ad
বিশ্ব মশা দিবস

যুদ্ধ থেকে দাসব্যবসা/মশা যেভাবে বদলে দিয়েছে মানব ইতিহাসের গতিপথ

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৫০
মশা যেভাবে বদলে দিয়েছে মানব ইতিহাসের গতিপথ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
মশা যেভাবে বদলে দিয়েছে মানব ইতিহাসের গতিপথ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

মশা ছোট। এতটাই ছোট যে হাতের এক চাপে তার অস্তিত্ব মুছে যায়। কিন্তু ইতিহাসের ওপর তার ছাপ মুছে ফেলা এত সহজ নয়। এই ক্ষুদ্র প্রাণী কখনো সেনাবাহিনী দুর্বল করেছে, কখনো যুদ্ধের ফলাফল বদলে দিয়েছে, আবার কখনো জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। উপনিবেশ বিস্তার থেকে শুরু করে মানবসভ্যতার নানা গুরুত্বপূর্ণ বাঁকেও মশাবাহিত রোগ রেখে গেছে প্রভাব।

ইতিহাসবিদ টিমোথি ওয়াইনগার্ড তাঁর ‘দ্য মস্কিটো: আ হিউম্যান হিস্ট্রি অব আওয়ার ডেডলিয়েস্ট প্রিডেটর’ বইয়ে এই বিষয়গুলো সামনে এনেছেন।

যুদ্ধের ফলাফল বদলে দিয়েছে মশক বাহিনী

মশার বিভিন্ন প্রজাতি আছে। এর মধ্যে ম্যালেরিয়াবাহী অ্যানোফিলিস মশা মানুষের চলাচল ও বসতি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে রোগ ছড়িয়েছে। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ, জলাভূমি, পুকুর কিংবা স্থির পানির জায়গা মশার জন্য উপযোগী।

ফলে কোনো সেনাবাহিনী যখন অপরিচিত এলাকায় প্রবেশ করেছে, তখন শত্রুসেনার পাশাপাশি লড়তে হয়েছে সেই এলাকার জীবাণু ও রোগের সঙ্গেও। সেনাবাহিনী অস্ত্রের আঘাতে যতটা দুর্বল হতে পারে, কখনো কখনো রোগের আক্রমণে তার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কোনো যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে মশা সরাসরি অস্ত্র না হয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

‘অ্যাগু অ্যান্ড ফিভার’, প্রকাশিত ১৭৮৮ সালের ২৯ মার্চ। সংগৃহীত ছবি
‘অ্যাগু অ্যান্ড ফিভার’, প্রকাশিত ১৭৮৮ সালের ২৯ মার্চ। সংগৃহীত ছবি

১৮৬২ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ মশার এই অদৃশ্য প্রভাব বোঝার একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোর সেনারা দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশ করতে থাকে। এদিকে উত্তরের অনেক সৈন্য মশাবাহিত রোগের সঙ্গে ততটা পরিচিত ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল উষ্ণ ও মশাবহুল হওয়ায় সেখানে গিয়ে তাঁরা ব্যাপকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অর্থাৎ দক্ষিণাঞ্চলের সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করার আগেই উত্তরাঞ্চলের সেনাদের একটি বড় অংশকে রোগের সঙ্গে লড়তে হয়। ফলে যুদ্ধও দীর্ঘায়িত হয় এবং এর পেছনে মশাবাহিত রোগও একটি কারণ হয়ে ওঠে।

তবে এই গল্প এখানেই শেষ নয়। যুদ্ধের পরের দিকে উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে পণ্য সরবরাহ নিষিদ্ধ থাকায় বিভিন্ন সংকট দেখা দেয়। এর মধ্যে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কুইনাইনের সরবরাহও কমে যায়। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সৈন্যরা মশাবাহিত রোগে আরও বেশি আক্রান্ত হতে থাকে। এক অর্থে, মশার দল যেন যুদ্ধের মাঝপথে নিজের পক্ষ বদলে ফেলল। এভাবেই একটি ক্ষুদ্র পোকা যুদ্ধের সামগ্রিক গতিপথে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।

আফ্রিকান দাস ব্যবসায় মশার প্রভাব

মশার প্রভাব শুধু যুদ্ধের ময়দানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আফ্রিকা ও আমেরিকার ইতিহাসেও এর প্রভাব দেখা যায়। আফ্রিকায় ম্যালেরিয়া ও হলুদ জ্বরের মতো মশাবাহিত রোগ বহু প্রজন্ম ধরে মানুষের জীবনের অংশ ছিল। ফলে কিছু আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব রোগের বিরুদ্ধে তুলনামূলক বেশি প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়।

অন্যদিকে, ইউরোপীয়রা যখন আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করতে যায়, তখন তারা মশাবাহিত রোগসহ বিভিন্ন নতুন পরিবেশগত ঝুঁকির মুখোমুখি হয়। ইউরোপীয় শ্রমিকদের অনেকে এসব রোগে মারা যেতেন। একই সময়ে আফ্রিকানদের একটি অংশের এসব রোগের বিরুদ্ধে তুলনামূলক বেশি প্রতিরোধক্ষমতা ছিল।

ছবিটি ১৮ শতকের শেষের দিকের ক্যারিবীয় অঞ্চলের। দাস বিদ্রোহ সফল হওয়ার পেছনে মশাবাহিত রোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সংগৃহীত ছবি
ছবিটি ১৮ শতকের শেষের দিকের ক্যারিবীয় অঞ্চলের। দাস বিদ্রোহ সফল হওয়ার পেছনে মশাবাহিত রোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সংগৃহীত ছবি

এই পার্থক্য পরবর্তীতে ইতিহাসের এক মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। আর তা হলো আফ্রিকান দাসব্যবসা। আমেরিকার উপনিবেশ ব্যবস্থায় আফ্রিকান মানুষদের দাস হিসেবে নিয়ে যাওয়ার পেছনে নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ ছিল। তবে মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতাও এই ব্যবস্থাকে লাভজনক করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল বলে ওয়াইনগার্ড তাঁর গবেষণায় তুলে ধরেছেন।

শুধু তা-ই নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও মশা ছিল বড় হুমকি। যুদ্ধরত সৈন্যদের জন্য ম্যালেরিয়া ছিল গুরুতর সমস্যা। মার্কিন সেনাবাহিনীর ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ প্রচারণায় শিশুতোষ লেখক ড. সিউসও কাজ করেছিলেন। তিনি অ্যানোফিলিস মশাকে নিয়ে ‘ব্লাডথার্স্টি এন’ নামে একটি চরিত্র তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল সৈন্যদের ম্যালেরিয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা।

জিনগত পরিবর্তন এনেছে মশা

মশার সঙ্গে মানুষের লড়াই শুধু বাইরে নয়, মানুষের শরীরের ভেতরেও হয়েছে। আফ্রিকায় ম্যালেরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে মানুষের শরীরে কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এর একটি উদাহরণ হলো সিকল সেল বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য থাকলে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

আফ্রিকার যেসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে বেশি ছিল, সেখানে এই বৈশিষ্ট্যটি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

শুধু মানুষ নয়, বড় বানরজাতীয় প্রাণী, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীদের মধ্যেও ম্যালেরিয়ার পরজীবীর সঙ্গে অভিযোজন দেখা যায়। তারা শরীরে ম্যালেরিয়ার পরজীবী বহন করলেও অনেক সময় খুব সামান্য বা কোনো উপসর্গই দেখায় না।

অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাণীই নিজেদের টিকে থাকার জন্য মশাবাহিত রোগের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

দুই বিশ্বযুদ্ধে যত মানুষ মারা গেছে, তার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ মরেছে মশার কামড়ে

২০১৭ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যানোফিলিস মশাকে মানুষের জন্য ‘সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ধারণা করা হয়, প্রতি বছর এই মশার কারণে প্রায় ৭ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

লেখক টিমোথি ওয়াইনগার্ডের মতে, অ্যান্টার্কটিকা, আইসল্যান্ড, সিসিলি ও ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার কয়েকটি ছোট দ্বীপ ছাড়া প্রায় পুরো পৃথিবীতেই মশার বিচরণ রয়েছে। আর সেই সংখ্যাও কম নয়। পৃথিবীজুড়ে প্রায় ১১০ ট্রিলিয়ন মশা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওয়াইনগার্ডের হিসাব অনুযায়ী, সৃষ্টির সূচনা থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ১০৮ বিলিয়ন মানুষ বাস করেছে। এর মধ্যে মশাবাহিত রোগে মারা গেছে প্রায় ৫২ বিলিয়ন মানুষ। অর্থাৎ মানুষের ইতিহাসে মশার মতো এত বড় ঘাতক প্রাণী আর নেই। এই সংখ্যা গত দুই বিশ্বযুদ্ধে যত মানুষ মারা গেছে, তার তুলনায়ও অনেক বেশি।

মশার সঙ্গে মানুষের লড়াই শুধু বাইরে নয়, মানুষের শরীরের ভেতরেও হয়েছে। আফ্রিকায় ম্যালেরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে মানুষের শরীরে কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

কারণ পৃথিবীর যেসব প্রাণীকে আমরা বিপজ্জনক ভাবি, যেমন বাঘ, সিংহ, হাঙর কিংবা সাপ, এগুলো কিন্তু নিজে থেকে আপনার ঘরে বা আপনার খুব কাছে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু এই সক্ষমতা মশার আছে। আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, সুযোগ পেলে মশা আপনাকে কামড় বসাবেই। তবে সেই কামড় যে সবসময় ‘মরণ কামড়’ হবে, তা নয়।

ডেঙ্গু, এনসেফালাইটিসের মতো রোগও মশার মাধ্যমে ছড়ায়। সিংহ কিংবা হাঙর নিয়ে যত ভয়ংকর গল্পই থাকুক, মানুষের মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে তারা মশার ধারেকাছেও নেই।

তবে আধুনিক বিজ্ঞান মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। মশারির ব্যবহার, কয়েল বা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার মশাকে আমাদের থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করছে। আবার অসুস্থ হলে রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা বহু মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। ডেঙ্গুর বিস্তার কমাতেও নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে।

এমনকি বিভিন্ন জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মশার রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা কমানোর সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। তবে সমস্যা হলো, এই প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুবিধা পৃথিবীর সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। সবার জন্য সমান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডাটা, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

মশা যেভাবে বদলে দিয়েছে মানব ইতিহাসের গতিপথ