জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস

ডিস্টোপিয়ান সিনেমার দুঃস্বপ্ন এখন আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা

স্ট্রিম গ্রাফিক

একটা সময় ছিল আমরা পপকর্ন হাতে ডিস্টোপিয়ান সিনেমা দেখে ভাবতাম, ‘যাক বাবা, এটা তো শুধুই সিনেমা!’ সেই ফ্যান্টাসি বা সায়েন্স ফিকশনের দুনিয়া আমাদের রোমাঞ্চিত করত, কিন্তু ভয় দেখাত না। কারণ আমরা জানতাম, পর্দা সরলেই আমরা ফিরে আসব আমাদের নিরাপদ, স্বাভাবিক পৃথিবীতে। কিন্তু আজ, একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে চারপাশের পৃথিবীর দিকে তাকালে সেই স্বস্তি আর পাওয়া যায় না। মনে হয়, আমরা অজান্তেই সেই পর্দার ওপাশের জগতটাতে ঢুকে পড়েছি। জর্জ অরওয়েল বা ফিলিপ কে ডিকের কল্পনাগুলো এখন আর নিছক সাহিত্য বা চিত্রনাট্য নয়, বরং আমাদের সকালবেলার খবরের কাগজের শিরোনাম।

ডিস্টোপিয়া বা দুঃস্বপ্নের জগত হলো এমন এক কাল্পনিক সমাজব্যবস্থা, যেখানে মানুষের জীবন দুর্বিষহ, পরিবেশ ধ্বংসের মুখে, প্রযুক্তি মানুষের প্রভু ও স্বাধীনতা এক লুপ্তপ্রায় শব্দ। হলিউড বা বিশ্ব চলচ্চিত্রের পরিচালকরা দশকের পর দশক ধরে আমাদের সতর্ক করে এসেছেন এই ডিস্টোপিয়ান সমাজের। আজকের পৃথিবী ও ডিস্টোপিয়ান সিনেমার মধ্যে মিলগুলো এতই প্রকট যে, মনে হয় সিনেমাগুলো কোনো ফিকশন ছিল না, ছিল ভবিষ্যতের প্রামাণ্যচিত্র।

সর্বব্যাপী নজরদারি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মৃত্যু

ডিস্টোপিয়ান সিনেমার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ‘বিগ ব্রাদার’ বা সর্বব্যাপী নজরদারি। স্টিভেন স্পিলবার্গের কালজয়ী সিনেমা ‘মাইনরিটি রিপোর্ট’-এ (২০০২) আমরা দেখি, এমন এক জগত যেখানে অপরাধ ঘটার আগেই প্রি-কগনিটিভ ক্ষমতার মাধ্যমে পুলিশ অপরাধীকে ধরে ফেলে। শহরের প্রতি কোণায় স্ক্যানার বসানো, যা মানুষের চোখের রেটিনা স্ক্যান করে তাকে শনাক্ত করছে ও তার পছন্দ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে। কিংবা ১৯৯৮ সালের পিটার উইয়ারের ‘দ্য ট্রুম্যান শো’-এর কথা ভাবুন, যেখানে একজন মানুষের পুরো জীবনটাই একটি রিয়েলিটি শো, যা সারা বিশ্ব দেখছে। তার কোনো গোপনীয়তা নেই, তার প্রতিটি পদক্ষেপ ক্যামেরাবন্দি।

আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে এই সিনেমাগুলোর দৃশ্যপট কি খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়? সম্ভবত না। আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে আমাদের পকেটের স্মার্টফোনটি চব্বিশ ঘণ্টা আমাদের ওপর নজর রাখছে। আমরা কোথায় যাচ্ছি, কী খাচ্ছি, কার সাথে কথা বলছি—সব তথ্য গুগল, ফেসবুক বা অ্যাপল-এর সার্ভারে জমা হচ্ছে। চীনের মতো দেশে ‘সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম’ চালু হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা ফেশিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের প্রতিটি কাজ পর্যবেক্ষণ করছে। রাস্তাঘাটে ট্রাফিক আইন ভাঙা থেকে শুরু করে ইন্টারনেটে কী মন্তব্য করছেন—সব কিছুর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হচ্ছে নাগরিক সুবিধা।

সর্বব্যাপী নজরদারি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মৃত্যু
সর্বব্যাপী নজরদারি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মৃত্যু

‘মাইনরিটি রিপোর্ট’-এর সেই ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের দৃশ্য আজ বাস্তব। আপনি হয়তো বন্ধুর সাথে জুতো কেনার কথা আলোচনা করলেন, আর কিছুক্ষণ পরেই আপনার ফেসবুকে জুতোর বিজ্ঞাপন চলে এল। রাষ্ট্র ও কর্পোরেট সংস্থাগুলোর কাছে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বলে আর কিছু নেই। এডওয়ার্ড স্নোডেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএ-এর নজরদারির কথা ফাঁস করেছিলেন, তখন তা ‘এনিমি অফ দ্য স্টেট’ (১৯৯৮) সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানিয়েছিল। আমরা স্বেচ্ছায় আমাদের বায়োমেট্রিক ডেটা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ফেস আইডেন্টিটি তুলে দিচ্ছি প্রযুক্তির হাতে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আজ এক বিলাসিতা।

জলবায়ু বিপর্যয় এবং বাসযোগ্য পৃথিবীর বিনাশ

পরিবেশ ধ্বংস ও পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়া ডিস্টোপিয়ান সিনেমার জনপ্রিয় থিম। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ (২০১৪) সিনেমায় দেখা যায়, পৃথিবী শস্যহীন হয়ে পড়ছে, ধূলিঝড় বা ডাস্ট বোল মানবসভ্যতাকে গ্রাস করছে। বাঁচার একমাত্র উপায় পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহে পাড়ি জমানো। আবার জর্জ মিলারের ‘ম্যাড ম্যাক্স: ফিউরি রোড’ (২০১৫) আমাদের নিয়ে যায় এমন এক রুক্ষ ভবিষ্যতে, যেখানে পানি ও জ্বালানি তেলের জন্য মানুষ একে অপরকে হত্যা করছে। পৃথিবী এক বিশাল মরুভূমি, যেখানে সবুজ কেবলই স্মৃতি। ১৯৭৩ সালের ক্লাসিক সিনেমা ‘সয়লেন্ট গ্রিন’-এ দেখানো হয়েছিল অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও গ্রিনহাউস এফেক্টের কারণে পৃথিবী এক উত্তপ্ত চুল্লিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য খাবার জোটানো অসম্ভব।

আজকের বাস্তবতা কি এর চেয়ে খুব ভিন্ন? জাতিসংঘের জলবায়ু রিপোর্টগুলো বলছে, আমরা খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি। দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার বনভূমি, আমাজন ও ক্যালিফোর্নিয়া। ‘ম্যাড ম্যাক্স’-এর পানির জন্য হাহাকার আজ দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন কিংবা ভারতের চেন্নাইয়ের বাস্তব চিত্র। সুপেয় পানির সংকট নিয়ে আগামী দিনে যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

‘ইন্টারস্টেলার’-এর মতো ধূলিঝড় হয়তো এখনো সব জায়গায় শুরু হয়নি, কিন্তু বায়ুদূষণে দিল্লি বা বেইজিংয়ের আকাশ যখন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, তখন তা সিনেমার চেয়ে কম ভয়ের মনে হয় না। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন মানুষের রক্তে ও প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম স্থানেও পাওয়া যাচ্ছে। আমরা পৃথিবীকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছি যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ হওয়ার পথে। সিনেমার নায়করা হয়তো শেষ মুহূর্তে পৃথিবীকে বাঁচায় বা নতুন গ্রহ খুঁজে পায়, কিন্তু বাস্তবে আমাদের জন্য কোনো ‘প্ল্যান বি’ বা দ্বিতীয় পৃথিবী নেই।

প্রযুক্তি যখন প্রভু: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত উত্থান

প্রযুক্তি মানুষের দাস থাকবে, নাকি মানুষ প্রযুক্তির দাসে পরিণত হবে—এই প্রশ্ন ডিস্টোপিয়ান সিনেমার কেন্দ্রে বহুবার এসেছে। জেমস ক্যামেরনের ‘দ্য টার্মিনেটর’ (১৯৮৪) ফ্রাঞ্চাইজিতে স্কাইনেট নামক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যখন নিজের চেতনা লাভ করে, তখন সে মানবজাতিকে তার শত্রু মনে করে ধ্বংস করতে চায়। আবার রিডলি স্কটের ‘ব্লেড রানার’ (১৯৮২) এবং এর সিক্যুয়েল ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’ (২০১৭)-এ আমরা দেখি বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার্ড মানুষ বা রেপ্লিক্যান্টদের, যারা মানুষের মতোই দেখতে ও আচরণ করতে সক্ষম, কিন্তু তাদের কোনো মানবাধিকার নেই।

