দাস ও শ্রমিকদের পুষ্টি জোগানো খাবার হিসেবে কাঁঠালকে বেছে নিয়েছিল ব্রিটিশরা!

ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা কাঁঠালকে শুধু একটি ফল হিসেবে দেখেনি; সস্তায় দাস ও শ্রমিকদের পুষ্টি জোগানোর সম্ভাব্য খাদ্যসম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করেছিল। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমশক্তিকে টিকিয়ে রাখার অর্থনৈতিক প্রয়োজন থেকেই কাঁঠালের মতো সহজলভ্য ও পুষ্টিকর ফলের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল হলেও এটি যে সবার কাছে জনপ্রিয়, তা কিন্তু নয়। অনেকে কাঁঠাল দেখলেই নাক সিটকান। এমনকি কেন এটি দেশের জাতীয় ফল তা নিয়েও প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক চলে ফেসবুকে।

ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজরাও কাঁঠালকে খুব একটা পাত্তা দিত না। হয়তো সে জন্যই তারা এর ইংরেজি নাম দিয়েছিল ‘জ্যাকফ্রুট’, যার অর্থ দাঁড়ায় সাধারণ মানুষ বা আমজনতার ফল। আভিজাত্যের লড়াইয়ে এই ফলটি তাদের টেবিলে তেমন জায়গা করে নিতে পারেনি।

তবে শুধুমাত্র নামকরণে নয়, ঐতিহাসিকভাবেও কাঁঠাল ছিল সাধারণের খাবার। দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ সমাজে এটি দীর্ঘদিন ধরে সস্তা, সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরাও কাঁঠালের এই ব্যবহারিক মূল্য বুঝেছিল। বড় আকার, বেশি ফলন এবং কম খরচে পুষ্টি জোগানোর ক্ষমতার কারণে দাসশ্রম ও শ্রমিক শ্রেণির খাদ্য হিসেবে কাঁঠালকে কৌশলগতভাবে ব্যবহারের চিন্তা করা হয়েছিল।

ইতিহাসের পথ ধরে কাঁঠালের আদি নিবাসের সন্ধানে

ভারতীয় উপমহাদেশের খাদ্যসংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কাঁঠালের সম্পর্ক অনেক গভীর ও পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ফলের জন্ম হয়েছে ভারতের মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও কেরালা অঞ্চলে। খাদ্য বিশেষজ্ঞ কে. টি. আচার্যের তথ্য অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৩ থেকে ৬ হাজার বছর আগেই এই অঞ্চলে কাঁঠালের চাষ শুরু হয়েছিল।

শত বছর ধরেই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঁচা কাঁঠাল বা ‘এঁচড়’-কে মাংসের বিকল্প হিসেবে রান্না করা হয়। বিশেষ করে পশ্চিম বাংলায় এটি এতটাই জনপ্রিয় যে, রান্নার পর এর স্বাদ ও গঠন খাসির মাংসের মতো মনে হয় বলে একে প্রায়ই ‘গাছ পাঁঠা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

অন্য একটি গবেষণায় (১৯৮০ সাল) জানা যায়, কাঁঠাল মূলত পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পাদদেশীয় অঞ্চলের নিজস্ব ফল। সেখান থেকেই এটি বিশ্বের অন্যান্য উষ্ণপ্রধান দেশে ছড়িয়ে পড়ে। উনবিংশ শতাব্দীর সুইস উদ্ভিদবিজ্ঞানী অগাস্টিন পিরামাস দে ক্যান্ডোলের মতে, পাঞ্জাব থেকে শুরু করে চীন এবং হিমালয় থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিশাল দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বহু যুগ ধরেই কাঁঠালের চাষ হয়ে আসছে।

পশ্চিমা বিশ্বেও কাঁঠাল খুব পুরোনো। ‘অক্সফোর্ড কম্প্যানিয়ন টু ফুড’-এর তথ্য অনুযায়ী, কাঁঠালের ওজন কখনো কখনো ৪০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এই বিশাল আকারের কারণে কাঁঠাল গাছের ডালে জন্মানো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফল হিসেবে স্বীকৃত। চতুর্দশ শতাব্দীতে এক পরিব্রাজক তো কাঁঠালের আকার বোঝাতে একে ভেড়ার ছানা বা তিন বছর বয়সী শিশুর সাথে তুলনা করেছিলেন।

কাঁঠালের স্বাদ ও পুষ্টিগুণও দারুণ বৈচিত্র্যময়। কাঁচা অবস্থায় কাঁঠালের ভেতরটা স্টার্চ বা শ্বেতসারে ভরপুর থাকে। আর পাকলে এর রূপ পালটে যায়। খাদ্যবিষয়ক লেখক তেজাল রাওয়ের মতে, কাঁঠাল পাকার পর এতে কিছুটা মিষ্টি ভাব ও তীব্র গন্ধ তৈরি হয়। তখন এর স্বাদ হয় আনারসের মতো চমৎকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয়।

ইউরোপীয়রা যখন দক্ষিণ এশিয়ায় এল, তাদের কেউ কেউ কাঁঠালের স্বাদ ও গুণের প্রশংসাও করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর পর্তুগিজ চিকিৎসক গার্সিয়া দা ওর্তা তাঁর একটি বইয়ে কাঁঠালের গুণের প্রশংসা করে লিখেছিলেন, ‘কাঁঠালের বিচিগুলো পোড়ালে ঠিক চেস্টনাটের (ইউরোপ এবং আমেরিকার এক প্রকার বাদাম-জাতীয় ফল) মতো স্বাদ লাগে। আর এখন তুমি এর ভেতরের হলুদ কোয়াগুলো খেতে পারো, যেগুলোর স্বাদ বেশ চমৎকার।’

গম ও চালের পরিবর্তে খাওয়ানো হতো কাঁঠাল ও ব্রেডফ্রুটজাতীয় ফল

ইতিহাসবিদ রিচার্ড গ্রোভের তথ্য অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্ভিদবিজ্ঞানী উইলিয়াম রক্সবার্গ দক্ষিণ ভারতের বোটানিক্যাল গার্ডেনগুলোতে কাঁঠালকে গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করেন। শুধু তাই নয়, তিনি শ্রীলঙ্কায় কাঁঠাল গাছ লাগানোরও পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন ব্রিটিশদের ভুল খাদ্যনীতির কারণে ওই এলাকাগুলোতে বারবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিত। ধারণা করা হয়, এই খাদ্যসংকট মেটানোর লক্ষ্যেই তিনি কাঁঠাল চাষের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, রক্সবার্গের মতো ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা দুর্ভিক্ষ রুখতে এবং শ্রমিকদের সস্তায় খাবার জোগাতে বিশ্বজুড়ে ‘ডালিম বা ডেউয়া জাতীয় ফল’ ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে এই ধরণের ফল স্থানান্তরের কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু দাস ও দরিদ্র প্রজাদের ক্ষুধা মেটাতে এবং তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ব্রিটিশরা যে কাঁঠালকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, সেই ইতিহাস অনেকেরই অজানা।

ইতিহাসবিদ অ্যানিয়া জিলবারস্টেইনের মতে, ইংরেজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ ব্যাঙ্কস আমেরিকা থেকে গম ও চাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দাসদের খাওয়ানোর খরচ কমাতে সাউথ সিজ থেকে ব্রেডফ্রুটের পাশাপাশি কাঁঠালও ওয়েস্ট ইন্ডিজে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

পশ্চিমা দেশগুলোতে জনপ্রিয়তা পেল না কাঁঠাল

১৭৮৭ সালে লেখা একটি চিঠিতে উদ্ভিদবিজ্ঞানী ব্যাঙ্কস কাঁঠালকে এর পুষ্টিগুণের কারণে ‘অত্যন্ত মূল্যবান ফল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে কাঁঠাল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের খাদ্য সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তবে দক্ষিণ এশিয়া বা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে জনপ্রিয় হলেও, যুক্তরাজ্যের মূল ভূখণ্ডে কাঁঠাল শুরুতে তেমন পাত্তা পায়নি। এর মূল কারণ ছিল ইংল্যান্ডের ঠান্ডা জলবায়ু, যা কাঁঠাল চাষের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। পাশাপাশি, ঔপনিবেশিক মানসিকতার কারণে ইউরোপীয়রা কাঁঠালের তীব্র গন্ধকে ‘কটু’ বা ‘বিরক্তিকর’ বলে এড়িয়ে চলত। ফলে এক সময় পশ্চিমাদের কাছে কাঁঠাল একপ্রকার হারিয়েই গিয়েছিল।

তবে বিগত কয়েক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে কাঁঠালকে এর পুষ্টিগুণের জন্য মাংসের নতুন বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও খাদ্যবিষয়ক আলোচনায় কাঁঠালকে এখন উদ্ভিদভিত্তিক মাংসের বিকল্প হিসেবে নতুনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর একটি প্রবন্ধ প্রশ্ন তুলেছে, ‘কাঁঠালই কি মাংসের পরবর্তী বিকল্প?’

তবে বিশ্বব্যাপী নিরামিষাশীদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে এই ধারণা মোটেও নতুন নয়। শত বছর ধরেই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঁচা কাঁঠাল বা ‘এঁচড়’-কে মাংসের বিকল্প হিসেবে রান্না করা হয়। বিশেষ করে পশ্চিম বাংলায় এটি এতটাই জনপ্রিয় যে, রান্নার পর এর স্বাদ ও গঠন খাসির মাংসের মতো মনে হয় বলে একে প্রায়ই ‘গাছ পাঁঠা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত