বৈশ্বিক পরিবেশ সূচকে ‘শেষের দিক থেকে তৃতীয়’ বাংলাদেশ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ০৩
বায়ুদূষণ প্রতিরোধ, জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা ও জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত
বায়ুদূষণ প্রতিরোধ, জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা ও জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত

পরিবেশ সুরক্ষায় সাফল্যের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭টি দেশের মধ্যে ১৭৫তম। গত জুলাইয়ে ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) ২০২৬’ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে এই ফলাফল উঠে এসেছে।

বায়ুদূষণ প্রতিরোধ, জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা ও জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় ব্যর্থতার দিক থেকে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে শুধু ভারত (১৭৬তম) ও লাওস (১৭৭তম)।

একই বিষয়ে আগের সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থা নাজুক ছিল। তবে এবারের চিত্র বেশি হতাশাজনক। ২০২৪ সালের সেই সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ষষ্ঠ সর্বনিম্ন (১৭৫তম)। সার্বিক স্কোর ছিল ২৮ দশমিক ১। এবার সার্বিক স্কোর আরও কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৪৬।

এর অর্থ হলো, গত দুই বছরে দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় কোনো উন্নতি হয়নি। বরং জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষার বিষয়গুলো ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়েছে।

এবারের সূচক তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে পরিবেশগত চিত্র আগের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে বলে দাবি গবেষকদের।

বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সবার নিচে, বায়ুর মানেও হাঁসফাঁস

সূচকটিতে ১২টি বিভাগে মোট ৪৭টি মাপকাঠিতে পরিবেশ সুরক্ষার পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ইকোসিস্টেম ভাইটালিটি’ বা বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। দেশের বনভূমি, প্রাকৃতিক জলাশয় ও জীববৈচিত্র্য যে চরম হুমকির মুখে, এটি তারই প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি বায়ুদূষণ। বায়ুর মান সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭১তম। সূচকে বলা হয়েছে, বিষাক্ত গ্যাস ও ক্ষতিকর ধূলিকণার কারণে দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা নীতিতেও অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ (১২০তম অবস্থান)।

কেন এই বেহাল দশা?

দেশে পরিবেশ রক্ষায় সরকার, এনজিওসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ হলেও সেগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই বলে মনে করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন রুনু।

তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের কাজের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু বুড়িগঙ্গার পানি কালোই থেকে যাচ্ছে। কারণ কাজগুলো বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে।’

এর মূল কারণ হিসেবে তিনি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিকে দায়ী করেন। অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে মূল প্রতিষ্ঠান। তারা সেমিনারে, কাগজে-কলমে বা ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষার কথা মেনে নেয় ঠিকই, কিন্তু অন্তরে ধারণ করে না। ফলে পরিবেশের বিষয়গুলো মূলধারার নীতিতে কার্যকর হয় না।’

অবশ্য বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস ও পরিবেশের এই বেহাল দশার জন্য পরিবেশ বা বন অধিদপ্তরকে দায়ী করতে রাজি নন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এম এম আব্দুল্লাহ আল মামুন।

তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘শুধু কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দোষারোপের সঙ্গে আমি একমত নই। তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সবাই এর জন্য দায়ী। আমাদের মতো গবেষক ও শিক্ষাবিদদেরও দায় আছে। আমরা অনেক গবেষণা করছি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কোনো প্রয়োগ নেই। এসব গবেষণা সমাজে কোনো অবদান রাখছে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে আমরা সচেতনতা তৈরি করতে পারিনি।’

বাংলাদেশের আইন ও নীতিমালা যথেষ্ট ভালো উল্লেখ করে এই পরিবেশবিজ্ঞানী বলেন, ‘শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি আছে। কিন্তু টাকা বাঁচাতে মালিকরা তা চালান না। আমরা সবসময় জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলি। এর কারণে আমরা ভুক্তভোগী হচ্ছি ঠিকই। কিন্তু দূষণের মূল কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা। অপরিকল্পিত কনস্ট্রাকশনের কারণে বায়ুদূষণ হচ্ছে। সিঙ্গেল-ইউজ বা একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।’

শীর্ষে ইউরোপ, পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন

পরিবেশ সুরক্ষায় বরাবরের মতোই আধিপত্য দেখিয়েছে ইউরোপ। শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে ১৯টিই ইউরোপের। জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ায় সূচকের শীর্ষে উঠে এসেছে এস্তোনিয়া। এরপর রয়েছে লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস।

তালিকায় শীর্ষ ২০-এ ইউরোপের বাইরে রয়েছে কেবল জাপান (১৬তম)। অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণে শীর্ষ দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন রয়েছে যথাক্রমে ২৭তম ও ১২৯তম অবস্থানে। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা পূরণে এই দুই দেশের অবদান অনেকটাই কম।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভারত, মালি ও ভিয়েতনামের মতো দেশ চরম পরিবেশগত সংকটে রয়েছে। এখনই যদি দূষণ প্রতিরোধ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় কঠোর ও কার্যকর নীতি গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এসব দেশ।

করণীয় কী?

পরিবেশের এই বিপর্যয় ঠেকাতে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্য জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক জামাল উদ্দিন রুনু। তিনি বলেন, ‘সরকারে যে দলই থাকুক না কেন, পরিবেশ রক্ষায় একটি উন্মুক্ত সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি জাতীয় বা কমন পলিসি তৈরি করতে হবে। তাহলেই দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

অন্যদিকে অধ্যাপক এম এম আব্দুল্লাহ আল মামুন গবেষণাকে শুধু জার্নালে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে তা প্রয়োগ করার তাগিদ দেন। সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তৈরির মতো দেশীয় গবেষণাগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করার ওপরও জোর দেন তিনি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত