বাংলাদেশের বামপন্থীদের কলকাতামুখী রেললাইন উধাও, ডানপন্থীরা কি নাগপুরের টিকিট কাটছে?

ডেইলি ওয়াদায় ২৪ আগস্ট প্রকাশিত ফয়সাল মাহমুদের ‘Bangladesh's Left is still waiting for the Calcutta train’ নিবন্ধে ছাপা হয়েছে। যেখানে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের বাম মহল আজও কলকাতার নকশাল-উত্তর সাহিত্য ও সিপিআই(এম)-এর কফিহাউস সংস্কৃতি থেকে ধার করা ভাষা ও নান্দনিকতা বহন করছে। কিন্তু সেই নন্দন ও ভাষা বাংলাদেশকে ব্যাখ্যা করতে আর সক্ষম নয়। ফলে দাবিটি অতিসরলীকরণ এবং সমস্যাজনক। তার প্রতিক্রিয়া এ লেখা।

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৪৬
বাংলাদেশের বামপন্থীদের কলকাতামুখী রেললাইন উধাও, ডানপন্থীরা কি নাগপুরের টিকিট কাটছে? ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
বাংলাদেশের বামপন্থীদের কলকাতামুখী রেললাইন উধাও, ডানপন্থীরা কি নাগপুরের টিকিট কাটছে? ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

‘একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ভাঁড়গুলো এই কথাই বলে আসছে। তোমাদের কি মনে প্রশ্ন জাগে না: কেন আমাকে বারবার মৃত ঘোষণা করার দরকার হয়?’—কার্ল মার্ক্সের মুখ দিয়ে ২৭ বছর আগে হাওয়ার্ড জিন তাঁর 'মার্ক্স ইন সোহো'-তে কথাগুলো উচ্চারণ করান। আসলেও, মৃত চিন্তাকে বার বার মারার প্রয়োজন পড়ে না। জীবিত চিন্তাকেই বারবার মারার উদ্যোগ নিতে হয়।

যে মশা ধোঁয়া দিলেই পালায়, তার দিকে কামান দাগালে গোলন্দাজের নিয়ত নিয়ে প্রশ্ন জাগে। বাংলাদেশে ‘বাম’ গোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে কম। তারা কোন চুলায় যাচ্ছে, তা নিয়ে এত মাথা ঘামানোর অবকাশ যে কারও আছে, কে জানত! অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, দিব্যি আছে। এমনকি তারা কোন ট্রেনে উঠতে চায়, তা নিয়েও।

ফয়সাল মাহমুদ সেই কাজটিই করতে চাচ্ছেন। বামেরা চাক বা না চাক, মাহমুদ তাদের কলকাতার ট্রেনে উঠিয়েই ছাড়বেন। তিনি প্রাগমেটিজম, বুদ্ধিবৃত্তিক আভিজাত্য, ঐতিহাসিক দলিল আর একটি অনিবার্য উপসংহারের দিকে এগিয়ে যাওয়া গদ্যের মোড়কে তাদের টিকিট কেটে দিয়েছেন। চাইলে তিনি বামপন্থীদের ভুলের একটি সৎ বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে পারতেন। তার বদলে বেছে নিলেন বাম-মুণ্ডুপাত। ডানপন্থী পাঠকেরা নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞ থাকবেন।

যে একশিলাটি আদতে নেই

লেখকের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুতর ত্রুটি হলো ‘বাম’ নামক বিশাল ছাতাকে তিনি একশিলা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অভিধাটির জন্ম ফরাসি বিপ্লবের সময়। খোদ ফরাসি বিপ্লবের সময়েই বামপন্থীরা একশিলা ছিল না। জ্যাকোবিন ও জিরোন্ডিনদের মধ্যকার তীব্র মতাদর্শিক বিতর্কই তার প্রমাণ। পরে উনিশ শতকে ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনালে কার্ল মার্ক্স ও মিখাইল বাকুনিনের মধ্যকার মার্ক্সবাদ বনাম অ্যানার্কিজম দ্বন্দ্ব, কিংবা রুশ বিপ্লবের পর স্তালিন, ট্রটস্কি ও রোজা লুক্সেমবার্গের মধ্যকার আদর্শিক সংঘাত স্পষ্ট করে দেয় যে বামপন্থা একটি বহুমাত্রিক স্রোত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্রোত বিবর্তিত হয়ে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি, নিও-মার্ক্সিজম, এবং হাল আমলের পোস্ট-কলোনিয়াল ও ইকো-ফেমিনিস্ট লেফটে এসে ঠেকেছে।

