নতুন প্রজন্ম কার্ল মার্ক্সকে কতটা চেনে

নতুন প্রজন্ম কার্ল মার্ক্সকে কতটা চেনে। স্ট্রিম গ্রাফিক

সকালের ঢাকায় এক রাইড-শেয়ার চালক ফোনের স্ক্রিনে নতুন ট্রিপের জন্য অপেক্ষা করছেন। ভাড়া কত হবে, কমিশন কত কাটা যাবে, দিনের শেষে হাতে কত থাকবে—এই হিসাবটা তিনি জানেন না, শুধু আন্দাজ করেন। অন্যদিকে, একটি কো-ওয়ার্কিং স্পেসে বসে এক তরুণ ফ্রিল্যান্সার রাত জেগে কাজ শেষ করছেন। ডেডলাইন, ক্লায়েন্ট, আর অনিশ্চিত আয়ের চাপ তাঁর প্রতিদিনের সঙ্গী। দুইজনের জীবন আলাদা—কিন্তু অনিশ্চয়তা একইরকম।

এই অনিশ্চয়তা কি শুধু ‘মডার্ন লাইফের স্ট্রেস’, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো অর্থনৈতিক কাঠামো কাজ করছে? এই প্রশ্ন থেকেই আসে এক নাম—‘কার্ল মার্ক্স।

৫ মে এলেই ইতিহাসের এই নামটি আবার আমাদের সামনে আসে। এ দিনেই জন্মেছিলেন মহামতি কার্ল মার্ক্স। কিন্তু প্রশ্নটা এখন আর কেবল ইতিহাসের নয়। প্রশ্নটা বর্তমানের। আজকের তরুণরা কি সত্যিই মার্ক্সকে চেনে? নাকি মার্ক্সকে না জেনেও তারা মার্ক্সের ব্যাখ্যা করে যাওয়া পৃথিবীতেই আটকে পড়ে আছে?

বর্তমান তরুণদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রলিংয়ে অসম বেতন, কর্পোরেট গ্রিড বা গিগ ইনকাম—এই শব্দগুলো খুবই পরিচিত। এগুলো কোনো দর্শনের বই থেকে উঠে আসা শব্দ মনে না হলেও, বাস্তবে এই সমস্যাগুলোর ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে ১৯শ শতকের সেই চিন্তাবিদের কাছে, যিনি পুঁজিবাদকে একদম মূল থেকে বিশ্লেষণ করেছিলেন।

পরিচিতি কতটুকু

ঢাকার এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাইশা। কার্ল মার্ক্সকে চেনেন কি না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম বর্ষের পাঠ্যতে তাঁর লেখা দুটি বইয়ের নাম ছিল। কি নাম মনে নেই।’

একই বর্ষের নগরপরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থী লাবিব জানান—নাম শুনেছি, তবে কোথায় মনে পড়ছে না।

অন্য দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সামিয়া দ্বিধাগ্রস্ত মনে প্রশ্ন করেন, ‘উনি কি অ্যানিমেল ফার্ম লিখেছেন না?’

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া এরকম আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীকে একই প্রশ্ন করলে দেখা যায়, তারা বেশিরভাগই কার্ল মার্ক্সকে চেনেন না অথবা তাঁর নাম শোনেননি। কয়েকজন শুধু নাম-ই শুনেছেন, তবে আর কিছু জানেন না।

বাস্তবতা হলো, আজকের অধিকাংশ তরুণ কখনো ‘ক্যাপিটাল’ খুলে দেখেনি। দ্য ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’র নাম হয়তো শুনেছেন। কিন্তু সেটি পড়েছেন এমন তরুণ লোক বিরল।

না জেনেও ‘মার্ক্সিস্ট’ হয়ে ওঠা

মার্ক্স সম্পর্কে না জানলেও তারা আয় বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক লোভ, সম্পদের বৈষম্য, কর্ম-অবসাদ বা চাপজনিত মানসিক ক্লান্তি—এ ধরনের শব্দগুলো ব্যবহার করছেন। কেন একই কাজের জন্য সবার আয় সমান নয়, কেন কর্পোরেট কোম্পানিগুলো এত বেশি ক্ষমতাশালী বা কেন ‘ফ্রিল্যান্স’ বা ‘গিগ’ কাজের স্বাধীনতার আড়ালে নিরাপত্তাহীনতা লুকিয়ে থাকে—এইসব প্রশ্ন করছেন।

মজার বিষয়, তারা যে শব্দগুলো ব্যবহার করছে এসব কোনো আধুনিক শব্দ নয়। এগুলোর পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন। এগুলোই ছিল মার্ক্সের মূল প্রশ্ন—যা তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ এবং পুঁজির কাঠামো দিয়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি খুব আলাদা নয়। রাইড-শেয়ারিং ড্রাইভার, ফুড ডেলিভারি রাইডার, কিংবা গার্মেন্টস শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা বড় কর্পোরেট কর্মকর্তা—এদের কাজের ধরন, মজুরি, আর অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যা মার্কসীয় বিশ্লেষণ ছাড়া ব্যাখ্যা করা কঠিন। বিশেষ করে শ্রেণি সংগ্রাম—অর্থাৎ শ্রেণিভিত্তিক স্বার্থের সংঘর্ষ—এই ধারণাটি আজকের বিশ্ব ব্যবস্থায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশে এর বাস্তবতা খুব দৃশ্যমান। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলন, ডেলিভারি রাইডারদের অনিশ্চিত আয়ের কাঠামো, কিংবা বেসরকারি খাতে কর্মরত তরুণদের কাজের চাপ—সবকিছু মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এগুলো বৃহত্তর একটি অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ—যা বোঝার জন্য মার্ক্স এখনও একটি কার্যকর বিশ্লেষণী হাতিয়ার।

অভিজ্ঞতা আগে, তত্ত্ব পরে

আজকের প্রজন্ম তত্ত্ব দিয়ে শুরু করে না। তারা শুরু করে অভিজ্ঞতা দিয়ে। গিগ ইকোনমি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ—এই নতুন কাজের জগৎ তরুণদের সামনে এক ধরনের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে। নিজের সময় নিজের মতো ব্যবহার করার সুযোগ, অফিসের বাঁধনহীনতা, বিশ্ববাজারে কাজ করার সম্ভাবনা—সবই আছে।

কিন্তু এই স্বাধীনতার আড়ালেই আছে এক ধরনের অস্থিরতা। কাজ থাকলেও নেই স্থায়ী অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। এসব পেশায় আয় থাকলেও ধারাবাহিকতা নেই। আবার এই সুযোগের কারণে প্রতিযোগিতাও অসীম।

আবার, বাঁধাধরা নয়টা-পাঁচটা চাকরি করলে সেখানেও ‘এক্সপ্লয়েট’ এর শিকার হন কর্মীরা। বেশিরভাগ সময়ই বেতন ও কাজের সমন্বয় থাকে না। এই দ্বৈত বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে গেলে আমরা অজান্তেই এমন এক তাত্ত্বিক জায়গায় পৌঁছে যাই, যেটি ১৯শ শতকে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন কার্ল মার্ক্স। তাঁর মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিক তার শ্রমের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে না। সে কাজ করে, কিন্তু কাজের ফল—অর্থাৎ লাভের বড় অংশ তার হাতে থাকে না।

আজকের গিগ ওয়ার্কার, ফ্রিল্যান্সার বা কর্পোরেট চাকরিজীবী—হয়তো এই ভাষায় নিজের অবস্থাকে ব্যাখ্যা করে না। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা এই তত্ত্বের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।

‘মার্ক্স’—নাম নিয়ে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া

তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈততা আছে। তরুণদের মধ্যে যারা অ্যাক্টিভিজম বা সমালোচনামূলক আলোচনায় যুক্ত—তারা মার্ক্সকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করছেন। বৈশ্বিকভাবে পরিণত পুঁজিবাদ বা সম্পদের বৈষম্য নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানে মার্ক্স বারবার ফিরে আসছেন।

অন্যদিকে, একটি বড় অংশের কাছে মার্ক্স মানেই একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক পরীক্ষার প্রতীক। বিশেষ করে রুশ বিপ্লবের পর যে সোভিয়েত মডেল তৈরি হয়েছিল এবং ১৯৯১ সালে যার পতন ঘটে—সেই ইতিহাস অনেকের কাছে মার্ক্সবাদকে অবিশ্বাস্য করে তুলেছে। ফলে মার্ক্স নামটি এখন আর নিরপেক্ষ নয়। এটি এক ধরনের মতাদর্শিক অবস্থানও নির্দেশ করে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একদিকে, অনেক তরুণ মার্ক্সের ধারণাগুলোর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করে। বিশেষ করে যখন তারা বৈষম্য, শোষণ বা কর্পোরেট ক্ষমতার সমালোচনা করে।

অন্যদিকে, ‘মার্ক্স’ নামটি নিজেই অনেকের কাছে একটি রাজনৈতিক প্রতীক। বাংলাদেশের বেশিরভাগ তরুণদের কাছে তিনি ‘বাম রাজনীতি’র পথিকৃৎ হিসেবেই বেশি পরিচিত। ফলে দেখা যায়, একজন তরুণ হয়তো নিজের আয় নিয়ে কথা বলতে গেলে তাঁর উদাহরণ আনছেন, কিন্তু নিজেকে ‘মার্ক্সবাদী’ বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করছে না।

ডিজিটাল যুগে মার্ক্স

আরেকটা নতুন বাস্তবতা হলো—মার্ক্স এখন শুধু বইয়ের পাতায় নেই, তিনি মিমের ভেতরেও আছেন। টিকটক, ফেসবুক, বা টুইটারে তার নাম কখনো ব্যঙ্গ, কখনো সমর্থন, কখনো ভুল ব্যাখ্যার অংশ হয়ে ওঠে। অনেক সময়ই দেখা যায় কোনো জটিল বাক্য দিয়ে তাঁর বক্তব্য বলে মিম বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। যদিও কথাটি তিনি বলেননি। এই প্রজন্ম খুব দ্রুতই কোনো বিষয়ে তথ্য পেয়ে যায়, ফলে সবসময় এর গভীরে যায় না। ফলে মার্ক্সের জটিল তত্ত্ব অনেক সময় ‘ধনী বনাম গরিব’ এর সরলীকৃত বয়ানে আটকে যায়।

তাহলে প্রশ্ন আসে—এটা কি মার্ক্সকে ভুলভাবে জানার উদাহরণ, নাকি তার ধারণাগুলোর জনপ্রিয় হয়ে ওঠার প্রমাণ?

সোশ্যাল মিডিয়ায় মার্ক্স এখন শুধু একজন চিন্তাবিদ নন। তিনি একটি আইকন, কখনো একটি মিম, কখনো একটি স্লোগান। এতে একদিকে তার ধারণা সহজলভ্য হয়, অন্যদিকে তা আংশিকভাবে বিকৃতও হয়। ফলে আজকের তরুণরা তাঁর নাম জানলেও তা খুবই ‘সারফেস লেভেল’-এর ধারণা।

তাহলে, চেনে—না কি চেনে না?

সম্ভবত উত্তরটা মাঝামাঝি কোথাও।

আজকের তরুণরা হয়তো তাঁকে পুরোপুরি চেনে না। তাঁর জীবন, তাঁর লেখার জটিলতা, তার তাত্ত্বিক কাঠামো—সহজ কথায় তিনি আদতে কী বলেছেন—এসব তাদের অনেকেরই অজানা।

কিন্তু তারা যে বাস্তবতায় বাস করছে, যে প্রশ্নগুলো করছে, যে অসন্তোষগুলো প্রকাশ করছে—সেগুলো মার্কসীয় ধারণারই প্রতিফলন। অর্থাৎ, তারা হয়তো মার্ক্স ‘পড়ছে’ না, কিন্তু সেই ধারণাটিই ‘এক্সপেরিয়েন্স’ করছে।

ফলে তাঁর নাম না জানা বা তাঁর সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলেও তিনি বর্তমানের তরুণদের জীবনেই বেশি প্রাসঙ্গিক। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা ব্যাখ্যা করতে তাদের মার্ক্সের সাহায্য নিতেই হয়। তাই বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁর পরিচিতি নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও জীবনে তাঁর প্রভাব ঠিকই আছে।

সম্পর্কিত