স্ট্রিম ডেস্ক

বঙ্গভবন। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা দিলকুশার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন অনেক কিছুর সাক্ষী।
গল্পটা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। তখন এই জায়গায় ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের একটি বাগানবাড়ি। পরে সরকার সেটি কিনে নেয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর এর নাম হয় ‘গভর্নমেন্ট হাউস’। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে, ভবনটির নাম পাল্টে রাখা হয় ‘হাউস অব প্রভিন্স’। তারপর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আরও একবার নাম পরিবর্তন এই ভবনের। তখন নাম রাখা হয় ‘বঙ্গভবন’।
সেই বঙ্গভবনে আজ রোববার (২৩ আগস্ট) নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো। ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে এই ভবনে উঠলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কারণ, ভবনটির আরেক পরিচয়—‘রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়’।
বাংলাপিডিয়া বলছে, সুলতানি আমলে এই এলাকায় সুফিসাধক হজরত শাহজালাল দখিনি বসবাস করতেন। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের মৃত্যুর পর এখানে তাঁদের সমাধি হয় এবং জায়গাটি একটি মাজার হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে জায়গাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
মুঘল আমলে এই এলাকার সঙ্গে মির্জা মুকিমের নামও জড়িয়ে আছে। তিনি সুবাদার মীর জুমলার অধীনে নওয়ারা মহলের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর বাসস্থানের সঙ্গে থাকা দুটি বড় টিলার একটি এখনো বঙ্গভবনের সীমানার ভেতরে রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলে জায়গাটি একটি জমিদার পরিবারের মালিকানায় ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি জায়গাটি কিনে সেখানে একটি বাংলো তৈরি করেন। তিনি এর নাম দেন ‘দিলকুশা গার্ডেন’। সেই দিলকুশার একটি অংশই পরবর্তী সময়ে বঙ্গভবনের জায়গা হয়ে ওঠে।
বঙ্গভবনের বর্তমান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর। ওই বছর পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ তৈরি হলে নতুন প্রদেশের প্রধান শাসনকর্তা, অর্থাৎ লেফটেন্যান্ট গভর্নরের জন্য একটি অফিস ও বাসভবনের প্রয়োজন হয়। তখন দিলকুশা এলাকার জায়গাটি সরকারের অধীনে আসে এবং সেখানে একটি সরকারি ভবন নির্মাণ করা হয়।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশের যাত্রার সঙ্গে এই ভবনেরও যাত্রা শুরু হয়। তখন এর নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট হাউস’।
১৯০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি স্যার জোসেফ বামফিল্ড ফুলার, পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর, এই ভবনের দরবার হলে তাঁর সরকারি কাজ শুরু করেন। এরপর ভবনটি ‘দিলকুশা গভর্নমেন্ট হাউস’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
বঙ্গভবনের ইতিহাসের শুরু থেকেই এটি সাধারণ কোনো আবাসিক ভবন ছিল না। শুরু থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র।
১৯০৫ সালের পর পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর এবং তাঁর কর্মকর্তাদের জন্য ভবনটি ব্যবহার করা হতো। প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জোসেফ বামফিল্ড ফুলারের পর স্যার ল্যান্সলট হেয়ার ও স্যার চার্লস স্টুয়ার্ট বেইলির মতো লেফটেন্যান্ট গভর্নররাও এখানে ছিলেন। তাঁদের সময় ভবনটি শুধু প্রশাসনিক কাজের জায়গা ছিল না, ব্রিটিশ শাসনামলের প্রাদেশিক রাজধানীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ভারতের ভাইসরয়ও পূর্ববঙ্গ সফরের সময় এই ভবনে অবস্থান করতেন। ১৯১১ সাল পর্যন্ত ভাইসরয়ের পূর্ববঙ্গ সফরের সময় এটি তাঁর অস্থায়ী সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরও ভবনটির গুরুত্ব শেষ হয়নি। ঢাকার প্রশাসনিক গুরুত্ব বজায় থাকায় পরবর্তী সময়েও গভর্নর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভবনটির সম্পর্ক ছিল। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এর পরিচয় ছিল গভর্নমেন্ট হাউস বা গভর্নর হাউস হিসেবে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। ঢাকাই থাকে এর রাজধানী।
এরপর আগের গভর্নমেন্ট হাউস নতুন প্রাদেশিক গভর্নরের সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। তখন এর নাম বদলে হয় ‘গভর্নর হাউস’।
পূর্ববঙ্গ পরে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত হলে ভবনটিও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বাসভবন ও দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই ভবন ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।
বঙ্গভবনের বর্তমান চেহারা মূলত ১৯৬০-এর দশকের পুনর্নির্মাণের ফল। ১৯৬১ সালে একটি ভয়াবহ ঝড়ে গভর্নর হাউস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ভবনটির বড় ধরনের পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ হয় ১৯৬৪ সালে। আজকের বঙ্গভবন ১৯০৫-০৬ সালের সেই প্রথম ভবনের হুবহু চেহারা নয়। ১৯৬১ সালের ঝড়ের পর পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভবনটি বর্তমানের রূপ পায়।
এই সময় পর্যন্ত এখানে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নররা বসবাস করেছেন। ১৯৪৭ সালের প্রথম গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক চালমার্স বোর্ন থেকে ১৯৭১ সালের শেষ গভর্নর এ এম মালিক পর্যন্ত গভর্নর হাউস ছিল তাঁদের সরকারি বাসভবন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভবনটির পরিচয়ও বদলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি ছিল পাকিস্তানি শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন। স্বাধীনতার পর সেই ভবনই নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা গভর্নর হাউজে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই ভবনটির নতুন নাম ‘বঙ্গভবন’ করার সিদ্ধান্ত হয়। নামটির অর্থ দাঁড়ায় বাংলার ভবন।
এর কিছুদিন পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং বঙ্গভবন রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন হিসেবে নতুন পরিচয় পায়। তখন থেকে এটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়।
বঙ্গভবনের ভেতরের সবকিছু সাধারণ দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরকারি তথ্য থেকে ভবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশের পরিচয় পাওয়া যায়।
এর মূল ভবনে রয়েছে ঐতিহাসিক দরবার হল। এটি বঙ্গভবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক স্থানগুলোর একটি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান এখানে অনুষ্ঠিত হয়।

বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা বাংলাদেশ সফরে এলে তাঁদের সম্মানে এখানে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। ঈদ, জন্মাষ্টমী, দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, বড়দিন ও বাংলা নববর্ষের মতো বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও দরবার হলে হয়ে থাকে।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের কাজ পরিচালনার জন্য বঙ্গভবনে জন বিভাগ ও আপন বিভাগ নামে দুটি বিভাগ রয়েছে। রাষ্ট্রপতির সচিব ও সামরিক সচিবের নেতৃত্বে এসব বিভাগ পরিচালিত হয়। ফলে বঙ্গভবন একই সঙ্গে বাসভবন, কার্যালয় এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
বঙ্গভবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তোশাখানা। সহজভাবে বললে, এটি রাষ্ট্রীয় উপহার সংরক্ষণের ভান্ডার। দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিদেশি দূত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানকে বিভিন্ন সময়ে যে উপহার দিয়েছেন, তার একটি অংশ এখানে সংরক্ষিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে তৈজসপত্র, স্মারক মুদ্রা, স্মারক, প্রতিকৃতি, আলোকচিত্র, শিল্পকর্ম, লোকশিল্প ও হস্তশিল্পের নানা নিদর্শন।
এই সংগ্রহ এত বড় হয়েছে যে এর ২৫০টি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রীয় উপহার দেখার সুযোগ করে দিতে বিজয় সরণিতে সামরিক জাদুঘরের পাশে আলাদা রাষ্ট্রীয় তোশাখানা জাদুঘর ভবনও নির্মাণ করা হয়। ওই বছরের ২২ আগস্ট বঙ্গভবনের তোশাখানা থেকে ৭২৬টি উপহার সেখানে স্থানান্তর করা হয়।
দিলকুশা গার্ডেন থেকে গভর্নমেন্ট হাউস, সেখান থেকে গভর্নর হাউস, আর শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবন—নাম বদলের এই ধারাটিই আসলে ঢাকার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ পরিবর্তনের গল্প। আর সেই কারণেই বঙ্গভবন শুধু একটি সরকারি ভবন নয়; এটি এমন একটি জায়গা, যার দেয়ালের ভেতর দিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ভূখণ্ডের শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিবর্তন ঘটেছে।

বঙ্গভবন। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা দিলকুশার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন অনেক কিছুর সাক্ষী।
গল্পটা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। তখন এই জায়গায় ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের একটি বাগানবাড়ি। পরে সরকার সেটি কিনে নেয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর এর নাম হয় ‘গভর্নমেন্ট হাউস’। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে, ভবনটির নাম পাল্টে রাখা হয় ‘হাউস অব প্রভিন্স’। তারপর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আরও একবার নাম পরিবর্তন এই ভবনের। তখন নাম রাখা হয় ‘বঙ্গভবন’।
সেই বঙ্গভবনে আজ রোববার (২৩ আগস্ট) নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো। ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে এই ভবনে উঠলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কারণ, ভবনটির আরেক পরিচয়—‘রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়’।
বাংলাপিডিয়া বলছে, সুলতানি আমলে এই এলাকায় সুফিসাধক হজরত শাহজালাল দখিনি বসবাস করতেন। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের মৃত্যুর পর এখানে তাঁদের সমাধি হয় এবং জায়গাটি একটি মাজার হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে জায়গাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
মুঘল আমলে এই এলাকার সঙ্গে মির্জা মুকিমের নামও জড়িয়ে আছে। তিনি সুবাদার মীর জুমলার অধীনে নওয়ারা মহলের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর বাসস্থানের সঙ্গে থাকা দুটি বড় টিলার একটি এখনো বঙ্গভবনের সীমানার ভেতরে রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলে জায়গাটি একটি জমিদার পরিবারের মালিকানায় ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি জায়গাটি কিনে সেখানে একটি বাংলো তৈরি করেন। তিনি এর নাম দেন ‘দিলকুশা গার্ডেন’। সেই দিলকুশার একটি অংশই পরবর্তী সময়ে বঙ্গভবনের জায়গা হয়ে ওঠে।
বঙ্গভবনের বর্তমান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর। ওই বছর পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ তৈরি হলে নতুন প্রদেশের প্রধান শাসনকর্তা, অর্থাৎ লেফটেন্যান্ট গভর্নরের জন্য একটি অফিস ও বাসভবনের প্রয়োজন হয়। তখন দিলকুশা এলাকার জায়গাটি সরকারের অধীনে আসে এবং সেখানে একটি সরকারি ভবন নির্মাণ করা হয়।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশের যাত্রার সঙ্গে এই ভবনেরও যাত্রা শুরু হয়। তখন এর নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট হাউস’।
১৯০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি স্যার জোসেফ বামফিল্ড ফুলার, পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর, এই ভবনের দরবার হলে তাঁর সরকারি কাজ শুরু করেন। এরপর ভবনটি ‘দিলকুশা গভর্নমেন্ট হাউস’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
বঙ্গভবনের ইতিহাসের শুরু থেকেই এটি সাধারণ কোনো আবাসিক ভবন ছিল না। শুরু থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র।
১৯০৫ সালের পর পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর এবং তাঁর কর্মকর্তাদের জন্য ভবনটি ব্যবহার করা হতো। প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জোসেফ বামফিল্ড ফুলারের পর স্যার ল্যান্সলট হেয়ার ও স্যার চার্লস স্টুয়ার্ট বেইলির মতো লেফটেন্যান্ট গভর্নররাও এখানে ছিলেন। তাঁদের সময় ভবনটি শুধু প্রশাসনিক কাজের জায়গা ছিল না, ব্রিটিশ শাসনামলের প্রাদেশিক রাজধানীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ভারতের ভাইসরয়ও পূর্ববঙ্গ সফরের সময় এই ভবনে অবস্থান করতেন। ১৯১১ সাল পর্যন্ত ভাইসরয়ের পূর্ববঙ্গ সফরের সময় এটি তাঁর অস্থায়ী সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরও ভবনটির গুরুত্ব শেষ হয়নি। ঢাকার প্রশাসনিক গুরুত্ব বজায় থাকায় পরবর্তী সময়েও গভর্নর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভবনটির সম্পর্ক ছিল। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এর পরিচয় ছিল গভর্নমেন্ট হাউস বা গভর্নর হাউস হিসেবে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। ঢাকাই থাকে এর রাজধানী।
এরপর আগের গভর্নমেন্ট হাউস নতুন প্রাদেশিক গভর্নরের সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। তখন এর নাম বদলে হয় ‘গভর্নর হাউস’।
পূর্ববঙ্গ পরে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত হলে ভবনটিও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বাসভবন ও দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই ভবন ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।
বঙ্গভবনের বর্তমান চেহারা মূলত ১৯৬০-এর দশকের পুনর্নির্মাণের ফল। ১৯৬১ সালে একটি ভয়াবহ ঝড়ে গভর্নর হাউস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ভবনটির বড় ধরনের পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ হয় ১৯৬৪ সালে। আজকের বঙ্গভবন ১৯০৫-০৬ সালের সেই প্রথম ভবনের হুবহু চেহারা নয়। ১৯৬১ সালের ঝড়ের পর পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভবনটি বর্তমানের রূপ পায়।
এই সময় পর্যন্ত এখানে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নররা বসবাস করেছেন। ১৯৪৭ সালের প্রথম গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক চালমার্স বোর্ন থেকে ১৯৭১ সালের শেষ গভর্নর এ এম মালিক পর্যন্ত গভর্নর হাউস ছিল তাঁদের সরকারি বাসভবন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভবনটির পরিচয়ও বদলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি ছিল পাকিস্তানি শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন। স্বাধীনতার পর সেই ভবনই নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা গভর্নর হাউজে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই ভবনটির নতুন নাম ‘বঙ্গভবন’ করার সিদ্ধান্ত হয়। নামটির অর্থ দাঁড়ায় বাংলার ভবন।
এর কিছুদিন পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং বঙ্গভবন রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন হিসেবে নতুন পরিচয় পায়। তখন থেকে এটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়।
বঙ্গভবনের ভেতরের সবকিছু সাধারণ দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরকারি তথ্য থেকে ভবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশের পরিচয় পাওয়া যায়।
এর মূল ভবনে রয়েছে ঐতিহাসিক দরবার হল। এটি বঙ্গভবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক স্থানগুলোর একটি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান এখানে অনুষ্ঠিত হয়।

বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা বাংলাদেশ সফরে এলে তাঁদের সম্মানে এখানে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। ঈদ, জন্মাষ্টমী, দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, বড়দিন ও বাংলা নববর্ষের মতো বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও দরবার হলে হয়ে থাকে।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের কাজ পরিচালনার জন্য বঙ্গভবনে জন বিভাগ ও আপন বিভাগ নামে দুটি বিভাগ রয়েছে। রাষ্ট্রপতির সচিব ও সামরিক সচিবের নেতৃত্বে এসব বিভাগ পরিচালিত হয়। ফলে বঙ্গভবন একই সঙ্গে বাসভবন, কার্যালয় এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
বঙ্গভবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তোশাখানা। সহজভাবে বললে, এটি রাষ্ট্রীয় উপহার সংরক্ষণের ভান্ডার। দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিদেশি দূত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানকে বিভিন্ন সময়ে যে উপহার দিয়েছেন, তার একটি অংশ এখানে সংরক্ষিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে তৈজসপত্র, স্মারক মুদ্রা, স্মারক, প্রতিকৃতি, আলোকচিত্র, শিল্পকর্ম, লোকশিল্প ও হস্তশিল্পের নানা নিদর্শন।
এই সংগ্রহ এত বড় হয়েছে যে এর ২৫০টি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রীয় উপহার দেখার সুযোগ করে দিতে বিজয় সরণিতে সামরিক জাদুঘরের পাশে আলাদা রাষ্ট্রীয় তোশাখানা জাদুঘর ভবনও নির্মাণ করা হয়। ওই বছরের ২২ আগস্ট বঙ্গভবনের তোশাখানা থেকে ৭২৬টি উপহার সেখানে স্থানান্তর করা হয়।
দিলকুশা গার্ডেন থেকে গভর্নমেন্ট হাউস, সেখান থেকে গভর্নর হাউস, আর শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবন—নাম বদলের এই ধারাটিই আসলে ঢাকার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ পরিবর্তনের গল্প। আর সেই কারণেই বঙ্গভবন শুধু একটি সরকারি ভবন নয়; এটি এমন একটি জায়গা, যার দেয়ালের ভেতর দিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ভূখণ্ডের শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিবর্তন ঘটেছে।
.png)

মশা ছোট। এতটাই ছোট যে হাতের এক চাপে তার অস্তিত্ব মুছে যায়। কিন্তু ইতিহাসের ওপর তার ছাপ মুছে ফেলা এত সহজ নয়। এই ক্ষুদ্র প্রাণী কখনো সেনাবাহিনী দুর্বল করেছে, কখনো যুদ্ধের ফলাফল বদলে দিয়েছে, আবার কখনো জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। উপনিবেশ বিস্তার থেকে শুরু করে মানবসভ্যতার নানা গুরুত্বপূর্ণ বাঁকেও মশাবাহিত
২০ আগস্ট ২০২৬-1363a1-256x144.webp)
বুড়িগঙ্গার পানিতে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তা একদিন গিয়ে শেষ হলো ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে আলাদা করেছে এই চ্যানেল। কোনো এক সাঁতারুর ব্যর্থতার খবরই একসময় নাড়া দিয়েছিল বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা ব্রজেন দাসের। তাঁর মনে হলো, ইংলিশ চ্যানেল তাঁকে পাড়ি দিতেই হবে। এরপর সেই স্বপ্ন পূরণ
১৮ আগস্ট ২০২৬
আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এম মনসুর আলী ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৫ আগস্ট সকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং দেশজুড়ে সামরিক ও সান্ধ্য আই
১৬ আগস্ট ২০২৬
প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ঢাকা নগরীও এমন অসংখ্য পরিবর্তনের সাক্ষী। একসময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবাব কিংবা সমাজের উচ্চবিত্তরা ঢাকায় আসেন। তাঁদের সঙ্গে আসেন নানা ধরনের কারিগর, শিল্পী ও পেশাজীবীরাও। ফলে কলকাতা ও উত্তর ভারতের অনেক পেশা একসময় ঢাকায় প্রচলিত ছিল। সময়ের আবর্তে সেই পেশাগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে
০৯ আগস্ট ২০২৬