বামপন্থীদের অতীত ভুলের অজুহাতে বর্তমানের ডানপন্থী তাণ্ডবকে আড়াল করার এই চেষ্টা কি সন্দেহের উদ্রেক করে না? একদিকে কয়েক দশক পুরোনো তাত্ত্বিক কোন্দল ও হঠকারিতা আর অন্যদিকে আজকের বাড়বাড়ন্ত দঙ্গলবাজি, এ দুটোকে কি একপাল্লায় মাপা আদৌ সম্ভব?

লেখক এই ঐতিহাসিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনকে বেমালুম গায়েব করে দিয়েছেন। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদ পাওয়া রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সিপিআই(এম), পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের লিবারেল স্কলার এবং সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র মাওবাদী সর্বহারা পার্টিকে একই তুলিতে এঁকে এক অপূর্ব দৃশ্যপট তৈরি করেছেন। কিন্তু কেন? এই জগাখিচুড়ি বামপন্থার বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসকে মুছে দিয়ে তাকে স্রেফ একটি ব্যর্থ, সেকেলে ও রক্তপিপাসু ফ্যাশন হিসেবে পাঠকের সামনে হাজির করে।

আইভি লিগে পড়লেই বুঝি সাম্রাজ্যবাদের দালাল

লেখক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা আর মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নেওয়ার মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর লেখার ভাবখানা এমন যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করবে, আবার সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপও নেবে, ধিক্কার এ হেন বাম! আইভি লিগে পড়লেই কেউ বুঝি রাতারাতি সাম্রাজ্যবাদের দালাল হয়ে যায়! কিন্তু এই যুক্তি ধোপে টেকে না।

অ্যাডওয়ার্ড সাইদ, গায়ত্রী স্পিভাক, মাহমুদ মামদানি বা নোয়াম চমস্কিকে কি তবে লেখক খারিজ করে দিতে চান? তারাও তো মার্কিন আলো-বাতাসে থেকেছেন আর সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন?

সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে খোদ আমেরিকার আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। সেখানকার এলিট ক্যাম্পাসে পড়েই হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক পুলিশের টিয়ারগ্যাস, বরখাস্তের হুমকি ও লাঠিপেটা সয়েছেন। তারা ফ্রি প্যালেস্টাইন আন্দোলন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডিং থেকে ইসরায়েলকে প্রত্যাহারের দাবি তুলছেন। পশ্চিমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকা আর সাম্রাজ্যবাদের দালালি করা এক বিষয় নয়।

ফলে জ্ঞানার্জনের জন্য পশ্চিমা একাডেমিয়ায় প্রবেশ করা আর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করার মধ্যকার এই কাল্পনিক দ্বন্দ্ব কেবল তাদের চোখেই ধরা পড়ে, যারা বাম-ব্যাশিং করে অন্য কারো হাততালি কুড়াতে চান।

‘ছককাটা ডায়াগ্রাম’ কোন মার্কসবাদ

লেখক খোঁচা দিয়েছেন যে মার্ক্সবাদীরা ছককাটা ডায়াগ্রাম পছন্দ করেন। এই খোঁচার মধ্যে সত্যতা হয়তো কিছুটা আছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে মার্ক্সবাদ একটি বিবর্তনশীল তত্ত্ব। মার্ক্সবাদীরা ঐতিহাসিকভাবে নিজেরাও নানা প্রশ্ন তুলেছেন।

খেয়াল করলে দেখবেন, দুই দেশের ডানপন্থী সহিংসতার কার্যকরী কাঠামো প্রায় অভিন্ন। উভয় ক্ষেত্রেই ‘ধর্মীয় বিশুদ্ধতা’ রক্ষার নামে দঙ্গলকে বিচারক বানানো হচ্ছে। দুই দেশেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী বা প্রান্তিক মানুষকে।

আন্তোনিও গ্রামশি যেমন দেখিয়েছেন, কেবল অর্থনৈতিক বা কাঠামোগত ক্ষমতার জোরেই আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না, তা তৈরি হয় সমাজে সম্মতি আদায়ের মধ্য দিয়ে। ঠিক এ কারণেই কৃষক-বুর্জোয়া-ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মিলিত জাতীয়তাবাদী কোয়ালিশন কোনো তাত্ত্বিক বিচ্যুতি নয়, বরং হেজিমনি নির্মাণের এক ধ্রুপদি উদাহরণ।

আরেক মার্ক্সবাদী লুই আলথুসারও বলেছেন, কোনো ঐতিহাসিক ঘটনাই একরৈখিক কারণে ঘটে না। তা নির্ধারিত হয় বহু বিরোধী শক্তির মিথস্ক্রিয়ায়। লেখক যে ‘ছককাটা’ মার্ক্সবাদের সমালোচনা করছেন, বাংলাদেশের ঠিক কোন সমসাময়িক তাত্ত্বিক বা অ্যাকটিভিস্ট সেই মডেলকে বাইবেলের মতো মেনে চলেন!

লেখার শেষের দিকে এসে লেখক নিজেই বাংলাদেশের স্বতন্ত্র বাম প্রতিবাদী ঘরানার এক দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন। সেখানে আছে মওলানা ভাসানীর কৃষক রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, শ্রমিক আন্দোলন, সিরাজ সিকদারের বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ, পোশাকশিল্প ও অভিবাসনে বদলে যাওয়া সমাজ এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন। তিনি নিজেই স্বীকার করছেন, বাংলাদেশের ইতিহাস নিজস্ব র‍্যাডিক্যাল রাজনৈতিক ঐতিহ্য গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তাহলে যে বামপন্থার শিকড় পূর্ব বাংলার জাতীয় প্রশ্ন, কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং সিরাজ সিকদারের মতো স্বতন্ত্র বিপ্লবী ধারায় গভীরভাবে প্রোথিত, তাকে কোন প্রমাণের ভিত্তিতে কলকাতার ‘ইন্টেলেকচুয়াল ভ্যাটিকান’-এর অনুসারী বলা হচ্ছে? কলকাতার সাহিত্য পড়া, নকশাল রোমান্টিসিজমে মুগ্ধ হওয়া বা নিছক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে কি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নির্ভরতার অকাট্য প্রমাণ বলা চলে? বাংলাদেশের উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণেরা স্রেফ সমরেশ মজুমদার পড়েই বামপন্থী হয়ে উঠেছে—এমন উদ্ভট বিশ্বাস সম্ভবত লেখকের ব্যক্তিগত ‘চেরি-পিকিং’ অভ্যাসের কারণেই তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ঐতিহ্যের এই দীর্ঘ তালিকাই বরং তাঁর কেন্দ্রীয় থিসিসকে জোরালোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এত সমৃদ্ধ নিজস্ব ঐতিহ্যের কথা স্বীকার করে নেওয়ার পরও বাংলাদেশের বামদেরকে ‘কলকাতার বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশ’ হিসেবে হাজির করতে চাইলে স্রেফ রূপক দিয়ে কাজ হবে না। অকাট্য প্রমাণ দরকার।

ফয়সাল মাহমুদের লেখায় ‘কলকাতা’ ব্যাপকভাবে হাজির আছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের বামদের ‘কলকাতার ট্রেনে’ চড়ার অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণ খুবই সামান্য। তিনি মূলত কিছু সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে রাজনৈতিক নির্ভরতা বলে ধরে নিয়েছেন। আর সাহিত্যিক রোমান্টিসিজমকে পাঠ করেছেন মতাদর্শিক আনুগত্য হিসেবে। মাহমুদের এই ‘কলকাতার ট্রেন’ তাই ইতিহাসে পাওয়া কোনো বাস্তব রেললাইন নয়, তাঁর নিজের গদ্যে নির্মিত এক দুর্বল রূপক মাত্র।

হিরণ্ময় নীরবতা

এ লেখার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকটি এর হিরণ্ময় নীরবতা। বাংলাদেশ ও ভারতের সাম্প্রতিক বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে সব ধরনের উগ্রবাদের বিরুদ্ধে একত্রে লড়াইয়ের আহ্বান জানানোই কি সময়োপযোগী নয়? তা না করে তিনি কেন কেবল বামপন্থীদের অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করতেই এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন?

অথচ আমাদের চোখের সামনে কী ঘটছে? বাংলাদেশে একের পর এক বুলডোজার আর হাতুড়ি দিয়ে মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, সিরাজগঞ্জে পীরের কবর খুঁড়ে লাশ তুলে এনে পুড়িয়ে ফেলার মতো বীভৎস ও আদিম ঘটনা ঘটেছে। আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে মিছিল হচ্ছে। দঙ্গলবাজির মহোৎসব চলছে। দীপু দাসকে পুড়িয়ে মারার মতো লোমহর্ষক ঘটনাগুলো আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করছে। প্রত্যেকটি ঘটনার পরে আমরা দেখতে পাই কেউ কেউ দাবি করেন এগুলো সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু, একটু তলিয়ে দেখলে এগুলোকে কি সমাজে সহিষ্ণুতার হার যে পড়তির দিকে আর উগ্র ডানপন্থা উত্থানের দিকে চলার প্রমাণ নয়?

অ্যাডওয়ার্ড সাইদ, গায়ত্রী স্পিভাক, মাহমুদ মামদানি বা নোয়াম চমস্কিকে কি তবে লেখক খারিজ করে দিতে চান? তারাও তো মার্কিন আলো-বাতাসে থেকেছেন আর সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন?

সীমান্তের ওপারে ভারতের দিকে চিত্রটা হুবহু এক। কেবল নামগুলো ভিন্ন। সেখানে গোরক্ষার নামে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মহম্মদ আখলাক বা পেহলু খানের মতো নিরীহ মুসলমানদের রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে হত্যা করছে। বাবরির পর এবার বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ কিংবা মথুরার শাহী ঈদগাহ মসজিদকে জোরপূর্বক মন্দির বানানোর পাঁয়তারা চলছে। লাভ জিহাদের ধুয়া তুলে দম্পতিদের হয়রানি করা হচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যে গির্জায় হামলা চলছে।

খেয়াল করলে দেখবেন, দুই দেশের ডানপন্থী সহিংসতার কার্যকরী কাঠামো প্রায় অভিন্ন। উভয় ক্ষেত্রেই ‘ধর্মীয় বিশুদ্ধতা’ রক্ষার নামে দঙ্গলকে বিচারক বানানো হচ্ছে। দুই দেশেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী বা প্রান্তিক মানুষকে।

বাংলাদেশের উগ্র ডানপন্থার ঐতিহাসিক উৎস অবশ্যই বহুকেন্দ্রিক। কিন্তু জনতার হাতে নৈতিক বিচার তুলে দেওয়া, ধর্মীয় বিশুদ্ধতার নামে প্রতিপক্ষকে বহিষ্কার করা এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে ভেটো আরোপের রাজনৈতিক ব্যাকরণে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে তার উদ্বেগজনক সাদৃশ্য রয়েছে। সে অর্থে বলা যায়, বাংলাদেশের ডানপন্থা যদি কোনো প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেটি ভারতের আরএসএসের সদরদপ্তর নাগপুর প্ল্যাটফর্মে। আরএসএস-বজরং দলের বিশুদ্ধতা রক্ষার যে রাজনৈতিক ব্যাকরণ আর বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দঙ্গলবাজির ব্যাকরণ একেবারে একবিন্দুতে মিলে যায়।

আক্ষেপের বিষয় হলো ডানপন্থার এই উত্থান নিয়ে লেখকের কলম থেকে দু ছত্রও বেরোলো না! লেখক বামপন্থীদের কাল্পনিক কলকাতার সাংস্কৃতিক নির্ভরতা নিয়ে পাতার পর পাতা আক্ষেপ করছেন। অথচ দুই দেশের ডানপন্থীদের এই যে গভীর, বাস্তব ও রক্তাক্ত পদ্ধতিগত নির্ভরতা বজায় রয়েছে নিয়ে তাঁর এই হিরণ্ময় নীরবতার অর্থ কী?

ডানপন্থী মব রাজনীতি ক্রমশ সামাজিক স্বাভাবিকতা অর্জন করছে। সেই সময় বাম রাজনীতির দুর্বলতাকে এত বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে হাজির করা কোন ধরনের রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ করে? এই মুণ্ডুপাত করার মাধ্যমে লেখক কি মূলত এই দঙ্গলবাজি বা ‘প্রেশার গ্রুপের’ কাণ্ডকারখানাকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাত্ত্বিক পাটাতন তৈরি করে দিচ্ছেন?

এলিয়েন তৈরির রাজনীতি

লেখাটি পড়লে ভ্রম হয়, এ কি চল্লিশের দশকের কোনো প্রপাগান্ডা? জর্জিও আগামবেন এখন ডানপন্থীদের ভেতর বেশ জনপ্রিয়। সবাই নাকি সবাইকে ‘হত্যাযোগ্য’ করে তুলছে। আগামবেনের কাছেই তাই ফিরি। তাঁর ‘হোমো সাকের’ নামে একটা ধারণা আছে। কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ নির্দিষ্ট একটা গোষ্ঠীকে সমাজের বাইরের, অপ্রাসঙ্গিক বা পরম অপর বলে ঠাহর করলে সেই গোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা ধীরে ধীরে আইনি-নৈতিক পরিসরের বাইরে চলে যায়। একসময় তাদের ক্ষতি আর অপরাধ হিসেবেই গণ্য হয় না।

লেখক বাম চিন্তাকে বারবার কলকাতার আমদানি করা জীবাশ্ম বলে সমাজের বাইরের বস্তু হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এই কাঠামোটাই বিপজ্জনক। কারণ, কাউকে একবার বহিরাগত বা অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করলে তার ওপর আঘাত জায়েজ করার পথ প্রশস্ত হয়ে যায়। আমরা দেখেছি, পাকিস্তান আমলে কেউ যৌক্তিক দাবি তুললেই তাকে ‘ভারতীয়’ ট্যাগ দেওয়া হতো। যেমনটা এখন হয় ‘বিদেশি সংস্কৃতির এজেন্ট’, ‘নাস্তিক’, বা ‘জাতির শত্রু’ হিসেবে দেখানো। সাম্প্রতিক ভারতেও ‘আরবান নকশাল’, ‘দিমাগি নকশাল’ এসব বলে যৌক্তিক দাবিকে নস্যাৎ করার পাঁয়তারা। এমনকি নাৎসি জার্মানিতে প্রকৃত জাতীয় সত্তা বনাম বিদেশি দূষণ ঘিরে ভলকিশ চিন্তাধারা ঠিক এই কাজেই ব্যবহৃত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল মার্ক্সবাদ ও ইহুদি বুদ্ধিজীবীদের শিকড়হীন আন্তর্জাতিকতাবাদী ঘোষণা করে জার্মান সংস্কৃতি থেকে বহিষ্কারযোগ্য বানানো। ধন্যবাদ যে লেখককে, এখ্যনো অতদূর আগাননি।

বামেরা কি তবে ভুল করেনি?

বামপন্থীরা আলবাত ভুল করেছে। একাত্তরে তাদের একাংশ আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের অন্ধ অনুকরণ করেছে। সত্তর-আশির দশকে শ্রেণিশত্রু খতমের নামে হঠকারিতা করেছে। হয়েছে উপদলীয় কোন্দলে আত্মঘাতী। ব্যাপক বিভাজন ও সশস্ত্র হানাহানির ইতিহাস কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বর্তমান সময়ের রামপাল-বিরোধী আন্দোলনে সুন্দরবন রক্ষার সংগ্রাম, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আন্দোলন কিংবা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাম কর্মীদের বুকের রক্ত দিয়ে অংশগ্রহণ—এসব মুছে দিয়ে তাদের স্রেফ ‘কলকাতার মুখাপেক্ষী’ হিসেবে হাজির করাটা এক প্রতারণা।

বামপন্থীদের অতীত ভুলের অজুহাতে বর্তমানের ডানপন্থী তাণ্ডবকে আড়াল করার এই চেষ্টা কি সন্দেহের উদ্রেক করে না? একদিকে কয়েক দশক পুরোনো তাত্ত্বিক কোন্দল ও হঠকারিতা আর অন্যদিকে আজকের বাড়বাড়ন্ত দঙ্গলবাজি, এ দুটোকে কি একপাল্লায় মাপা আদৌ সম্ভব? এদিকে তো ডানপন্থী দঙ্গল তাণ্ডব করে বেড়াচ্ছে। এমন সময় বামপন্থীদের নিয়ে এই ব্যঙ্গ বিলাসিতা নয়, বরং বিপজ্জনক।

কলকাতার ট্রেন বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু নাগপুরের টিকিট যে ক্রমশ চড়া হচ্ছে। এই খবর চেপে রাখলে কার লাভ?

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত