চলচ্চিত্রে নজরুল, নজরুলের চলচ্চিত্র

স্ট্রিম গ্রাফিক

কাজী নজরুল ইসলামের শিল্প সাহিত্যের বিবিধ বিষয়ে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস সর্বজনবিদিত। তাঁর এই যুক্ত হওয়া কেবল রচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একই সঙ্গে একজন পারফর্মার, একজন শিল্পী। ফলে নজরুল কবি, কথাসাহিত্যিক ও সংগীত রচয়িতার পাশাপাশি একজন সংগীত শিল্পী, একজন বাদক, একজন অভিনয় শিল্পী এবং একই সঙ্গে একজন রাজনীতিকও বটে। তাই নজরুলকে নির্দিষ্ট কিছু অভিধা দিয়ে পরিচিত করানো হলে তাঁর খণ্ডিত রূপকেই হাজির করা হয়। নজরুল নিজেও অবশ্য তেমনটি চাননি। ফলে তিনি প্রতিনিয়ত ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ নিজে মেতে থেকেছেন, অন্যদেরও মাতিয়েছেন। চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি তেমনই সরব, এই অর্থে যে, তিনি নিজে অভিনয় করেছেন, সুর দিয়েছেন এবং সংগীত পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।

নজরুলের চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি ধরন লক্ষ করা যায়, যথা: অভিনয়, সংগীত ও পরিচালনা। কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে নজরুল যতোটা আলোচিত ও সমালোচিত তাঁর চলচ্চিত্রজগৎ ততটাই অনালোচিত। এর কারণ কী? ঐতিহাসিকভাবে এই বিষয়টির খোঁজ করা দরকার। বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রায় প্রাথমিক পর্যায়েই নজরুলের সম্পৃক্ততা লক্ষ করা যায়। ১৯৩০-৩১ সালে পার্সি চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে উদ্যোগ গ্রহণ করে, সেখানে ম্যাডান থিয়েটারে নজরুল সুরভাণ্ডারী হিসেবে নিযুক্ত হন। এ পদে তাঁর দায়িত্ব ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় শিল্পীদের কণ্ঠস্বর যাচাই করা। এবং এটি ছিল সংগীত পরিচালকের চেয়ে ঊর্ধ্বতন পদ। এ প্রসঙ্গে ১৯৩১ সালে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদটি ছিল এরকম:

নজরুল ইসলাম ম্যাডান কোম্পানীর সুরভাণ্ডারী

ম্যাডার্ন থিয়েটারস লিমিটেড বাঙ্গালা গানের টকি নির্মাণ করিতেছেন। প্রসিদ্ধ কবি ও সঙ্গীতকার নজরুল ইসলামকে সুর-ভান্ডারী নিযুক্ত করিয়াছেন। তাঁহাদের এ মনোনয়ন যথার্থ হইয়াছে, কারণ অধুনা বাংলার তরুণ কবিদের মধ্যে নজরুল ইসলাম সুরকার ও কবি হিসেবে শ্রেষ্ঠ। বর্তমান কিছুকাল ম্যাডান কোম্পানি নট নটীদের স্বর পরীক্ষার জন্য কেবল গান-আবৃত্তির সবাক চিত্রই নির্মাণ করিবেন। পরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবি তাঁহারা সবাক করিয়া তুলিবেন বলিয়া শুনা যাইতেছে।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে নজরুলের এই যাত্রা তার অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত জারি থাকে। বলা যায়, ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তার এই চলচ্চিত্রযাত্রা চলে। যার অন্যতম চিত্র লক্ষ করা যায়, ১৯৩৩ সালে কাজী নজরুল ইসলাম ও সত্যেন্দ্রনাথ দে পরিচালিত ‘ধ্রুব’ সিনেমায়। এটি মূলত গিরীশচন্দ্রের ‘ধ্রুব চরিত’ অবলম্বনে নির্মিত হয়। ‘ধ্রুব’তে কাজী নজরুল ইসলাম একই সঙ্গে পরিচালক, সুরকার, গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী ও অভিনয়ে যুক্ত থাকেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী নজরুলের চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত অভিনন্দন বার্তাটি হলো-

কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ইনি সম্প্রতি পাইওনিয়ার ফিল্ম কোম্পানির ফিল্ম ডিরেক্টর নিযুক্ত হইয়াছেন। বাঙালী মুসলমানের মধ্যে ইতি পূর্বে আর কেহ ছায়াচিত্র জগতে এরূপ উচ্চপদের অধিকারী হন নাই। আমরা কবিকে তাহার এই সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জ্ঞাপন করিতেছি।

উদ্ধৃতির এই অভিনন্দন বার্তায় কাজী নজরুলের পরিচয় বিশেষ ভাবে খেয়াল করা দরকার। এখানে তাকে ‘বাঙালী মুসলমান’ হিসেবে পরিচয় প্রদান করা হয়েছে। তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, বাঙালি মুসলমান নজরুল যে সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সেই সময়ে চলচ্চিত্রের দর্শক হিসেবে বাঙালি মুসলমানের অবস্থান কেমন ছিল? নজরুল কবি হিসেবে যেভাবে বাঙালি মুসলমান সমাজে সমাদৃত কিংবা স্বীকৃতি পেয়েছে চলচ্চিত্রের নজরুল হিসেবে খ্যাতি না পাওয়ার ক্ষেত্রে কি বলা যায় যে, বাঙালি মুসলমান এই ভূমিকায় তাকে গ্রহণ করেনি! যেমন নজরুলকে বিভিন্ন সময়ে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী কাফের, মুরতাদ হিসেবেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। সেই সময়ের জনপ্রিয় কবি গোলাম মোস্তফা ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে ব্যঙ্গ করে ‘আমি ব্যাঙ’ নামে প্যারোডি লেখেন।

গোলাম মোস্তফার এই ধরনের কার্যকলাপের কারণ কী? বলা যায়, বাঙালি মুসলমান সমাজের অনেকেই নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করতে পারেনি। তারা নজরুলকে শুধু বাঙালি মুসলমানের কবি হিসেবেই দেখেছেন বা দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু নজরুল তো নিজেকে সেই বৃত্তে বন্দী করতে চাননি। ফলে তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’তে তিনি নারদের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৯৩৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রের আঠারোটি গানের মধ্যে সতেরোটি গান তাঁর লেখা ও সুর-আরোপ করা এবং চারটি গানে তিনি কণ্ঠশিল্পীর ভূমিকায় থাকেন। এরপর ১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রে কাজী নজরুল ইসলাম গীতিকার ও সংগীত পরিচালনা করেন। এই চলচ্চিত্রে কাজী নজরুল সংগীতের ক্ষেত্রে একধরনের ফিউশন করেন, যা নজরুলী ঝুমুর হিসেবে পরিচিত পায়। তিনি ‘রাঢ় বাংলার প্রচলিত ঝুমুরের সুরের সাথে সাঁওতালিকে মিলিয়ে তৈরি করলেন নজরুলী ঝুমুর।’

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নজরুলের গান ব্যবহারের পরিসংখ্যানের তুলনায় তাঁর সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা নগণ্য। এর কারণ কী? যে নজরুলকে বাঙালি মুসলমান রবীন্দ্রনাথের কাউন্টার হিসেবে পরিচয় দিতে মরিয়া হয়ে থাকে, সেই নজরুলের সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের দুর্দশা আসলে কোন ধরনের সংকটকে হাজির করে

এই ধারাবাহিকতায় নজরুল ইসলাম ‘গ্রহের ফের’ (১৯৩৭), ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৮), ‘গোরা’ (১৯৩৮) চলচ্চিত্রে সুর ও সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। ‘গোরা’ চলচ্চিত্রটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ (১৯১০) উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়। ফলে রবীন্দ্র-নজরুল একই সঙ্গে বিরাজ করে এই চলচ্চিত্রে। যদিও জানা যায় যে, ‘গোরা’ চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র সংগীতের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বভারতী সমস্যা তৈরি করে আর তখন কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণাপন্ন হন। তৎকালে রবীন্দ্র সংগীত ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশ্বভারতীর অনুমতি নেওয়ার বিধান ছিল। কিন্তু সংগীত পরিচালক নজরুল তা করেননি। তার বিশ্বাস ছিল ‘গোরা’ সিনেমার ক্ষেত্রে হয়তোবা তারা কোনো বিপত্তি করবে না। কিন্তু চলচ্চিত্র মুক্তির দুয়েকদিন পূর্বে বিশ্বভারতী আপত্তি তোলে যে, চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত রবীন্দ্র সংগীতে ত্রুটি রয়েছে। এই অজুহাতে তারা ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের মুক্তি বন্ধ করে দেন। বিষয়টি ছিল এরকম :

