বান্দরবানে এখনো বসবাসের উপযোগী হয়নি বাড়িগুলো, ফিরছে বাসিন্দারা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বান্দরবান

বান্দরবানের উজানীপাড়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরেই ফিরছেন বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি

বন্যায় পাঁচ দিন আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন শৈখিংহ্লা মারমা। বান্দরবানের সদর উপজেলার উজানীপাড়ায় নিজ বাড়িতে ফিরেছেন গতকাল। ফিরেই লেগে পড়েন ঘরের কাদা-মাটি পরিষ্কার করতে। তাতেও লেগেছে একদিন। এখনো পুরোপুরি থাকার উপযোগী হয়তি তার ঘর। তিনি বলেন, ‘আমি আর আমার নানি বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম। পানি নামার সময় ঘরের অনেক অংশ ভেঙে নিয়ে গেছে। গতকাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় ঘরের ফাঁকা জায়গা দিয়ে পানি ঢুকে বিছানাগুলো ভিজে গেছে। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি।’

শৈখিংহ্লা মারমার মতো বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেলেও বান্দরবানের বন্যা দুর্গতদের এখনো দুর্ভোগ কাটেনি। ঘরজুড়ে কাদা ও বালির স্তূপ, ভাঙা মাচাং বাড়ি, পাহাড়ধসের পর আশ্রয়হীন অনেক পরিবার। কেউ সারাদিন কাদা পরিষ্কার করছেন, কেউ মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে। এখনো বসবাসের উপযোগী হয়নি বন্যাকবলিত এলাকার বাড়িগুলো।

মধ্যমপাড়ার বাসিন্দা লক্ষ্মী রানী দাশ বলেন, ‘বাড়িতে প্রায় দুই ফুট বালি জমেছিল। কয়েকদিন ধরে ধুয়ে-মুছে আজ শেষ করেছি। গ্যাসের চুলা কেনার সামর্থ্য নেই, মাটির চুলায় রান্না করতাম। কিন্তু চুলা যেখানে ছিল, সেই মাচাংটাও বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে। এখনো নতুন করে চুলা বানাতে পারিনি।’

বান্দরবান শহরের কাসেম পাড়ায় বাড়িঘর ও সড়কের কাদা পরিস্কার করছেন বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি
বান্দরবান শহরের কাসেম পাড়ায় বাড়িঘর ও সড়কের কাদা পরিস্কার করছেন বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি

অন্যদের মতো নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি ইসলামপুর এলাকার রহিমা বেগম। পাহাড়ধসে তার ঘর ভেঙে গেছে। তিনি আশ্রয় নিয়েছেন শ্বশুরের বাড়িতে। রহিমা বলেন, একদিকে বন্যার পানি উঠছিল, অন্যদিকে ঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ছিল। দুই সন্তানকে নিয়ে কোনোমতে বের হতে পেরেছি। আমার স্বামীকে টিন কেটে উদ্ধার করতে হয়েছে। এখন শ্বশুরবাড়িতে আছি। কবে আবার নিজের ঘরে ফিরতে পারব, জানি না।’

একইভাবে শহরের আর্মিপাড়া, মেম্বারপাড়া, কাশেমপাড়া, ইসলামপুর, হাফেজঘোনা, ক্যচিংঘাটা ও বালাঘাটার এলাকার বন্যার পানি নেমে গেছে দুদিন আগে। বুধবার এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেকেই ঘরে ফিরে কাদামাটি সরিয়ে এখনো বসবাসের উপযোগী করছেন। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছেন দোকানিরা।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় জেলার ৭০ শতাংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাঙ্গু তীরবর্তী বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান পৌরসভা ও মাতামুহুরী তীরবর্তী লামা পৌরসভায়। এছাড়া জেলার ৩৪টি ইউনিয়ন আক্রান্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ পরিবারের। পরোক্ষভাবে ১ লাখের বেশি মানুষ।

বান্দরবান শহরের অফিসার্স ক্লাব পাড়ায় বন্যা আক্রান্ত বাড়িঘর পরিস্কার করছেন বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি
বান্দরবান শহরের অফিসার্স ক্লাব পাড়ায় বন্যা আক্রান্ত বাড়িঘর পরিস্কার করছেন বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি

জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করবেন। বাড়ি ফেরার সময় প্রতিটি পরিবারকে অন্তত দুই দিনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য ৩ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন বরাদ্দ করা হয়েছে সরকার থেকে। তবে গৃহনির্মাণ সহায়তার জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক জানান, বন্যা-পরবর্তী পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ের পাদদেশে নিরাপদ আবাসন নির্মাণ, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধ এবং বান্দরবান শহরের ম্যাকসি খাল সংস্কারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ ও কিনারে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এদিকে বুধবার সকালে বান্দরবান শহরের বন্যাকবলিত বালাঘাটা আমবাগান এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বান্দরবানে পাহাড়ের কোনো মানুষ ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হবে না। একসঙ্গে বন্যায় যেসব ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে, সেগুলো সরকারি উদ্যোগে পুনর্নির্মাণ করা হবে। যারা পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন, তাদের নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত