মাহজাবিন নাফিসা

১৯৬৪ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে যে তরুণটি চলচ্চিত্রে জায়গা খুঁজছিলেন, মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনিই হয়ে উঠলেন ‘বেহুলা’র নায়ক। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ, নতুন চলচ্চিত্রের ভাষা, বাণিজ্যিক সিনেমার উত্থান—সবকিছুর মধ্য দিয়েই রাজ্জাকের ক্যারিয়ার এগিয়েছে। প্রায় ছয় দশকের কর্মজীবনে তিনি চার শতাধিক বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং ষাট, সত্তর ও আশির দশকের শুরুতেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শীর্ষ অভিনেতাদের একজন ছিলেন।
রাজ্জাক ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল। তখন এই শহরের চলচ্চিত্রশিল্প আজকের মতো প্রতিষ্ঠিত কোনো বড় বিনোদনব্যবস্থা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণের অবকাঠামো তখন গড়ে উঠছিল মাত্র। ১৯৫৬ সালে মুখ ও মুখোশ মুক্তির পর ঢাকার চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হলেও নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিত্তি শক্ত হয় ১৯৫৭ সালে ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর। স্বাধীনতার পর, এফডিসির সুযোগ-সুবিধা চালু হলে ১৯৫৯ সাল থেকে নিয়মিত চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। রাজ্জাকের নায়ক হওয়ার ক্যারিয়ার এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প যেন একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে।
কলকাতায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও ঢাকায় এসে তাঁর শুরুটা মোটেও নায়কের মতো হয়নি। কমলাপুরে ভাড়া বাসায় থেকে কাজের খোঁজ করা, ইকবাল ফিল্মসে যোগ দেওয়া, ‘উজালা’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাঁকে এগোতে হয়েছে। ঢাকায় এসে তিনি প্রথমে অভিনয়ের সুযোগ না পেয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন।

‘রোমান্টিক’ নায়ক হলেও দূরে ছিলেন না সমাজ ও রাজনীতির গল্প থেকে
১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের বেহুলাতে লখিন্দরের চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক। ছবিটি ছিল বড় সাফল্য। এর পরই তিনি ঢাকার চলচ্চিত্রে নতুন তারকা হিসেবে উঠে আসেন। এরপরেই রাজ্জাক তখনকার প্রতিষ্ঠিত নায়কদের পাশে নতুন মুখ হিসেবে জায়গা করে নেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত নির্মিত বহু ছবিতে অভিনয় করেন।
ষাটের দশকের চলচ্চিত্রে একদিকে ছিল লোককাহিনি ও রোমান্টিক গল্প, অন্যদিকে সমাজ ও রাজনীতির অস্থিরতা। সেসময় ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ও ‘জীবন থেকে নেয়া’র মতো চলচ্চিত্র সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে চলচ্চিত্রকে যুক্ত করেছিল। রাজ্জাকের ক্যারিয়ারও এই পরিবর্তনের ভেতরে দিয়ে গেছে।
রূপালি পর্দায় তাঁর পরিচয় শুধু ‘রোমান্টিক হিরো’র ছাঁচেই আটকে থাকেনি। ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘এতটুকু আশা’ কিংবা ‘ময়নামতি’র পাশাপাশি তিনি অভিনয় করেছেন জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’র মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে। এই সিনেমায় তাঁর উপস্থিতিই বুঝিয়ে দেয়, মূলধারার একজন তুমুল জনপ্রিয় নায়ক হয়েও তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতির সাহসী গল্পগুলো থেকে তিনি কখনোই দূরে ছিলেন না।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্জাকের অভিনয়জীবনও এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। স্বাধীনতার পর স্বাভাবিকভাবেই দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পরিচয়ে বদল আসে। ‘ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন’ নাম বদলে যায় ‘বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএফডিসি)’। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে নির্মিত হতে থাকে নতুন ধারার চলচ্চিত্র। তেমনই একটি চলচ্চিত্র ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া স্বাধীন দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’। পরিবর্তিত এই নতুন প্রেক্ষাপটেও রাজ্জাক নিজের শীর্ষস্থান ধরে রাখেন সগৌরবে।
স্বাধীনতার পর তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘মানুষের মন’ দারুণ ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। এরপর ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় জহিরুল হক পরিচালিত ‘রংবাজ’। এই ছবির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অ্যাকশন সিনেমার এক নতুন ধারার সূচনা হয়, আর রাজ্জাকও নিজেকে একেবারে ভিন্ন রূপে দর্শকের সামনে তুলে ধরেন। ষাটের দশকে প্রেম ও সামাজিক গল্পের সিনেমায় অভিনয় করে যিনি রোমান্টিক আইকন হয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তিনিই হয়ে ওঠেন অ্যাকশনধর্মী বাণিজ্যিক সিনেমার অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক। মূলত দেশ, সময়, দর্শকের চাহিদা আর সিনেমার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে নিরন্তর ভেঙেছেন এবং নতুন করে গড়েছেন।
১৯৭৩ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পত্রিকা ‘চিত্রালী’র সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী রাজ্জাককে ‘নায়করাজ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কালক্রমে এই উপাধি তাঁর তারকা-পরিচয়ের সঙ্গে চিরস্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়। তবে ‘নায়করাজ’ খেতাব পাওয়ার পরও রাজ্জাক নিজেকে গৎবাঁধা নায়কের ছাঁচে বন্দি রাখেননি।
১৯৭৬ সালে তিনি নাম লেখান চলচ্চিত্র প্রযোজনায়। পরের বছর ১৯৭৭ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবেও তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এখানেই শেষ নয়, তখনকার শীর্ষ তারকা হয়েও ১৯৭৮ সালে ‘অশিক্ষিত’ সিনেমায় তিনি একজন সাধারণ পাহারাদারের চরিত্রে অভিনয় করেন। পরবর্তী সময়ে কালজয়ী সিনেমা ‘ছুটির ঘণ্টা’তেও তাঁকে স্কুলের দপ্তরির চরিত্রে দেখা যায়।
সময়ের সঙ্গে রাজ্জাকের এই বোঝাপড়া ও বিবর্তনের লড়াইটি সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু নায়ক হিসেবে টিকে থাকা আর একই খোলসে আটকে থাকা কখনোই এক বিষয় নয়।
সত্তরের দশকের শেষ ভাগ এবং আশির দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ঢাকার চলচ্চিত্রশিল্পে বছরে গড়ে ২৮টি ছবি তৈরি হতো। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালে সেই গড় বেড়ে দাঁড়ায় ৪২টিতে। আর ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে তা আরও বেড়ে বছরে গড়ে ৬৭টিতে গিয়ে পৌঁছায়।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, রাজ্জাক যখন তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, তখন এই শিল্পে নিজের জায়গা করে নেওয়া যতটা কঠিন ছিল, কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই শিল্পই একটি বিশাল বাজারে পরিণত হয়। তবে বাজার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে তীব্র প্রতিযোগিতাও। আশির দশকে দেশের বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোতে ভারতীয়, বিশেষ করে হিন্দি সিনেমার নির্মাণশৈলী ও উপস্থাপনার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। ঠিক একই সময়ে বাস্তবধর্মী ও বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রও বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইন্ডাস্ট্রির এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট ও নতুন প্রজন্মের নায়কদের আগমনের পরও রাজ্জাক থেমে থাকেননি। নায়করাজের মতোই সমান দাপটের সঙ্গে নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন।
