয়োজনে রুহিনের দরজায় দ্রিম দ্রিম করে বাজাক বাজনা। বারিধারার ডুপ্লেক্সের এসি রুমে রুহিনের স্বস্তিকর ঘুম ভেঙে যাক। উৎকন্ঠায় সে ছুটে আসুক সেই ছোট্ট পরীটার মত। জড়িয়ে ধরুক তাকে। আমজাদ টস করে আসবে রুহিন নাকি আসবে না? হয়তো আসবেই না। না আসুক। তার শরীরের ভারহীন অনুভব এখন নিশ্চিত জানে, এইতো আর একটু, আর একটু হলেই অন্যচোখে দেখতে পাওয়া যাবে সেই নির্দয় বালিকার মুখ, শোনা যাবে ‘পাপা পাপা ভঅঅঅয়’।
আমজাদ সাহেব এসব ভাবেন, ভেবে ভেবে জ্বরে ভোগেন বিভ্রমের থাকেন, সেখান থেকে কেউ তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে বলেন না আসলে রুহিন নামে তার কোনো কন্যাই নেই। অতীতেও ছিলো না। কেউ তাকে জানান না তিনি কোনো বারিধারার ডুপ্লেক্সে নেই, তিনি আছেন 'আশ্রয়' নামের এক বৃদ্ধ নিবাসে। তাকে দীর্ঘদিন মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের পাশে ভালো কাপড়-চোপড় পরে বসে থাকতে দেখা গেছে।
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও পরিচয় উদ্ধার হয়নি বলেই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন দিয়ে গেছেন এই নিবাসে। হতে পারেন তিনি অন্য দেশের। দীর্ঘদিন কাজ করে এখানে স্মৃতি-বিভ্রম রোগে হারিয়েছেন ঘরে ফেরার পথ। আমজাদ সাহেব যে ফটোফ্রেমকে আকড়ে ধরে স্মৃতির পরিচর্যা শূন্যতা দীর্ঘ করেন, ওটা একটা ক্যালেন্ডারের পাতা, যেখানে সবসময় একটা হাসিমুখ ছোট মেয়ের নাচের ভঙ্গিমা। অথরিটির কেউ প্রয়োজনেও ওখানে গেলে আমজাদ সাহেব চেঁচান, হাত পা ছোঁড়েন, ছবির মেয়েকে আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলেন, রুহিন রুহিন ভঅঅয় ভঅঅয়।

বারিধারার এই ডুপলেক্স ভবনের দক্ষিণের মাস্টার বেডরুমটা বুড়ো আমজাদ সাহেবের এখন স্থায়ী ঠিকানা। পাশের ঝকঝকে টয়লেট আর লেক ভিউ বারান্দাটাও তার। শরীর আর মনের যে অবস্থা, তাতে জুম্মার নামাজে মসজিদে যাওয়ার সামর্থ্যটুকুও হারিয়েছেন তিনি। জায়নামাজে বসে তসবিহ গোনা আর শেলফের উপরে রাখা পবিত্র কোরআনের ক্যালিগ্রাফি করা মলাটটুকু আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখাই এখন তার বড় প্রার্থনা।
রুহিন একটা রুপালি ফটোফ্রেম রেখে গেছে পাশে। আমজাদ সাহেবের কাঁধে ছোট্ট রুহিন। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে লাল কাঁকড়া দেখে হাসছিলো বাপ-বেটি। আমজাদ সাহেব ভেবে অবাক হন, এই মেয়েটা তখন কত ছোট ছিল। ফ্রক পরে ঘুরতো, থপথপ করে হাঁটতো। তেলাপোকা দেখলে দৌড়ে ছুটে আসত বাবার বুকে, ঝাপিয়ে পড়ে আধো-আধো বোলে বলতো ‘পাপা পাপা ভয়অঅয়’! রুহিনের মা সুরাইয়া মারা যায় বাচ্চাটাকে এই এইটুকুন রেখে, ঠিক যেন বিড়ালের ছানা। আমজাদ সাহেবের শখ হলে আঙুল চুবিয়ে দুধ তুলে দিতেন ওর ঠোঁটে। চুকচুক করে খেতো কেমন। বারিধারার এই যান্ত্রিক নাগরিক এলাকায় উৎসব এলে কেবল মুশকিল হতো। কেউ ছিল না রুহিনকে সাজাবার। আমজাদ সাহেব নিজেই মেয়ের লম্বা গাউনে ফিতা বেঁধে দিতেন আর গুনগুন করে গাইতেন কোনো পুরনো দিনের গান।
আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী
সাথী মোদের নীল পরী
সেই ছোট্ট রুহিন। একসময় আমজাদ সাহেব ছিলেন এই শহরের নামকরা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। চাইলে যৌবনের পুরোটা খরচ করে দিতে পারতেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অলিতে-গলিতে। তার পছন্দও ছিল ওসব রোমহর্ষক কাজ, তারপরও সুরাইয়ার অনুপস্থিতিতে সে রুহিনের ‘সুপার ড্যাড’ হওয়ার চেষ্টা করেছেন পুরোদমে। ক্যাঙারুর থলের মত বুকে-কাঁধে-পেটে বাচ্চা বেঁধে নিয়ে ঘুরেছেন এদিক-সেদিক। পৈত্রিক এই বাড়িটার এককোনা সংস্কার করে মেয়েকে বানিয়ে দিয়েছিলেন বিশাল প্লে-জোন। ঘোড়া, দোলনা আর স্লাইডারের হুলুস্থুল। রুহিনকে কখনো একা হতে দেননি তিনি। রুহিন একটু বড় হলে তার বন্ধুদের সাথে আড্ডা, দামি পারফিউমের ঘ্রাণ আর তার ও তার বন্ধুর আবছায়া যৌথ শরীর, আলিঙ্গন ও হাসির শব্দ শুনেও তথাকথিত কড়া বাঙালি বাবার মত তর্জনীর শাসন তুলে বিব্রত করতে চাননি মেয়েকে। মেয়ে যা করতে চেয়েছে, করেছে। আমজাদ কেবল কলুর বলদের মত মুখে রক্ত তুলে যুগিয়ে গেছেন প্রাচুর্যের যোগান।
রুহিন তার অচেনা হয়েছে সেই কবেই যেদিন ওই হুলোমুখো ছেলেটাকে বিয়ে করলো, আবার বছর ঘুরতেই ডিভোর্স হয়ে মেয়েটা যখন খিটখিটে হয়ে একা হয়ে গেল সেই সময় থেকেই। নিঃসঙ্গ রুহিন যখন রাত হলে ড্রয়িংরুমে বসে হরর কিংবা অ্যাডাল্ট মুভি নিয়ে বসতো, সময় সময় আমজাদ সাহেব চাইতেন আলগোছে ওর পাশে বসতে, পিঠে হাত রেখে বলতে কিছু স্নেহের কথা। অথচ ওই বুড়ো বাবাকে রুহিনের মন আর ঠিক বন্ধু হিসেবে নিতে পারতো না। আমজাদ বুঝতেন তার উপস্থিতি রুহিনকে আর আনন্দ দেয় না একটুও। সেই ড্রয়িংরুমের আবছা আলোতেও সে টের পেত মেয়ের কুঁচকানো ভ্রু আর তোবড়ানো গালে বিরক্তি।
এখন আর ওসবের বালাই নেই। সব দুঃশ্চিন্তা একদম হঠাৎ করেই ফুরিয়েছে তার। নিজেকে খুব ভারহীন লাগে এখন। তার নাকি অ্যালঝাইমার্স নামের এক ভয়াবহ স্মৃতিভক্ষক ভাইরাস ওলট-পালট করে দিচ্ছে তার মস্তিষ্ক, একা করে দিচ্ছে মানুষ—তার এখন ভালোই লাগছে। পৃথিবীতে কেন শুধু সে একাই বিস্মৃত হবে? সবাই হোক। সবাই আটকে থাকুক নিজের মগজের কুঠুরিতে। চেনা মানুষের অচেনা চাহনির তাপে পুড়ুক আমলা-কামলা সব। কারো কিছুতে তার আর কিচ্ছু যায় আসে না।
আমজাদ সাহেবের এই ‘অন্তরীণবাস’ রুহিনের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হয়েছে। কী করেছিলেন তিনি? ভুল করে একদিন গ্যাস ওভেন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, আরেকদিন বারিধারার রাস্তায় লুঙ্গি পরে বেরিয়ে পড়েছিলেন নিজের হারিয়ে যাওয়া অফিস খুঁজতে। প্রতিবেশীরা যখন তাকে উদ্ধার করে আনলো, রুহিনের আভিজাত্যে বড় চোট লাগলো। ব্যস, রুমটা লকডাউন হয়ে গেল। আর মাঝখান থেকে অসংলগ্ন কথাবার্তা আর হ্যালুসিনেশনের বদৌলতে আমজাদ সাহেবও খেলেন মেয়ের কাছে ধরা। যাক কী আর করা। মেয়ে গৃহবন্দি করেছে করুক, এটাও হয়তো ওর পূর্বেকার মত উচ্ছ্বাসহীন একপ্রকার ভালোবেসে ফেলে রাখাই।
প্রথম-প্রথম খুব ভালো আছেন—ভালো আছেন এমন একটা ভাব করেছেন তিনি। কার কাছে করেছেন তিনি জানেন না, হয়তো নিজের কাছেই। একা থাকার অভ্যেস তো তার হয়েই আছে, এখন আর কি! এখন বরং নিজেকে খুব আপন লাগছে, কারো কথা ভাবতেই হচ্ছে না—না বিজনেস, না মেয়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বেশি সময় এই ভাবটা থাকে না তার। রাত হলেই তৃষ্ণা জেগে ওঠে, কীসের যে তৃষ্ণা? অবরুদ্ধ দিনের একেকটা দিন যাচ্ছে আর তার তৃষ্ণার বোধটা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে কত দীর্ঘকাল সে পানি খায় না। কতদিন হলো?
দুদিন ধরে যখনই তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে শূন্যতার অদৃশ্য পোকা কামড় দিচ্ছে, তখনই তার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে—হাউমাউ করে কান্না। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘রুহিন রুহিন তুই কইরে মা, কাছে আয়, এই দেখ তোর পাপা সব ভুলে যাচ্ছে, পাপা মরে যাচ্ছে, আয়।’
কেউ আসে না। কেউ না। স্মৃতির উত্তাপে পুড়তে পুড়তে তবু সে স্বপ্ন দেখে যায় আবার তার সেই প্রথম যৌবন; সুরাইয়া আবার ফিরে এসেছে, তাদের ঘর ভরা ছেলেপুলে। সে অফিস যায়, সুরাইয়া ব্রেকফাস্ট গোছায়। তাদের বড় মেয়ে, ছোট মেয়ে মায়ের ওড়না নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। ছেলেবাবুরা হাফপ্যান্ট পরে বাবল ফোলায়, ক্রিসক্রস খেলে। তাদের মেয়েরা বড় হয়, তাদের ছেলেরা হাতে বাড়ে, পায়ে বাড়ে। আর তারা দুই বুড়োবুড়ি পার্কে হাঁটতে-হাঁটতে স্বপ্ন দেখতে-দেখতে দিন ফুরিয়ে ফেলে।
তারপর বাতাস এসে নিয়ে যায় সব। সুরাইয়া হারিয়ে যায়, রুহিন হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় বাবল ফোলানো সেই ক্রিসক্রস দিন। সময় আর কাটে না। একেকটা মুহূর্ত পরে আমজাদ সাহেব ভয়ে সেধিয়ে যান নিজের শরীরের ভেতরে। শব্দ শুনতে পান হৃৎপিণ্ডের। ধুকপুক ধুকপুক ধুকপুক। এত জোরে বাজে মনে হয় স্নেক গেমসের সেই রেগে থাকা অজগর। নিজেকে প্রবোধ দেন তিনি, ভয় পেলে চলবে না এখন, সে একা নয়; আজ হোক কাল হোক রুহিন আসবেই, মাথায় হাত রেখে বলবে—ভয় নেই পাপা, আমি আছি তো, এই দেখ রাত জেগে বসে আছি তোমার পাশে। ভয় নেই একদম। তোমার পানি লাগবে পাপা? বাতাস? অক্সিজেন? এই নাও, হা করো হা।
আমজাদ সাহেব হা করে শ্বাস নেন। কোথায় পানি, কোথায় মমতা? রুহিন বলেছিল ক্ষুধার্ত হলে দরজায় টোকা দিতে। দিয়েছেন তো কতদিন। রুহিন কিছু শুনেছে, কিছু শোনেনি। এই টোকাহীন দরজায় রুহিন কী টের পায় না তার পাপার ক্ষুধা ফুরিয়েছে, ফুরিয়েছে বোধ? মগজের পোকারা, গলার পোকারা গলে গলে যাচ্ছে তার, আর কিছু দিন হয়তো। কাল অথবা হয়তো আজই—
তারপর? আমজাদ সাহেব খুব চান এইসব নিঃসঙ্গতার পোকারা উল্লাস আয়োজনে রুহিনের দরজায় দ্রিম দ্রিম করে বাজাক বাজনা। বারিধারার ডুপ্লেক্সের এসি রুমে রুহিনের স্বস্তিকর ঘুম ভেঙে যাক। উৎকন্ঠায় সে ছুটে আসুক সেই ছোট্ট পরীটার মত। জড়িয়ে ধরুক তাকে। আমজাদ টস করে আসবে রুহিন নাকি আসবে না? হয়তো আসবেই না। না আসুক। তার শরীরের ভারহীন অনুভব এখন নিশ্চিত জানে, এইতো আর একটু, আর একটু হলেই অন্যচোখে দেখতে পাওয়া যাবে সেই নির্দয় বালিকার মুখ, শোনা যাবে ‘পাপা পাপা ভঅঅঅয়’।
আমজাদ সাহেব এসব ভাবেন, ভেবে ভেবে জ্বরে ভোগেন বিভ্রমের থাকেন, সেখান থেকে কেউ তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে বলেন না আসলে রুহিন নামে তার কোনো কন্যাই নেই। অতীতেও ছিলো না। কেউ তাকে জানান না তিনি কোনো বারিধারার ডুপ্লেক্সে নেই, তিনি আছেন 'আশ্রয়' নামের এক বৃদ্ধ নিবাসে। তাকে দীর্ঘদিন মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের পাশে ভালো কাপড়-চোপড় পরে বসে থাকতে দেখা গেছে।
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও পরিচয় উদ্ধার হয়নি বলেই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন দিয়ে গেছেন এই নিবাসে। হতে পারেন তিনি অন্য দেশের। দীর্ঘদিন কাজ করে এখানে স্মৃতি-বিভ্রম রোগে হারিয়েছেন ঘরে ফেরার পথ। আমজাদ সাহেব যে ফটোফ্রেমকে আকড়ে ধরে স্মৃতির পরিচর্যা শূন্যতা দীর্ঘ করেন, ওটা একটা ক্যালেন্ডারের পাতা, যেখানে সবসময় একটা হাসিমুখ ছোট মেয়ের নাচের ভঙ্গিমা। অথরিটির কেউ প্রয়োজনেও ওখানে গেলে আমজাদ সাহেব চেঁচান, হাত পা ছোঁড়েন, ছবির মেয়েকে আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলেন, রুহিন রুহিন ভঅঅয় ভঅঅয়।

কোরবানির ঈদে বাড়িতে বানানো হয় মাংসের বিভিন্ন পদ। সকালে মাংস-রুটি, দুপুরে কালাভুনা বা মেজবানি গরুর মাংস আর রাতে পোলাও-কোরমা কিংবা বিরিয়ানি। ঈদের সময়টায় কখনও নিজের ঘরে, কখনও দাওয়াতে মাংস খাওয়ার ধুম চলতেই থাকে। তবে উৎসবের আনন্দে অনেকেই হিসাব ছাড়া মাংস খেয়ে ফেলেন। এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
২৩ মিনিট আগে
কলম আমার বয়সী মানুষের কাছে খুব পছন্দ আর শখের বস্তু। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মই চক বা পেন্সিল থেকে শুরু করে বলপেন হয়ে স্মার্টপেনের বিবর্তন দেখতে পেয়েছে। এর আগে ঘড়ি নিয়ে আমার একটা লেখা সম্পর্কে অনেকেই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কলম নিয়ে লেখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সে সূত্রে আজ বলা যাক কলমের গল্প।
১ ঘণ্টা আগে
প্রথমে ছুরি মারার দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছিল। এখন দুই পক্ষের মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হওয়ার খবর আসতে লাগল। সেই লড়াইয়ে দেদার ব্যবহার হচ্ছিল চাকু-ছুরির পাশাপাশি কৃপাণ, তলোয়ার আর বন্দুক। মাঝে মাঝে দেশে তৈরি বোমা ফাটার খবরও আসছিল।
১ ঘণ্টা আগে
জীবিত অবস্থায় অন্ধকার ঘরে গিয়ে তাঁর পাশে বসা কঠিন ছিল। এখন সেই ঘরে গিয়ে বসা আর সম্ভব নয়। এখন তাঁর দরজায় আর কড়া নাড়া যাবে হয়তো; কিন্তু ভেতর থেকে ছিটকিনি খুলে কেউ মুখোমুখি দাঁড়াবে না। কেউ বলবে না, ঘরে সাপ আসে।
২ ঘণ্টা আগে