ad
আফ্রিকার পথে প্রান্তরে

তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’/শিল্পের ভেতর দিয়ে আফ্রিকাকে চেনা যায় যেখানে

তানজানিয়ার আরুশায় অবস্থিত ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’ পূর্ব আফ্রিকার অন্যতম প্রধান শিল্প ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানে আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিল্প, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, অলংকার ও হস্তশিল্পের বিশাল সংগ্রহ দেখা যায়। শুধু প্রদর্শনী নয়, অনেক শিল্পী এখানেই কাজ করেন। ফলে এই কেন্দ্র আফ্রিকার শিল্প ও ঐতিহ্য দেখার পাশাপাশি শিল্পীদের সৃজনশীলতা কাছ থেকে বোঝারও সুযোগ করে দেয়।

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ১১
 তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে
তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে

এবারের আফ্রিকা ভ্রমণে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও স্মরণীয় জায়গাগুলোর একটি ছিল তানজানিয়ার আরুশায় অবস্থিত ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। আফ্রিকার বুকে এর আগে অনেক জায়গা ঘুরেছি। দেখেছি অসংখ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, পাহাড়, হ্রদ, নদী আর বিস্তীর্ণ সাভানা। কিন্তু এখানে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, সেটি একেবারেই অন্যরকম।

মনে হলো, আফ্রিকাকে শুধু তার প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী কিংবা সাফারি দিয়ে চেনা যায় না। এই মহাদেশের মানুষের শিল্প, সৃজনশীলতা, কারুশিল্প, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের বৈচিত্র্যও সমানভাবে বিস্ময়কর। পুরো ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’ যেন আফ্রিকার শিল্প ও সংস্কৃতির জীবন্ত জগৎ।

তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে
তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে

তব এটাকে শুধু জাদুঘর বা কেনাকাটার জায়গা বললে এর পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এখানে আছে আফ্রিকান শিল্পের গ্যালারি, হস্তশিল্পের দোকান, শিল্পীদের কাজের জায়গা, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার প্রদর্শনী, রত্ন ও অলংকারের সংগ্রহ। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষের শিল্প ও কারুশিল্পও এখানে দেখা যায়।

তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে কাঠের ভাস্কর্য। কাঠের টুকরো থেকে শিল্পীরা কীভাবে মানুষের মুখ, প্রাণী কিংবা জীবনের নানা গল্প তৈরি করেন, তা দেখে মুগ্ধ হতে হয়। পশুর চোখ কীভাবে এত জীবন্ত করে তোলা যায়, কাঠের ওপর পালকের সূক্ষ্ম রেখাগুলো কীভাবে এত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, কিংবা প্রাণীর শরীরের গঠন ও ভঙ্গিমাকে কীভাবে এত স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করা যায় সেগুলো সামনে দাঁড়িয়ে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে
তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছি। বিভিন্ন জায়গায় শিল্পকর্ম, হস্তশিল্প ও স্থানীয় সংস্কৃতির নানা নিদর্শন দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’-এর মতো এত বড় পরিসরে এত বৈচিত্র্যময় ও সূক্ষ্ম হাতের কাজ একসঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা আমার আগে হয়নি।

আর এখানে শুধু পুরোনো বা প্রদর্শনীর জন্য রাখা শিল্পকর্ম নেই। অনেক জায়গায় শিল্পীরা নিজেরাই কাজ করেন। অর্থাৎ আপনি একটি ভাস্কর্য দেখছেন, আবার তার কাছেই হয়তো একজন শিল্পী কাঠে খোদাই করছেন। কোথাও চিত্র আঁকা হচ্ছে, কোথাও পুঁতির কাজ হচ্ছে, আবার কোথাও রত্ন কাটা ও অলংকার তৈরির কাজ চলছে। ফলে এটি হয়ে উঠছে শিল্প তৈরির চলমান কর্মশালা।

তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে
তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে

এই কেন্দ্রটির ইতিহাসও বেশ আকর্ষণীয়। ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে সাইফুদ্দিন খানভাই ও জাহরা খানভাইয়ের উদ্যোগে এর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে এটি কার্যক্রম শুরু করে।

প্রতিষ্ঠার পেছনে সাইফুদ্দিন খানভাইয়ের আফ্রিকান শিল্প, ঐতিহ্য ও কারুশিল্পের প্রতি আগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিল্প ও জীবনধারার সঙ্গে তাঁর পরিচয় থেকেই এমন একটি জায়গা তৈরির ধারণা আসে। উদ্দেশ্য ছিল, এখানে আফ্রিকার শিল্পীরা নিজেদের কাজ তুলে ধরতে পারবেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ আফ্রিকার সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানতে পারবেন।

তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে
তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে

সময়ের সঙ্গে ছোট একটি গ্যালারি ধীরে ধীরে বিশাল এক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে। ২০০৩ সালের দিকে এর বাজার ও কারুশিল্পের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। তানজানিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর শিল্পীদের তৈরি সামগ্রী এখানে জায়গা পেতে শুরু করে। বর্তমানে এই কেন্দ্রের সঙ্গে দুই শতাধিক কারুশিল্পী পরিবার যুক্ত রয়েছে বলে তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

তানজানিয়া সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। এখানে ১২০টিরও বেশি জাতিগোষ্ঠী ও জনগোষ্ঠীর বসবাস। ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’ সেই বৈচিত্র্যকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পোশাক, অলংকার, পুঁতির কাজ, দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী, ঐতিহ্যবাহী বস্তু, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম এবং সাংস্কৃতিক প্রতীক এখানে দেখতে পাওয়া যায়।

প্রতিদিনই এখানে দর্শনার্থীদের দেখা পাওয়া যায়। ছবি লেখকের সৌজন্যে
প্রতিদিনই এখানে দর্শনার্থীদের দেখা পাওয়া যায়। ছবি লেখকের সৌজন্যে

এখানকার মাকোন্দে কাঠের ভাস্কর্য বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। মাকোন্দে শিল্পীরা কাঠ খোদাই করে যে ধরনের অসাধারণ ভাস্কর্য তৈরি করেন, তা আফ্রিকান শিল্পের অন্যতম পরিচিত ধারার মধ্যে পড়ে। মানুষের মুখাবয়ব, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক জীবন, প্রাণী এবং বিভিন্ন প্রতীকী চরিত্রকে কাঠের মধ্যে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় যে, শক্ত কাঠের মধ্যেও যেন প্রাণের স্পন্দন অনুভব করা যায়। প্রতিটি খোদাইয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা দক্ষতা।

এর পাশাপাশি টিঙ্গাটিঙ্গা চিত্রকর্মও এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। উজ্জ্বল রং, শক্তিশালী রেখা এবং আফ্রিকার মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে কেন্দ্র করে তৈরি এই চিত্রশৈলী তানজানিয়ার শিল্পজগতের বিশেষ পরিচয় বহন করে। আর মাসাই পুঁতির কাজের রঙিন অলংকারগুলোও অসাধারণ। রং ও নকশার মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে।

তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে
তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে

‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’-এর আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো এর বিশাল আর্ট গ্যালারি। কেন্দ্রটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এখানে পাঁচ হাজারেরও বেশি শিল্পকর্ম রয়েছে। চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যের এই বিশাল সংগ্রহে আফ্রিকার মানুষ, পরিবার, প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী, আধ্যাত্মিকতা, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও দৈনন্দিন জীবনের নানা গল্প ফুটে উঠেছে। কোথাও সাভানার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা হাতি, সিংহ কিংবা জিরাফ, কোথাও আফ্রিকার মানুষের জীবন, কোথাও আবার পরিবার, উৎসব কিংবা ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের দৃশ্য।

এখানকার স্থাপত্যও কম আকর্ষণীয় নয়। ভবনগুলোর নকশায় আফ্রিকার সাংস্কৃতিক প্রতীক ও স্থানীয় ঐতিহ্যের নানা ছাপ রয়েছে। পুরো কমপ্লেক্সটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, ভেতরে প্রবেশের আগেই দর্শকের মনে আফ্রিকার একটি বিশেষ আবহ তৈরি হয়। ভবনের নকশায় পাহাড়, ঢাল, ঢোল, ঢাল-তলোয়ার, বর্শা কিংবা আফ্রিকান ঐতিহ্যের বিভিন্ন প্রতীকের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে
তানজানিয়ার ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’। ছবি লেখকের সৌজন্যে

‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’-এর সঙ্গে তানজানিয়ার বিখ্যাত টানজানাইটের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর তানজানিয়ার মেরেলানি অঞ্চলে পাওয়া এই বিরল রত্ন বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় মূল্যবান পাথর। কেন্দ্রটির অলংকার ও রত্ন বিভাগে টানজানাইটের নানা রূপ দেখা যায়।

এখানে ‘মিউজিয়াম অব ট্রাইবাল সেরিমনিস’-এর মতো তানজানিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান, আচার, পোশাক, অলংকার ও সাংস্কৃতিক সামগ্রীর পরিচয় পাওয়া যায়। আবার ‘জেন গুডল এক্সপেরিয়েন্স’-এর মাধ্যমে বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ নিয়েও জানার সুযোগ রয়েছে। ফলে ‘কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার’-এর পরিসর এখন কেবল শিল্প ও কারুশিল্পে সীমাবদ্ধ নেই; শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস, প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ সবকিছুকে এক সুতোয় গেঁথে এটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।

মজার বিষয় হলো, এখানে প্রায় প্রতিটি জিনিসই বিক্রির জন্য রাখা। ফলে দর্শনার্থী চাইলে আফ্রিকার কোনো শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য, অলংকার কিংবা ছোট্ট কারুশিল্প কিনে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন। তখন সেটি ভ্রমণের একটি স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে এবং এর সঙ্গে শিল্পীর কাজ ও স্থানীয় ঐতিহ্যেরও একটি যোগ তৈরি হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত