ফিচার
মো. সোহেল রানা

কলম আমার বয়সী মানুষের কাছে খুব পছন্দ আর শখের বস্তু। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মই চক বা পেন্সিল থেকে শুরু করে বলপেন হয়ে স্মার্টপেনের বিবর্তন দেখতে পেয়েছে। এর আগে ঘড়ি নিয়ে আমার একটা লেখা সম্পর্কে অনেকেই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কলম নিয়ে লেখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সে সূত্রে আজ বলা যাক কলমের গল্প।
বলছিলাম যে, কলম আমার খুব প্রিয়। বন্ধু বা সহকর্মীরা আমাকে শার্ট-প্যান্ট উপহার দিবেন কি না, তা নিয়ে কনফিউজড থাকলে আমি আগ বাড়িয়ে বলি আমার জন্য একটা ফাউন্টেইন পেন নিয়ে আসবি/আসবেন। এছাড়া সারাদিন আমি ঘড়ি আর কলম নিয়ে বিভিন্ন লেখা পড়ি। ইউটিউব দেখি।
আমার আরেকটি বদ অভ্যাস আছে। বিদেশে কোনো হোটেলে উঠলে আমি প্রথমেই তাদের রুমে থাকা কলমটি ব্যাগে ভরিয়ে ফেলি। আমার মতো প্রায় সবাই এই কাজটা করেন বলে এখন আর আত্মগ্লানি হয় না। তবে আমাদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিভিন্ন দেশের হোটেল একধরনের ডিস্পোজেবল কলম দেয় যা নেয়া আর না নেয়া একই কথা।
কলম নিয়ে একটু ইন্টারনেট ঘাঁটতেই এমন সব মজার ঘটনা পেলাম না শেয়ার করলেই নয়।
অনেকেই জানেন না যে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা এবং স্বাক্ষরের পর বিচারকগণ কলমটা ভেঙে ফেলেন। মোঘল আমলের একটি প্রথা থেকে ব্রিটিশ শাসনকালে আইনি রীতি হিসেবে এটি গড়ে ওঠে, যা এখনো ভারতীয় উপমহাদেশ এবং কিছু কমনওয়েলথ দেশে দেখা যায়। এর পেছনে গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়—এই বার্তা দেওয়ার জন্যই কলমটি ভেঙে ফেলা হয় । এছাড়া রায়ের গভীরতা ও মানবজীবনের গুরুত্ব বোঝাতে বিচারকরা এটি করে থাকেন । সম্প্রতি ২০১৩ সালের দিল্লি ধর্ষণ মামলার রায়ের সময়ও বিচারক এই প্রথা পালন করেছিলেন।
ফাউন্টেইন পেনের জন্ম কিন্তু এক চরম ‘বিরক্তি’ থেকে! বিশ শতকের শুরুতে লুইস ওয়াটারম্যান নামের এক বিমা বিক্রয়কর্মী বড় একটি চুক্তি করতে যাচ্ছিলেন। ক্লায়েন্টের সামনে একটি দামি ফাউন্টেন পেন বের করতেই কলমটি থেকে কালি পড়ে গোটা কাগজ নষ্ট করে দেয়। বিব্রত ও ক্ষিপ্ত ক্লায়েন্ট অন্য বিমা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করে ফেলেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে রাগ ও দুঃখে ওয়াটারম্যান প্রতিজ্ঞা করেন, তিনি একটি নির্ভরযোগ্য কলম বানাবেন। শেষমেশ ১৮৮৪ সালে সফল হন ।
আধুনিক ফাউন্টেইন পেনের ইতিহাস ওয়াটারম্যানকে দিয়ে শুরু হলেও এর ধারণা কিন্তু হাজার বছরের পুরোনো। ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের ফাতিমীয় খলিফা আল-মুইজ লি-দিনাল্লাহ কাপড়ের দাগ এবং হাতের কালির হাত থেকে বাঁচতে একটি বিশেষ কলম চান। তিনি কারিগরদের নির্দেশ দেন এমন একটি কলম বানাতে, যার ভেতরে কালি জমা থাকবে এবং উল্টো করে রাখলেও কালি পড়বে না। কারিগররা একটি কলম বানিয়েও দিয়েছিলেন কিন্তু তার নকশাটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায়।
চুক্তি স্বাক্ষরে—ব্যবসা হোক আর যুদ্ধই হোক—বিশেষ কলম থাকবে না, তা কি হয়? জার্মানির হামবুর্গে ১৯০৬ সালে একটি ছোট কলম কারখানা শুরু করেছিলেন আলফ্রেড নেহেমিয়াস এবং অগাস্ট এবারস্টাইন। কোম্পানিটি ১৯২৪ সালে ‘মাস্টারপিস’ মডেল চালু করে। ওয়াল স্ট্রিটের ব্রোকাররা আর্থিক দলিলে স্বাক্ষরের জন্য এটি ব্যবহার করেন এবং নাম দেন ‘পাওয়ার পেন’।
এরপর পোপ দ্বিতীয় জন পল থেকে শুরু করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই কলমের ভক্ত। অন্যদিকে ১৯৪৫ সালের ৭ মে, ফ্রান্সের রেইমস শহরে মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম হেডকোয়ার্টার্সে জার্মানির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিল সই হয়। এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই করার জন্য জেনারেল ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার তাঁর নিজের দুটি 'পার্কার ৫১' ফাউন্টেইন পেন ব্যবহার করেছিলেন।
ইতিহাসের পাতায় এই কলম দুটিই ‘রেইমস পেন’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৬৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন যখন ‘সিভিল রাইটস অ্যাক্ট’ সই করেন, তখন তিনি ৭৫টি ভিন্ন ফাউন্টেইন পেন ব্যবহার করেছিলেন! তিনি একেকটি অক্ষরের অংশবিশেষ লিখতে একেকটি কলম ব্যবহার করছিলেন। সই শেষে সেই ঐতিহাসিক কলমগুলো তিনি চুক্তির পেছনে অবদান রাখা ব্যক্তিদের উপহার হিসেবে দেন।
