হিরো আলম যখন ‘ক্রিঞ্জ’, তারও রাজনীতি আছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ১৬: ৪৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৩ সালের মার্চে প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, হিরো আলমের মতো ব্যক্তিত্বের উত্থান সমাজে এক ধরনের ‘রুচির দুর্ভিক্ষের’ ইঙ্গিত বহন করে। তাঁর ভাষায়, এটি ‘কুরুচি’, ‘কুশিক্ষা’ ও ‘অপসংস্কৃতি’ বিস্তারের লক্ষণ। এর জবাবে হতাশা প্রকাশ করে হিরো আলম বলেছিলেন, ‘আমি যদি আপনাদের রুচির সঙ্গে খাপ না খেয়ে থাকি, তাহলে আপনারা হিরো আলমকে মেরে ফেলুন।’

স্বল্প বাজেটে নির্মিত বলিউডি গানের প্যারোডি, অতিনাটকীয় অভিনয়ভঙ্গি এবং অপেশাদার ভিডিও নির্মাণের মধ্য দিয়ে হিরো আলম দেশীয় ডিজিটাল সেলিব্রিটিতে পরিণত হয়েছেন। তাঁর খ্যাতি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা বা পরিশীলিত নান্দনিকতার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়নি। হিরো আলমের ভিডিওগুলোতে অতিরিক্ত আবেগপ্রকাশ, সাধারণ মানের ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট, অস্বাভাবিক রোমান্টিক জুটি, অতিরঞ্জিত মুখভঙ্গি কিংবা অপেশাদার লিপ-সিঙ্ক দেখা যায়। এসব বৈশিষ্ট্যকে বহু দর্শক ‘বেমানান’, ‘অতিরঞ্জিত’ বা ‘হাস্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু ঠিক এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মাধ্যমেই তিনি এমন এক ‘আরোপিত নন্দনতত্ত্ব’ তৈরি করেন, যা প্রচলিত সিনেমা-রুচি, শ্রেণিনির্ভর অভিনয়ধারা এবং কাঙ্ক্ষিত পুরুষত্বের মানদণ্ডকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

দক্ষিণ এশিয়া ও প্রবাসী বাঙালি সমাজের গ্রামীণ এবং উপশহরকেন্দ্রিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হিরো আলম বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও তাঁর ডিজিটাল উপস্থিতি সমানভাবে বিদ্রূপ, ঠাট্টা ও উপহাসে পূর্ণ। ইউটিউবের মন্তব্য বিভাগে তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ‘রোস্ট’ ভিডিও, তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য এবং ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া। তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য, উচ্চারণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি আত্মবিশ্বাসী আত্ম-উপস্থাপনাকেও রসিকতার উপাদানে পরিণত করা হয়।

সম্প্রতি ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি শীলচরের দুই গবেষক—অভিষেক রায় ও দিয়ালী ভট্টাচার্য হিরো আলমকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁদের গবেষণাপত্র ‘হিরো আলম অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব ক্রিঞ্জ’ গত ১৩ মার্চ আন্তর্জাতিক জার্নাল সেলিব্রেটি স্টাডিজে প্রকাশিত হয়। এই গবেষণায় হিরো আলমের ব্যক্তিত্ব, কনটেন্ট এবং ডিজিটাল দৃশ্যমানতাকে ‘ক্রিঞ্জ’ ধারণার মাধ্যমে তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণাটিতে ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দ্যিয়ুর ‘রুচি’ বিষয়ক তত্ত্বকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বুর্দিয়্যুর তত্ত্ব দেখায়, কীভাবে সাংস্কৃতিক আধিপত্য সামাজিক সীমানা নির্মাণের মাধ্যমে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে গবেষকদের মতে, ডিজিটাল পরিসরে মানুষ যেভাবে লজ্জা, উপহাস, অস্বস্তি ও বিদ্রূপ ভাগাভাগি করে সামাজিক বিচার গড়ে তোলে, তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বুর্দিয়্যুর তত্ত্ব সীমাবদ্ধ। কারণ ‘ক্রিঞ্জ’ কেবল সামাজিক পার্থক্যের রাজনীতি নয়; এটি একই সঙ্গে একটি সংবেদনশীল, আবেগনির্ভর এবং প্ল্যাটফর্ম-নির্ভর অভিজ্ঞতা।

অনলাইন ক্রিঞ্জ সংস্কৃতিতে দর্শকরা একদিকে কাউকে উপহাস করে, অন্যদিকে তার প্রতি প্রকৃত আগ্রহও পোষণ করে। ফলে বিদ্রূপ ও আবেগগত আকর্ষণের মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

গবেষকদের ভাষায়, ‘ক্রিঞ্জ’ হলো এমন এক ধরনের পরোক্ষ লজ্জাবোধ, যা কোনো ব্যক্তির ‘অযৌক্তিক’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ ইতিবাচক আত্ম-উপস্থাপনা থেকে জন্ম নেয়। এর মাধ্যমে দর্শকরা নিজেদের তুলনামূলকভাবে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখে এবং সমষ্টিগত ঠাট্টা-বিদ্রূপের ভেতর দিয়ে সামাজিক বন্ধন তৈরি করে। সেই অর্থে ‘ক্রিঞ্জ’ কেবল হাস্যরস নয়; এটি একটি নিয়ন্ত্রণমূলক আবেগও। এই আবেগ সমষ্টিগতভাবে উৎপাদিত হয় এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষকেরা হিরো আলমকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনপরিসরের আলোচনাকে বৃহত্তর এক আবেগগত অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখিয়েছেন, যেখানে বিদ্রূপ, অপমান এবং বর্জনও আনন্দদায়ক ও অংশগ্রহণমূলক যোগাযোগে রূপ নেয়। তাঁদের মতে, হিরো আলমকে ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে ব্যবহার করলে বোঝা যায়, কীভাবে ‘ক্রিঞ্জ’ গড়ে ওঠে ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষা, দেশজ অতিরঞ্জন, অতিনাটকীয় অভিনয় এবং গণমাধ্যমে আত্ম-উন্মোচনের সংযোগস্থলে।

হিরো আলমকে নিয়ে গবেষণা করেছেন ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি শিলচরের দুই গবেষক—অভিষেক রায় ও দিয়ালী ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত
হিরো আলমকে নিয়ে গবেষণা করেছেন ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি শিলচরের দুই গবেষক—অভিষেক রায় ও দিয়ালী ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে পর্দায় উপস্থিত হওয়ার অর্থই যেন বিচারাধীন হওয়ার ঝুঁকি গ্রহণ করা। কে ‘ভদ্র’, ‘রুচিশীল’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং কে ‘ক্রিঞ্জ’ হিসেবে চিহ্নিত হবে—তা ক্রমশ নান্দনিক নজরদারি এবং অ্যালগরিদমিক শাসনের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে।

গবেষণাটিতে ‘মাইক্রো-সেলিব্রিটি’ ধারণার আলোকে হিরো আলমকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে ধারাবাহিক সেলফ-ব্র্যান্ডিং, নিয়মিত কনটেন্ট নির্মাণ এবং অংশগ্রহণমূলক প্রচারণার মাধ্যমে দৃশ্যমানতা তৈরি হয়। কিন্তু এই দৃশ্যমানতার সঙ্গেই জুড়ে থাকে তীব্র সমালোচনা, বিদ্রূপ এবং সামাজিক উপহাস। ফলে হিরো আলমের ভাইরাল জনপ্রিয়তা ও সমষ্টিগত উপহাস একই সঙ্গে সহাবস্থান করে।

গবেষণাটি আরও দেখায়, ‘ক্রিঞ্জ’ আসলে শ্রেণি ও লিঙ্গভিত্তিক মূল্যায়নেরও একটি বিশেষ রূপ। এটি বাঙালি জনপরিসরে দৃশ্যমানতা, সামাজিক আকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বৈধতাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি আবেগগত পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে।

