ডেঙ্গু: দ্বিতীয়বার সংক্রমণ, প্লাটিলেট ও বিপদসংকেত নিয়ে যা জানা জরুরি
ডা. কাকলী হালদার
-620e44.jpeg)
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় দেশে ডেঙ্গু এখন গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং গুরুতর অবস্থায় কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছেন। তবে ডেঙ্গু মানেই মৃত্যু নয়। অধিকাংশ রোগী যথাযথ পরিচর্যা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো চিকিৎসা পেলে সাধারণত সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
ডেঙ্গু কী এবং কীভাবে ছড়ায়
ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ। এটি ডেঙ্গু ভাইরাস (ডিইএনভি) নামের একটি ভাইরাসের সংক্রমণে হয়। এই ভাইরাস ফ্ল্যাভিভিরিডি পরিবারের ফ্ল্যাভিভাইরাস গণের অন্তর্ভুক্ত। মানুষের শরীরে ভাইরাসটি সাধারণত সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না।
এটি ছড়ানোর জন্য বাহক হিসেবে মূলত এডিস ইজিপ্টাই মশা এবং কিছু ক্ষেত্রে এডিস অ্যালবোপিক্টাস মশা কাজ করে। যখন কোনো স্ত্রী এডিস মশা ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত পান করে, তখন ভাইরাসটি মশার শরীরে প্রবেশ করে। মশার শরীরে ভাইরাসের সংখ্যা বাড়ার পর তা মশার লালাগ্রন্থিতে পৌঁছে যায়। এরপর ওই সংক্রমিত মশা অন্য একজন সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তার লালার সঙ্গে ভাইরাসটি নতুন মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
অর্থাৎ, ডেঙ্গু ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হলো সংক্রমিত এডিস মশার কামড়। এডিস মশা সাধারণত মানুষের বসতবাড়ির আশপাশেই বংশবিস্তার করে এবং দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে। তবে শুধু দিনের বেলায়ই কামড়ায়—এমন ধারণা ঠিক নয়। তাই রাতে মশারি ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর সাধারণত ৪ থেকে ৭ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে; তবে সময়টি কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন প্রায় সারা বছরের রোগ, কিন্ত কেন
আগে ডেঙ্গুকে মূলত বর্ষাকালের রোগ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে বছরের প্রায় সব সময়ই ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন কারণ—অপরিকল্পিত নগরায়ন, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকা, বাসাবাড়িতে পানির পাত্র খোলা রাখা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র ও টায়ার, ছাদ-বারান্দা ও আঙিনায় পানি জমে থাকা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টিপাতের ধরন ও তাপমাত্রার পরিবর্তন, মানুষের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ব্যাপক চলাচল।
এডিস মশার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা খুব অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। কখনো কখনো স্যাঁতসেঁতে জায়গাতেও এরা টিকে থাকতে পারে। তাই বড় কোনো জলাশয় না থাকলেও একটি ছোট ফুলের টব, প্লাস্টিকের কাপ বা পুরোনো টায়ার থেকেও মশার প্রজনন হতে পারে।
ডেঙ্গুর কয়টি ধরন আছে
ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান চারটি সেরোটাইপ রয়েছে: ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ এবং ডিইএনভি-৪। একবার কোনো ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সাধারণত সেই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। কিন্তু অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে একই মাত্রার সুরক্ষা থাকে না। তাই একজন মানুষের জীবনে একাধিকবার ডেঙ্গু হতে পারে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সেরোটাইপের আধিপত্য দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে ডিইএনভি-২ ও ডিইএনভি-৩ উল্লেখযোগ্যভাবে শনাক্ত হয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার—ডিইএনভি-২ বা ডিইএনভি-৩ মানেই মারাত্মক ডেঙ্গু নয়। রোগের তীব্রতা শুধু ভাইরাসের ধরন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। রোগীর বয়স, আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কি না, অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কি না, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ভাইরাসের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য—সব মিলিয়ে রোগ কতটা গুরুতর হবে, তা নির্ধারিত হয়।
দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে কি ঝুঁকি বাড়ে
হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে বাড়তে পারে। বিশেষ করে প্রথমবার এক ধরনের সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্বিতীয়বার অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগপ্রতিরোধী প্রক্রিয়া হলো অ্যান্টিবডি-ডিপেনডেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট (এডিই)।
প্রথম সংক্রমণের পর তৈরি কিছু অ্যান্টিবডি দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপের ভাইরাসকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে না পেরে উল্টো ভাইরাসকে কিছু রোগপ্রতিরোধী কোষে প্রবেশে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে ভাইরাসের সংখ্যা ও শরীরে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বেড়ে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলেই রোগী গুরুতর অবস্থায় যাবেন। আবার প্রথমবার ডেঙ্গু হলেও গুরুতর ডেঙ্গু হতে পারে। তাই শুধু ‘প্রথমবার না দ্বিতীয়বার’—এটি দিয়ে রোগীর অবস্থা বিচার করা যাবে না।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ কী
ডেঙ্গুর লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারও খুব সামান্য উপসর্গ থাকতে পারে, আবার কারও গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা, প্রচণ্ড দুর্বলতা, বমি বমি ভাব বা বমি, ক্ষুধামন্দা এবং শরীরে লালচে দাগ বা র্যাশ। জ্বর সাধারণত কয়েক দিন স্থায়ী হয় এবং প্রায়ই ৩–৭ দিনের মধ্যে কমে আসে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটি মানুষ করে থাকেন। জ্বর কমে যাওয়া মানেই রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন, এমন নয়। ডেঙ্গুর অসুস্থতাকে সাধারণভাবে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়।
১. জ্বরের পর্যায় (ফেব্রাইল ফেজ)
এ সময় রোগীর জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব বা র্যাশ থাকতে পারে। এই সময় পর্যাপ্ত তরল পান করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এই ফেজ ১-৩ দিন স্থায়ীত্ব থাকতে পারে। কখনো কখনো রোগী ৭ দিন পরে ভালো হয়ে যায়।
২. সংকটকাল (ক্রিটিক্যাল ফেজ)
ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় এটি। সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার সময়, অসুস্থতার কয়েক দিন পর, কিছু রোগীর শরীরের ছোট রক্তনালিগুলো থেকে রক্তের তরল অংশ বা প্লাজমা বাইরে বেরিয়ে যেতে শুরু করতে পারে। একে প্লাজমা লিকেজ বলা হয়। এর ফলে বুক বা পেটে তরল জমতে পারে এবং রক্তনালিতে রক্তের কার্যকর পরিমাণ কমে গিয়ে রক্তচাপ কমতে পারে। গুরুতর অবস্থায় শকও হতে পারে। এই পর্যায় সাধারণত ৩-৭ দিন স্থায়ী হতে পারে।
৩. সুস্থ হওয়ার পর্যায় (কনভালেসেন্ট বা রিকভারি ফেজ)
সংকটকাল পার হওয়ার পর ধীরে ধীরে রোগীর অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। রক্তনালির বাইরে চলে যাওয়া তরল আবার রক্তনালিতে ফিরে আসে, প্রস্রাব বাড়তে পারে, ক্ষুধা ফিরে আসে এবং রোগী সুস্থ হতে শুরু করেন।
এই সময়ে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত শিরাপথে তরল দিলে শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে যেতে পারে। এমনকি ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্টও হতে পারে। তাই ডেঙ্গুতে ‘যত বেশি স্যালাইন, তত ভালো’—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
ডেঙ্গুর বিপদসংকেতগুলো কী কী
নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে যেতে হবে।
তীব্র বা ক্রমাগত পেটব্যথা, বারবার বমি, পানি বা স্যালাইন মুখে রাখতে না পারা, অতিরিক্ত দুর্বল বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, অস্থিরতা বা আচরণে পরিবর্তন, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, বমিতে রক্তকালো পায়খানা বা পায়খানায় রক্ত, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, জ্বর কমে যাওয়ার পর হঠাৎ অবস্থার অবনতি, বিশেষ করে জ্বর কমার পর রোগী ভালো হওয়ার বদলে দুর্বল হয়ে পড়লে বা নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা করা যাবে না।
প্লাটিলেট কমলেই কি বিপদ
ডেঙ্গু নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো—‘প্লাটিলেট কমলেই রোগী বিপজ্জনক অবস্থায়’। আসলে বিষয়টি এত সরল নয়। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়া খুবই সাধারণ। কিন্তু শুধুমাত্র প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে রোগীর অবস্থা বা মৃত্যুঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। চিকিৎসকেরা একই সঙ্গে দেখেন রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং রক্তপাত হচ্ছে কি না।
হেমাটোক্রিটের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। এটি শরীরে প্লাজমা লিকেজের একটি ইঙ্গিত হতে পারে। রোগীর সামগ্রিক অবস্থার পাশাপাশি হেমাটোক্রিট ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্লাজমা লিকেজ হলে রক্তে হেমাটোক্রিটের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
তাই শুধু ‘প্লাটিলেট কত?’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি জানতে হবে ‘রোগীর রক্তচাপ কেমন? প্রস্রাব হচ্ছে কি? হেমাটোক্রিট বাড়ছে কি? রক্তপাত বা প্লাজমা লিকেজের কোনো লক্ষণ আছে কি?’
কখন কোন পরীক্ষা করবেন
সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোন পরীক্ষা করা হবে, তা রোগের কততম দিন চলছে এবং রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
১. সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট- CBC)
এর মাধ্যমে সাধারণত শ্বেত রক্তকণিকা (ডব্লিউবিসি), প্লাটিলেট ও হেমাটোক্রিট দেখা হয়। ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে সিবিসি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রোগের কয়েক দিন পর প্লাটিলেট ও হেমাটোক্রিটের পরিবর্তন চিকিৎসকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
২. এনএস১ অ্যান্টিজেন টেস্ট (NS1 Antigen Test)
রোগের শুরুর দিকে ডেঙ্গু শনাক্ত করতে এটি সাহায্য করে। জ্বরের প্রথম কয়েক দিনে, বিশেষ করে ১ থেকে ৫ দিনের মধ্যে, পরীক্ষাটি বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর শনাক্ত করার ক্ষমতা কমতে পারে। তাই জ্বরের প্রথম দিকে এনএস১ নেগেটিভ হলেও শুধু এই ফলাফলের ভিত্তিতে ডেঙ্গু পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না।
৩. ডেঙ্গু-স্পেসিফিক আইজিএম (Dengue-specific IgM)
সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার প্রায় ৫ দিন পর আইজিএম শনাক্ত হতে শুরু করে। তাই জ্বরের প্রথম দিকে আইজিএম নেগেটিভ হওয়া মানেই ডেঙ্গু নেই, এমন নয়।
৪. আইজিজি (IgG)
শুধু আইজিজি টেস্টের মাধ্যমে নতুন করে ডেঙ্গু হয়েছে কি না সবসময় নিশ্চিত হওয়া যায় না। কারণ আগের ডেঙ্গু সংক্রমণের পরও শরীরে আইজিজি থাকতে পারে।
তাই কোন পরীক্ষা কখন করতে হবে, তা রোগের কততম দিন চলছে, উপসর্গ এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের সঙ্গে মিলিয়েই ঠিক করা উচিত।
ডা. কাকলী হালদার: সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
.png)







-8b2e31-256x144.webp)


