আশা ভোসলে নিজেকে বলতেন ‘চলচ্চিত্র জগতের শেষ মুঘল’। কারণ তাঁর স্মৃতিতে জমা ছিল ইন্ডাস্ট্রির জন্ম থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের না বলা গল্প। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগতের এক সোনালি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। একটি যুগের অবসান ঘটল ঠিকই, তবে সুরের বিস্তৃত আকাশে তিনি চিরকাল উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়েই জ্বলবেন।
ফাবিহা বিনতে হক

আশা ভোসলের প্রথম প্লেব্যাক ছিল ১৯৪৩ সালে। তখন বয়স মাত্র ১০ বছর। গানটি ছিল মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’। গানের নাম ‘চলা চলা নব বালা’। এরপর ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ ছবির ‘সাওয়ান আয়া’ গান দিয়ে বলিউডের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে অভিষেক ঘটে। তবে শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না।
সে সময় বলিউডের প্লেব্যাক জগৎ দাপটের সঙ্গে শাসন করছিলেন গীতা দত্ত ও তাঁর নিজের বড় বোন লতা মঙ্গেশকরসহ অন্যরা। প্রযোজক-পরিচালকরা নায়িকার গানের জন্য লতা বা গীতা দত্তকেই খুঁজতেন। ফলে বাধ্য হয়ে আশাকে বেছে নিতে হতো যেগুলো অন্য শিল্পীরা গাইতে চাইতেন না, সেই গানগুলো। খলনায়িকা, ক্যাবারে ড্যান্সার কিংবা পার্শ্বচরিত্রের ঠোঁটেই মূলত শোনা যেত আশার গান।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে গণপতরাও ভোসলেকে বিয়ে করেন আশা। তবে এই বিয়ে তাঁর জীবনে নিয়ে আসে শুধুই নিরাশা। শুধু তাই নয়, দুই সন্তানের জননী আশা গর্ভবতী অবস্থায় আত্মহননের পথে পা বাড়ান। নিজের জীবনের এসব দুঃসহ স্মৃতি উঠে এসেছে তাঁর জীবনীগ্রন্থ ‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’। বইটি লিখেছেন রম্যা শর্মা।

আশা ভোসলে ও তাঁর প্রথম স্বামী গণপতরাও ভোসলের বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ২০ বছর। সেই বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘শোনা যায়, গণপতরাও মদ্যপ ছিলেন এবং প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন—এমনকি গর্ভাবস্থায়ও, যার ফলে তাঁকে প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো।’
নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আশা বলেন, পরিবারটি ছিল রক্ষণশীল, গায়িকা পুত্রবধূকে মেনে নিতে পারেনি। স্বামী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর মেজাজ খারাপ ছিল। হয়ত তিনি কষ্ট দিতে পছন্দ করতেন, হয়ত তিনি স্যাডিস্ট ছিলেন। কিন্তু বাইরে কেউ তা জানতে পারত না। আমি তাঁকে সম্মান দিতাম, কখনো তাঁর কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি।’
আশা ভোসলে আরও জানান, তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকাকালে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। নিজের মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে আশা বলেন, ‘মনে হয়েছিল যেন নরকে এসে পড়েছি। মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম। তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু গর্ভের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এতটাই প্রবল ছিল যে আমি মারা যাইনি। আমাকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়।’
পরবর্তী সময়ে গণপতরাও ভোসলের সঙ্গে আশার দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে। তবে নিজের জীবনকে কখনোই ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেননি আশা। দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বলিউডের সংগীত জগতে।
আশা ভোসলের সংগীত ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ১৯৫২ সালে ‘সঙ্গদিল’ ছবির মাধ্যমে। তবে তাঁকে সবচেয়ে বড় ব্রেক দেন বিখ্যাত সুরকার ও. পি. নায়ার। ১৯৫৬ সালের ‘সিআইডি’ এবং ১৯৫৭ সালের ব্লকবাস্টার ছবি ‘নয়া দৌড়’-এর গানগুলো আশাকে রাতারাতি তারকা খ্যাতি এনে দেয়। ‘মাং কে সাথ তুমহারা’ কিংবা ‘উড়ে যাব জুলফে তেরি’ গানগুলো তখনকার শ্রোতাদের মুখে মুখে। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আশা ভোসলে তাঁর নিজস্ব গায়কি ও বহুমুখী প্রতিভার জোরে বলিউডের চেনা ছক ভেঙে দেন। ষাট ও সত্তরের দশকে সুরকার রাহুল দেববর্মণের সঙ্গে তাঁর জুটি ইতিহাস বদলে দেয়। পশ্চিমা সুরের সঙ্গে ভারতীয় রাগিণীর মিশেল ঘটিয়ে তাঁরা এমন সব গান তৈরি করেন, যা আজও সমান জনপ্রিয়। আশার কণ্ঠে তারুণ্য, বিদ্রোহ আর প্রেমের যে সংমিশ্রণ ছিল, তা সে যুগের অন্য কোনো শিল্পীর মধ্যে ছিল না। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে আর. ডি. বর্মণকে ভালোবেসে বিয়ে করেন আশা।
আশা ভোসলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য। প্রচুর এনার্জেটিক বা পাশ্চাত্য ধাঁচের গানও যেমন আশা স্বাচ্ছন্দ্যে গাইতে পারতেন, তেমনি ধ্রুপদী গজল, ভজন, পপ বা ফোক গানেও ছিলেন সমান পারদর্শী।
‘পিয়া তু আব তো আজা’ বা ‘ইয়ে মেরা দিল’, জিনাত আমানের ঠোঁটে ‘দম মারো দম’ কিংবা ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো’—এই গানগুলো তাঁকে বলিউডের ‘কুইন অব গ্রুভ’ খেতাব এনে দেয়।
তবে অনেকের ধারণা ছিল আশা শুধু নাচের বা ‘প্রথাগত বলিউডি’ গানই গাইতে পারেন। সেই ভুল ধারণা তিনি ভেঙে দেন ১৯৮১ সালের ‘উমরাও জান’ ছবির গজলগুলোর মাধ্যমে। খৈয়ামের সুরে ‘ইন আঁখো কি মাস্তি’ বা ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’ প্রমাণ করে দেয়, শাস্ত্রীয় সংগীতেও তিনি বেশ দক্ষ।
শুধু হিন্দি বা মারাঠি নয়, বাংলা সংগীতেও আশা ভোসলের অবদান অবিস্মরণীয়। ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’, ‘যাবো কি যাবো না’, ‘তুমি কত যে দূরে’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গান আজও বাঙালি শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আশার পদচারণা ছিল দৃপ্ত। আশা ভোসলে প্রথম ভারতীয় গায়িকা হিসেবে বিশ্বের সংগীতাঙ্গনের সবচেয়ে বড় পুরষ্কার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে ওস্তাদ আলী আকবর খানের সঙ্গে তাঁর ‘লিগ্যাসি’ অ্যালবামের জন্য প্রথমবার এবং পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে আরেকটি অ্যালবামের জন্য তিনি গ্র্যামি মনোনয়ন পান।
ভারতীয় সংগীতে লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলের নাম যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ২০২২ সালে চিরবিদায় নেন বড় বোন লতা, আর আজ বিদায় নিলেন আশাও। লতা মঙ্গেশকর যখন তাঁর সুরেলা, স্নিগ্ধ ও ধ্রুপদী কণ্ঠের জন্য পরিচিত ছিলেন, আশা তখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাধাধরা নিয়মের বাইরের কণ্ঠশিল্পী হিসেবে।
গণমাধ্যমে এই দুই বোনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে প্রায়ই নানা গুঞ্জন শোনা যেত। অনেকেই বলতেন বলিউডের সংগীত জগতে লতা মঙ্গেশকরের আধিপত্যের কারণে আশা অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বয়সের ব্যবধান এবং কাজের ভিন্ন ধারার কারণে তাঁদের মধ্যে একটা দূরত্ব থাকলেও, বড় বোনের প্রতি শ্রদ্ধা কমতি ছিল না আশা ভোসলের।
দীর্ঘ সংগীত জীবনে ২০ ভাষায় প্রায় ১২ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন আশা ভোসলে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে ইতিহাসের সর্বাধিক একক গান রেকর্ডকারী শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নিজের এই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য দেশি-বিদেশি স্বীকৃতি।
‘উমরাও জান’ (১৯৮১) ও ‘ইজাজাত’ (১৯৮৬) ছবির জন্য দুইবার শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি। শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে সাতবার সম্মানজনক ফিল্মফেয়ার জেতার পর নতুন প্রতিভাদের সুযোগ দিতে তিনি এই পুরস্কারের মনোনয়ন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ২০০১ সালে তিনি ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ এবং ২০০৮ সালে দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ অর্জন করেন তিনি। বাংলা সংগীতে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মাননায় ভূষিত করে।
আশা ভোসলে নিজেকে বলতেন ‘চলচ্চিত্র জগতের শেষ মুঘল’। কারণ তাঁর স্মৃতিতে জমা ছিল ইন্ডাস্ট্রির জন্ম থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের না বলা গল্প। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগতের এক সোনালি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। একটি যুগের অবসান ঘটল ঠিকই, তবে সুরের বিস্তৃত আকাশে তিনি চিরকাল উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়েই জ্বলবেন।

আশা ভোসলের প্রথম প্লেব্যাক ছিল ১৯৪৩ সালে। তখন বয়স মাত্র ১০ বছর। গানটি ছিল মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’। গানের নাম ‘চলা চলা নব বালা’। এরপর ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ ছবির ‘সাওয়ান আয়া’ গান দিয়ে বলিউডের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে অভিষেক ঘটে। তবে শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না।
সে সময় বলিউডের প্লেব্যাক জগৎ দাপটের সঙ্গে শাসন করছিলেন গীতা দত্ত ও তাঁর নিজের বড় বোন লতা মঙ্গেশকরসহ অন্যরা। প্রযোজক-পরিচালকরা নায়িকার গানের জন্য লতা বা গীতা দত্তকেই খুঁজতেন। ফলে বাধ্য হয়ে আশাকে বেছে নিতে হতো যেগুলো অন্য শিল্পীরা গাইতে চাইতেন না, সেই গানগুলো। খলনায়িকা, ক্যাবারে ড্যান্সার কিংবা পার্শ্বচরিত্রের ঠোঁটেই মূলত শোনা যেত আশার গান।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে গণপতরাও ভোসলেকে বিয়ে করেন আশা। তবে এই বিয়ে তাঁর জীবনে নিয়ে আসে শুধুই নিরাশা। শুধু তাই নয়, দুই সন্তানের জননী আশা গর্ভবতী অবস্থায় আত্মহননের পথে পা বাড়ান। নিজের জীবনের এসব দুঃসহ স্মৃতি উঠে এসেছে তাঁর জীবনীগ্রন্থ ‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’। বইটি লিখেছেন রম্যা শর্মা।

আশা ভোসলে ও তাঁর প্রথম স্বামী গণপতরাও ভোসলের বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ২০ বছর। সেই বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘শোনা যায়, গণপতরাও মদ্যপ ছিলেন এবং প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন—এমনকি গর্ভাবস্থায়ও, যার ফলে তাঁকে প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো।’
নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আশা বলেন, পরিবারটি ছিল রক্ষণশীল, গায়িকা পুত্রবধূকে মেনে নিতে পারেনি। স্বামী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর মেজাজ খারাপ ছিল। হয়ত তিনি কষ্ট দিতে পছন্দ করতেন, হয়ত তিনি স্যাডিস্ট ছিলেন। কিন্তু বাইরে কেউ তা জানতে পারত না। আমি তাঁকে সম্মান দিতাম, কখনো তাঁর কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি।’
আশা ভোসলে আরও জানান, তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকাকালে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। নিজের মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে আশা বলেন, ‘মনে হয়েছিল যেন নরকে এসে পড়েছি। মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম। তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু গর্ভের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এতটাই প্রবল ছিল যে আমি মারা যাইনি। আমাকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়।’
পরবর্তী সময়ে গণপতরাও ভোসলের সঙ্গে আশার দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে। তবে নিজের জীবনকে কখনোই ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেননি আশা। দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বলিউডের সংগীত জগতে।
আশা ভোসলের সংগীত ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ১৯৫২ সালে ‘সঙ্গদিল’ ছবির মাধ্যমে। তবে তাঁকে সবচেয়ে বড় ব্রেক দেন বিখ্যাত সুরকার ও. পি. নায়ার। ১৯৫৬ সালের ‘সিআইডি’ এবং ১৯৫৭ সালের ব্লকবাস্টার ছবি ‘নয়া দৌড়’-এর গানগুলো আশাকে রাতারাতি তারকা খ্যাতি এনে দেয়। ‘মাং কে সাথ তুমহারা’ কিংবা ‘উড়ে যাব জুলফে তেরি’ গানগুলো তখনকার শ্রোতাদের মুখে মুখে। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আশা ভোসলে তাঁর নিজস্ব গায়কি ও বহুমুখী প্রতিভার জোরে বলিউডের চেনা ছক ভেঙে দেন। ষাট ও সত্তরের দশকে সুরকার রাহুল দেববর্মণের সঙ্গে তাঁর জুটি ইতিহাস বদলে দেয়। পশ্চিমা সুরের সঙ্গে ভারতীয় রাগিণীর মিশেল ঘটিয়ে তাঁরা এমন সব গান তৈরি করেন, যা আজও সমান জনপ্রিয়। আশার কণ্ঠে তারুণ্য, বিদ্রোহ আর প্রেমের যে সংমিশ্রণ ছিল, তা সে যুগের অন্য কোনো শিল্পীর মধ্যে ছিল না। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে আর. ডি. বর্মণকে ভালোবেসে বিয়ে করেন আশা।
আশা ভোসলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য। প্রচুর এনার্জেটিক বা পাশ্চাত্য ধাঁচের গানও যেমন আশা স্বাচ্ছন্দ্যে গাইতে পারতেন, তেমনি ধ্রুপদী গজল, ভজন, পপ বা ফোক গানেও ছিলেন সমান পারদর্শী।
‘পিয়া তু আব তো আজা’ বা ‘ইয়ে মেরা দিল’, জিনাত আমানের ঠোঁটে ‘দম মারো দম’ কিংবা ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো’—এই গানগুলো তাঁকে বলিউডের ‘কুইন অব গ্রুভ’ খেতাব এনে দেয়।
তবে অনেকের ধারণা ছিল আশা শুধু নাচের বা ‘প্রথাগত বলিউডি’ গানই গাইতে পারেন। সেই ভুল ধারণা তিনি ভেঙে দেন ১৯৮১ সালের ‘উমরাও জান’ ছবির গজলগুলোর মাধ্যমে। খৈয়ামের সুরে ‘ইন আঁখো কি মাস্তি’ বা ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’ প্রমাণ করে দেয়, শাস্ত্রীয় সংগীতেও তিনি বেশ দক্ষ।
শুধু হিন্দি বা মারাঠি নয়, বাংলা সংগীতেও আশা ভোসলের অবদান অবিস্মরণীয়। ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’, ‘যাবো কি যাবো না’, ‘তুমি কত যে দূরে’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গান আজও বাঙালি শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আশার পদচারণা ছিল দৃপ্ত। আশা ভোসলে প্রথম ভারতীয় গায়িকা হিসেবে বিশ্বের সংগীতাঙ্গনের সবচেয়ে বড় পুরষ্কার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে ওস্তাদ আলী আকবর খানের সঙ্গে তাঁর ‘লিগ্যাসি’ অ্যালবামের জন্য প্রথমবার এবং পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে আরেকটি অ্যালবামের জন্য তিনি গ্র্যামি মনোনয়ন পান।
ভারতীয় সংগীতে লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলের নাম যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ২০২২ সালে চিরবিদায় নেন বড় বোন লতা, আর আজ বিদায় নিলেন আশাও। লতা মঙ্গেশকর যখন তাঁর সুরেলা, স্নিগ্ধ ও ধ্রুপদী কণ্ঠের জন্য পরিচিত ছিলেন, আশা তখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাধাধরা নিয়মের বাইরের কণ্ঠশিল্পী হিসেবে।
গণমাধ্যমে এই দুই বোনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে প্রায়ই নানা গুঞ্জন শোনা যেত। অনেকেই বলতেন বলিউডের সংগীত জগতে লতা মঙ্গেশকরের আধিপত্যের কারণে আশা অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বয়সের ব্যবধান এবং কাজের ভিন্ন ধারার কারণে তাঁদের মধ্যে একটা দূরত্ব থাকলেও, বড় বোনের প্রতি শ্রদ্ধা কমতি ছিল না আশা ভোসলের।
দীর্ঘ সংগীত জীবনে ২০ ভাষায় প্রায় ১২ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন আশা ভোসলে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে ইতিহাসের সর্বাধিক একক গান রেকর্ডকারী শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নিজের এই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য দেশি-বিদেশি স্বীকৃতি।
‘উমরাও জান’ (১৯৮১) ও ‘ইজাজাত’ (১৯৮৬) ছবির জন্য দুইবার শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি। শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে সাতবার সম্মানজনক ফিল্মফেয়ার জেতার পর নতুন প্রতিভাদের সুযোগ দিতে তিনি এই পুরস্কারের মনোনয়ন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ২০০১ সালে তিনি ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ এবং ২০০৮ সালে দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ অর্জন করেন তিনি। বাংলা সংগীতে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মাননায় ভূষিত করে।
আশা ভোসলে নিজেকে বলতেন ‘চলচ্চিত্র জগতের শেষ মুঘল’। কারণ তাঁর স্মৃতিতে জমা ছিল ইন্ডাস্ট্রির জন্ম থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের না বলা গল্প। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগতের এক সোনালি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। একটি যুগের অবসান ঘটল ঠিকই, তবে সুরের বিস্তৃত আকাশে তিনি চিরকাল উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়েই জ্বলবেন।

মনে রাখবেন, টাকা জমানো আর জীবন উপভোগ করার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। নির্দিষ্ট সীমা মেনে চললে আজকের দিনটাও সুন্দর হবে। আবার ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
১ ঘণ্টা আগে
অনেক সময় আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, বিড়াল কি মানুষের মতো অতীত রোমন্থন করতে পারে? নাকি তাদের স্মৃতি কেবল খাবার আর বাসস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? বিজ্ঞান বলছে, বিড়ালের স্মৃতিশক্তি আমরা যতটা ভাবি, তার চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী।
২০ ঘণ্টা আগে
কখনো ভেবে দেখেছেন, আপনার সাধারণ জীবনযাপনের সঙ্গে দুনিয়া কাঁপানো সুপারস্টারদের দারুণ একটি মিল রয়েছে? শুনতে অবাক লাগলেও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটি একদম সত্য। ক্যালিফোর্নিয়ার মনোবিজ্ঞানী রবার্ট পাফ তাঁর প্রবন্ধে এমন কথাই বলেছেন। আমাদের সবার জীবনেই ‘অদৃশ্য দর্শক’ বা ‘ইনভিজিবল অডিয়েন্স’ রয়েছে, যা
১ দিন আগে
সম্প্রতি ওমানে গাড়ির ভেতরে চার বাংলাদেশি ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনাতে ময়নাতদন্তের পর কার্বন মনোক্সাইডে শ্বাস গ্রহণকে কারণ হিসেবে নিশ্চিত করেছে দেশটির পুলিশ।
২ দিন আগে