গবেষণার জন্য গবেষকেরা হিরো আলমের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল থেকে নির্বাচিত ভিডিও বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে তাঁরা দেখতে পেয়েছেন, বাঙালি দর্শকেরা নিজেদের উদ্বেগ, অস্বস্তি ও সাংস্কৃতিক উৎকণ্ঠাকে বিদ্রূপ, রসিকতা এবং ‘আয়রনিক দর্শকত্ব’-এর মাধ্যমে প্রকাশ করে। ফলে হিরো আলমকে ঘিরে তৈরি হওয়া ‘ক্রিঞ্জ’কে কেবল নান্দনিক ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি দক্ষিণ এশীয় সমাজে হাস্যরস, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, আকাঙ্ক্ষা এবং দেশজ আত্ম-উপস্থাপনার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ।

গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—হিরো আলমের ভিডিওর প্ল্যাটফর্মগত অবস্থান। তাঁর ভিডিওগুলোতে অতিরঞ্জিত মুখভঙ্গি, সাধারণ মানের গ্রিন-স্ক্রিন ইফেক্ট এবং অপেশাদার লিপ-সিঙ্ক ব্যবহৃত হয়, যা টিকটকের দেশজ, ক্ষণস্থায়ী ও ভাইরাল সংস্কৃতির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। টিকটক প্ল্যাটফর্মে স্বল্প সময়ের মনোযোগ, ভাইরাল অনুকরণ, কম ইন্টারনেট খরচ এবং সহজ অংশগ্রহণের জন্য ভিডিও তৈরি করা হয়। এই ভিডিওগুলোতে নিখুঁত মানের চেয়ে পারফরম্যান্স বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু একই নান্দনিকতা যখন ইউটিউবের দীর্ঘ ভিডিওভিত্তিক এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ-প্রযোজনামানের পরিবেশে স্থানান্তরিত হয়, তখন সেটি ‘অতিরিক্ত’, ‘বেমানান’ কিংবা ‘ক্রিঞ্জ’ হিসেবে গণ্য হয়। গবেষকদের মতে, ইউটিউবে পরিষ্কার ছবি, উন্নত এডিটিং, ভালো আলো, পরিষ্কার শব্দ এবং পেশাদার নির্মাণশৈলীকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে, হিরো আলমের ভিডিওগুলো কম বাজেটের এবং অপেশাদার ধরনের হওয়ায় সেগুলো প্রায়ই উপহাস বা বিদ্রূপের বিষয় হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ যে বিষয় টিকটকে স্বাভাবিক, মজার বা অংশগ্রহণমূলক বলে মনে হতে পারে, ইউটিউবে সেটিই ‘ক্রিঞ্জ’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ফলে সমস্যা শুধু কনটেন্টে নয়; বরং প্ল্যাটফর্ম বদলানোর কারণে দর্শকের প্রতিক্রিয়াও বদলে যায়।

গবেষকদের মতে, হিরো আলমকে ‘ক্রিঞ্জ’ মনে হওয়ার পেছনে কেবল তাঁর ভিডিওর বৈশিষ্ট্য দায়ী নয়; বরং টিকটকের ধারা যখন ইউটিউবের ভিন্ন নান্দনিক পরিবেশে এসে পড়ে, তখন সেই অসামঞ্জস্য থেকেই এই প্রতিক্রিয়া জন্ম নেয়। এখানে তাঁর গ্রামীণ ও শ্রমজীবী পটভূমিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ ইউটিউবের প্রভাবশালী নান্দনিক মানদণ্ড অনেক সময় শহুরে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত রুচি দ্বারা নির্ধারিত।

পৌরুষের সংকট

এই সামাজিক বিচার কেবল শ্রেণিভিত্তিক নয়; এটি গভীরভাবে লিঙ্গভিত্তিকও। হিরো আলমকে নিয়ে উপহাসের একটি বড় কারণ হলো, তিনি প্রচলিত বাঙালি নায়কের চেহারা ও আচরণের সঙ্গে মেলে না। বাংলা সিনেমা ও বলিউডে ‘নায়ক’ বলতে সাধারণত বোঝানো হয়—লম্বা গড়নের, ফর্সা, পরিপাটি পোশাক পরা, আত্মবিশ্বাসী ও আকর্ষণীয় পুরুষকে। হিরো আলমের শারীরিক গঠন, গায়ের রং এবং গ্রামীণ উচ্চারণ এই প্রতিষ্ঠিত পৌরুষের ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না। ফলে অনেক দর্শকের কাছে তাঁর পৌরুষ ‘ব্যর্থ’, ‘হাস্যকর’ কিংবা ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মনে হয়। তাই তাঁকে নিয়ে উপহাস কেবল অভিনয়ের কারণে নয়; বরং সমাজে প্রচলিত পৌরুষের ধারণার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

‘বাঙালিত্ব’ প্রদর্শনের সীমা

গবেষণাটি ‘বাঙালিত্ব’ প্রদর্শনের সীমা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি সমাজে ভাষা, রুচি ও সংস্কৃতির কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারণ করে এসেছে কোন সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়। যদিও গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকগান বা জনপ্রিয় বিনোদনকে অনেক সময় গ্রহণ করা হয়েছে, তবুও সেগুলো সাধারণত উচ্চবিত্ত বা শিক্ষিত শ্রেণির মাধ্যমে ‘পরিশীলিত’ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই হিরো আলমকে বাঙালি সংস্কৃতির জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন।

ইউটিউবের মন্তব্যে প্রায়ই দেখা যায়—‘বাংলা সিনেমা ডুবে গেল’, ‘বাঙালি পরিচয় নষ্ট করে ফেলেছে’ ইত্যাদি মন্তব্য। এসব প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত করে যে, বহু মানুষের কাছে ‘সত্যিকারের’ বাঙালি সাংস্কৃতিক বৈধতা এখনও শহুরে, মধ্যবিত্ত এবং পুরুষকেন্দ্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে হিরো আলমকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাঙালি জনসাধারণের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার আসলে কার?

গবেষকদের মতে, হিরো আলমের ডিজিটাল পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি সংস্কৃতির নান্দনিক ও নৈতিক বৈধতার সীমানা নির্ধারণ করে আসা রুচি, পৌরুষ এবং শ্রেণিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তাঁর ঘটনা দেখায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে এমন এক সংঘাতপূর্ণ পরিসরে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিনোদনের ধরন, পৌরুষ, সামাজিক আকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বৈধতা জটিলভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এর মাধ্যমে বাঙালি পরিচয়ের প্রতীকী জগতে কে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কাকে ‘রুচিহীন’, ‘অতিরঞ্জিত’ বা ‘হাস্যকর’ বলে বাইরে ঠেলে দেওয়া হবে—সে বিষয়ে সমাজের অন্তর্নিহিত উদ্বেগগুলো প্রকাশ পায়।

সবশেষে গবেষণাটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ক্রিঞ্জকে কেবল নান্দনিক ব্যর্থতার প্রতি নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক ছাঁকনি, যার মাধ্যমে রুচির নামে শ্রেণি, লিঙ্গ ও আঞ্চলিক পরিচয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসকে আবেগগতভাবে নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করা হয়। দর্শকদের অস্বস্তির কারণ শুধু হিরো আলমের স্বল্প বাজেটের নির্মাণশৈলী নয়; বরং তাঁদের অস্বস্তির উৎস এই ধারণা যে, তিনি প্রতিষ্ঠিত ও অনুমোদিত বৈধতার গণ্ডির বাইরে থেকেও নিজেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আকর্ষণীয় এবং দৃশ্যমান হিসেবে উপস্থাপন করার সাহস দেখিয়েছেন।

অতএব, ক্রিঞ্জকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা মানে শুধু ভাইরাল সংস্কৃতি বোঝা নয়; বরং এটিও বোঝা যে, নেটওয়ার্কভিত্তিক জনপরিসর কেবল অ্যালগরিদম বা দৃশ্যমানতার প্রযুক্তিগত কাঠামো দ্বারা পরিচালিত হয় না। এর ভেতরে সক্রিয় থাকে সামাজিক পুনরুৎপাদনের যুক্তি, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের গভীর কাঠামো এবং আবেগগত নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। ফলে দৃশ্যমানতা নিজেই এক ধরনের সংগ্রামের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, যেখানে সামাজিক স্বীকৃতি অর্জন কিংবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার লড়াই ক্রমাগত চলতে থাকে।

সম্পর্কিত