অ্যালেক্স গারল্যান্ডের ‘এক্স মাকিনা’ (২০১৪) দেখায় এআই কীভাবে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলতে পারে ও তাকে ধোঁকা দিতে পারে।

জলবায়ু বিপর্যয় এবং বাসযোগ্য পৃথিবীর বিনাশের সিনেমার কোলাজ।
জলবায়ু বিপর্যয় এবং বাসযোগ্য পৃথিবীর বিনাশের সিনেমার কোলাজ।

আজকের দিনে চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি বা ডিপফেক প্রযুক্তির উত্থান আমাদের সেই ডিস্টোপিয়ান ভয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এআই এখন ছবি আঁকছে, কবিতা লিখছে, কোডিং করছে—এমনকি মানুষের গলার স্বর নকল করে প্রতারণাও করছে। হলিউডের চিত্রনাট্যকাররা ধর্মঘটে গিয়েছিলেন এই ভয়ে যে, এআই তাদের চাকরি খেয়ে ফেলবে। অটোমেশনের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে।

‘টার্মিনেটর’-এর মতো রোবট হয়তো এখনই রাস্তায় বন্দুক নিয়ে নামেনি, কিন্তু আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। এআই এখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে ঋণ পাবে, কে চাকরি পাবে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কে বিচার পাবে। অ্যালগরিদমের এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ আমাদের জীবনকে পরিচালিত করছে। 'ব্লেড রানার'-এর মতো মানুষ ও যন্ত্রের বিভেদরেখা ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে। ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তিবিদরা ব্রেন-চিপ বা নিউরালিঙ্ক নিয়ে কাজ করছেন, যা মানুষকে সরাসরি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করবে। প্রযুক্তি এখন আর আমাদের হাতে থাকা যন্ত্র নয়, তা আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে উঠছে।

চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য: প্রাচুর্যের দ্বীপ বনাম টিকে থাকার লড়াই

ডিস্টোপিয়ান সমাজব্যবস্থায় প্রায়ই দেখা যায়, সমাজ দুটি ভাগে বিভক্ত—একদল অতি ধনী যারা স্বর্গে বাস করে, আর বাকিরা নরকে। নিল ব্লমক্যাম্পের 'ইলাইসিয়াম' (২০১৩) সিনেমায় পৃথিবী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে গরিবরা রোগ-শোকে ধুঁকছে। অন্যদিকে ধনীরা পৃথিবীর কক্ষপথে ‘ইলাইসিয়াম’ নামক কৃত্রিম উপগ্রহে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, যেখানে সব রোগের চিকিৎসা আছে।

কোরিয়ান সিনেমা ‘প্যারাসাইট’ (২০১৯) বা ‘স্নোপিয়ার্সার’ (২০১৩)-এর পাশাপাশি নেটফ্লিক্সের স্প্যানিশ ছবি ‘দ্য প্ল্যাটফর্ম’ (২০১৯)-এ এই শ্রেণীভেদকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দ্য প্ল্যাটফর্ম সিনেমায় এক উল্লম্ব কারাগারে ওপর থেকে খাবারের টেবিল ধাপে ধাপে নিচে নামে। ওপরতলার কয়েদিরা যখন পেটভরে রাজকীয় খাবার খায়, নিচের তলার মানুষেরা পায় কেবল উচ্ছিষ্ট অথবা অভুক্ত থাকে। এটি আমাদের সমাজের ‘ট্রিকল-ডাউন’ অর্থনীতির এক নিষ্ঠুর রূপক, যেখানে ওপরের স্তরের সীমাহীন লোভ নিচের স্তরের মানুষদের ঠেলে দেয় জঘন্যতম হিংস্রতা ও অস্তিত্ব সংকটের দিকে।

আমাদের বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকালে ‘ইলাইসিয়াম’-এর ছায়া দেখা যায়। অক্সফামের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে বাকি ৯৯ শতাংশের চেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে। জেফ বেজোস বা ইলন মাস্ক যখন বিলিয়ন ডলার খরচ করে মহাকাশে প্রমোদভ্রমণে যান, তখন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ দুবেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করছে। উন্নত দেশগুলোতেও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, স্বাস্থ্যসেবা হয়ে উঠছে সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

‘দ্য হাঙ্গার গেমস’ সিনেমায় যেমন ক্যাপিটলের মানুষেরা বিলাসিতায় মগ্ন আর ডিস্ট্রিক্টের মানুষরা ক্ষুধার্ত, আজকের পৃথিবীও গ্লোবাল নর্থ এবং গ্লোবাল সাউথ-এ বিভক্ত। কর্পোরেট লোভ ও পুঁজিবাদের চরম রূপ পৃথিবীকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে টাকা থাকলেই কেবল বাঁচার অধিকার পাওয়া যায়। জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বাড়িয়ে দেওয়া, পানির উৎস দখল করা—এসবই আজকের দিনের বাস্তবতা। সিনেমাগুলোতে যে বিভাজন দেয়াল বা কাঁটাতার দিয়ে দেখানো হয়, বাস্তবে তা অদৃশ্য অর্থনৈতিক দেয়াল হয়ে আমাদের ঘিরে রেখেছে।

কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং বাকস্বাধীনতার রুদ্ধদ্বার

রাজনীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার ডিস্টোপিয়ান সিনেমার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেমস ম্যাকটিগের ‘ভি ফর ভেনডেটা’ (২০০৫) সিনেমায় আমরা দেখি এক ফ্যাসিস্ট ব্রিটেন, যেখানে সরকার মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করেছে, কারফিউ জারি করেছে ও মিডিয়াকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। ভিন্নমত পোষণ করলেই গুম বা হত্যা করা হচ্ছে। কিংবা কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা ‘নাইনটিন এইটি ফোর’ (১৯৮৪)-এর কথা ভাবুন, যেখানে ‘থট পুলিশ’ বা চিন্তা-পুলিশ মানুষের চিন্তাকেও নিয়ন্ত্রণ করে ও ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে বিকৃত করে।

সমাজব্যবস্থা, ক্ষমতা ও বৈষম্যের ডিস্টোপিয়ান সিনেমার কোলাজ।
সমাজব্যবস্থা, ক্ষমতা ও বৈষম্যের ডিস্টোপিয়ান সিনেমার কোলাজ।

আজকের বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে এই সিনেমাগুলোর দৃশ্যপট জীবন্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা জেঁকে বসছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদের দমন করা, সাংবাদিকদের জেলে ভরা ও ইন্টারনেট শাটডাউন করা এখন নিয়মিত ঘটনা। ‘ভি ফর ভেনডেটা’-এর মতো অনেক দেশেই সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে এবং সত্যকে ধামাচাপা দিচ্ছে।

‘ফ্যারেনহাইট ৪৫১’ (১৯৬৬) সিনেমায় বই পুড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে জ্ঞান ও ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। আজকেও আমরা দেখি পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করে, ইতিহাস বিকৃত করে নতুন প্রজন্মের মগজধোলাই করার চেষ্টা। ফেক নিউজ এবং মিসইনফরমেশনের যুগে সত্যকে খুঁজে পাওয়া দায়। রাষ্ট্র এখন কেবল আমাদের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে না, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম ও নজরদারির মাধ্যমে আমাদের চিন্তাকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ভিন্নমত এখন আর ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ নয়, বরং ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে অনেক দেশেই।

মহামারি এবং মানব অস্তিত্বের জৈবিক সংকট

২০২০ সালের আগে স্টিভেন সোডারবার্গের ‘কন্টাজিয়ন’ (২০১১) সিনেমাটি দেখলে হয়তো মনে হতো শুধুই থ্রিলার। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির পর এই সিনেমা দেখলে গা শিউরে ওঠে। এক অজানা ভাইরাস, মাস্ক পরা মানুষ, লকডাউন, ভ্যাকসিনের জন্য হাহাকার, সামাজিক অস্থিরতা—সবই যেন আমাদের গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার হুবহু প্রতিফলন।

আলফনসো কুয়ারনের ‘চিলড্রেন অফ মেন’ (২০০৬) সিনেমায় দেখানো হয়েছে এমন এক ভবিষ্যৎ, যেখানে দূষণ ও অন্যান্য কারণে নারীরা প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে ও গত ১৮ বছরে কোনো শিশু জন্মায়নি। মানবজাতি বিলুপ্তির পথে।

কোভিড-১৯ আমাদের দেখিয়েছে, যতই আমরা প্রযুক্তিতে উন্নত হই না কেন, প্রকৃতির সামান্য অণুজীবের কাছে আমরা কতটা অসহায়। ‘কন্টাজিয়ন’-এর মতো বাস্তবেও আমরা দেখেছি মহামারির সময় স্বার্থপরতা, ভুল তথ্য ও অরাজকতা।

অন্যদিকে, ‘চিলড্রেন অফ মেন’-এর মতো পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি না এলেও, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। মানুষের স্পার্ম কাউন্ট কমে যাওয়া, হরমোনাল সমস্যা ও পরিবেশগত বিষক্রিয়া আমাদের জৈবিক অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। বায়ো-ওয়েপন বা জীবাণু অস্ত্রের ভীতিও এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। ল্যাবরেটরিতে তৈরি ভাইরাস যে কোনো সময় মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে—এই আশঙ্কা এখন বিজ্ঞানীদেরও।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ভার্চুয়াল বাস্তবতায় পলায়ন

ডিস্টোপিয়া মানেই সবসময় যুদ্ধ বা ধ্বংসলীলা নয়; কখনো কখনো তা আসে নীরব বিচ্ছিন্নতার মোড়কে। স্পাইক জোনসের ‘হার’ (২০১৩) সিনেমায় দেখা যায়, মানুষ এতটাই নিঃসঙ্গ যে তারা রক্তমাংসের মানুষের বদলে অপারেটিং সিস্টেম বা এআই-এর প্রেমে পড়ছে। তারা একে অপরের সাথে কথা বলার চেয়ে কানে ইয়ারপিস লাগিয়ে যন্ত্রের সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘রেডি প্লেয়ার ওয়ান’ (২০১৮) সিনেমায় মানুষ তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাস্তব জীবন থেকে পালাতে ‘ওয়েসিস’ নামক এক ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেমের মধ্যে বেঁচে থাকে।

আজকের সমাজের দিকে তাকালে আমরা ঠিক এই চিত্রই দেখি। রেস্তোরাঁয় বসে একদল বন্ধু আড্ডা না দিয়ে নিজ নিজ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে—এটা এখন খুব সাধারণ দৃশ্য। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ‘কানেক্টেড’ করার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা আমাদের আরও একা করে দিয়েছে। ‘হার’ সিনেমার থিওডরের মতো আজ অনেকেই চ্যাটবট বা ভার্চুয়াল সঙ্গীর মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজছে। জাপানে ‘হিকিকোমোরি’ বা সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মেটাভার্স বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রতি মানুষের আসক্তি বাড়ছে কারণ বাস্তব পৃথিবীটা ক্রমশ কঠিন ও আনন্দহীন হয়ে পড়ছে। আমরা বাস্তবের সমস্যা সমাধান না করে ভার্চুয়াল দুনিয়ার রঙিন চশমা পরে থাকতে পছন্দ করছি। এও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ডিস্টোপিয়া, যেখানে শরীর বাস্তবে থাকলেও মন থাকে ডিজিটাল কারাগারে।

ডিস্টোপিয়ান সিনেমাগুলো কেবল বিনোদনের জন্য তৈরি হয়নি; এগুলো একধরণের সতর্কবার্তা বা ‘কশনারি টেল’। পরিচালকরা আমাদের দেখাতে চেয়েছিলেন, আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে আমাদের গন্তব্য কোথায়। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা সেই সতর্কবার্তাগুলোকে কেবল পপকর্ন খাওয়ার অনুষঙ্গ হিসেবেই দেখেছি।

নজরদারি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ, প্রযুক্তির আগ্রাসন—এসব আজ আর পর্দার গল্প নয়। এগুলো আমাদের দৈনন্দিন সংগ্রামের অংশ। ‘ব্লেড রানার’-এর অন্ধকার শহর কিংবা ‘ম্যাড ম্যাক্স’-এর রুক্ষ প্রান্তর হয়তো হুবহু আমাদের চোখের সামনে নেই, কিন্তু সেই আবহ, সেই হতাশা ও সংকটআমাদের ঘিরে ধরেছে। ডিস্টোপিয়ান ভবিষ্যৎ এখন আর আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে না, সে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই ডিস্টোপিয়াকে মেনে নিয়ে ‘ইলাইসিয়াম’-এর নিচে পড়ে থাকা মানুষের মতো ধুঁকে ধুঁকে মরব, নাকি সিনেমার নায়কদের মতো ঘুরে দাঁড়াব? সিনেমার পর্দা হয়তো অন্ধকার হয়ে যায়, কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবনের শো এখনো চলছে। এবং এর ক্লাইম্যাক্স বা শেষটা কেমন হবে, তা লেখার দায়িত্ব এখনো আমাদের হাতেই।

সম্পর্কিত