ষাট-সত্তর-আশি—এই দীর্ঘ তিন দশকের পরিক্রমায় তাঁর পাশে সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন কবরী, শাবানা, সুচন্দা, ববিতার মতো নায়িকারা এবং ফারুক, জাফর ইকবাল, আলমগীরের মতো একাধিক প্রজন্মের তারকারা। তবে চলচ্চিত্রে নতুনদের যত ভিড়ই বাড়ুক না কেন, কেউই তাঁর নিজস্ব শক্ত অবস্থানটি কখনো টলাতে পারেনি।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে রাজ্জাকের ‘নায়ক’ হিসেবে জনপ্রিয়তার গ্রাফ কিছুটা নিম্নমুখী হতে শুরু করে। সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ তারকাই ক্যারিয়ারের ইতি টানেন বা হারিয়ে যান। কিন্তু রাজ্জাক ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রথাগত ‘নায়ক’ পরিচয়ের গণ্ডি থেকে বের করে আনেন এবং একজন পুরোদস্তুর অভিনেতা, সফল পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেন।
নায়ক হিসেবে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পাওয়া এক বিষয়, আর সেই ‘নায়কত্ব’ ফুরিয়ে যাওয়ার পরও দর্শকের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যাপার। রাজ্জাকের জীবনী থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটিই ছিল কেন্দ্রীয় নায়ক হিসেবে তাঁর শেষ চলচ্চিত্র। এরপর তিনি অভিনয়, পরিচালনা ও প্রযোজনা চালিয়ে গেছেন।

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ‘বাবা কেন চাকর’ সিনেমাটির মধ্য দিয়ে তিনি আবারও তুমুল আলোচনায় আসেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া দর্শকপ্রিয় এই চলচ্চিত্রে তিনি একাধারে লেখক, প্রযোজক, পরিচালক এবং প্রধান অভিনেতা ছিলেন।
সাধারণত একজন তারকার জনপ্রিয়তা মাপা হয় অন্য কোনো তারকার সঙ্গে তাঁর তুলনামূলক বিচারের মাধ্যমে। কে দেখতে বেশি স্মার্ট, কে বেশি জনপ্রিয়, কিংবা বক্স অফিসে কার সিনেমা বেশি ব্যবসাসফল—এসব প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু রাজ্জাকের ক্ষেত্রে এই সমীকরণ একেবারেই অসম্পূর্ণ।
ষাটের দশকে যখন তিনি চলচ্চিত্রে পা রাখেন, তখনকার দর্শক নিজেদের দেশের নায়ক বা নিজস্ব সিনেমা—কোনোটিতেই খুব একটা অভ্যস্ত ছিলেন না। স্বাধীনতার পর সেই দর্শকের রুচিতে পরিবর্তন আসে। সত্তরের দশকে বদলে যায় সিনেমার পুরো বাজার। আশির দশকে ইন্ডাস্ট্রিতে আগমন ঘটে নতুন নায়কদের, তৈরি হয় চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা। আর নব্বইয়ের দশকে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের প্রভাবে দেশের চলচ্চিত্রশিল্প যখন এক অভাবনীয় প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে, তখনও রাজ্জাক দাপটের সঙ্গে টিকে ছিলেন।
সময়ের প্রয়োজনে তিনি নিজেকে বারবার ভেঙেছেন ও গড়েছেন, কিন্তু কখনো হারিয়ে যাননি। সময়কে জয় করে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন নতুন রূপে। ১৯৬৪ সালে রূপালি পর্দায় পা রাখা সেই তরুণ রাজ্জাক আর জীবনের শেষভাগের রাজ্জাক কখনোই এক মানুষ ছিলেন না। ঢাকা বদলেছে, সিনেমার ব্যাকরণ বদলেছে, দর্শকের রুচি পাল্টেছে, এমনকি বদলে গেছে ‘নায়ক’ হওয়ার সংজ্ঞাও। সময় যতবার তাঁকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে, রাজ্জাক ততবারই পরম দক্ষতায় নিজের জন্য তৈরি করে নিয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন এক আসন।

১৯৬৪ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে যে তরুণটি চলচ্চিত্রে জায়গা খুঁজছিলেন, মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনিই হয়ে উঠলেন ‘বেহুলা’র নায়ক। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ, নতুন চলচ্চিত্রের ভাষা, বাণিজ্যিক সিনেমার উত্থান—সবকিছুর মধ্য দিয়েই রাজ্জাকের ক্যারিয়ার এগিয়েছে। প্রায় ছয় দশকের কর্মজীবনে তিনি চার শতাধিক বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং ষাট, সত্তর ও আশির দশকের শুরুতেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শীর্ষ অভিনেতাদের একজন ছিলেন।
রাজ্জাক ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল। তখন এই শহরের চলচ্চিত্রশিল্প আজকের মতো প্রতিষ্ঠিত কোনো বড় বিনোদনব্যবস্থা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণের অবকাঠামো তখন গড়ে উঠছিল মাত্র। ১৯৫৬ সালে মুখ ও মুখোশ মুক্তির পর ঢাকার চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হলেও নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিত্তি শক্ত হয় ১৯৫৭ সালে ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর। স্বাধীনতার পর, এফডিসির সুযোগ-সুবিধা চালু হলে ১৯৫৯ সাল থেকে নিয়মিত চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। রাজ্জাকের নায়ক হওয়ার ক্যারিয়ার এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প যেন একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে।
কলকাতায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও ঢাকায় এসে তাঁর শুরুটা মোটেও নায়কের মতো হয়নি। কমলাপুরে ভাড়া বাসায় থেকে কাজের খোঁজ করা, ইকবাল ফিল্মসে যোগ দেওয়া, ‘উজালা’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাঁকে এগোতে হয়েছে। ঢাকায় এসে তিনি প্রথমে অভিনয়ের সুযোগ না পেয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন।

‘রোমান্টিক’ নায়ক হলেও দূরে ছিলেন না সমাজ ও রাজনীতির গল্প থেকে
১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের বেহুলাতে লখিন্দরের চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক। ছবিটি ছিল বড় সাফল্য। এর পরই তিনি ঢাকার চলচ্চিত্রে নতুন তারকা হিসেবে উঠে আসেন। এরপরেই রাজ্জাক তখনকার প্রতিষ্ঠিত নায়কদের পাশে নতুন মুখ হিসেবে জায়গা করে নেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত নির্মিত বহু ছবিতে অভিনয় করেন।
ষাটের দশকের চলচ্চিত্রে একদিকে ছিল লোককাহিনি ও রোমান্টিক গল্প, অন্যদিকে সমাজ ও রাজনীতির অস্থিরতা। সেসময় ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ও ‘জীবন থেকে নেয়া’র মতো চলচ্চিত্র সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে চলচ্চিত্রকে যুক্ত করেছিল। রাজ্জাকের ক্যারিয়ারও এই পরিবর্তনের ভেতরে দিয়ে গেছে।
রূপালি পর্দায় তাঁর পরিচয় শুধু ‘রোমান্টিক হিরো’র ছাঁচেই আটকে থাকেনি। ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘এতটুকু আশা’ কিংবা ‘ময়নামতি’র পাশাপাশি তিনি অভিনয় করেছেন জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’র মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে। এই সিনেমায় তাঁর উপস্থিতিই বুঝিয়ে দেয়, মূলধারার একজন তুমুল জনপ্রিয় নায়ক হয়েও তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতির সাহসী গল্পগুলো থেকে তিনি কখনোই দূরে ছিলেন না।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্জাকের অভিনয়জীবনও এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। স্বাধীনতার পর স্বাভাবিকভাবেই দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পরিচয়ে বদল আসে। ‘ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন’ নাম বদলে যায় ‘বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএফডিসি)’। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে নির্মিত হতে থাকে নতুন ধারার চলচ্চিত্র। তেমনই একটি চলচ্চিত্র ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া স্বাধীন দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’। পরিবর্তিত এই নতুন প্রেক্ষাপটেও রাজ্জাক নিজের শীর্ষস্থান ধরে রাখেন সগৌরবে।
স্বাধীনতার পর তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘মানুষের মন’ দারুণ ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। এরপর ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় জহিরুল হক পরিচালিত ‘রংবাজ’। এই ছবির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অ্যাকশন সিনেমার এক নতুন ধারার সূচনা হয়, আর রাজ্জাকও নিজেকে একেবারে ভিন্ন রূপে দর্শকের সামনে তুলে ধরেন। ষাটের দশকে প্রেম ও সামাজিক গল্পের সিনেমায় অভিনয় করে যিনি রোমান্টিক আইকন হয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তিনিই হয়ে ওঠেন অ্যাকশনধর্মী বাণিজ্যিক সিনেমার অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক। মূলত দেশ, সময়, দর্শকের চাহিদা আর সিনেমার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে নিরন্তর ভেঙেছেন এবং নতুন করে গড়েছেন।
১৯৭৩ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পত্রিকা ‘চিত্রালী’র সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী রাজ্জাককে ‘নায়করাজ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কালক্রমে এই উপাধি তাঁর তারকা-পরিচয়ের সঙ্গে চিরস্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়। তবে ‘নায়করাজ’ খেতাব পাওয়ার পরও রাজ্জাক নিজেকে গৎবাঁধা নায়কের ছাঁচে বন্দি রাখেননি।
১৯৭৬ সালে তিনি নাম লেখান চলচ্চিত্র প্রযোজনায়। পরের বছর ১৯৭৭ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবেও তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এখানেই শেষ নয়, তখনকার শীর্ষ তারকা হয়েও ১৯৭৮ সালে ‘অশিক্ষিত’ সিনেমায় তিনি একজন সাধারণ পাহারাদারের চরিত্রে অভিনয় করেন। পরবর্তী সময়ে কালজয়ী সিনেমা ‘ছুটির ঘণ্টা’তেও তাঁকে স্কুলের দপ্তরির চরিত্রে দেখা যায়।
সময়ের সঙ্গে রাজ্জাকের এই বোঝাপড়া ও বিবর্তনের লড়াইটি সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু নায়ক হিসেবে টিকে থাকা আর একই খোলসে আটকে থাকা কখনোই এক বিষয় নয়।
সত্তরের দশকের শেষ ভাগ এবং আশির দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ঢাকার চলচ্চিত্রশিল্পে বছরে গড়ে ২৮টি ছবি তৈরি হতো। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালে সেই গড় বেড়ে দাঁড়ায় ৪২টিতে। আর ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে তা আরও বেড়ে বছরে গড়ে ৬৭টিতে গিয়ে পৌঁছায়।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, রাজ্জাক যখন তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, তখন এই শিল্পে নিজের জায়গা করে নেওয়া যতটা কঠিন ছিল, কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই শিল্পই একটি বিশাল বাজারে পরিণত হয়। তবে বাজার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে তীব্র প্রতিযোগিতাও। আশির দশকে দেশের বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোতে ভারতীয়, বিশেষ করে হিন্দি সিনেমার নির্মাণশৈলী ও উপস্থাপনার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। ঠিক একই সময়ে বাস্তবধর্মী ও বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রও বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইন্ডাস্ট্রির এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট ও নতুন প্রজন্মের নায়কদের আগমনের পরও রাজ্জাক থেমে থাকেননি। নায়করাজের মতোই সমান দাপটের সঙ্গে নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন।
ষাট-সত্তর-আশি—এই দীর্ঘ তিন দশকের পরিক্রমায় তাঁর পাশে সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন কবরী, শাবানা, সুচন্দা, ববিতার মতো নায়িকারা এবং ফারুক, জাফর ইকবাল, আলমগীরের মতো একাধিক প্রজন্মের তারকারা। তবে চলচ্চিত্রে নতুনদের যত ভিড়ই বাড়ুক না কেন, কেউই তাঁর নিজস্ব শক্ত অবস্থানটি কখনো টলাতে পারেনি।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে রাজ্জাকের ‘নায়ক’ হিসেবে জনপ্রিয়তার গ্রাফ কিছুটা নিম্নমুখী হতে শুরু করে। সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ তারকাই ক্যারিয়ারের ইতি টানেন বা হারিয়ে যান। কিন্তু রাজ্জাক ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রথাগত ‘নায়ক’ পরিচয়ের গণ্ডি থেকে বের করে আনেন এবং একজন পুরোদস্তুর অভিনেতা, সফল পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেন।
নায়ক হিসেবে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পাওয়া এক বিষয়, আর সেই ‘নায়কত্ব’ ফুরিয়ে যাওয়ার পরও দর্শকের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যাপার। রাজ্জাকের জীবনী থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটিই ছিল কেন্দ্রীয় নায়ক হিসেবে তাঁর শেষ চলচ্চিত্র। এরপর তিনি অভিনয়, পরিচালনা ও প্রযোজনা চালিয়ে গেছেন।

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ‘বাবা কেন চাকর’ সিনেমাটির মধ্য দিয়ে তিনি আবারও তুমুল আলোচনায় আসেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া দর্শকপ্রিয় এই চলচ্চিত্রে তিনি একাধারে লেখক, প্রযোজক, পরিচালক এবং প্রধান অভিনেতা ছিলেন।
সাধারণত একজন তারকার জনপ্রিয়তা মাপা হয় অন্য কোনো তারকার সঙ্গে তাঁর তুলনামূলক বিচারের মাধ্যমে। কে দেখতে বেশি স্মার্ট, কে বেশি জনপ্রিয়, কিংবা বক্স অফিসে কার সিনেমা বেশি ব্যবসাসফল—এসব প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু রাজ্জাকের ক্ষেত্রে এই সমীকরণ একেবারেই অসম্পূর্ণ।
ষাটের দশকে যখন তিনি চলচ্চিত্রে পা রাখেন, তখনকার দর্শক নিজেদের দেশের নায়ক বা নিজস্ব সিনেমা—কোনোটিতেই খুব একটা অভ্যস্ত ছিলেন না। স্বাধীনতার পর সেই দর্শকের রুচিতে পরিবর্তন আসে। সত্তরের দশকে বদলে যায় সিনেমার পুরো বাজার। আশির দশকে ইন্ডাস্ট্রিতে আগমন ঘটে নতুন নায়কদের, তৈরি হয় চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা। আর নব্বইয়ের দশকে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের প্রভাবে দেশের চলচ্চিত্রশিল্প যখন এক অভাবনীয় প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে, তখনও রাজ্জাক দাপটের সঙ্গে টিকে ছিলেন।
সময়ের প্রয়োজনে তিনি নিজেকে বারবার ভেঙেছেন ও গড়েছেন, কিন্তু কখনো হারিয়ে যাননি। সময়কে জয় করে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন নতুন রূপে। ১৯৬৪ সালে রূপালি পর্দায় পা রাখা সেই তরুণ রাজ্জাক আর জীবনের শেষভাগের রাজ্জাক কখনোই এক মানুষ ছিলেন না। ঢাকা বদলেছে, সিনেমার ব্যাকরণ বদলেছে, দর্শকের রুচি পাল্টেছে, এমনকি বদলে গেছে ‘নায়ক’ হওয়ার সংজ্ঞাও। সময় যতবার তাঁকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে, রাজ্জাক ততবারই পরম দক্ষতায় নিজের জন্য তৈরি করে নিয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন এক আসন।
.png)

‘আশা ছিল ভালোবাসা ছিল’, ‘সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা’, ‘মেরে সপ্নো কি রানি’, ‘রূপ তেরা মস্তানা’ কিংবা ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের কণ্ঠশিল্পী বলিউডের কিংবদন্তি কিশোর কুমার। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তাঁর গান আজও মানুষের মনে একই রকম জনপ্রিয়। রোমান্টিক গানে যেমন শ্রোত
০৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে ‘মুখ ও মুখোশ’। এই সিনেমার হাত ধরেই এ দেশে নিজেদের সিনেমা তৈরির স্বপ্ন সত্যি হয়। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রথম সবাক পূর্ণাঙ্গ বাংলা সিনেমা। এই ছবির পেছনের কারিগর ছিলেন আবদুল জব্বার খান। তিনি অনেক
০৩ আগস্ট ২০২৬
সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘মুসাফির ক্যাফে’ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচিত ওয়েব সিরিজ। কেউ স্ক্রিনের সামনে জুতা তুলে ধরছেন, কেউ বলছেন অসমাপ্ত ভালোবাসার নির্মল উপাখ্যান। চলুন জেনে নেওয়া যাক, মুসাফির ক্যাফেতে আসলে কী আছে? আর যদি স্পয়লার এড়িয়ে চলতে চান, তাহলে এখানেই থেমে যাওয়া ভালো।
০১ আগস্ট ২০২৬
ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান অনেক সময়ই ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আসে না; আসে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও অভিজ্ঞতার গল্প থেকে। চব্বিশের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সেই জনতার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘জুলাই ডায়েরিজ’।