বছরের পর বছর বাংলাদেশের তরুণরা ইউটিউব-স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে পাকিস্তানি শিল্পীদের গান শুনেছেন। এখন প্রিয় শিল্পীদের সরাসরি দেখতে তাঁরা বৃষ্টিতে ভিজছেন, চড়া দামে টিকিট কিনছেন, এমনকি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন। প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানি সংগীতের প্রতি এই আগ্রহ এতটা বেড়ে গেল কীভাবে?
ডন

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬। সন্ধ্যা ছয়টা। ঢাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। ষ্টেজের সামনে পানি জমে গেছে। দর্শকদের অনেকেই ভিজে একাকার। তবু কেউ চলে যাচ্ছে না। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, ভিড় ততই বাড়ছে।
এই ভিড়েরই একজন ২২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলিফ। আতিফ আসলামকে সামনে থেকে দেখবেন বলে ১০৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছেন তিনি। আলিফ বলেন, ‘আমি ১০ বছর বয়স থেকে আতিফ আসলামের গান শুনছি। আজ তাঁকে সামনে থেকে গান গাইতে দেখা আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।’
রাত ৮টা ৫২ মিনিটে আতিফ আসলাম মঞ্চে উঠতেই হাজারো কণ্ঠে একসঙ্গে ডেকে উঠল, ‘আতিফ! আতিফ!’ এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা দর্শকেরা গলা মেলালেন তাঁর একের পর এক জনপ্রিয় গানে। দীর্ঘ অপেক্ষা, তুমুল বৃষ্টি সবকিছু যেন মুহূর্তেই ভুলে গেল সবাই।
আলিফের মতো ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মুশফিকা জাহান অবশ্য সেদিন কনসার্টে যেতে পারেননি। পরিবারের অনুমতি মেলেনি। তাই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওর মাধ্যমে কনসার্টের নানা মুহূর্ত দেখে নিতে হয়েছে। মুশফিকা বলেন, ‘আমি নিয়মিত ইউটিউবে আতিফ আসলামের গান শুনি। তাঁর গানের কথাগুলো আমার অনুভূতির সঙ্গে মিলে যায়। আমি সত্যিই চেয়েছিলাম তাঁকে সামনে থেকে গান গাইতে দেখতে।’
শুধু আলিফ ও মুশফিকা নন, বাংলাদেশের হাজারো তরুণের প্রতিদিনের গানের তালিকায় এখন পাকিস্তানি মিউজিকের জায়গা হয়েছে। তবে এই আগ্রহ এক দিনে তৈরি হয়নি।
পাকিস্তানি শিল্পীদের গান গান বাংলাদেশে হঠাৎ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও বেড়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অনেক তরুণ অনলাইনে পাকিস্তানি শিল্পীদের গান শুনছেন। এতদিন সেই আগ্রহ অনেকটাই সীমাবদ্ধ ছিল ব্যক্তিগত প্লেলিস্ট আর অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে।

২০২৪ সালের পর বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে। দুই দেশের কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি শিল্পীদের বাংলাদেশে এসে গান গাওয়ার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও গতি পায়।
বছরের পর বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচলও আবার শুরু হয়। বছরের পর বছর অনলাইনে গান শোনা সেই শ্রোতারাই এবার প্রিয় শিল্পীদের সামনে থেকে দেখতে ভিড় করছেন।
মঞ্চেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ঢাকায় কনসার্ট করতে এসেছিলেন আতিফ আসলাম। একই বছরের নভেম্বরে আবারও ঢাকায় কনসার্ট করতে আসেন তিনি। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৪ জুলাই আরেকটি বড় কনসার্ট করতে ঢাকায় আসেন তিনি।
শুধু তাই নয়, গত ২৩ জুলাই ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে আতিফ আসলাম বাংলাদেশকে তাঁর ‘সেকেন্ড হোম’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সারা বিশ্বে গান পরিবেশন করেছি। কিন্তু বাংলাদেশে দর্শকদের কাছ থেকে যে ধরনের সাড়া পাই, অন্য কোথাও তা পাই না।’
তবে আতিফ আসলাম ছাড়াও বাংলাদেশে জনপ্রিয় পাকিস্তানি শিল্পীদের তালিকায় আরও অনেকেই আছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় দুটি কনসার্টে গান পরিবেশন করেন রাহাত ফতেহ আলী খান। পাকিস্তানি ব্যান্ড জালও ১৪ বছর পর আবার বাংলাদেশে আসে। এ ছাড়া, ২০২৫ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো গান পরিবেশন করেন পাকিস্তানী কণ্ঠশিল্পী আইমা বেগ, ব্যান্ড কাভিশ এবং রক্সেন ব্যান্ডের প্রধান শিল্পী মোস্তফা জাহিদ। ২০২৪ সালের পর আবদুল হান্নানও ২০২৫ সালে আবার বাংলাদেশে আসেন। ২০২৬ সালে ব্যান্ড বায়ান ঢাকায় প্রথম কনসার্ট করে। এ বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গান পরিবেশন করতে আসছেন মুরতজা কিজিলবাশ। আর চলতি মাসের শেষ দিকে আসছেন হাসান রহিম।
আতিফ আসলাম ও রাহাত ফতেহ আলী খানের মতো শিল্পীদের কনসার্টের বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক আসেন। টিকিটের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও চাহিদা কমছে না। পাকিস্তানি গানের ভক্তদের অনেকেই এসব কনসার্টকে এখন শুধু গান শোনার অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না। বরং কন্ঠশিল্পী আর ভক্তদের মধ্যে ভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ হিসেবেও দেখছেন তাঁরা।

বাংলাদেশের গীতিকার ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফয়সাল রাব্বিকীন মনে করেন, পাকিস্তানি শিল্পীদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি শিল্পীর দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হলে আর কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলে স্বাভাবিকভাবেই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বাড়ে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি শিল্পীদের কনসার্টের সংখ্যা বাড়াও সেই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েবও প্রায় একই মত দেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশিরা কয়েক দশক ধরেই পাকিস্তানি সংগীত, বিশেষ করে গজল শুনে আসছেন। তিনি বলেন, ‘আগে মানুষ গান শোনার জন্য টেলিভিশন ও রেডিওর ওপর নির্ভর করতেন। এখন তরুণেরা খুব সহজেই ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের গান খুঁজে নিতে পারেন বা নিজের পছন্দ অনুযায়ী গান বেছে নিতে পারেন। ডিজিটাল মাধ্যম সেটিই সম্ভব করেছে।’
বাংলাদেশের অনেক তরুণের কাছে পাকিস্তানি মিউজিকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অন্যতম মাধ্যম ‘কোক স্টুডিও পাকিস্তান’। লোকজ সংগীত, কাওয়ালি ও আধুনিক পপ সংগীতের মিশ্রণ ইউটিউবে তৈরি করেছে বিপুল শ্রোতা। বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমের কারণে মূলধারার বলিউড শিল্পী ছাড়াও বাইরের শিল্পীদের গান খুঁজে পাওয়া আগের চেয়ে সহজ হয়ে গিয়েছে।
২৪ বছর বয়সী মারিন আমিন ছোটবেলা থেকেই পাকিস্তানি শিল্পীদের গান শুনছেন। ঢাকায় রাহাত ফতেহ আলী খান ও আতিফ আসলামের বেশ কয়েকটি কনসার্টেও দেখেছেন তিনি। মারিন বলেন, ‘পাকিস্তানি মিউজিকে অন্যরকম কিছু একটা আছে। তারা যেভাবে গান পরিবেশন করেন, সেটা আমার খুব ভালো লাগে। গানগুলোর সঙ্গে নিজেকে সহজেই মেলাতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চেয়ে ছোটদের মধ্যেও এসব গান সমান জনপ্রিয়। কখনো কখনো এসব গান শুনলে মনে হয়, গানগুলো যেন আমার নিজের জীবনের গল্প বলছে।’
বাংলাদেশি তরুণ সংগীতশিল্পী অ্যাঞ্জেল নূরের মতে, ভারতীয় সিনেমাও বাংলাদেশে পাকিস্তানি মিউজিকের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তবে শেষ পর্যন্ত শ্রোতাদের ধরে রাখার মূল কারণ সংগীতের মান। অ্যাঞ্জেল বলেন, ‘আমাদের পাকিস্তানি গান শোনার কোনো কারণ নেই, এমনটা ভাবার কিছু নেই। তাদের গানের মান খুব ভালো।’
-c47540.jpg)
পাকিস্তানি মিউজিক তাঁর নিজের কাজেও প্রভাব ফেলেছে। তিনি জানান, সামনে প্রকাশিত অ্যালবামে পাকিস্তানি মিউজিকের কিছু উপাদান রাখার চেষ্টা করেছেন। অ্যালবামের সংগীতায়োজনে পাকিস্তানি সংগীতশিল্পীরাও যুক্ত থাকছেন। তিনি বলেন, ‘আমার আপকামিং ১২টি গানের অ্যালবামে পাকিস্তানি সংগীতের একটা স্বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
ঢাবি শিক্ষক মোহাম্মদ শোয়েব মনে করেন, সংগীতের ক্ষেত্রে শ্রোতারা শিল্পীর জাতীয়তার চেয়ে গানের মানকেই বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘গান শোনার সময় কেউ ভেবে দেখেন না গানটি ভারতীয় না পাকিস্তানি। সুর, কণ্ঠ, গানের কথা আর কীভাবে গানটি পরিবেশন করা হয়েছে—এসবই মূল বিষয়। পাকিস্তানি সংগীতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। আর এ কারণেই বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এর এত শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।’
গীতিকার ফয়সাল রাব্বিকীনের বিশ্বাস, বাংলাদেশে পাকিস্তানি সংগীতের জনপ্রিয়তা শুধু কয়েকজন শিল্পীর জনপ্রিয়তার জন্য নয়। এর পেছনে রয়েছে সাংস্কৃতিক যোগাযোগের বিস্তার, ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসার আর তরুণ শ্রোতাদের বদলে যাওয়া ‘মিউজিক টেস্ট’। তিনি বলেন, ‘আজকের তরুণেরা কোনো শিল্পীর পাসপোর্ট দেখে গান বেছে নেয় না। গানটি ভালো কি না, সেটাই তাঁরা দেখেন।’
তবে ফয়সাল রাব্বিকীনের মতে, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান কখনো একতরফা হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘যেভাবে পাকিস্তানি শিল্পীরা বাংলাদেশে গান পরিবেশন করছেন, একইভাবে বাংলাদেশি সংগীতশিল্পীদেরও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে নিয়মিত গান পরিবেশনের সুযোগ থাকা উচিত।’
সেদিন মাদানী অ্যাভিনিউয়ে আতিফ আসলামের কনসার্টে কারও কারও বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কুমিল্লা থেকে আসা মোহাম্মদ আলিফের মতো কেউ বছরের পর বছর আতিফ আসলামের গান শোনার পর প্রথমবারের মতো তাঁকে সরাসরি মঞ্চে দেখেছেন। আবার মুশফিকা জাহানের মতো অনেকের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
(পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন-এ প্রকাশিত মারুফ হাসানের প্রতিবেদন; অনুবাদ করেছেন ফাবিহা বিনতে হক)
• মারুফ হাসান: বাংলাদেশি সাংবাদিক

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬। সন্ধ্যা ছয়টা। ঢাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। ষ্টেজের সামনে পানি জমে গেছে। দর্শকদের অনেকেই ভিজে একাকার। তবু কেউ চলে যাচ্ছে না। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, ভিড় ততই বাড়ছে।
এই ভিড়েরই একজন ২২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলিফ। আতিফ আসলামকে সামনে থেকে দেখবেন বলে ১০৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছেন তিনি। আলিফ বলেন, ‘আমি ১০ বছর বয়স থেকে আতিফ আসলামের গান শুনছি। আজ তাঁকে সামনে থেকে গান গাইতে দেখা আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।’
রাত ৮টা ৫২ মিনিটে আতিফ আসলাম মঞ্চে উঠতেই হাজারো কণ্ঠে একসঙ্গে ডেকে উঠল, ‘আতিফ! আতিফ!’ এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা দর্শকেরা গলা মেলালেন তাঁর একের পর এক জনপ্রিয় গানে। দীর্ঘ অপেক্ষা, তুমুল বৃষ্টি সবকিছু যেন মুহূর্তেই ভুলে গেল সবাই।
আলিফের মতো ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মুশফিকা জাহান অবশ্য সেদিন কনসার্টে যেতে পারেননি। পরিবারের অনুমতি মেলেনি। তাই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওর মাধ্যমে কনসার্টের নানা মুহূর্ত দেখে নিতে হয়েছে। মুশফিকা বলেন, ‘আমি নিয়মিত ইউটিউবে আতিফ আসলামের গান শুনি। তাঁর গানের কথাগুলো আমার অনুভূতির সঙ্গে মিলে যায়। আমি সত্যিই চেয়েছিলাম তাঁকে সামনে থেকে গান গাইতে দেখতে।’
শুধু আলিফ ও মুশফিকা নন, বাংলাদেশের হাজারো তরুণের প্রতিদিনের গানের তালিকায় এখন পাকিস্তানি মিউজিকের জায়গা হয়েছে। তবে এই আগ্রহ এক দিনে তৈরি হয়নি।
পাকিস্তানি শিল্পীদের গান গান বাংলাদেশে হঠাৎ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও বেড়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অনেক তরুণ অনলাইনে পাকিস্তানি শিল্পীদের গান শুনছেন। এতদিন সেই আগ্রহ অনেকটাই সীমাবদ্ধ ছিল ব্যক্তিগত প্লেলিস্ট আর অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে।

২০২৪ সালের পর বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে। দুই দেশের কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি শিল্পীদের বাংলাদেশে এসে গান গাওয়ার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও গতি পায়।
বছরের পর বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচলও আবার শুরু হয়। বছরের পর বছর অনলাইনে গান শোনা সেই শ্রোতারাই এবার প্রিয় শিল্পীদের সামনে থেকে দেখতে ভিড় করছেন।
মঞ্চেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ঢাকায় কনসার্ট করতে এসেছিলেন আতিফ আসলাম। একই বছরের নভেম্বরে আবারও ঢাকায় কনসার্ট করতে আসেন তিনি। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৪ জুলাই আরেকটি বড় কনসার্ট করতে ঢাকায় আসেন তিনি।
শুধু তাই নয়, গত ২৩ জুলাই ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে আতিফ আসলাম বাংলাদেশকে তাঁর ‘সেকেন্ড হোম’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সারা বিশ্বে গান পরিবেশন করেছি। কিন্তু বাংলাদেশে দর্শকদের কাছ থেকে যে ধরনের সাড়া পাই, অন্য কোথাও তা পাই না।’
তবে আতিফ আসলাম ছাড়াও বাংলাদেশে জনপ্রিয় পাকিস্তানি শিল্পীদের তালিকায় আরও অনেকেই আছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় দুটি কনসার্টে গান পরিবেশন করেন রাহাত ফতেহ আলী খান। পাকিস্তানি ব্যান্ড জালও ১৪ বছর পর আবার বাংলাদেশে আসে। এ ছাড়া, ২০২৫ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো গান পরিবেশন করেন পাকিস্তানী কণ্ঠশিল্পী আইমা বেগ, ব্যান্ড কাভিশ এবং রক্সেন ব্যান্ডের প্রধান শিল্পী মোস্তফা জাহিদ। ২০২৪ সালের পর আবদুল হান্নানও ২০২৫ সালে আবার বাংলাদেশে আসেন। ২০২৬ সালে ব্যান্ড বায়ান ঢাকায় প্রথম কনসার্ট করে। এ বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গান পরিবেশন করতে আসছেন মুরতজা কিজিলবাশ। আর চলতি মাসের শেষ দিকে আসছেন হাসান রহিম।
আতিফ আসলাম ও রাহাত ফতেহ আলী খানের মতো শিল্পীদের কনসার্টের বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক আসেন। টিকিটের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও চাহিদা কমছে না। পাকিস্তানি গানের ভক্তদের অনেকেই এসব কনসার্টকে এখন শুধু গান শোনার অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না। বরং কন্ঠশিল্পী আর ভক্তদের মধ্যে ভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ হিসেবেও দেখছেন তাঁরা।

বাংলাদেশের গীতিকার ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফয়সাল রাব্বিকীন মনে করেন, পাকিস্তানি শিল্পীদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি শিল্পীর দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হলে আর কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলে স্বাভাবিকভাবেই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বাড়ে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি শিল্পীদের কনসার্টের সংখ্যা বাড়াও সেই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েবও প্রায় একই মত দেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশিরা কয়েক দশক ধরেই পাকিস্তানি সংগীত, বিশেষ করে গজল শুনে আসছেন। তিনি বলেন, ‘আগে মানুষ গান শোনার জন্য টেলিভিশন ও রেডিওর ওপর নির্ভর করতেন। এখন তরুণেরা খুব সহজেই ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের গান খুঁজে নিতে পারেন বা নিজের পছন্দ অনুযায়ী গান বেছে নিতে পারেন। ডিজিটাল মাধ্যম সেটিই সম্ভব করেছে।’
বাংলাদেশের অনেক তরুণের কাছে পাকিস্তানি মিউজিকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অন্যতম মাধ্যম ‘কোক স্টুডিও পাকিস্তান’। লোকজ সংগীত, কাওয়ালি ও আধুনিক পপ সংগীতের মিশ্রণ ইউটিউবে তৈরি করেছে বিপুল শ্রোতা। বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমের কারণে মূলধারার বলিউড শিল্পী ছাড়াও বাইরের শিল্পীদের গান খুঁজে পাওয়া আগের চেয়ে সহজ হয়ে গিয়েছে।
২৪ বছর বয়সী মারিন আমিন ছোটবেলা থেকেই পাকিস্তানি শিল্পীদের গান শুনছেন। ঢাকায় রাহাত ফতেহ আলী খান ও আতিফ আসলামের বেশ কয়েকটি কনসার্টেও দেখেছেন তিনি। মারিন বলেন, ‘পাকিস্তানি মিউজিকে অন্যরকম কিছু একটা আছে। তারা যেভাবে গান পরিবেশন করেন, সেটা আমার খুব ভালো লাগে। গানগুলোর সঙ্গে নিজেকে সহজেই মেলাতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চেয়ে ছোটদের মধ্যেও এসব গান সমান জনপ্রিয়। কখনো কখনো এসব গান শুনলে মনে হয়, গানগুলো যেন আমার নিজের জীবনের গল্প বলছে।’
বাংলাদেশি তরুণ সংগীতশিল্পী অ্যাঞ্জেল নূরের মতে, ভারতীয় সিনেমাও বাংলাদেশে পাকিস্তানি মিউজিকের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তবে শেষ পর্যন্ত শ্রোতাদের ধরে রাখার মূল কারণ সংগীতের মান। অ্যাঞ্জেল বলেন, ‘আমাদের পাকিস্তানি গান শোনার কোনো কারণ নেই, এমনটা ভাবার কিছু নেই। তাদের গানের মান খুব ভালো।’
-c47540.jpg)
পাকিস্তানি মিউজিক তাঁর নিজের কাজেও প্রভাব ফেলেছে। তিনি জানান, সামনে প্রকাশিত অ্যালবামে পাকিস্তানি মিউজিকের কিছু উপাদান রাখার চেষ্টা করেছেন। অ্যালবামের সংগীতায়োজনে পাকিস্তানি সংগীতশিল্পীরাও যুক্ত থাকছেন। তিনি বলেন, ‘আমার আপকামিং ১২টি গানের অ্যালবামে পাকিস্তানি সংগীতের একটা স্বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
ঢাবি শিক্ষক মোহাম্মদ শোয়েব মনে করেন, সংগীতের ক্ষেত্রে শ্রোতারা শিল্পীর জাতীয়তার চেয়ে গানের মানকেই বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘গান শোনার সময় কেউ ভেবে দেখেন না গানটি ভারতীয় না পাকিস্তানি। সুর, কণ্ঠ, গানের কথা আর কীভাবে গানটি পরিবেশন করা হয়েছে—এসবই মূল বিষয়। পাকিস্তানি সংগীতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। আর এ কারণেই বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এর এত শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।’
গীতিকার ফয়সাল রাব্বিকীনের বিশ্বাস, বাংলাদেশে পাকিস্তানি সংগীতের জনপ্রিয়তা শুধু কয়েকজন শিল্পীর জনপ্রিয়তার জন্য নয়। এর পেছনে রয়েছে সাংস্কৃতিক যোগাযোগের বিস্তার, ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসার আর তরুণ শ্রোতাদের বদলে যাওয়া ‘মিউজিক টেস্ট’। তিনি বলেন, ‘আজকের তরুণেরা কোনো শিল্পীর পাসপোর্ট দেখে গান বেছে নেয় না। গানটি ভালো কি না, সেটাই তাঁরা দেখেন।’
তবে ফয়সাল রাব্বিকীনের মতে, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান কখনো একতরফা হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘যেভাবে পাকিস্তানি শিল্পীরা বাংলাদেশে গান পরিবেশন করছেন, একইভাবে বাংলাদেশি সংগীতশিল্পীদেরও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে নিয়মিত গান পরিবেশনের সুযোগ থাকা উচিত।’
সেদিন মাদানী অ্যাভিনিউয়ে আতিফ আসলামের কনসার্টে কারও কারও বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কুমিল্লা থেকে আসা মোহাম্মদ আলিফের মতো কেউ বছরের পর বছর আতিফ আসলামের গান শোনার পর প্রথমবারের মতো তাঁকে সরাসরি মঞ্চে দেখেছেন। আবার মুশফিকা জাহানের মতো অনেকের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
(পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন-এ প্রকাশিত মারুফ হাসানের প্রতিবেদন; অনুবাদ করেছেন ফাবিহা বিনতে হক)
• মারুফ হাসান: বাংলাদেশি সাংবাদিক
.png)

‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নেতিবাচক শব্দ। শুধু বাংলাদেশ কেন, বিশ শতকীয় ‘আধুনিক’বৈশ্বিক মূল্যবোধে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ গৃহীত হয়েছে ‘প্রগতিশীলতা’র বিপরীত ধারণা হিসেবে, রক্ষণশীলতার অনুগামী অর্থে। কিন্তু সামাজিক প্রাণী হিসেবে মানুষ কোনো না কোনো সম্প্রদায়ের আওতায় বসবাস করে।
১ দিন আগে
‘কিন্তু মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে তুর্কীরা রাজনৈতিক সেকিউলারিযম গ্রহণ করিতেছে; পোশাক-পাতিতে ইউরোপীয় সাজিবার চেষ্টা করিতেছে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠান উঠাইয়া দিতে পারে বলিয়া গুজব রটিতেছে। স্বয়ং তুর্কীরা খিলাফত উঠাইয়া দিলে আমরা ভারতীয়রা কিরূপে আন্দোলন চালাইব, প্রধানতঃ এই কথাটার আলোচনার জন্যই মওলানা
২৯ আগস্ট ২০২৬
১৯২২ সালের নভেম্বরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যে তরুণ কবিটিকে কলকাতার জেলে এনে তোলা হয়েছিল, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাঁকে চিনেছিল কেবল একটি মামলার নম্বর হিসেবে—‘রাজবন্দি’। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দিটি লিখে দিলেন, সেটি আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না; সেটি ছিল বিচারকের আসনটিকেই উল্ট
২৯ আগস্ট ২০২৬-207c16-256x144.webp)
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবিনশ্বর রচনা তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। বিখ্যাত এই কবিতা নজরুলকে এনে দিয়েছে ‘বিদ্রোহী কবি’ খেতাব। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বয়স একশ বছর অতিক্রান্ত। কবিতার জন্ম থেকে আজ অবধি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও ‘বিদ্রোহী’ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অতিক্রান্ত শত বছরেও এই কবি
২৯ আগস্ট ২০২৬