২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সেই অকুতোভয় স্মৃতি, আহতদের হাহাকার আর শহীদ পরিবারের করুণ আর্তি নিয়ে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ গ্রন্থ ‘জুলাই বয়ান’। ‘জুলাই রেকর্ডস’-এর উদ্যোগে এবং কাজী ওয়ালী উল্লাহ ও সুলাইম মাহমুদের সম্পাদনায় বইটি বাজারে এনেছে ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশনী।
বইটি কেবল আন্দোলনের দিনলিপি নয়, বরং এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি জীবন্ত ‘ওরাল হিস্ট্রি’। বইটি সম্পর্কে ‘জুলাই রেকর্ডস’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সুলাইম মাহমুদ জানান, আন্দোলনের পর পর আহতদের চিকিৎসা ও সহায়তার উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করলেও নানা জটিলতার কারণে তারা ভিন্ন পথ বেছে নেন। তারা উপলব্ধি করেন, প্রতিটি আহত ও শহীদ পরিবারের বুকে জমে আছে না বলা অনেক গল্প। সেই গল্পগুলো মানুষের নিজস্ব ভাষায় অবিকৃতভাবে সংরক্ষণের তাগিদ থেকেই ‘জুলাই রেকর্ডস’-এর জন্ম।
সুলাইম মাহমুদ ও কাজী ওয়ালী উল্লাহর সাথে এই টিমে আরও যুক্ত আছেন চট্টগ্রামের আইনজীবী সানজিদুল আলম সাগর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়াস, মেহেদী, ভিডিওগ্রাফার আবু নাসেরসহ মোট সাতজন নিবেদিতপ্রাণ সদস্য।
‘জুলাই বয়ান’-এর বিশেষত্ব হলো এর উপস্থাপন ভঙ্গি। সুলাইম মাহমুদ বলেন, ‘আমরা প্রথাগত কোনো সাক্ষাৎকারের ছকে গল্পগুলো বাঁধিনি। আমাদের লক্ষ্য ছিল মানুষের কাঁচা আবেগ ও অব্যক্ত বেদনাগুলোকে অবিকৃত রাখা। আমরা যখন কারও কাছে গিয়েছি, তাকে কেবল গল্পটি বলতে বলেছি—সে যেভাবে চায়। তাদের কান্না, বিলাপ এবং যন্ত্রণার সেই বয়ানগুলো বইটিতে এমনভাবে উঠে এসেছে যে পাঠক এখানে ইতিহাসের পাশাপাশি এক ট্রাজিক ফিকশনের স্বাদ পাবেন।’
সারা দেশের ১৩টি জেলায় ঘুরে প্রায় ২৫০টি সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছে জুলাই রেকর্ডস টিম। শুরুতে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে কাজ শুরু করলেও একপর্যায়ে আর্থিক সংকটে কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সুলাইম মাহমুদ জানান, পরবর্তীতে ফেসবুকের মাধ্যমে ক্রাউডফান্ডিং বা সাধারণ মানুষের অনুদানে কাজ চললে তারা বিপুল সাড়া পান। মানুষের এই ভালোবাসাই আড়াই শ ইন্টারভিউ সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছে।
‘জুলাই বয়ান’। ছবি: সংগৃহীতবইটিতে বাছাইকৃত ১৮টি সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। এতে উঠে এসেছে কক্সবাজারের শহীদ নূর মোস্তফার গল্প, যিনি একজন রোহিঙ্গা হয়েও এই আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন কিন্তু এখনো পাননি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের রাজপথে শহীদ হওয়া শ্রমিক ফারুক এবং ফয়সাল আহমেদ শান্তর ট্র্যাজেডিও এখানে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক শিক্ষার্থী তাওহীদুল হক সিয়ামের অভিজ্ঞতা এবং আবু সাঈদের সেই বন্ধুর বয়ানও এতে রয়েছে, যিনি সাঈদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন। মূলত জুলাইয়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও আন্দোলনের কেন্দ্রগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্র এই বইয়ে উঠে এসেছে।
বই প্রকাশের পাশাপাশি ‘জুলাই রেকর্ডস’ তাদের সংগৃহীত সব সাক্ষাৎকার, ভিডিও এবং ডকুমেন্টস নিয়ে একটি ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরির কাজ করছে। সুলাইম মাহমুদ জানান, ভবিষ্যতে গবেষকদের জন্য এই তথ্যগুলো উন্মুক্ত থাকবে। এখনো প্রায় দেড়শো ভিডিও এডিটিংয়ের অপেক্ষায় আছে যা পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।
৫৪০ টাকা মূল্যের এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন কাজী ওয়ালী উল্লাহ। এটি কেবল একটি বই নয়, বরং আগামীর প্রজন্মের কাছে বীরত্ব ও বেদনার এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ইতিহাসের সাক্ষ্য দেবে।