হাঙ্গেরির সাংবাদিক লাসজলো জোসেফ বিরো যখন সংবাদপত্রের প্রেস দেখতেন, তখন টের পেতেন দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া ছাপার কালি কখনও দাগ পড়ে না। অথচ তার হাতে থাকা কলমের কালি ধীরে ধীরে শুকানোর ফলে কাগজে এলোমেলো দাগ ফেলে দিচ্ছিল। একদিন ছাপাখানার একটি ছোট্ট বল দেখে তাঁর মাথায় খেলে যায়—যদি কলমের মুখেও ছোট্ট একটি বল বসানো যায়! তাঁর সেই কল্পনা বাস্তবে রূপ নেয় ১৯৩৮ সালে, যখন বিশ্বের প্রথম ব্যবহারযোগ্য বলপয়েন্ট পেনের জন্ম হয়।
অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমানের পাইলটরা ফাউন্টেইন পেন নিয়ে বড় বিপদে পড়তেন। বিমান যখন অনেক উঁচুতে উঠত, তখন বাতাসের চাপ কমে যেত। এর ফলে পেনের ভেতরের বাতাস প্রসারিত হয়ে কালিকে ধাক্কা দিয়ে নিব দিয়ে বের করে দিত। অনেক পাইলটের পকেট কালিতে পুরো নষ্ট হয়ে যেত, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কলম আক্ষরিক অর্থেই কালির ছোটখাটো ‘বিস্ফোরণ’ ঘটাত। এই সমস্যা সমাধান করতেই পরবর্তী কালে বলপয়েন্ট কলমের জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়তে থাকে।
ওদিকে, মহাকাশে কিন্তু বলপয়েন্ট কলম ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ মহাকাশে অভিকর্ষের অভাবে কালি নামতে পারে না। ১৯৬০-এর দশকে নাসার যখন কলম গবেষণায় ব্যস্ত তখন পল সি ফিশার নামের একজন আমেরিকান উদ্ভাবক নিজের টাকায় আবিষ্কার করেন নতুন একধরনের কলম। প্রেশারাইজড কালি ব্যবহার করে তিনি এমন একটি কলম, যা অভিকর্ষ ছাড়াও পানি ও বরফের নিচে কাজ করতে পারে। এরপর ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো ৭ মিশন থেকে শুরু করে আজ অবধি ফিশার স্পেস পেন মহাকাশ অভিযানের সঙ্গী হয়ে চলেছে। এর দাম অবশ্য মাত্র ছয় ডলার।
আমরা আজ অনেক সহজে কলম হাতে তুলে লিখি; একসময় লেখা ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ। কলমের ইতিহাস মানেই সভ্যতার ইতিহাস; আর সভ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লিখন সংস্কৃৃতির ইতিহাস। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন পথ পেরিয়ে আজকের এই বলপয়েন্ট বা ফাউন্টেন পেনে আমরা পৌঁছেছি।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে—মানে আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে আজকের ইরাককে বলা হতো মেসোপটেমিয়া। সেখানকার সুমেরীয় সভ্যতার মানুষ প্রথম লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করে। তখন আজকের মতো কাগজ বা কালি ছিল না। তারা নরম, ভেজা মাটির তৈরি ফলক বা স্ল্যাব বানিয়ে নিত। এরপর খাগড়া বা শক্ত কাঠের টুকরোকে কোনাকুনি বা ত্রিভুজাকৃতি করে কেটে একধরনের কলম বানাত, যেটিকে বলা হতো 'স্টাইলাস'। এই স্টাইলাস দিয়ে ভেজা মাটিতে চেপে চেপে বা আঁচড় কেটে তারা লিখত। মাটির ওপর এই ত্রিভুজাকৃতি বা তিরের ফলার মতো চিহ্নের লেখাকেই বলা হয় 'কিউনিফর্ম' লিপি। লেখা শেষে কাদা মাটির ট্যাবলেটটি রোদে শুকিয়ে বা আগুনে পুড়িয়ে স্থায়ী করে নেওয়া হতো।
সুমেরীয়রা যখন মাটিতে আঁচড় কাটছে, প্রায় একই সময়ে প্রাচীন মিশরীয়রা লেখার জগতে আরেকটি বড় বিপ্লব ঘটায়। নীল নদের তীরে একধরনের জলজ উদ্ভিদ জন্মাত যার নাম 'প্যাপিরাস'। মিশরীয়রা এই গাছের কাণ্ড চিড়ে, পিটিয়ে একধরনের চ্যাপ্টা লেখার পাতা বা স্ক্রল তৈরি করত। এই ‘প্যাপিরাস’ শব্দটি থেকেই ইংরেজি 'পেপার' শব্দটির উৎপত্তি। প্যাপিরাসের পাতলা পাতায় তো আর মাটির মতো আঁচড় কাটা যাবে না, তাই তারা আবিষ্কার করল 'রিড পেন' বা নলখাগড়ার কলম। তারা ফাঁপা নলখাগড়া কিংবা বাঁশের কঞ্চিকে লম্বালম্বি কেটে ডগাটি সুচালো বা চ্যাপ্টা করত। এরপর উদ্ভিদের রস, ভুসাকালি বা কয়লা দিয়ে তৈরি তরল কালিতে সেই নলখাগড়ার ডগাটি ডুবিয়ে প্যাপিরাসের ওপর লিখত।
৭ম শতাব্দী থেকে শুরু করে ১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ১২০০ বছর ধরে এই কলমটিই ছিল পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার প্রধান হাতিয়ার। মিশরীয়দের নলখাগড়ার কলমের পর মানুষ আরও মসৃণ ও নমনীয় কিছু খুঁজছিল। ইউরোপীয় মধ্যযুগে (৭ম শতকের দিকে) মানুষ আবিষ্কার করল যে বড় পাখিদের ডানার পালক দিয়ে চমৎকার কলম বানানো যায়।
সাধারণত হাঁস, রাজহাঁস, টার্কি এবং বড় কাকের ডানার শক্ত পালক ব্যবহার করা হতো। সবচেয়ে দামি ও শক্ত কলম হতো ইগল বা পেঁচার পালক দিয়ে। পালকটি সংগ্রহ করার পর তার ভেতরের ফাঁপা অংশটি পরিষ্কার করা হতো। এরপর একটি বিশেষ ছোট ছুরি দিয়ে পালকের ডগাটিকে তেরছা বা কোনাকুনি করে কেটে নিব বানানো হতো এবং মাঝখান দিয়ে একটু চিরে দেওয়া হতো যাতে কালি সহজে চুইয়ে নিচে নামে। এই ছুরিটিকে বলা হতো 'পেন-নাইফ', যা থেকে আজকের 'পকেট নাইফ' ধারণার উৎপত্তি।
কুইল পেনের প্রধান সুবিধা ছিল এর নমনীয়তা এবং ধারালো ভাব। পালকের ডগাটি নমনীয় হওয়ায় লেখার সময় হাতের সামান্য চাপে এটি হালকা বেঁকে যেত। ফলে অক্ষরের কোথাও মোটা, কোথাও চিকন—এমন চমৎকার আলংকারিক রূপ দেওয়া খুব সহজ হতো। পালক নরম হওয়ায় কাগজের ওপর খুব মসৃণভাবে পিছলে চলত যেখানে কাঠের শক্ত নিব দিয়ে লিখলে কাগজ ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকত।
সুবিধা থাকলেও এই কলম ব্যবহার করা ছিল অত্যন্ত ধৈর্য ও ঝামেলার কাজ। এই কলমের ভেতরে কালি ধরে রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই মাত্র কয়েকটা শব্দ বা বড়জোর এক-দুটি লাইন লেখার পরপরই কলমটিকে পাশের কালির দোয়াতে চুবিয়ে নিতে হতো। একটানা বা দ্রুত লেখার জন্য এটি ছিল বিরাট বাধা। এছাড়া একটি পালক কলম মাত্র এক সপ্তাহ টিকত। কাগজের সাথে ঘর্ষণে পালকের নরম ডগাটি খুব দ্রুত ভোঁতা বা ক্ষয়ে যেত। তখন আবার পেন-নাইফ দিয়ে কেটে নতুন করে ডগা ছুঁচালো করতে হতো। কয়েকবার কাটার পর পুরো পালকটাই ছোট আর অকেজো হয়ে যেত।
এই ঝামেলার কলম দিয়েই কিন্তু মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় দলিল এবং সাহিত্য রচিত হয়েছে। স্যার আইজ্যাক নিউটনের বিজ্ঞানের সূত্র, উইলিয়াম শেকসপিয়রের কালজয়ী নাটক, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ডায়েরি থেকে শুরু করে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সবই লেখা হয়েছিল এই কুইল পেন বা পালক কলম দিয়ে। প্রতি সপ্তাহে কলম কাটা এবং বারবার কালিতে ডোবানোর ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ লোহার নিব এবং সবশেষে ভেতরের কালি ধারণকারী ফাউন্টেইন পেন আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে যায়।
আগে পালকের কলম দ্রুত ক্ষয়ে যেত এবং বারবার কাটতে হতো। কিন্তু কারখানায় বা মেশিনে তৈরি এই ধাতব নিবগুলো ছিল সস্তা, টেকসই ও নিখুঁত। এর ফলে প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো ‘পালক কলমের যুগ’ চিরতরে শেষ হয়ে যায় এবং সবার হাতে হাতে মেটাল নিব পৌঁছে যায়। ব্রিটেনের জন মিচেল প্রথম ইস্পাত বা স্টিলের তৈরি ধাতব নিব আবিষ্কার করেন। তবে তখনও এটি দোয়াতে চুবিয়েই লিখতে হতো।
১৮৮৪ সালে ফাউন্টেইন পেন আবিষ্কারের মধ্যেই কলমের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট চেম্বার বা জলাধারে কালি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হলো। ফলে বারবার দোয়াতে কলম ডোবানোর ঝামেলা রইলো না এবং কলমটি হয়ে উঠল ‘জলমান’ বা সহজে বহনযোগ্য।
ফাউন্টেইন পেনের কালি শুকাতে সময় লাগত; আর তা থেকে মাঝে মাঝে কালি চুইয়ে জামা কাপড় নষ্ট হতো। হাঙ্গেরির সাংবাদিক লাসলো বিরো ১৯৩৮ সালে আধুনিক বলপয়েন্ট কলম আবিষ্কার করেন—যা আমরা আজ সাধারণত ব্যবহার করি। বলপয়েন্ট কলমের ডগায় একটি অতি ক্ষুদ্র ঘূর্ণায়মান বল এবং বিশেষ একধরনের দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া ঘন কালি ব্যবহার করার ফলে লেখার জগত সম্পূর্ণ বদলে যায়। এটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের সবচেয়ে সস্তা, নির্ভরযোগ্য এবং গণমানুষের কলম। এখন আছে হরেক রকম কলম—জেল পেন, রোলার বল পেন, স্কেচ ও মার্কার পেন; হালে চলে এসেছে ডিজিটাল বা স্মার্ট পেন ।
স্মার্টপেন এমন একটি উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন কলম, যা দিয়ে সাধারণ কাগজের মতো (তবে বিশেষ ডট প্যাটার্নযুক্ত কোডেড পেপার) কোনো ডায়েরি বা খাতায় লিখলে সেই হাতে লেখা টেক্সট বা আঁকা ছবি অবিকল ডিজিটাল ডেটাতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ব্লুটুথের মাধ্যমে এটি মুহূর্তের মধ্যে আপনার স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারে চলে যায়। শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, স্থপতি এবং করপোরেট পেশাজীবীদের জন্য এটি দারুণ এক আবিষ্কার। বিশেষ করে যারা টাইপ করার চেয়ে খাতা-কলমে নোট নিতে বা স্কেচ করতে বেশি পছন্দ করেন এবং পরে সেগুলো ইমেইল বা পিডিএফ আকারে অন্যদের পাঠাতে চান।
আপনি খাতায় সাধারণ কলমের মতোই লিখবেন। কিন্তু স্মার্টপেনের ভেতরে থাকা অপটিক্যাল ক্যামেরা ও প্রসেসর সেই লেখা ট্র্যাক করে ওসিআর (optical character reader) প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি কম্পিউটারের ফন্ট বা টাইপ করা টেক্সটে রূপান্তর করে দিতে পারে। অনেক স্মার্টপেনে (যেমন লাইভস্ক্রাইব) বিল্ট-ইন মাইক্রোফোন থাকে।
আপনি যখন কোনো মিটিং বা ক্লাসে নোট নিচ্ছেন, তখন শিক্ষকের বা বক্তার কথা ব্যাকগ্রাউন্ডে রেকর্ড হতে থাকে। পরে খাতার কোনো নির্দিষ্ট শব্দের ওপর কলমটি ছোঁয়ালে, ঠিক ওই শব্দটি লেখার সময় স্পিকার কী বলছিলেন—তা কলমটি শুনিয়ে দেয়! এই কলমগুলোর নিজস্ব মেমোরি থাকে। ফোন বা কম্পিউটার সাথে না থাকলেও আপনি লিখে যেতে পারবেন, পরে কানেক্ট করলেই সব ডেটা সিঙ্ক বা ট্রান্সফার হয়ে যাবে। কী আজব ব্যাপার!
পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কলম হলো ‘অরোরা ডায়মন্ড’। এটি কোনো সাধারণ কলম নয়, বরং এটি একটি গয়না বা শিল্পের শামিল। ইতালির বিখ্যাত বিলাসবহুল কলম প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘অরোরা’ এটি তৈরি করেছে। কোম্পানিটি বছরে মাত্র একটি করে এমন কলম তৈরি করে যাতে এর অনন্যতা বজায় থাকে।
এই কলমের পুরো অবয়বজুড়ে প্রায় ৩০ ক্যারেটেরও বেশি ওজনের ১,৯১৯টি ‘ডি কালার’ বোহেমিয়ান হীরা বসানো রয়েছে। এর নিবটি তৈরি করা হয়েছে ১৮ ক্যারেটের খাঁটি সোনা দিয়ে যার ওপর গ্রাহকের ইচ্ছেমতো নাম বা লোগো খোদাই করে দেওয়া হয়। এটার দাম প্রায় ১.৪ থেকে ১.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকারও বেশি।
আসুন বিশ্বের কিছু অভিজাত ও বিলাসবহুল কলম কোম্পানির নাম জানি—যারা কারিগরি দক্ষতা, ডিজাইন ও মূল্যের জন্য শীর্ষস্থানীয়। মন্টব্ল্যাঙ্ক জার্মানি সবচেয়ে পরিচিত বিলাসবহুল কলম ব্র্যান্ড। তাদের সাদা তারকা চিহ্ন ও মিস্টারবাটজ সিরিজ স্ট্যাটাস সিম্বল। পার্কার (ফ্রান্স/ যুক্তরাষ্ট্র) ডুফোল্ড ও প্রিমিয়ার সিরিজের জন্য বিখ্যাত। ইতিহাসের অনেক রাষ্ট্রনায়ক এই ব্র্যান্ড ব্যবহার করেছেন।
ফ্রান্সের ওয়াটারম্যান গড়ে উঠেছে আধুনিক ফাউন্টেন পেনের জনক লুইস ওয়াটারম্যানের নামে। ক্যারিন ও এক্সপার্ট সিরিজ অত্যন্ত জনপ্রিয়। জার্মানির পেলিকান পিস্টন ফিলিং সিস্টেমের জন্য বিখ্যাত। সোভেরিন সিরিজ সংগ্রাহকদের প্রিয়।
অরোরা হলো হাতে তৈরি ফাউন্টেন পেন যার ইতালিয়ান ডিজাইন ও ৮৮ সিরিজ অতুলনীয়। ইতালির আরেকটি ব্রান্ড ভিসকন্টি—যারা অভিনব ডিজাইন, ব্রিজ ফিলিং সিস্টেম ও দামি উপকরণ যেমন লাভা, মূল্যবান ধাতু ব্যবহার করে।
ফ্রান্সের কার্টিয়া জুয়েলারি ব্র্যান্ড হলেও তাদের লিখনপণ্যও রত্নখচিত ও অত্যন্ত বিলাসবহুল। জার্মানির গ্রাফ ভন ফেবার-ক্যাস্টেল হলো ফেবার-ক্যাস্টেলের অভিজাত উপব্র্যান্ড যারা পেন্সিলের জন্যও বিখ্যাত। জাপানের নমিকি পাইলট কোম্পানির এক অভিজাত শাখা। মাকি-এ নামক হাতে আঁকা ল্যাকারওয়ার্কের জন্য সারা বিশ্বে প্রশংসিত।
আমেরিকার ডেভিড অস্কারসন হাতে খোদাই করা, এনামেল ও গিল্ডিংয়ের অনন্য সংস্করণ, যা খুব সীমিত পরিসরে উৎপাদিত হয়। এছাড়া মন্টেগ্রাপা (ইতালি), ক্রন (সুইজারল্যান্ড), শেফার (যুক্তরাষ্ট্র) উল্লেখযোগ্য। এই ব্র্যান্ডগুলোর কোনো কলমের দাম সাধারণত কয়েকশ ডলার থেকে শুরু করে কয়েক হাজার বা লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
পাথরের ফলকের আঁচড় আজ স্মার্টস্ক্রিনে রূপ নিয়েছে। কিন্তু কলমের মৌলিক আনন্দ আজও অমলিন। প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক হাতে কলম নিয়ে লেখার অনুভূতি অনন্য।

কলম আমার বয়সী মানুষের কাছে খুব পছন্দ আর শখের বস্তু। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মই চক বা পেন্সিল থেকে শুরু করে বলপেন হয়ে স্মার্টপেনের বিবর্তন দেখতে পেয়েছে। এর আগে ঘড়ি নিয়ে আমার একটা লেখা সম্পর্কে অনেকেই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কলম নিয়ে লেখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সে সূত্রে আজ বলা যাক কলমের গল্প।
বলছিলাম যে, কলম আমার খুব প্রিয়। বন্ধু বা সহকর্মীরা আমাকে শার্ট-প্যান্ট উপহার দিবেন কি না, তা নিয়ে কনফিউজড থাকলে আমি আগ বাড়িয়ে বলি আমার জন্য একটা ফাউন্টেইন পেন নিয়ে আসবি/আসবেন। এছাড়া সারাদিন আমি ঘড়ি আর কলম নিয়ে বিভিন্ন লেখা পড়ি। ইউটিউব দেখি।
আমার আরেকটি বদ অভ্যাস আছে। বিদেশে কোনো হোটেলে উঠলে আমি প্রথমেই তাদের রুমে থাকা কলমটি ব্যাগে ভরিয়ে ফেলি। আমার মতো প্রায় সবাই এই কাজটা করেন বলে এখন আর আত্মগ্লানি হয় না। তবে আমাদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিভিন্ন দেশের হোটেল একধরনের ডিস্পোজেবল কলম দেয় যা নেয়া আর না নেয়া একই কথা।
কলম নিয়ে একটু ইন্টারনেট ঘাঁটতেই এমন সব মজার ঘটনা পেলাম না শেয়ার করলেই নয়।
অনেকেই জানেন না যে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা এবং স্বাক্ষরের পর বিচারকগণ কলমটা ভেঙে ফেলেন। মোঘল আমলের একটি প্রথা থেকে ব্রিটিশ শাসনকালে আইনি রীতি হিসেবে এটি গড়ে ওঠে, যা এখনো ভারতীয় উপমহাদেশ এবং কিছু কমনওয়েলথ দেশে দেখা যায়। এর পেছনে গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়—এই বার্তা দেওয়ার জন্যই কলমটি ভেঙে ফেলা হয় । এছাড়া রায়ের গভীরতা ও মানবজীবনের গুরুত্ব বোঝাতে বিচারকরা এটি করে থাকেন । সম্প্রতি ২০১৩ সালের দিল্লি ধর্ষণ মামলার রায়ের সময়ও বিচারক এই প্রথা পালন করেছিলেন।
ফাউন্টেইন পেনের জন্ম কিন্তু এক চরম ‘বিরক্তি’ থেকে! বিশ শতকের শুরুতে লুইস ওয়াটারম্যান নামের এক বিমা বিক্রয়কর্মী বড় একটি চুক্তি করতে যাচ্ছিলেন। ক্লায়েন্টের সামনে একটি দামি ফাউন্টেন পেন বের করতেই কলমটি থেকে কালি পড়ে গোটা কাগজ নষ্ট করে দেয়। বিব্রত ও ক্ষিপ্ত ক্লায়েন্ট অন্য বিমা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করে ফেলেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে রাগ ও দুঃখে ওয়াটারম্যান প্রতিজ্ঞা করেন, তিনি একটি নির্ভরযোগ্য কলম বানাবেন। শেষমেশ ১৮৮৪ সালে সফল হন ।
আধুনিক ফাউন্টেইন পেনের ইতিহাস ওয়াটারম্যানকে দিয়ে শুরু হলেও এর ধারণা কিন্তু হাজার বছরের পুরোনো। ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের ফাতিমীয় খলিফা আল-মুইজ লি-দিনাল্লাহ কাপড়ের দাগ এবং হাতের কালির হাত থেকে বাঁচতে একটি বিশেষ কলম চান। তিনি কারিগরদের নির্দেশ দেন এমন একটি কলম বানাতে, যার ভেতরে কালি জমা থাকবে এবং উল্টো করে রাখলেও কালি পড়বে না। কারিগররা একটি কলম বানিয়েও দিয়েছিলেন কিন্তু তার নকশাটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায়।
চুক্তি স্বাক্ষরে—ব্যবসা হোক আর যুদ্ধই হোক—বিশেষ কলম থাকবে না, তা কি হয়? জার্মানির হামবুর্গে ১৯০৬ সালে একটি ছোট কলম কারখানা শুরু করেছিলেন আলফ্রেড নেহেমিয়াস এবং অগাস্ট এবারস্টাইন। কোম্পানিটি ১৯২৪ সালে ‘মাস্টারপিস’ মডেল চালু করে। ওয়াল স্ট্রিটের ব্রোকাররা আর্থিক দলিলে স্বাক্ষরের জন্য এটি ব্যবহার করেন এবং নাম দেন ‘পাওয়ার পেন’।
এরপর পোপ দ্বিতীয় জন পল থেকে শুরু করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই কলমের ভক্ত। অন্যদিকে ১৯৪৫ সালের ৭ মে, ফ্রান্সের রেইমস শহরে মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম হেডকোয়ার্টার্সে জার্মানির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিল সই হয়। এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই করার জন্য জেনারেল ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার তাঁর নিজের দুটি 'পার্কার ৫১' ফাউন্টেইন পেন ব্যবহার করেছিলেন।
ইতিহাসের পাতায় এই কলম দুটিই ‘রেইমস পেন’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৬৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন যখন ‘সিভিল রাইটস অ্যাক্ট’ সই করেন, তখন তিনি ৭৫টি ভিন্ন ফাউন্টেইন পেন ব্যবহার করেছিলেন! তিনি একেকটি অক্ষরের অংশবিশেষ লিখতে একেকটি কলম ব্যবহার করছিলেন। সই শেষে সেই ঐতিহাসিক কলমগুলো তিনি চুক্তির পেছনে অবদান রাখা ব্যক্তিদের উপহার হিসেবে দেন।
হাঙ্গেরির সাংবাদিক লাসজলো জোসেফ বিরো যখন সংবাদপত্রের প্রেস দেখতেন, তখন টের পেতেন দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া ছাপার কালি কখনও দাগ পড়ে না। অথচ তার হাতে থাকা কলমের কালি ধীরে ধীরে শুকানোর ফলে কাগজে এলোমেলো দাগ ফেলে দিচ্ছিল। একদিন ছাপাখানার একটি ছোট্ট বল দেখে তাঁর মাথায় খেলে যায়—যদি কলমের মুখেও ছোট্ট একটি বল বসানো যায়! তাঁর সেই কল্পনা বাস্তবে রূপ নেয় ১৯৩৮ সালে, যখন বিশ্বের প্রথম ব্যবহারযোগ্য বলপয়েন্ট পেনের জন্ম হয়।
অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমানের পাইলটরা ফাউন্টেইন পেন নিয়ে বড় বিপদে পড়তেন। বিমান যখন অনেক উঁচুতে উঠত, তখন বাতাসের চাপ কমে যেত। এর ফলে পেনের ভেতরের বাতাস প্রসারিত হয়ে কালিকে ধাক্কা দিয়ে নিব দিয়ে বের করে দিত। অনেক পাইলটের পকেট কালিতে পুরো নষ্ট হয়ে যেত, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কলম আক্ষরিক অর্থেই কালির ছোটখাটো ‘বিস্ফোরণ’ ঘটাত। এই সমস্যা সমাধান করতেই পরবর্তী কালে বলপয়েন্ট কলমের জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়তে থাকে।
ওদিকে, মহাকাশে কিন্তু বলপয়েন্ট কলম ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ মহাকাশে অভিকর্ষের অভাবে কালি নামতে পারে না। ১৯৬০-এর দশকে নাসার যখন কলম গবেষণায় ব্যস্ত তখন পল সি ফিশার নামের একজন আমেরিকান উদ্ভাবক নিজের টাকায় আবিষ্কার করেন নতুন একধরনের কলম। প্রেশারাইজড কালি ব্যবহার করে তিনি এমন একটি কলম, যা অভিকর্ষ ছাড়াও পানি ও বরফের নিচে কাজ করতে পারে। এরপর ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো ৭ মিশন থেকে শুরু করে আজ অবধি ফিশার স্পেস পেন মহাকাশ অভিযানের সঙ্গী হয়ে চলেছে। এর দাম অবশ্য মাত্র ছয় ডলার।
আমরা আজ অনেক সহজে কলম হাতে তুলে লিখি; একসময় লেখা ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ। কলমের ইতিহাস মানেই সভ্যতার ইতিহাস; আর সভ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লিখন সংস্কৃৃতির ইতিহাস। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন পথ পেরিয়ে আজকের এই বলপয়েন্ট বা ফাউন্টেন পেনে আমরা পৌঁছেছি।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে—মানে আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে আজকের ইরাককে বলা হতো মেসোপটেমিয়া। সেখানকার সুমেরীয় সভ্যতার মানুষ প্রথম লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করে। তখন আজকের মতো কাগজ বা কালি ছিল না। তারা নরম, ভেজা মাটির তৈরি ফলক বা স্ল্যাব বানিয়ে নিত। এরপর খাগড়া বা শক্ত কাঠের টুকরোকে কোনাকুনি বা ত্রিভুজাকৃতি করে কেটে একধরনের কলম বানাত, যেটিকে বলা হতো 'স্টাইলাস'। এই স্টাইলাস দিয়ে ভেজা মাটিতে চেপে চেপে বা আঁচড় কেটে তারা লিখত। মাটির ওপর এই ত্রিভুজাকৃতি বা তিরের ফলার মতো চিহ্নের লেখাকেই বলা হয় 'কিউনিফর্ম' লিপি। লেখা শেষে কাদা মাটির ট্যাবলেটটি রোদে শুকিয়ে বা আগুনে পুড়িয়ে স্থায়ী করে নেওয়া হতো।
সুমেরীয়রা যখন মাটিতে আঁচড় কাটছে, প্রায় একই সময়ে প্রাচীন মিশরীয়রা লেখার জগতে আরেকটি বড় বিপ্লব ঘটায়। নীল নদের তীরে একধরনের জলজ উদ্ভিদ জন্মাত যার নাম 'প্যাপিরাস'। মিশরীয়রা এই গাছের কাণ্ড চিড়ে, পিটিয়ে একধরনের চ্যাপ্টা লেখার পাতা বা স্ক্রল তৈরি করত। এই ‘প্যাপিরাস’ শব্দটি থেকেই ইংরেজি 'পেপার' শব্দটির উৎপত্তি। প্যাপিরাসের পাতলা পাতায় তো আর মাটির মতো আঁচড় কাটা যাবে না, তাই তারা আবিষ্কার করল 'রিড পেন' বা নলখাগড়ার কলম। তারা ফাঁপা নলখাগড়া কিংবা বাঁশের কঞ্চিকে লম্বালম্বি কেটে ডগাটি সুচালো বা চ্যাপ্টা করত। এরপর উদ্ভিদের রস, ভুসাকালি বা কয়লা দিয়ে তৈরি তরল কালিতে সেই নলখাগড়ার ডগাটি ডুবিয়ে প্যাপিরাসের ওপর লিখত।
৭ম শতাব্দী থেকে শুরু করে ১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ১২০০ বছর ধরে এই কলমটিই ছিল পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার প্রধান হাতিয়ার। মিশরীয়দের নলখাগড়ার কলমের পর মানুষ আরও মসৃণ ও নমনীয় কিছু খুঁজছিল। ইউরোপীয় মধ্যযুগে (৭ম শতকের দিকে) মানুষ আবিষ্কার করল যে বড় পাখিদের ডানার পালক দিয়ে চমৎকার কলম বানানো যায়।
সাধারণত হাঁস, রাজহাঁস, টার্কি এবং বড় কাকের ডানার শক্ত পালক ব্যবহার করা হতো। সবচেয়ে দামি ও শক্ত কলম হতো ইগল বা পেঁচার পালক দিয়ে। পালকটি সংগ্রহ করার পর তার ভেতরের ফাঁপা অংশটি পরিষ্কার করা হতো। এরপর একটি বিশেষ ছোট ছুরি দিয়ে পালকের ডগাটিকে তেরছা বা কোনাকুনি করে কেটে নিব বানানো হতো এবং মাঝখান দিয়ে একটু চিরে দেওয়া হতো যাতে কালি সহজে চুইয়ে নিচে নামে। এই ছুরিটিকে বলা হতো 'পেন-নাইফ', যা থেকে আজকের 'পকেট নাইফ' ধারণার উৎপত্তি।
কুইল পেনের প্রধান সুবিধা ছিল এর নমনীয়তা এবং ধারালো ভাব। পালকের ডগাটি নমনীয় হওয়ায় লেখার সময় হাতের সামান্য চাপে এটি হালকা বেঁকে যেত। ফলে অক্ষরের কোথাও মোটা, কোথাও চিকন—এমন চমৎকার আলংকারিক রূপ দেওয়া খুব সহজ হতো। পালক নরম হওয়ায় কাগজের ওপর খুব মসৃণভাবে পিছলে চলত যেখানে কাঠের শক্ত নিব দিয়ে লিখলে কাগজ ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকত।
সুবিধা থাকলেও এই কলম ব্যবহার করা ছিল অত্যন্ত ধৈর্য ও ঝামেলার কাজ। এই কলমের ভেতরে কালি ধরে রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই মাত্র কয়েকটা শব্দ বা বড়জোর এক-দুটি লাইন লেখার পরপরই কলমটিকে পাশের কালির দোয়াতে চুবিয়ে নিতে হতো। একটানা বা দ্রুত লেখার জন্য এটি ছিল বিরাট বাধা। এছাড়া একটি পালক কলম মাত্র এক সপ্তাহ টিকত। কাগজের সাথে ঘর্ষণে পালকের নরম ডগাটি খুব দ্রুত ভোঁতা বা ক্ষয়ে যেত। তখন আবার পেন-নাইফ দিয়ে কেটে নতুন করে ডগা ছুঁচালো করতে হতো। কয়েকবার কাটার পর পুরো পালকটাই ছোট আর অকেজো হয়ে যেত।
এই ঝামেলার কলম দিয়েই কিন্তু মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় দলিল এবং সাহিত্য রচিত হয়েছে। স্যার আইজ্যাক নিউটনের বিজ্ঞানের সূত্র, উইলিয়াম শেকসপিয়রের কালজয়ী নাটক, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ডায়েরি থেকে শুরু করে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সবই লেখা হয়েছিল এই কুইল পেন বা পালক কলম দিয়ে। প্রতি সপ্তাহে কলম কাটা এবং বারবার কালিতে ডোবানোর ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ লোহার নিব এবং সবশেষে ভেতরের কালি ধারণকারী ফাউন্টেইন পেন আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে যায়।
আগে পালকের কলম দ্রুত ক্ষয়ে যেত এবং বারবার কাটতে হতো। কিন্তু কারখানায় বা মেশিনে তৈরি এই ধাতব নিবগুলো ছিল সস্তা, টেকসই ও নিখুঁত। এর ফলে প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো ‘পালক কলমের যুগ’ চিরতরে শেষ হয়ে যায় এবং সবার হাতে হাতে মেটাল নিব পৌঁছে যায়। ব্রিটেনের জন মিচেল প্রথম ইস্পাত বা স্টিলের তৈরি ধাতব নিব আবিষ্কার করেন। তবে তখনও এটি দোয়াতে চুবিয়েই লিখতে হতো।
১৮৮৪ সালে ফাউন্টেইন পেন আবিষ্কারের মধ্যেই কলমের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট চেম্বার বা জলাধারে কালি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হলো। ফলে বারবার দোয়াতে কলম ডোবানোর ঝামেলা রইলো না এবং কলমটি হয়ে উঠল ‘জলমান’ বা সহজে বহনযোগ্য।
ফাউন্টেইন পেনের কালি শুকাতে সময় লাগত; আর তা থেকে মাঝে মাঝে কালি চুইয়ে জামা কাপড় নষ্ট হতো। হাঙ্গেরির সাংবাদিক লাসলো বিরো ১৯৩৮ সালে আধুনিক বলপয়েন্ট কলম আবিষ্কার করেন—যা আমরা আজ সাধারণত ব্যবহার করি। বলপয়েন্ট কলমের ডগায় একটি অতি ক্ষুদ্র ঘূর্ণায়মান বল এবং বিশেষ একধরনের দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া ঘন কালি ব্যবহার করার ফলে লেখার জগত সম্পূর্ণ বদলে যায়। এটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের সবচেয়ে সস্তা, নির্ভরযোগ্য এবং গণমানুষের কলম। এখন আছে হরেক রকম কলম—জেল পেন, রোলার বল পেন, স্কেচ ও মার্কার পেন; হালে চলে এসেছে ডিজিটাল বা স্মার্ট পেন ।
স্মার্টপেন এমন একটি উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন কলম, যা দিয়ে সাধারণ কাগজের মতো (তবে বিশেষ ডট প্যাটার্নযুক্ত কোডেড পেপার) কোনো ডায়েরি বা খাতায় লিখলে সেই হাতে লেখা টেক্সট বা আঁকা ছবি অবিকল ডিজিটাল ডেটাতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ব্লুটুথের মাধ্যমে এটি মুহূর্তের মধ্যে আপনার স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারে চলে যায়। শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, স্থপতি এবং করপোরেট পেশাজীবীদের জন্য এটি দারুণ এক আবিষ্কার। বিশেষ করে যারা টাইপ করার চেয়ে খাতা-কলমে নোট নিতে বা স্কেচ করতে বেশি পছন্দ করেন এবং পরে সেগুলো ইমেইল বা পিডিএফ আকারে অন্যদের পাঠাতে চান।
আপনি খাতায় সাধারণ কলমের মতোই লিখবেন। কিন্তু স্মার্টপেনের ভেতরে থাকা অপটিক্যাল ক্যামেরা ও প্রসেসর সেই লেখা ট্র্যাক করে ওসিআর (optical character reader) প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি কম্পিউটারের ফন্ট বা টাইপ করা টেক্সটে রূপান্তর করে দিতে পারে। অনেক স্মার্টপেনে (যেমন লাইভস্ক্রাইব) বিল্ট-ইন মাইক্রোফোন থাকে।
আপনি যখন কোনো মিটিং বা ক্লাসে নোট নিচ্ছেন, তখন শিক্ষকের বা বক্তার কথা ব্যাকগ্রাউন্ডে রেকর্ড হতে থাকে। পরে খাতার কোনো নির্দিষ্ট শব্দের ওপর কলমটি ছোঁয়ালে, ঠিক ওই শব্দটি লেখার সময় স্পিকার কী বলছিলেন—তা কলমটি শুনিয়ে দেয়! এই কলমগুলোর নিজস্ব মেমোরি থাকে। ফোন বা কম্পিউটার সাথে না থাকলেও আপনি লিখে যেতে পারবেন, পরে কানেক্ট করলেই সব ডেটা সিঙ্ক বা ট্রান্সফার হয়ে যাবে। কী আজব ব্যাপার!
পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কলম হলো ‘অরোরা ডায়মন্ড’। এটি কোনো সাধারণ কলম নয়, বরং এটি একটি গয়না বা শিল্পের শামিল। ইতালির বিখ্যাত বিলাসবহুল কলম প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘অরোরা’ এটি তৈরি করেছে। কোম্পানিটি বছরে মাত্র একটি করে এমন কলম তৈরি করে যাতে এর অনন্যতা বজায় থাকে।
এই কলমের পুরো অবয়বজুড়ে প্রায় ৩০ ক্যারেটেরও বেশি ওজনের ১,৯১৯টি ‘ডি কালার’ বোহেমিয়ান হীরা বসানো রয়েছে। এর নিবটি তৈরি করা হয়েছে ১৮ ক্যারেটের খাঁটি সোনা দিয়ে যার ওপর গ্রাহকের ইচ্ছেমতো নাম বা লোগো খোদাই করে দেওয়া হয়। এটার দাম প্রায় ১.৪ থেকে ১.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকারও বেশি।
আসুন বিশ্বের কিছু অভিজাত ও বিলাসবহুল কলম কোম্পানির নাম জানি—যারা কারিগরি দক্ষতা, ডিজাইন ও মূল্যের জন্য শীর্ষস্থানীয়। মন্টব্ল্যাঙ্ক জার্মানি সবচেয়ে পরিচিত বিলাসবহুল কলম ব্র্যান্ড। তাদের সাদা তারকা চিহ্ন ও মিস্টারবাটজ সিরিজ স্ট্যাটাস সিম্বল। পার্কার (ফ্রান্স/ যুক্তরাষ্ট্র) ডুফোল্ড ও প্রিমিয়ার সিরিজের জন্য বিখ্যাত। ইতিহাসের অনেক রাষ্ট্রনায়ক এই ব্র্যান্ড ব্যবহার করেছেন।
ফ্রান্সের ওয়াটারম্যান গড়ে উঠেছে আধুনিক ফাউন্টেন পেনের জনক লুইস ওয়াটারম্যানের নামে। ক্যারিন ও এক্সপার্ট সিরিজ অত্যন্ত জনপ্রিয়। জার্মানির পেলিকান পিস্টন ফিলিং সিস্টেমের জন্য বিখ্যাত। সোভেরিন সিরিজ সংগ্রাহকদের প্রিয়।
অরোরা হলো হাতে তৈরি ফাউন্টেন পেন যার ইতালিয়ান ডিজাইন ও ৮৮ সিরিজ অতুলনীয়। ইতালির আরেকটি ব্রান্ড ভিসকন্টি—যারা অভিনব ডিজাইন, ব্রিজ ফিলিং সিস্টেম ও দামি উপকরণ যেমন লাভা, মূল্যবান ধাতু ব্যবহার করে।
ফ্রান্সের কার্টিয়া জুয়েলারি ব্র্যান্ড হলেও তাদের লিখনপণ্যও রত্নখচিত ও অত্যন্ত বিলাসবহুল। জার্মানির গ্রাফ ভন ফেবার-ক্যাস্টেল হলো ফেবার-ক্যাস্টেলের অভিজাত উপব্র্যান্ড যারা পেন্সিলের জন্যও বিখ্যাত। জাপানের নমিকি পাইলট কোম্পানির এক অভিজাত শাখা। মাকি-এ নামক হাতে আঁকা ল্যাকারওয়ার্কের জন্য সারা বিশ্বে প্রশংসিত।
আমেরিকার ডেভিড অস্কারসন হাতে খোদাই করা, এনামেল ও গিল্ডিংয়ের অনন্য সংস্করণ, যা খুব সীমিত পরিসরে উৎপাদিত হয়। এছাড়া মন্টেগ্রাপা (ইতালি), ক্রন (সুইজারল্যান্ড), শেফার (যুক্তরাষ্ট্র) উল্লেখযোগ্য। এই ব্র্যান্ডগুলোর কোনো কলমের দাম সাধারণত কয়েকশ ডলার থেকে শুরু করে কয়েক হাজার বা লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
পাথরের ফলকের আঁচড় আজ স্মার্টস্ক্রিনে রূপ নিয়েছে। কিন্তু কলমের মৌলিক আনন্দ আজও অমলিন। প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক হাতে কলম নিয়ে লেখার অনুভূতি অনন্য।

কোরবানির ঈদে বাড়িতে বানানো হয় মাংসের বিভিন্ন পদ। সকালে মাংস-রুটি, দুপুরে কালাভুনা বা মেজবানি গরুর মাংস আর রাতে পোলাও-কোরমা কিংবা বিরিয়ানি। ঈদের সময়টায় কখনও নিজের ঘরে, কখনও দাওয়াতে মাংস খাওয়ার ধুম চলতেই থাকে। তবে উৎসবের আনন্দে অনেকেই হিসাব ছাড়া মাংস খেয়ে ফেলেন। এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
২৩ মিনিট আগে
বারিধারার এই ডুপলেক্স ভবনের দক্ষিণের মাস্টার বেডরুমটা বুড়ো আমজাদ সাহেবের এখন স্থায়ী ঠিকানা। পাশের ঝকঝকে টয়লেট আর লেক ভিউ বারান্দাটাও তার। শরীর আর মনের যে অবস্থা, তাতে জুম্মার নামাজে মসজিদে যাওয়ার সামর্থ্যটুকুও হারিয়েছেন তিনি। জায়নামাজে বসে তসবিহ গোনা আর শেলফের উপরে রাখা পবিত্র কোরআনের ক্যালিগ্রাফি
১ ঘণ্টা আগে
প্রথমে ছুরি মারার দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছিল। এখন দুই পক্ষের মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হওয়ার খবর আসতে লাগল। সেই লড়াইয়ে দেদার ব্যবহার হচ্ছিল চাকু-ছুরির পাশাপাশি কৃপাণ, তলোয়ার আর বন্দুক। মাঝে মাঝে দেশে তৈরি বোমা ফাটার খবরও আসছিল।
১ ঘণ্টা আগে
জীবিত অবস্থায় অন্ধকার ঘরে গিয়ে তাঁর পাশে বসা কঠিন ছিল। এখন সেই ঘরে গিয়ে বসা আর সম্ভব নয়। এখন তাঁর দরজায় আর কড়া নাড়া যাবে হয়তো; কিন্তু ভেতর থেকে ছিটকিনি খুলে কেউ মুখোমুখি দাঁড়াবে না। কেউ বলবে না, ঘরে সাপ আসে।
২ ঘণ্টা আগে