বিশ্ব চকলেট দিবস

নারীরা যেভাবে চকলেট ভালোবাসতে শিখল

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ২০: ৪৫
নারীরা যেভাবে চকলেট ভালোবাসতে শিখল। ছবি: এআই/স্ট্রিম গ্রাফিক

চকলেট খেতে পছন্দ করে না এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। ভালোবাসা প্রকাশ কিংবা অভিমান ভাঙাতে চকলেটের চেয়ে ভালো কোনো উপহার হতেই পারে না! বিশেষ করে, নারীদের কাছে চকলেট দারুণ জনপ্রিয়। মনে হয়, এটি যেন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। যেন যুগ যুগ ধরে এমনটাই চলে আসছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা।

আঠারশ দশকের শেষের দিকে চিনি উৎপাদন সহজ হয়ে যায়। তখন সমাজে নারীদের অবস্থানও কিছুটা বদলাতে শুরু করে। এই সুযোগ কাজে লাগায় বিজ্ঞাপন কোম্পানিগুলো। তারা ইচ্ছে করে চকলেট আর মিষ্টির বিজ্ঞাপনে মেয়েদের এমনভাবে দেখাতে শুরু করে, যেন মিষ্টি কিছু মানেই মেয়েদের খাবার।

নারীদের ‘প্রচুর’ চকলেট খাওয়া যখন ‘জাতীয় ব্যর্থতা’

যদিও চকলেটের শুরুর দিকের বিজ্ঞাপনগুলোতে ছোট ছোট শিশু, ডানাওয়ালা পরী বা বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্র দেখা যেত। চিনিজাতীয় খাবার কিংবা চকলেটকে খুব দামী খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যা কেবল সমাজের ধনীরাই কিনতে পারতেন।

আঠারশ দশকের শেষের দিকে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে চিনির দাম কমতে থাকে হু হু করে। ফলে চিনি হুট করে সবার কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠল। ১৮৭৪ সালে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা যায়, ‘ধনী পরিবারের তরুণী মেয়েরা অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল ফ্রেঞ্চ ক্যান্ডি বা মিষ্টি কেনে কিংবা তাদের জন্য কিনে উপহার দেওয়া হয়।’

তবে পুষ্টিবিদ জ্যাকলিন এর পেছনে মিডিয়ার প্রচারণাকেই দায়ী করছেন। তাঁর মতে, ‘এর পেছনে হয়তো কিছু শারীরিক কারণ থাকতে পারে। তবে নারীদের এই চকলেট ক্রেভিং যে হরমোনজনিত—এই বিষয়টিকে চকলেট কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে অতিরঞ্জিত করেছে।’

১৮৭৬ সালে নিউ ইয়র্কের একজন বাসিন্দা ব্রিটিশ পরিবারে চিঠি পাঠান। সেখানে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি লিখেছিলেন, নারীদের ক্যান্ডি খাওয়ার পরিমাণ ‘প্রচুর’ এবং এটি ‘মস্ত বড় জাতীয় ব্যর্থতা।’

‘এক বক্স চকলেট আপনার প্রিয়তমাকে সবসময় মিষ্টিময় রাখবে’

১৮৯৫ সালে যুক্তরাজ্যের ‘লোনি চকলেট’ নারী ও চকলেটকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেয়। তারা নারীদের নিয়ে পাঁচটি বিজ্ঞাপন তৈরি করে এবং এই বিজ্ঞাপনগুলো তখন বেশ আলোড়ন ফেলেছিল। কারণ, ভিক্টোরিয়ান যুগের শালীনতার মাপকাঠি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সে আমলে একজন নারীর জনসমক্ষে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করাকে (এমনকি তা যদি চকলেটের জন্যও হয়!) ‘আলাদা চোখে’ দেখা হতো। ফলে লোনি চকলেটের বিজ্ঞাপন পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘মেল গেজ’-কে বিজ্ঞাপন জগতে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

এরপর থেকে চকলেটের বিজ্ঞাপন দুটি আলাদা ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বক্সের ভেতরে থাকা চকলেটগুলোর গায়ে লাগানো হয় ‘রোমান্সের রং’ এবং সেগুলো প্রেমিকদের উদ্দেশ্যে মার্কেটিং করা শুরু হয়। যেমন ১৯৩৭ সালের রউন্ট্রি চকলেটের বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘এক বক্স চকলেট আপনার প্রিয়তমাকে সবসময় মিষ্টিময় রাখবে।’ অর্থাৎ, চকলেট হলো নারীকে শান্ত ও বশে রাখার হাতিয়ার!

অন্যদিকে, কোকো পাউডারের প্রচার শুরু হলো মূলত পরিবারের মা ও স্ত্রীদের লক্ষ্য করে। ১৯৫১ সালে ‘জে. ওয়াল্টার থম্পসন’ নামের বিজ্ঞাপন সংস্থা থেকে ‘রউন্ট্রি চকলেট’ কোম্পানিকে দেওয়া ব্রিফ থেকেই তা স্পষ্ট হয়। সেখানে লেখা ছিল: ‘আমরা মা ও স্ত্রীদের কাছে কোকো বিক্রি করছি। কারণ নিঃসন্তান পরিবারের চেয়ে সন্তান আছে এমন পরিবারেই কোকো বেশি খাওয়া হয়। তাছাড়া নারীরাই পরিবারের জন্য বেশি কেনাকাটা করেন। একজন নারীকে স্বামী ও সন্তানের ভালোর জন্য কাজ করতে যেভাবে অনুপ্রাণিত করা যায়, নিজের স্বার্থে হয়তো তা কখনোই করবেন না। ... তাই এই অনুভূতি কাজে লাগিয়ে আমাদের বিজ্ঞাপন তৈরি করতে হবে। আর এভাবেই আমরা তাকে রউন্ট্রি কোকো কিনতে বাধ্য করব।’

এরপর থেকে থম্পসন এমন সব বিজ্ঞাপন তৈরি করতে লাগলেন যেখানে লেখা থাকত, ‘যেদিন থেকে রউন্ট্রি কোকো আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে উঠেছে, সেদিন থেকে পরিবারের সবার স্বাস্থ্য অনেক উন্নত হয়েছে।’

১৯৩০ সালের বিজ্ঞাপন। সংগৃহীত ছবি
১৯৩০ সালের বিজ্ঞাপন। সংগৃহীত ছবি

কেবল রউন্ট্রি চকলেট একাই এই কাজ করেনি। ১৯৫০-এর দশকে ক্যাডবেরির একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একজন মা ক্যাডবেরি বারের ওপর দুটি গ্লাস থেকে দুধ ঢালছেন এবং গ্লাস দুটিকে এমনভাবে ধরেছেন যা দেখে মনে হয়, মায়ের দুধই সরাসরি চকোলেটে যাচ্ছে। অর্থাৎ মায়ের দুধের মতোই নিরাপদ এই চকলেট। যদিও এই বিজ্ঞাপনে ‘ডাবল মিনিং’ খুঁজে পেয়েছেন অনেকে।

চকলেটের বিজ্ঞাপনে পুরুষের উপস্থিতি তেমন দেখা যায়না কেন

ষাটের দশকের শুরুতে চকলেটের বিজ্ঞাপন থেকে পুরুষ মোটামুটি গায়েব। কারণ ততদিনে নারী ও চকলেটের সম্পর্ক সমাজে পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। সেসময়কার বিজ্ঞাপনগুলোতে দেখানো হয় চকলেটের মাধ্যমে নারীরা নিজেদের যত্ন নিজেরাই নিতে পারেন। শুধু অতীতেই নয়, আজও অনেক বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একজন নারী চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন আর আবেদনময়ী ভঙ্গিতে চকলেট উপভোগ করছেন। বিজ্ঞাপনে কোনো পুরুষ নেই; কেবল নারীর প্রয়োজন আর আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।

১৯৫৭ সালের বিজ্ঞাপন। সংগৃহীত ছবি
১৯৫৭ সালের বিজ্ঞাপন। সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল চকলেট কোম্পানির সিইও জিন থম্পসন এই বিপণন কৌশল নিয়ে বলেন, ‘চকলেট শিল্প সম্পর্কে আমার শুরুর দিকের পর্যবেক্ষণ ছিল-এখানে পুরুষরা নারীদের উদ্দেশ্য করে চকলেটের মার্কেটিং করছে। বিজ্ঞাপনগুলোতে দেখা যেত নারীরা হালকা পোশাক পরে সোফায় শুয়ে আছেন এবং তাঁদের পুরুষ সঙ্গী কখন চকলেট উপহার দেবে, সেই অপেক্ষায় দিন গুনছেন। অথচ আমি জানতাম যে আমার বন্ধুরা কিংবা আমি মোটেও এভাবে চকলেট কিনি না! আমরা চকলেট তখনই খাই যখন আমরা খুশি থাকি কিংবা কষ্টে থাকি অথবা কোনো উৎসব উদ্‌যাপন করি কিংবা কোনো কারণ ছাড়া এমনিই খাই।’

মুড সুইং-এর সঙ্গে কি আসলেই চকলেটের সম্পর্ক আছে

তবে নারীর সঙ্গে চকলেটের সম্পর্ক শুধু মার্কেটিং কৌশলের কারণে হয়েছে, তা নয়। নারীর মুড সুইং বা হরমোনের ওঠানামার সঙ্গেও চকলেটের সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, পিরিয়ড চলাকালীন সময় নারীর মুড সুইং হয়েছে বলে তিনি ডার্ক চকলেট খাচ্ছেন বা কোনো প্রিয়জন তাঁকে চকলেট উপহার দিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পুষ্টিবিদ ও পিসিওএস বিশেষজ্ঞ কোরি রুথ বলেন, ‘শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা এবং মেজাজ বা মুডের মধ্যে সংযোগ থাকতে পারে। চকলেট ম্যাগনেসিয়ামের অন্যতম উৎস। তাই পিএমএস বা প্রিম্যানস্ট্রুয়াল সিনড্রোমের কারণে আমাদের মন-মেজাজ আচমকাই খারাপ হয়ে যেতে পারে। তখন আমরা প্রায়ই চকলেট খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করি। চকলেট খেলে মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করা নিউরোট্রান্সমিটার ‘সেরোটোনিন’-এর মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। তাই এক অর্থে চকলেট খাওয়াকে নিজের মনের স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসা বা সেলফ-মেডিকেটিং বলা যেতে পারে!’

তবে পুষ্টিবিদ জ্যাকলিন এর পেছনে মিডিয়ার প্রচারণাকেই দায়ী করছেন। তাঁর মতে, ‘এর পেছনে হয়তো কিছু শারীরিক কারণ থাকতে পারে। তবে নারীদের এই চকলেট ক্রেভিং যে হরমোনজনিত—এই বিষয়টিকে চকলেট কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে অতিরঞ্জিত করেছে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত