শিশুর ঘুম নিয়ে প্রচলিত ৫টি ভুল ধারণা, কী বলছেন গবেষকেরা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৯: ১৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

ঘরে থাকা ছোট্ট শিশুর ঘুম নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন অনেক মা-বাবা। কারও অভিযোগ, আমার শিশু কম ঘুমায়, কেউ বলেন আমার শিশু শুধু দিনে ঘুমায়, রাতে জেগে থাকে ইত্যাদি।

আমাদের সমাজে শিশুর ঘুম নিয়ে প্রচলিত অনেক কথা আছে। যেমন, শিশু রাতে ১২ ঘণ্টা ঘুমাবে। কেউ বলেন, দিনে বেশি ঘুমালে রাতে ঘুম হবে না। আবার কেউ বলেন, দিনে বেশি ঘুমালে রাতেও ঘুমের অভ্যাস গড়ে উঠবে। এমন অনেক কথায় কান দিয়ে বাবা-মায়েরা সন্তানের ঘুম নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান।

শিশুদের ঘুম নিয়ে করা গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে।

শিশু সারারাত একটানা ঘুমাবে

প্রথম ভুল ধারণাটি হলো শিশু সারারাত একটানা ঘুমাবে। সব বাবা-মা এটাই চান। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, ভিন্ন চিত্র। নরওয়েতে ৫৫ হাজার শিশুর ওপর একটি বড় গবেষণা হয়। সেখানে দেখা যায়, ছয় মাস বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে সাতজনই রাতে অন্তত একবার জাগে। ১৮ মাস বয়সীদের মধ্যেও চারজনের একজন রাতে জাগে।

ফিনল্যান্ডে ২০২০ সালে আরেকটি গবেষণা হয়। সেখানে দেখা যায়, তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা রাতে গড়ে দুইবারের বেশি জাগে। বিজ্ঞানীরা জানান, রাতে দুই-একবার জাগা শিশুদের জন্য খুব স্বাভাবিক। সব শিশু একটানা ঘুমায় না। কেউ কেউ রাতে আরও বেশিবার জাগে। ভিডিও ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিশুরা বাবা-মায়ের ধারণার চেয়েও বেশিবার জাগে। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলে এই সমস্যা এমনিতেই অনেক কমে যায়।

রাত জাগা মানেই বদভ্যাস

শিশুদের ঘুম নিয়ে প্রচলিত দ্বিতীয় ভুল ধারণাটি হলো, অভ্যাস না করলে শিশুরা রাতে জাগতেই থাকবে। অনেকেই ভাবেন, রাতে জেগে থাকা মানেই হলো শিশুর বদভ্যাস। কিন্তু অনেক সময় শারীরিক নানা সমস্যার কারণেও শিশু রাতে বারবার জেগে উঠতে পারে।

যেমন, শরীরে আয়রনের অভাব থাকলে শিশুর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ শতাংশ শিশুর এই সমস্যা রয়েছে। আয়রনের অভাবে শিশু অস্থির বোধ করে বলে ঘুমাতে পারে না। এছাড়াও খাবারে অ্যালার্জি, হজমের সমস্যা বা কানের ব্যথার কারণে শিশু রাতে জেগে কাঁদতে পারে।

কিছু শিশুর আবার স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকে। তাই শিশু যদি রাতে অস্বাভাবিকভাবে বারবার জাগে, তবে তাকে জোর করে ঘুম পারানোর চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

রাতে ১২ ঘণ্টা ঘুমাতেই হবে

শিশুর ঘুম নিয়ে আরেকটি ভুল ধারণা হলো, শিশুকে রাতে অবশ্যই ১২ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। ইন্টারনেটে খুঁজলে পশ্চিমা দেশগুলোর একটি জনপ্রিয় নিয়ম দেখা যায়। সেটি হলো সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত একটানা ঘুমানো। অনেকেই মনে করেন, এর চেয়ে কম ঘুমালে শিশুর শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, সবার ঘুমের চাহিদা এক নয়। যেসব শিশুর শরীরে ঘুমের চাহিদা তুলনামূলক অন্য শিশুদের থেকে কম, তাদের জোর করে আগে শুইয়ে দিলে তারা বিরক্ত হয়। এই শিশুরা রাতে বারবার জেগে যায় অথবা সকালে খুব ভোরে উঠে পড়ে।

অস্ট্রেলিয়ায় পাঁচ হাজার শিশুর ওপর একটি গবেষণায় দেখা যায়, শিশুরা রাতে ১২ ঘণ্টার বদলে গড়ে ১১ ঘণ্টা ঘুমায়। এশিয়া মহাদেশের শিশুরা পশ্চিমা শিশুদের চেয়ে আরও কম ঘুমায়। চিকিৎসকদের মতে, ২৪ ঘণ্টায় একটি শিশুর মোট কত ঘণ্টা ঘুম হলো, সেটাই আসল বিষয়। টানা ১২ ঘণ্টা শুধু রাতেই ঘুমাতে হবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

দোল খেতে খেতে ঘুমানো ক্ষতিকর

চলন্ত বা দোল খাওয়া অবস্থায় ঘুমানো ক্ষতিকর; শিশুর ঘুম নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার মধ্যে এটিও একটি।

অনেকেই বলেন, গাড়িতে, দোলনায় বা কোলে দুলতে দুলতে ঘুমালে শিশুর ঘুম গভীর হয় না। গবেষকেরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটি কথা। গবেষণায় দেখা গেছে, আলতোভাবে দোল দিলে শিশুরা কান্না থামিয়ে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে।

প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর হওয়া এক গবেষণায় দেখা যায়, আলতো দোল খেলে মানুষের গভীর ঘুমের সময় বাড়ে। এটি মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে। একটু চিন্তা করলেই এর কারণ বোঝা যায়। জন্মের আগে শিশু মায়ের গর্ভে থাকে। তখন শিশু তার সময়ের প্রায় ৯০ শতাংশই ঘুমিয়ে কাটায়। মা যখন হাঁটাচলা করেন, গর্ভের শিশুটি তখন অনবরত দোল খেতে থাকে। তাই দোল খেতে খেতে ঘুমানো শিশুর জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ও আরামদায়ক একটি বিষয়। এতে তাদের মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতি হয় না।

দিনে বেশি ঘুমালে রাতেও ঘুম বাড়ে

সর্বশেষ ভুল ধারণাটি হলো, দিনে বেশি ঘুমালে রাতেও ভালো ঘুম হয়। অনেকে ভাবেন, শিশু দিনে শান্তিতে ঘুমালে রাতেও একটানা ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে উঠবে। কিন্তু বিজ্ঞানের গবেষণায় এর পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

উল্টো দেখা গেছে, দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুরা দিনে বেশি ঘুমালে রাতে তাদের ঘুমাতে দেরি হয়। তারা রাতে বারবার জেগেও যায়। তবে ছোট শিশুদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় একটু ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, ছয় সপ্তাহ বা ১৫ সপ্তাহ বয়সী শিশুরা দিনে বেশি ঘুমালেও তাদের রাতের ঘুমে কোনো প্রভাব পড়ে না। কিন্তু ২৪ সপ্তাহ বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে বেশি ঘুমালে রাতেও তারা সামান্য বেশি ঘুমায়। তবে এই পার্থক্য খুবই কম। রাতে মাত্র ১৪ মিনিট বেশি ঘুমানোর জন্য তাদের দিনে পুরো এক ঘণ্টা বেশি ঘুমাতে হয়।

এ বিষয়ে গবেষকরা বলছেন, মানুষের শরীরে ‘স্লিপ প্রেসার’ বা ঘুমের চাপ বলে একটি বিষয় থাকে। আমরা যত বেশি সময় জেগে থাকি, আমাদের ঘুমের চাপ তত বাড়ে। কোনো শিশু যদি দিনে তার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘুমিয়ে নেয়, তবে রাতে তার ঘুম আসা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

বাবা-মাকে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশু আলাদা এবং তাদের শারীরিক চাহিদাও ভিন্ন। ছোট শিশুদের চাইলেই জোর করে ঘুম পাড়ানো যায় না। তাই অন্যের কথায় কান দিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার শিশু সুস্থ, স্বাভাবিক ও হাসিখুশি আছে কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা।

সম্পর্কিত