ব্যাপারটি শোনামাত্র কবি সঙ্গে সঙ্গে একটি গাড়িতে করে ‘গোরা’ ফিল্মটির কপি একটি ছোটো প্রজেকশন মেশিন, সঙ্গে দেবদত্ত ফিল্মস এর প্রোপাইটর ও তখনকার সহকারী মানু গাঙ্গুলীকে সঙ্গে নিয়ে সোজা শান্তি নিকেতনে চলে গেলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে। বিশ্বকবি তো তাকে দেখে প্রথমে অবাক ও পরমুহূর্তে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে বললেন এসেছই যখন কয়েকদিন আমার কাছে থেকে যাও। নজরুল বললেন, ‘সে তো আমার সৌভাগ্য-কিন্তু এখন যে ভীষণ বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে আপনার কাছে ছুটে এসেছি। তারপর নজরুল ছবি সংক্রান্ত সমস্ত ব্যাপার বললেন।

বিশ্বভারতী বোর্ডের অনুমোদন না পাওয়ার কথাও জানালেন। শুনে বিশ্বকবি বেশ অসন্তুষ্ট স্বরে অভিমত প্রকাশ করলেন-‘কী কাণ্ড বলত? তুমি শিখিয়েছ আমার গান আর ওরা কোন আক্কলে তা’র দোষ ধরে...? তোমার চেয়েও আমার গান কী তারা বেশী বুঝবে। আমার গানের মর্যাদা কী ওরা বেশী দিতে পারবে?’ কবি নজরুল বললেন, ‘কিন্তু লিখিত অনুমতি না পেলে সামনের ঘোষিত তারিখে ছবিটার মুক্তি দেওয়া যাবে না। আপনি দয়া করে আজ এক সময় ছবিটা দেখুন- আমি প্রজেক্টর ও ফিল্ম সঙ্গে করে এনেছি। তারপর অনুমতি পত্রে একটা সই দিয়ে দিন।’ বিশ্বকবি বলেন- ‘ছবি দেখাতে চাও সকলকেই দেখাও- সবাই আনন্দ পাবে। আপতত দাও কিসে সই করতে হবে’- এই বলে নজরুলের হাত থেকে আগের থেকেই লিখে রাখা অনুমতি পত্র নিয়ে তাতে সই ও তারিখ দিয়ে দিলেন। নির্দিষ্ট দিনেই ছবিখানি মুক্তি পেল।

এরপর ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাপুড়ে’ সিনেমায় নজরুল কাহিনিকারের ভূমিকা পালন করেন। যদিও সুরকার হিসেবে তিনি এই চলচ্চিত্রে সুর সংযোজনও করেছিলেন কিন্তু তার নাম ব্যবহার করা হয়নি। পরবর্তী পর্যায়ে নজরুল নন্দিনী (১৯৪১), চৌরঙ্গী (১৯৪২) চলচ্চিত্রে গীতিকার ও সংগীত পরিচালনা করেন। এই সময়ের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আর প্রত্যক্ষভাবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেননি। তবে তাঁর রচিত গান চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হতে থাকে।

ঔপনিবেশিক ভারতের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে নজরুলের গান ‘দিকশূল’ (১৯৪৩), ‘শহর থেকে দূরে’ (১৯৪৩), ‘অভিনয় নয়’ (১৯৪৫) সিনেমায় ব্যবহার করা হয়। ১৯৪৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ সিনেমায় নজরুলের গান ব্যবহার করার ক্ষেত্রে নতুনত্ব আসে। উপনিবেশ-বিরোধী ভাবনা দ্বারা তাড়িত হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কালে ১৯৩০ সালে সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের যে ঘটনা তাকে উপজীব্য করা হয় এই সিনেমায়। ফলে এখানে ব্যবহৃত হয়েছে যথাক্রমে- ‘চল্ চল্ চল্/ উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ ও ‘কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙে ফেল কররে লোপাট’ গান দুটি। যদিও কোরাস ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তবুও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। চলচ্চিত্রে উপনিবেশ-বিরোধী চেতনাকে সাধারণ দর্শকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নজরুলের এই সকল গান অনবদ্য হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে দর্শকের মনে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রেও নজরুল সংগীত বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

খান আতার পরিচালনায় ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ (১৯৬৭) চলচ্চিত্রে নজরুলের দুটি গান ব্যবহার করা হয়। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্র বাঙালির জাতীয় জীবনে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে জাগিয়ে তোলে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের যে-দাবি ওঠে তা ভবিষ্যতের স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি পূর্বরূপরেখা হিসেব কাজ করে। এই প্রেক্ষাপটে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে নজরুলের ‘পথ হারা পাখি কেঁদে ফিরে একা’ ও ‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’ গান দুটি দর্শকের হৃদয় আর্দ্র করে এবং তারা আবেগী হয়ে ওঠে- যা তাদের মনে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জাতীয় চেতনা সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলে।

এরপর ১৯৭০ সালে জহির রায়হান নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে নজরুলের দুটি গান ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ ও ‘শিকল পরা ছল’ গান দুটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মনে যেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে ঠিক তেমনি বাঙালিদের মনে উদ্দীপনা জাগায়। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, চলচ্চিত্রে নজরুল সংগীত সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকেনি বরং তার ব্যক্তিজীবনের মতোই বহুধা অর্থ তৈরি করেছে। আর এখানেই নজরুল হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্র। স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জাতীয় কবির স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত ব্যবহারের তালিকা বেশ দীর্ঘ। তার মধ্যে যেগুলোর প্রমাণ পাওয়া যায়- ‘বারবধূ’ (১৯৭৮), ‘বধূবিদায়’ (১৯৭৮), ‘দেবদাস’ (১৯৭৯), ‘মাটির স্বর্গ’ (১৯৮২), ‘লাইলী মজনু’ (১৯৮৩), ‘আগমন’ (১৯৮৮), ‘দুষ্টু ছেলে মিষ্টি মেয়ে’ (২০০০), ‘চন্দ্রকথা’ (২০০৩), ‘মেহের নিগার’ (২০০৬), ‘রাক্ষুসী’ (২০০৬), ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ( ২০০৭) প্রভৃতি।

এআই জেনারেটেড ছবি
এআই জেনারেটেড ছবি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নজরুলের গান ব্যবহারের পরিসংখ্যানের তুলনায় তাঁর সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা নগণ্য। এর কারণ কী? যে নজরুলকে বাঙালি মুসলমান রবীন্দ্রনাথের কাউন্টার হিসেবে পরিচয় দিতে মরিয়া হয়ে থাকে, সেই নজরুলের সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের দুর্দশা আসলে কোন ধরনের সংকটকে হাজির করে? তিরিশের দশকে নজরুল তাঁর ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের জন্য যদি চলচ্চিত্রে তেমন সুবিধা করতে না পারে, তবে স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুল সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে বাধা কোথায়? বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে নজরুলের যে স্বীকৃতি তাতে তাঁকে সর্বসাধারণের কাছে ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চলচ্চিত্র তো সবচেয়ে সহজ ও গ্রহণযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু এখানেই নজরুলের অনুপস্থিতি প্রকট। বলা যায়, সাধারণ বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক অভিরুচি নজরুলকে এখনও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্যেই বৃত্ত-বন্দী করে রেখেছে। আর মুখরোচক কুতর্কে ধর্মীয় আইডেনটিটির কারণে রবীন্দ্রনাথের বিপরীত বর্গ হিসেবে নজরুলকে হাজির করেছে। কিন্তু নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা তো পুরোপুরি এর বিপরীত সত্তা হিসেবে হাজির হয়। তবে বাঙালি মুসলমানের সংকট তারা নজরুলকে জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি আরও নানান অভিধায় ভূষিত করে তাঁর গজলকে গ্রহণ করতে রাজী হয় ঠিকই কিন্তু শ্যামা সংগীতকে নয়। ফলে এখানেই বাঙালি মুসলমানের কাছে নজরুল খণ্ডিত হয়ে পড়ে। যে নজরুল মিথ ও পুরাণকে কেন্দ্র করে শিল্পসাহিত্য ও সংগীতের আধার নির্মাণ করেছেন সেই নজরুল বাঙালি মুসলমানের কাছে ব্রাত্য। ফলে নজরুলের সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এটা একধরনের বিপত্তি ও সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ প্রসঙ্গে ‘রাক্ষুসী’ সিনেমার কথা বলা যাক।

‘রাক্ষুসী’ কাজী নজরুল ইসলামের ‘রিক্তের বেদন’ (১৯২৪) গল্পগ্রন্থের একটি ছোটোগল্প। বীরভূম অঞ্চলের বাগদি নৃগোষ্ঠীর নারী বিন্দিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে গল্পের কাহিনি। বিন্দি তার স্বামীকে পরনারী আসক্তি থেকে ফেরাতে না পেরে স্বহস্তে হত্যা করে। স্বামী হত্যার পর তার সাত বছরের জেল হয় এবং কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সে যখন গ্রামে ফিরে আসে তখন গ্রামবাসী স্বামীকে খুনের দায়ে রাক্ষুসী তকমা দিয়ে তাকেও হত্যাযোগ্য করে তুলতে চায়।

ইংরেজ উপনিবেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একজন নারী তার অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়েছে এভাবেও গল্পটিকে পাঠ করা যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় বাগদি নৃগোষ্ঠীর স্বামী হন্তারক একজন নারীকে প্রধান চরিত্র হিসেবে ধরে পরিচালক মতিন রহমান নির্মাণ করেন রাক্ষুসী চলচ্চিত্রটি। প্রশ্ন জাগে, এই গল্পের চলচ্চিত্রের দর্শক কারা- বাঙালি নিম্নজীবী শ্রেণি, মধ্যবিত্ত শ্রেণি নাকি উচ্চবিত্ত?

যেহেতু কাজী নজরুল বিষয়ে বাঙালি মুসলমানের একধরনের ফ্যান্টাসি কাজ করে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কি দর্শককে বাঙালি মুসলমান আতরাফ, বাঙালি মুসলমান আশরাফ শ্রেণি বলা যাবে? তো এখানে নজরুল বিষয়ক আইডেনটিটির একটা ফাটল তৈরি হচ্ছে। কারণ পূর্বেই বলা হয়েছে, বাঙালি মুসলমান আইডেনটিটি নিয়ে যারা নজরুলকে ধারণ করে তারা নজরুলের খন্ডিত সত্তাকে দেখে ও দেখাতে চায়। ফলে বাঙালি মুসলমানের নজরুল অমুসলিম বাগদীদের নিয়ে নারীকেন্দ্রিক গল্প লিখছে এবং সেই গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, এর দর্শক তারা কোনোভাবেই হবে না। তাহলে এর দর্শক কারা? কিংবা এর পাঠক কারা? ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের বাইরে যারা জাতীয়তাবাদী আত্মপরিচয় ধারণ করে তারা। সেক্ষেত্রে ভাষিক আত্মপরিচয়টাই মুখ্য হয়ে ওঠে অর্থাৎ বাঙালি। তো নজরুল প্রতিনিয়ত প্রথাবদ্ধ সংকীর্ণতার গন্ডিকে এভাবেই তাঁর শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্ম দ্বারা ভেঙেছেন। সেটা হতে পারে চলচ্চিত্রে অভিনয়, সুর সংযোজন, সংগীত পরিচালনা কিংবা কাহিনি রচনার মধ্য দিয়ে।

তথ্যঋণ: অনুপম হায়াৎ, ‘চলচ্চিত্র জগতে নজরুল’, কলি প্রকাশনী, ঢাকা। আসাদুল হক, ‘চলচ্চিত্রে নজরুল’, বইপড়া, ঢাকা

সম্পর্কিত