leadT1ad

বিশ্বরাজনীতিতে অদ্ভুত যত নির্বাচনী প্রচার

নির্বাচন এলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পোস্টার, মিছিল আর প্রতিশ্রুতির লম্বা তালিকা। কিন্তু এই চেনা ছবির বাইরে বিশ্বরাজনীতিতে এমন কিছু নির্বাচনী প্রচারণা হয়েছে, যা শুনলে অবাক না হয়ে উপায় নেই। কোথাও প্রতিশ্রুতি মহাকাশ বন্দর, কোথাও ঘোড়া উপহার, কোথাও আবার সুইমিং পুলে বিনামূল্যে তোয়ালে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

অদ্ভুত আর মজার নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতির গল্প। এআই জেনারেটেড ছবি

আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে এখন পুরো বাংলাদেশেই নির্বাচনী আমেজ। প্রার্থীরা নানান প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছুটছেন ভোটারদের দরজায় দরজায়। হাতে হাতে লিফলেট, অলিগলিতে মিছিল, মাইকের শব্দ মিলিয়ে নির্বাচন মানেই এক আলাদা পরিবেশ।

কিন্তু এই চেনা ছবির বাইরেও বিশ্বরাজনীতিতে এমন কিছু নির্বাচনী প্রচারণা হয়েছে, যা শুনলে চোখ কপালে তুলবেন আপনিও! কোথাও প্রার্থী সেজেছেন মহাকাশচারী, আবার কেউ ভোটারদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন জ্যান্ত ঘোড়া, কেউ বলছেন ক্ষমতায় গেলে মহাকর্ষের নিয়মই বাতিল করে দেওয়া হবে! চলুন, এমনই কিছু অদ্ভুত আর মজার নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতির গল্প জেনে নেওয়া যাক।

বার্মিংহাম শহরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে সেখানে মহাকাশ বন্দর তৈরি করবেন

যুক্তরাজ্যের নির্বাচন বরাবরই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৭ সালে এই আলোচনা এক ভিন্ন মাত্রা পায় যখন ‘লর্ড বাকেটহেড’ নামের এক অদ্ভুত চরিত্র নির্বাচনী ময়দানে নামেন। কালো আলখাল্লা, মাথায় ডাস্টবিনের মতো হেলমেট পরে তিনি নিজেকে পরিচয় দেন একজন ‘মহাজাগতিক লর্ড’ হিসেবে।

তাঁর ইশতেহার ছিল অদ্ভুত ও হাস্যকর। তিনি জনগণকে আশ্বাস দেন, নির্বাচনে জিতলে বার্মিংহাম শহরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে সেখানে একটি ‘স্পেস-পোর্ট’ বা মহাকাশ বন্দর তৈরি করবেন। লর্ড বাকেটহেড এখানেই থামেননি। তিনি ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের বিরুদ্ধে এবং ২০১৭ সালে থেরেসা মে’র বিরুদ্ধেও একই আসনে তিনি প্রার্থী হন।

২০১৭ সালের সেই নির্বাচনে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ব্রিটিশ গায়িকা অ্যাডেলকে জাতীয়করণ করবেন এবং শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে সাইকেল দেবেন। যদিও তিনি কখনো জয়ের মুখ দেখেননি, কিন্তু ব্রিটেনের রাজনীতিতে তাঁর এই উপস্থিতি আইকনিক স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গ হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে।

প্রত্যেক আমেরিকান নাগরিককে একটি করে ছোট ঘোড়া উপহার দেবেন

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানেই বিপুল অর্থের প্রচারণা, কড়া বক্তৃতা আর বিশ্ব রাজনীতির টানটান উত্তেজনা। কিন্তু এই গম্ভীর পরিবেশে হঠাৎ করেই একেবারে ভিন্ন রঙ যোগ করেন ভারমিন সুপ্রিম। তিনি আলখাল্লা পরে, হাতে বিশাল টুথব্রাশ নিয়ে আর মাথায় টুপি হিসেবে কালো রঙের বড় বুট জুতো পরে প্রচারণায় নামেন। দেখলেই বোঝা যায়, এটা কোনো সাধারণ রাজনীতি নয়।

ভারমিনের প্রচারণার কৌশল হলো অবাস্তব সব প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া। সংগৃহীত ছবি
ভারমিনের প্রচারণার কৌশল হলো অবাস্তব সব প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া। সংগৃহীত ছবি

ভারমিনের প্রচারণার কৌশল হলো অবাস্তব সব প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া। এই রাজনীতিবিদ ভোটারদের কথা দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট হলে তিনি প্রত্যেক আমেরিকান নাগরিককে একটি করে ‘পনি’ বা ছোট ঘোড়া উপহার দেবেন। তাঁর যুক্তি, সবাই ঘোড়ায় চড়লে গাড়ির দূষণ কমবে। তিনি আরো প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হলে তিনি টাইম ট্রাভেল নিয়ে গবেষণা করবেন এবং জম্বিদের আক্রমণ থেকে পৃথিবীকে বাঁচাবেন।

ক্ষমতায় গেলে আইন পাস করে মহাকর্ষের নিয়ম বাতিল করে দেওয়া হবে!

কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘রাইনোসরাস পার্টি’ বা গন্ডার দল এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি টানা তিন দশক ধরে কানাডার রাজনীতিতে ব্যাপক হাস্যরসের জন্ম দিচ্ছে। তাদের দলের প্রতীক ছিল গন্ডার ‘কর্নেলিয়াস দ্য ফার্স্ট’।

এই প্রতীক বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলত, রাজনীতিবিদরা গন্ডারের মতোই মোটা চামড়ার। তাই এর চেয়ে ভালো প্রতীক আর হয় না।

রাইনোসরাস পার্টির ইশতেহার ছিল একেবারেই আজব। তারা ঘোষণা দেয়, ক্ষমতায় গেলে আইন পাস করে মহাকর্ষের নিয়ম বাতিল করে দেওয়া হবে! এছাড়া কানাডার ভৌগোলিক মানচিত্র বদলে ফেলার মতো অদ্ভুত পরিকল্পনাও ছিল তাদের। তারা রকি মাউন্টেনকে নিচু করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যাতে পূর্ব ও পশ্চিম কানাডার মানুষ একে অপরকে সহজে দেখতে পায়।

যদিও দলটি কখনোই কোনো নির্বাচনে জয় পায়নি, তবু ১৯৯৩ সালে বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত কানাডার রাজনীতিতে হাসি আর ব্যঙ্গের কমতি রাখেনি রাইনোসরাস পার্টি।

দুর্নীতি লুকোবেন না, প্রকাশ্যেই করবেন

আইসল্যান্ডের রাজনীতিতে ২০১০ সাল ছিল সত্যিই চমকপ্রদ। সে সময় দেশটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। মানুষ প্রচলিত রাজনীতিবিদদের ওপর বিরক্ত, আস্থা প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। ঠিক সেই সময়ে রাজধানী রেইকজাভিকের মেয়র নির্বাচনে কমেডিয়ান জন নার ‘বেস্ট পার্টি’ গঠন করে নির্বাচনে দাঁড়ান।

জন নার কোনো রাখঢাক না রেখেই স্লোগান দিয়েছিলেন যে, তিনি এবং তাঁর দল প্রকাশ্যে দুর্নীতি করবেন! তাঁর যুক্তি ছিল সোজাসাপটা, অন্য সব রাজনীতিবিদ গোপনে দুর্নীতি করেন এবং ধরা পড়লে অস্বীকার করেন। কিন্তু তিনি অন্তত এ ব্যাপারে ভোটারদের কাছে সৎ থাকবেন।

‘পোলিশ বিয়ার লাভার্স পার্টি’। সংগৃহীত ছবি
‘পোলিশ বিয়ার লাভার্স পার্টি’। সংগৃহীত ছবি

জন নারের প্রতিশ্রুতিগুলোও ছিল বেশ অদ্ভুত। তিনি বলেন, চিড়িয়াখানায় পোলার বিয়ার আনা হবে, সব সুইমিং পুলে বিনামূল্যে তোয়ালে দেওয়া হবে, আর ডিজনিল্যান্ডের মতো পার্ক বানানো হবে।

হাস্যরসাত্মকভাবে প্রচারণা চালালেও নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, জন নারের ‘বেস্ট পার্টি’ ৩৪.৭% ভোট পেয়ে শহরের কাউন্সিলে ৬টি আসন জিতে নিয়েছে! জন নার সত্যিই রেইকজাভিকের মেয়র নির্বাচিত হন এবং চার বছর সফলতার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করেন।

মদের বদলে বিয়ার, ভোটারদের মন জিতল নতুন তত্ত্ব

পোল্যান্ডে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে এমন একটি দল গঠিত হয়েছিল, যাদের পুরো রাজনীতিই আবর্তিত ছিল বিয়ারকে ঘিরে। দলটির নাম ছিল ‘পোলিশ বিয়ার লাভার্স পার্টি’। এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা জানুসজ রেউইনস্কি প্রচারণায় বলেছিলেন, মানুষ যদি ভদকার মতো কড়া পানীয় ছেড়ে বিয়ার খাওয়ার অভ্যাস করে, তবে তাঁরা কম মাতাল হবে এবং রাজনৈতিক আলোচনাগুলো আরও যুক্তিসঙ্গত হবে।

শুনতে হাস্যকর লাগলেও, এই ‘বিয়ার তত্ত্ব’ অনেক ভোটারের মন ছুঁয়ে যায়। ফলাফল হিসেবে দলটি প্রায় ৩ শতাংশ ভোট পায় এবং পোল্যান্ডের সংসদ ‘সেজম’-এ ১৬টি আসন জিতে নেয়। মজার ছলে জন্ম নেওয়া একটি দল যে সংসদে জায়গা করে নিতে পারে, সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় চমক।

ভোট চাইতে নেমে এল ভ্যাম্পায়ার!

২০০৬ সালে আমেরিকার মিনেসোটা রাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। জোনাথন শার্কি নামের এক ব্যক্তি নির্বাচনে দাঁড়ান, যিনি নিজেকে ‘দ্য ইম্পেলার’ নামে পরিচয় দিতেন। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তিনি নিজেকে একজন ভ্যাম্পায়ার বলে দাবি করতেন। তাঁর প্রচারণাও ছিল ভয়ংকর ধরনের। তিনি বলতেন, নির্বাচিত হলে অপরাধীদের ঠিক সেইভাবে শাস্তি দেবেন, যেভাবে গল্পে ভ্যাম্পায়াররা দেয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত