আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ—০
ভূ-পর্যটক তারেক অণু পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আমেরিকা রোডট্রিপে তিনি অতিক্রম করেছেন প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার। সেই অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে স্ট্রিমের পাঠকদের জন্য এবার তিনি মেলে ধরছেন তাঁর বেড়ানোর গল্প। নতুন ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। প্রতি বুধবার চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
তারেক অণু

১৯ জুন যাত্রা শুরু করে ৩২ ঘণ্টা পরে যখন নিউ ইয়র্কে পৌঁছালাম, তখনো তারিখ ১৯ জুনই! মনে হচ্ছিল আমি যেন ‘আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ’-এর ফিলিয়াস ফগ। সে বেচারা অবশ্য ৮০ দিন পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিশ্বভ্রমণের পর এক দিন বোনাস পেয়েছিলেন। আর আমি ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজো হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে সাইবেরিয়া, আলাস্কা, পুরো কানাডা আর আধা আমেরিকা পার হয়ে এমনিতেই সেই বাড়তি সময়টা পেয়ে গেলাম।
চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স-এর সার্ভিস বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে গুয়াংজো নামার পরপরই সেখানে ফ্রি লাঞ্চ, ডিনার এমনকি হোটেলে থাকার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু হোটেল বিমানবন্দরের বাইরে, সেখানে যাওয়ার জন্য আবার ২৪ ঘন্টার ভিসা নিতে হবে। এসব ঝামেলায় আর না জড়িয়ে ঝকঝকে তকতকে বিশাল বিমানবন্দরের খুব আরামদায়ক গদিচেয়ারে বসে ঘুমিয়ে-ঝিমিয়ে-পড়ে-লিখে ফেসবুক ছাড়াই একটা দিন পার করে ফেললাম।

এর মধ্যেই বিমানবন্দরের এক নিরাপত্তা কর্মী বোর্ডিং পাস দেখে বলল, ‘তোমার মেইন লাগেজে সন্দেহজনক কিছু আছে। আলাদা করে রাখা হয়েছে, খুলে দেখাতে হবে।’ মজার ব্যাপার হলো, ওই বিশাল সুটকেসটা আমার নিজেরও না। আমেরিকা থেকে অনেক বই আনার কথা বলায় কনক আদিত্য দাদা আগের দিনই দিয়েছিলেন সেটা। শুধু তাই না, চিনতে সমস্যা হতে পারে ভেবে একটা ফিতাও বেঁধে দিয়েছিলেন। যাই হোক ব্যাগ খুলে দেখা গেল সেই সন্দেহজনক বস্তু আর কিছুই নয়—ক্যামেরার ব্যাটারি আর মেমরি কার্ড!
১৪ ঘন্টার লম্বা ট্রানজিট। জায়গা বদল করে করে ইচ্ছামতো ঝিমাচ্ছি। হঠাৎ একবার মনে হলো, চোখের সামনে দিয়ে পুরোনো চাইনিজ বন্ধু গাও ফে হেঁটে যাচ্ছে! তাঁর সঙ্গে দশ বছরেরও বেশি সময় দেখা হয়নি। গাও আমার দেখা প্রথম চীনা, যারা তিন বোন। কারণ, তাঁরা বিশেষ সংখ্যালঘু জাতির হওয়ায় চীনের এক সন্তান নীতির ছাড় পেয়েছিল। কয়েক বছর কয়েক আগে সে ই-মেইল করেছিল, বিয়ে করে সে সাংহাইতে থিতু হয়েছে। ঐদিকে গেলে যেন দেখা করি। কিন্তু এটা কি গাও ফে? প্রায় এক যুগ পর চেহারা চিনে নেওয়া সহজ নয়। কয়েকশ মিটার পেছনে হেঁটে, সামনে থেকে দেখেও নিশ্চিত হলাম, না, গাও ফে নয়। উফ, দেখা হলে কী ভালোই না লাগত!

‘ধুত্তুরি’ বলে এক নির্জন কোণে ভাত খেতে বসে দেখি সামনে প্রিয় অড্রে হেপবার্নের মতো স্টাইলিশ হ্যাট পরে এক ভদ্রমহিলা ফোনে কথা বলছেন। মনে হচ্ছিল, পুরো বিমানবন্দর সেই হ্যাটের স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হয়ে ছিল। সুনীলের ‘পায়ের তলায় সর্ষে’ আবার খানিকটা পড়ে, ইলিয়ট সাহেবের পংক্তি মনে মনে আওড়াতে আওড়াতেই ফ্লাইটের সময় হয়ে গেল।
‘বিটুইন দ্য কনসেপশন অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন
বিটুইন দ্য ইমোশন অ্যান্ড রেসপন্স
ফলস দ্য শ্যাডো’
বিমানে পাশের আসনে বসল চিলির এক তরুণী। নাম পিলার ডমিংগুয়েজ। তাঁর দেশের কবি পাবলো নেরুদার নাম জানি, এটা শুনেই সে অতি আহ্লাদিত হয়ে উঠল। আর যখন গ্যাব্রিয়েল মিস্ত্রালের কথা বললাম, পুরো যাত্রাটা যেন স্প্যানিশ কবিতা আর চিলির আঙুরের রসে ডুবে গেল। এক মাস চীন ভ্রমণ করে সে আমেরিকা ফিরছে, ক’দিন নিউইয়র্কে থেকে আবার দেশে ফিরবে। নিজের হাতেই লিখে দিল দুই কবির বইয়ের নাম—নিকানোর পারা (যার কবিতা বহু আগেই বাংলায় অনূদিত হয়েছে, খুব ভালো লাগে সেই ধারালো তির্যক পংক্তিমালা) আর রাউল জুরিতা। বলল, লাতিন কাব্যপ্রেমী হলে নাকি তাঁদের কবিতা ভালো লাগবে।

সেই সময় সূর্য ডুবে গেছে। কিন্তু তার আভা আছে আকাশে-সাগরে ছড়িয়ে। আমি মৃদুকন্ঠে গেয়ে যাচ্ছিলাম কবীর সুমনের গান—
‘সন্ধে নামার সময় হলে,
পশ্চিমে নয় পূবের দিকে,
মুখ ফিরিয়ে ভাববো আমি,
কোন দেশে রাত হচ্ছে ফিকে!’
মধ্যরাতের আগেই বিমান নিউ ইয়র্কে নামল। তখন কানে বাজছিল ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমার রিচার্ড ব্লেইনের ভূমিকায় অভিনয় করা হামফ্রে বোগার্টের যন্ত্রণাময় কন্ঠ, কারণ নিউইয়র্ক ফেরা নিষিদ্ধ তার জন্য। আকন্ঠ সোমরসে ডুবে আর ভালোবাসার মানুষ হারানোর বেদনায় সে জানতে চেয়েছিল, মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কাতে এখন যদি রাত এতটা হয়, তাহলে নিউইয়র্কে কয়টা বাজে?
মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। ২০ জুনের গল্প আগামী বুধবার হবে।

১৯ জুন যাত্রা শুরু করে ৩২ ঘণ্টা পরে যখন নিউ ইয়র্কে পৌঁছালাম, তখনো তারিখ ১৯ জুনই! মনে হচ্ছিল আমি যেন ‘আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ’-এর ফিলিয়াস ফগ। সে বেচারা অবশ্য ৮০ দিন পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিশ্বভ্রমণের পর এক দিন বোনাস পেয়েছিলেন। আর আমি ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজো হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে সাইবেরিয়া, আলাস্কা, পুরো কানাডা আর আধা আমেরিকা পার হয়ে এমনিতেই সেই বাড়তি সময়টা পেয়ে গেলাম।
চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স-এর সার্ভিস বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে গুয়াংজো নামার পরপরই সেখানে ফ্রি লাঞ্চ, ডিনার এমনকি হোটেলে থাকার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু হোটেল বিমানবন্দরের বাইরে, সেখানে যাওয়ার জন্য আবার ২৪ ঘন্টার ভিসা নিতে হবে। এসব ঝামেলায় আর না জড়িয়ে ঝকঝকে তকতকে বিশাল বিমানবন্দরের খুব আরামদায়ক গদিচেয়ারে বসে ঘুমিয়ে-ঝিমিয়ে-পড়ে-লিখে ফেসবুক ছাড়াই একটা দিন পার করে ফেললাম।

এর মধ্যেই বিমানবন্দরের এক নিরাপত্তা কর্মী বোর্ডিং পাস দেখে বলল, ‘তোমার মেইন লাগেজে সন্দেহজনক কিছু আছে। আলাদা করে রাখা হয়েছে, খুলে দেখাতে হবে।’ মজার ব্যাপার হলো, ওই বিশাল সুটকেসটা আমার নিজেরও না। আমেরিকা থেকে অনেক বই আনার কথা বলায় কনক আদিত্য দাদা আগের দিনই দিয়েছিলেন সেটা। শুধু তাই না, চিনতে সমস্যা হতে পারে ভেবে একটা ফিতাও বেঁধে দিয়েছিলেন। যাই হোক ব্যাগ খুলে দেখা গেল সেই সন্দেহজনক বস্তু আর কিছুই নয়—ক্যামেরার ব্যাটারি আর মেমরি কার্ড!
১৪ ঘন্টার লম্বা ট্রানজিট। জায়গা বদল করে করে ইচ্ছামতো ঝিমাচ্ছি। হঠাৎ একবার মনে হলো, চোখের সামনে দিয়ে পুরোনো চাইনিজ বন্ধু গাও ফে হেঁটে যাচ্ছে! তাঁর সঙ্গে দশ বছরেরও বেশি সময় দেখা হয়নি। গাও আমার দেখা প্রথম চীনা, যারা তিন বোন। কারণ, তাঁরা বিশেষ সংখ্যালঘু জাতির হওয়ায় চীনের এক সন্তান নীতির ছাড় পেয়েছিল। কয়েক বছর কয়েক আগে সে ই-মেইল করেছিল, বিয়ে করে সে সাংহাইতে থিতু হয়েছে। ঐদিকে গেলে যেন দেখা করি। কিন্তু এটা কি গাও ফে? প্রায় এক যুগ পর চেহারা চিনে নেওয়া সহজ নয়। কয়েকশ মিটার পেছনে হেঁটে, সামনে থেকে দেখেও নিশ্চিত হলাম, না, গাও ফে নয়। উফ, দেখা হলে কী ভালোই না লাগত!

‘ধুত্তুরি’ বলে এক নির্জন কোণে ভাত খেতে বসে দেখি সামনে প্রিয় অড্রে হেপবার্নের মতো স্টাইলিশ হ্যাট পরে এক ভদ্রমহিলা ফোনে কথা বলছেন। মনে হচ্ছিল, পুরো বিমানবন্দর সেই হ্যাটের স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হয়ে ছিল। সুনীলের ‘পায়ের তলায় সর্ষে’ আবার খানিকটা পড়ে, ইলিয়ট সাহেবের পংক্তি মনে মনে আওড়াতে আওড়াতেই ফ্লাইটের সময় হয়ে গেল।
‘বিটুইন দ্য কনসেপশন অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন
বিটুইন দ্য ইমোশন অ্যান্ড রেসপন্স
ফলস দ্য শ্যাডো’
বিমানে পাশের আসনে বসল চিলির এক তরুণী। নাম পিলার ডমিংগুয়েজ। তাঁর দেশের কবি পাবলো নেরুদার নাম জানি, এটা শুনেই সে অতি আহ্লাদিত হয়ে উঠল। আর যখন গ্যাব্রিয়েল মিস্ত্রালের কথা বললাম, পুরো যাত্রাটা যেন স্প্যানিশ কবিতা আর চিলির আঙুরের রসে ডুবে গেল। এক মাস চীন ভ্রমণ করে সে আমেরিকা ফিরছে, ক’দিন নিউইয়র্কে থেকে আবার দেশে ফিরবে। নিজের হাতেই লিখে দিল দুই কবির বইয়ের নাম—নিকানোর পারা (যার কবিতা বহু আগেই বাংলায় অনূদিত হয়েছে, খুব ভালো লাগে সেই ধারালো তির্যক পংক্তিমালা) আর রাউল জুরিতা। বলল, লাতিন কাব্যপ্রেমী হলে নাকি তাঁদের কবিতা ভালো লাগবে।

সেই সময় সূর্য ডুবে গেছে। কিন্তু তার আভা আছে আকাশে-সাগরে ছড়িয়ে। আমি মৃদুকন্ঠে গেয়ে যাচ্ছিলাম কবীর সুমনের গান—
‘সন্ধে নামার সময় হলে,
পশ্চিমে নয় পূবের দিকে,
মুখ ফিরিয়ে ভাববো আমি,
কোন দেশে রাত হচ্ছে ফিকে!’
মধ্যরাতের আগেই বিমান নিউ ইয়র্কে নামল। তখন কানে বাজছিল ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমার রিচার্ড ব্লেইনের ভূমিকায় অভিনয় করা হামফ্রে বোগার্টের যন্ত্রণাময় কন্ঠ, কারণ নিউইয়র্ক ফেরা নিষিদ্ধ তার জন্য। আকন্ঠ সোমরসে ডুবে আর ভালোবাসার মানুষ হারানোর বেদনায় সে জানতে চেয়েছিল, মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কাতে এখন যদি রাত এতটা হয়, তাহলে নিউইয়র্কে কয়টা বাজে?
মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। ২০ জুনের গল্প আগামী বুধবার হবে।
.png)

ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
১৬ ঘণ্টা আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
১৭ ঘণ্টা আগে
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
১৯ ঘণ্টা আগে
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূ
২০ ঘণ্টা আগে